১৩ জুন ১৭৫৭, চন্দননগর থেকে যুদ্ধ যাত্রা করল ইংরেজ বাহিনী। নবদ্বীপ হয়ে ১৭ই জুন পাটুলি। ১৮ই জুন একদল গেল অগ্রদ্বীপ। মেজর আয়ারকুটের নেতৃত্বে এক দল পৌঁছাল কাটোয়া। কিন্তু কর্ণেল ক্লাইভ রইলেন পাটুলীতেই। ইতিমধ্যেই ১৬ জুন মীর জাফর ভরসা জুগিয়েছেন শেষ পত্রে। কিন্ত সেই ভরসাই কি শেষ কথা! গভীর চিন্তা আর উদ্বেগে অস্থির ক্লাইভ। সম্মুখেই নবাবের বিপুল বাহিনী। ইংরেজের যুদ্ধ যাত্রার খবর শুনে তারা পলাশীর লক্ষবাগ আম্রকাননে অর্ধবৃত্ত মরণ ফাঁদ রচণা করে আছে। মীর জাফর প্রধান সেনাপতি। এখনও নবাবের সঙ্গী। এ যদি ফাঁদ হয় সেখান থেকে বেঁচে ফেরা যাবে না। নির্জন প্রান্তরে শেয়াল কুকুরের খাদ্য হবে তাদের লাশ। এ দেশে ইংরেজের সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্নেও হয়ত ইতি ঘটবে সেখানেই!
১৯শে জুন শাঁখাই দুর্গ দখলের সংবাদ এল পাটুলি শিবিরে। তারপর কাটোয়া এলেন লর্ড ক্লাইভ। প্রায় বিনা যুদ্ধে গড় দখলে মীরজাফরের উপর আরও ভরসা বেড়েছিল তার। সম্ভবত ঐ কেল্লাদার ছিল মীরজাফর অনুগত। তাই যুদ্ধের খেলা করে দুর্গ ছেড়ে গেছে। ২০ জুন কালনা থেকে ওয়াটস সাহেবের পত্র নিয়ে এল এক দূত। তিনি নাকি মীরজাফর ও মিরন’এর সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন। তারও মতে মীরজাফরের আশ্বাস মিথ্যা নয়। তিনি নবাব বাহিনীর সাথে থাকলেও যুদ্ধে অংশ নেবেন না। ক্লাইভ আশ্বস্ত তবুও চূড়ান্ত সাবধানতার জন্য অধীনস্থ সকলের মতামত নিয়েই জীবন মরণের শেষ খেলায় নামতে চান।

২১ জুন মধ্য রাত্র। নিস্তব্ধ চরাচর। শুধু কাটোয়ায় শিবিরে জেগে ইংরেজ সেনাপতির দল। এক মন্ত্রণা সভায় উপস্থিত ২০ জন অধিনায়ক। সবাই চুপ। সভায় বলছেন রবার্ট ক্লাইভ। আমাদের সম্মুখে এখন দুটো পথ, এক, মীরজাফরের কথা মত যুদ্ধ করা, দুই, কাটোয়া দুর্গে দখল করা খাদ্য খেয়ে কয়েক মাস অপেক্ষা করে আরও শক্তি সঞ্চয় করা। তার পর মারাঠাদের সাহায্য নিয়ে নবাবকে আক্রমণ করা। বলুন, কে কোন মতের পক্ষে? দেখা গেল মাত্র সাত জন এখনই যুদ্ধের পক্ষে। বাকী তের জন, অর্থাৎ সংখ্যা গরিষ্ঠই অপেক্ষার পক্ষপাতী। স্বয়ং ক্লাইভও প্রাথমিক ভাবে সেই পক্ষেই ছিলেন। সেদিন ক্লাইভের মত সমর্থন করেন মেজর কিলপ্যাট্রিক ও গ্রান্ট কিন্তু তাদের বিরোধিতা করে ফুট সাহেব বললেন এখানে সময়ক্ষেপ করা ভুল তাতে সৈন্যদের সাহস নষ্ট হবে। ওদিকে ফরাসী সেনাপতি মুসে ল নবাবের সঙ্গে যোগ দিলে হিতে বিপরীত হবে। নবাবও বল বৃদ্ধির সময় পাবেন। এমন অবস্থায় সভা ভঙ্গ হল। অর্ম বলেন, ক্লাইভ কাছের বাগানে নির্জনে চিন্তামগ্ন হলেন। গভীর চিন্তার পর বুঝলেন ফুট সাহেবের কথাই ঠিক। তাই শিবিরে ফিরেই আদেশ দিলেন, ‘প্রত্যুষে সৈন্যগন গঙ্গা পার হইবে’। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণার ভার ছিল তার হাতে। সবাই ফিরে গেলেন নিজ নিজ তাঁবুতে। সেই বিনিদ্র রাতে কি ভেবেছিলেন ক্লাইভ! মনে আশা নিরাশার দোলা! দুঃস্বপ্নে মৃত্যুর হাতছানি! তবু পিছনে ফেরার পথ নেই। ইংরেজ বীরের জাত। মরলে মরবেন বীরের মতই। তাই হয়ত সম্মুখে এগিয়ে চলার সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন। এ বিষয়ে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার বলেছেন, “Clive was filled with anxiety as he gazed at an uncertain future… upto this time he had received nothing but bare promises from MirJarfar… a and he hesitated to risk the fortunes of the company on the bare word of a man who was a traitor to his own sovereign. So he first thought of holding his present position at Katwa (insted of crossing the Ganges and advancing on Murshidabad) till the end of rainy season”.
২২শে জুন সকালে ভাগীরথীর পশ্চিম কূল ধরে এগিয়ে সাত আট কিলোমিটার দূরে সম্ভবত সিরুলীর ঘাটে নদী পার হল ইংরেজ বাহিনী। তার একটু দূরেই সেই বিখ্যাত পলাশীর লক্ষবাগ আম্রকানন। যেখানে ২৩ শে জুন ১৭৫৭, হল পলাশীর যুদ্ধ। যুদ্ধ না প্রহসন! তাই পরাজিত হলেন নবাব সিরাজদৌল্লা। এ শুধু তার পরাজয় ছিল না। ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের পরাজয়। বিখ্যাত পর্তুগিজ ঐতিহাসিক বাকসার পলাশীর যুদ্ধকে গুরুত্বের দিক থেকে পৃথিবীর সেরা যুদ্ধগুলোর অন্যতম মনে করেন। এ বিষয়ে প্রখ্যাত ভারতীয় ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ সরকার বলেছেন “Thursday the 23 June 1757 exactly one year and two days after the Nawab’s capture of Calcutta witnessed a battle which was destined to revolutionise the life of India and indirectly and slowly that of Eastern hemisphere”.

২৩ জুন সকাল ৮টার দিকে যুদ্ধ শুরু হয়। ইংরেজদের বাহিনীর তুলনায় নবাবের বাহিনীর আকার অনেক বড় হলেও মীরজাফর, ইয়ার লতিফ এবং রায় দুর্লভের অধীনস্থ প্রায় দুই তৃতীয়াংশ সৈন্য নিষ্ক্রিয় দাঁড়িয়ে থাকে। মীর মর্দান, মোহনলাল, খাজা আব্দুল হাদী খান, নবে সিং হাজারীর নেতৃত্বাধীন সৈন্যরা এবং ফরাসী সৈনিকদের একটি দল যুদ্ধ চালিয়ে যায়। ক্লাইভ যুদ্ধে ধারণার চেয়ে বেশি প্রতিরোধের সন্মুখীন হন। যুদ্ধ চলাকালে বৃষ্টিতে নবাব এবং ফরাসীদের কামানের গোলায় ব্যবহৃত গানপাউডার ভিজে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে। কিন্তু ইংরেজরা তাদের গান পাউডার সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হয়। জানা যায়, ক্লাইভ দিনে যুদ্ধ চালিয়ে রাতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের এক পর্যায়ে বেলা তিনটার দিকে কামানের গোলার আঘাতে মীরমদন নিহত হলে নবাব ভেঙে পড়েন এবং প্রধান সেনাপতি মীর জাফরের কাছে পরামর্শ চান। মীরজাফর নবাবকে যুদ্ধ বন্ধ করে পরবর্তী দিনে নতুন উদ্যমে যুদ্ধ করার পরামর্শ দেন।
মোহনলালের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও নবাব যুদ্ধ বন্ধের নির্দেশ দেন। নবাবের সৈন্যরা পিছু হটে আসে। মীরজাফরের বার্তা পেয়ে ইংরেজরা নবাবের অপ্রস্তুত বাহিনীর ওপর হামলা চালায় এবং যুদ্ধে জয়লাভ করে। ফলে প্রায় ২০০ বছরের জন্য বাংলা স্বাধীনতা হারায়। প্রতি বছর সে জন্য ২৩ জুন পলাশী দিবস হিসাবে পালিত হয়। ১৭৫৭ সালের এইদিনে পলাশী প্রান্তরে রবার্ট ক্লাইভ, মীরজাফর, রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফ চক্র এই কালো দিবসের জন্ম দেয়। ঘৃণিত কলঙ্কজনক এই প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের অধ্যায় সৃষ্টির পেছনে জড়িত ছিল বিশ্বাসঘাতক জগৎশেঠ, মাহতাব চাঁদ, উমিচাঁদ, মহারাজা স্বরূপচাঁদ, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র, রায়দুর্লভ, মীর জাফর, ঘষেটি বেগম, রাজা রাজবল্লভ, নন্দকুমার প্রমুখ কৌশলী চক্র। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কুচক্রীদের সাহায্যে এভাবেই বাংলায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। এরপর সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দীর্ঘ ১৯০ বছর এদেশে শাসন শোষণ করে। কোটি কোটি টাকার অর্থ সম্পদ ইংল্যান্ডে পাচার করে। বাংলাদেশ থেকে লুটকৃত পুঁজির সাহায্যে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব ঘটে। আর এককালের প্রাচ্যের স্বর্গ সোনার বাংলা পরিণত হয় শ্মশান বাংলায়, স্থান পায় বিশ্বের দরিদ্রতম দেশে। এ যুদ্ধের রাজনৈতিক ফলাফল ছিল ধ্বংসাত্মক ও সুদূরপ্রসারী। এ যুদ্ধে জয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বাংলা ব্রিটিশদের অধিকারে চলে আসে। বাংলা অধিকারের পর ক্রমান্বয়ে ব্রিটিশরা পুরো ভারতবর্ষ এমনকি এশিয়ার অন্যান্য অংশও নিজেদের দখলে নিয়ে আসে। পলাশীর যুদ্ধের এই নৃশংস ও কলঙ্কজনক ঘটনার মাধ্যমে কলকাতা কেন্দ্রিক একটি নতুন উঠতি পুঁজিপতি শ্রেণী ও রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটে। ইংরেজ ও তাদের এ দেশীয় দালালগোষ্ঠী দেশবাসীর ওপর একের পর এক আগ্রাসন চালায়। ফলে দেশীয় কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনে ব্যাপক বিপর্যয় নেমে আসে যার অভিঘাত এখনও মুছে যায়নি এই উপমহাদেশ থেকে।পলাশী যুদ্ধ বিষয়ে যদুনাথ সরকার বলেছেন “Thursday the 23 June 1757 exactly one year and two days after the Nawab’s capture of Calcutta witnessed a battle which was destined to revolutionise the life of India and indirectly and slowly that of Eastern hemisphere”.

কিন্ত ২১শে জুন, মধ্যরাতে কাটোয়ার সেই কাউন্সিল সভায় সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত যদি ক্লাইভ মেনে নিতেন তা হলে কি হত? হয়ত অন্য ইতিহাস রচনা হত! ফুট সাহেবের কথামত ফরাসী সেনাপতি মুসে ল নবাবের সঙ্গে যোগ দিলে ও সময় পেলে নবাবের শক্তি সাহস বৃদ্ধি পেত। এদিকে অযথা সময়ক্ষেপে হতোদ্যম হয়ে পড়ত ইংরেজ বাহিনী। হিতে বিপরীত হবার সমূহ সম্ভাবনা ছিল। অর্থাৎ সেই রাত্রে ক্লাইভের সিদ্ধান্তই বদলে দিয়েছিল বাংলা তথা ভারতীয় উপ-মহাদেশের ভাগ্য। কজন জানে কাটোয়ার মাটিতেই রচিত হয়েছিল সেই ঐতিহাসিক মহেন্দ্রক্ষণ! আশ্চর্য! ইংরেজের সুবে বাংলা দখলের বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়েছিল এই কাটোয়াতেই। ১৭৬৩ খ্রীষ্টাব্দে কাটোয়া ও অগ্রদ্বীপের যুদ্ধে মীরকাশীমকে পরাজিত করে ইংরেজ বাহিনী। বাংলা থেকে ইংরেজ বিতাড়নের স্বপ্নের শেষ টুকুও নিঃশেষ হয়েছিল সেদিন।

সেই পলাশী আছে এখনও, আছে কাটোয়া। কিন্ত ইতিহাসে বড়ই উপেক্ষিত তারা। পলাশীর যুদ্ধ ক্ষেত্রের অধিকাংশই এখন ভাগীরথীর গর্ভে। সেই আম্রকানন নেই। বাগানের শেষ আম্র বৃক্ষটি ১৮৭৯ সালে সমূলে উঠিয়ে প্রদর্শনের জন্য ইংল্যান্ড নিয়ে গেছে ইংরেজ। বড়ই গর্বের স্মৃতি ওদের। যুদ্ধ ক্ষেত্রের দক্ষিণে তেজনগর বা নতুন পলাশী গ্রাম বসেছে। নদীয়া জেলার কালীগঞ্জ থানা। প্রচুর পর্যটক আসেন প্রতি বছর। দেখে যান ইংরেজ স্থাপিত যুদ্ধ স্মারক স্তম্ভ (পলাশী মনুমেন্ট), রয়েছে শহীদ মীর মদনের স্মৃতি স্মারক। আর ধূ ধূ প্রান্তর। মাথা উঁচু করে আসেন যারা, ফিরে যান মাথা নিচু করে। দেশের দুশো বছরের লজ্জা জমা আছে এখানেই। আবার অনেক শিক্ষাও আছে। প্রতি বছর ২৩শে জুন, সেই শিক্ষা নেওয়ার দিন।
তথ্য ঋণ:-
১। কালীপ্রসন্ন বন্দোপাধ্যায়, ২। দীনেশচন্দ্র সেন, ৩। নিবারণ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ৪। উইকিপিডিয়া ৫। উইকিপিডিয়া