৪৬. ‘সওগাত’-এর নাসিরুদ্দিন
একদিন সকালবেলা এক যুবক এলেন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে। দেখা করবেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। দোতলায় উঠে তিনি রবীন্দ্রনাথকে প্রণাম করলেন/বললেন কবির কাছে একটা আর্জি নিয়ে এসেছেন।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর নামধাম জেনে নিয়ে বললেন, কি করো তুমি?
যুবক বললেন, একটা চাকরি করি। কিন্তু পত্রিকা প্রকাশ করা আমার নেশা।
কবি বলেন, নেশাটা ভালো নয়, যাকে বলে সব্বনেশে নেশা।
যুবক তাঁর ঝোলা থেকে একটা পত্রিকা বের করে রবীন্দ্রনাথের হাতে তুলে দিলেন। পত্রিকার নাম ‘সওগাত’। হাত বাড়িয়ে পত্রিকাটি নিয়ে কবি দেখতে লাগলেন। দ্বিধা ও ভয় কেটে গেল যুবকের। একজন বিরাট মাপের মানুষ তাঁর কথা শুনছেন, তাঁর পত্রিকা উল্টে-পাল্টে দেখছেন।
যুবক বলেন, আমাদের মুসলমান সমাজে ভালো সাহিত্য পত্রিকা ছিল না, তাই আমি সাহস করে এগিয়েছি।
কবি বলেন, হিন্দু-মুসলমান নিয়ে আমাদের দেশ। তার একটা অংশে যদি আলো না পড়ে তাহলে দেশের সামগ্রিক উন্নতি হবে কি করে! তুমি যে সাহস করে এগিয়েছ,এটা ভালো কথা। কিন্তু….
কিন্তু কি! অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন যুবকটি।
রবীন্দ্রনাথ বলেন,নিশ্চয়ই সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছে তোমাকে!
যুবক বলেন, হ্যাঁ, এক শ্রেণির মোল্লা-মৌলবি জেহাদ ঘোষণা করেছেন। এ পত্রিকা পড়া গুণাহ বলে দিয়েছেন ফতোয়া।
রবীন্দ্রনাথ বলেন, এই নিন্দাই তোমার পুরস্কার। নিন্দা না থাকলে মহত্বের গৌরব কোথায়?
তারপর পত্রিকার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে তিনি বলেন, আরে, তুমি তো হিন্দু-মুসলমানের মিলনক্ষেত্র তৈরি করেছ। কিন্তু তোমাকে যে আরও গুরু দায়িত্ব পালন করতে হবে।
গুরু দায়িত্ব!
রবীন্দ্রনাথ বলেন, তৈরি করতে হবে মুসলমান লেখকদের। তাঁরা সাহিত্যে ফুটিয়ে তুলবেন মুসলমানদের জীবনচিত্র। বাংলা সাহিত্যে তার অভাব আছে।
এই যুবকের নাম মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন (১৮৮৮-১৯৯৪)। কুমিল্লা জেলার চাঁদপুর মহকুমার অন্তর্গত পাইকারদি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। চালিতাবলি এডওয়ার্ড ইন্সটিটিউশনে পড়তেন তিনি। বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে নানা পত্রিকা পড়তে পড়তে তাঁর মনে সাহিত্য প্রীতির উন্মেষ। এই রকম একটা পত্রিকা প্রকাশ করার ইচ্ছা জাগে মনে।
কিন্তু বিধি বাম। হঠাৎ মারা গেলেন বাবা। জীবিকার সন্ধানে কলকাতায় আসতে হল তাঁকে। ঢুলেন এক বিমা কোম্পানিতে। এ দেশে বিমা কোম্পানির প্রথম মুসলমান এজেন্ট তিনি। উপার্জন বাড়ল। দেশে টাকা পাঠাতে লাগলেন। অবদমিত স্বপ্নটা আবার মাথা চাড়া দিল।
চেনা-জানা বন্ধুদের বললেন। তাঁরা কেউ পাত্তা দিলেন না। দমলেন না নাসিরুদ্দিন। গেলেন সাদাত হোসেনের কাছে। তিনি নাসিরুদ্দিনকে নিয়ে গেলেন আবদুর রসুলের কা্ছে। ইনি কুমিল্লার জমিদার বংশের সন্তান। আর্থিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিলেন তিনি। কিন্তু প্রতিশ্রুতি পালনের আগেও অকালমৃত্যুর শিকার হলেন আবদুর রসুল।
নিজের সামান্য পুঁজি আর কিছু বন্ধুর সাহায্যে শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হল এক নতুন ধরনের পত্রিকা। সচিত্র মাসিক পত্রিকা। সেখানে বাধা ছিল। মুসলমান সমাজে ছবিওয়ালা পত্রিকার চল নেই।
তাই ছবির জন্য শিল্পী গণেশ ব্যানার্জীর দ্বারস্থ হতে হল।
সওগাতের প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৩২৫ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণে (নভেম্বর-ডিসেম্বর, ১৯১৮)। প্রথম সংখ্যায় যাঁদের লেখা প্রকাশিত হয় তাঁরা হলেন —
মিসেস আর এস রহমান, মানকুমারী বসু, মোহাম্মদ কে চাঁদ, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজি, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, ব্রজমোহন দাস, শাহাদাৎ হোসেন, রসময় লাহা, জীবেন্দ্রকুমার দত্ত, জলধর সেন, ফজলুর রহিম, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, এস এম হোসেন, পাঁচুলাল ঘোষ, ওয়াছিমুদ্দিন আহমদ, আবদুল গফুর, চণ্ডীচরণ মিত্র, কায়কোবাদ প্রভৃতি। তাই রবীন্দ্রনাথ পত্রিকাকে হিন্দু-মুসলমানের মিলনক্ষেত্র বলেছিলেন।
পত্রিকার জন্য সাতটি নীতি নির্ধারণ করেছিলেন নাসিরুদ্দিন :
১] লেখকদের স্বাধীনতা প্রকাশের সুযোগ দেওয়া; মুক্তবুদ্ধি ও স্বাধীন চিন্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
২] প্রথম শ্রেণির মাসিকের আদর্শে প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা, উপন্যাস দ্বারা পত্রিকার অঙ্গসৌষ্ঠব বৃদ্ধি করার চেষ্টা করা।
৩] সমাজের অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে মানুষকে জাগ্রত করার চেষ্টা করা।
৪] পত্রিকার প্রতি পাঠকের আকর্ষণ বৃদ্ধি করার জন্য বিভিন্ন বিষয়ে সচিত্র প্রবন্ধ ও মুসলিম জগতের সচিত্র বিবরণ নিয়মিত প্রকাশ করা।
৫] নারীশিক্ষা ও নারী জাগরণমূলক প্রবন্ধাদি ও’চিত্রে মহিলা জগৎ’ প্রকাশ করা, মহিলাদের সাহিত্য সাধনায় উৎসাহিত করা।
৬] তরুণ লেখকদের লেখা প্রকাশ করে তাদের উৎসাহিত করা।
৭] নির্ভীক, নিরপেক্ষ সম্পাদকীয় নীতি গ্রহণ করা।
১৯১৮ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত সগৌরবে প্রকাশিত হয়েছিল এই পত্রিকা। কাজি নজরুল ইসলাম যোগ দিলেন পত্রিকার সঙ্গে। উদারপন্থী ও স্বাধীন চিন্তা-ভাবনার ক্ষেত্রে প্ররণা জোগালেন নজরুল। এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট লেখকদের লেখা। বহু তরুণ লেখক অনুপ্রাণিত হয়েছেন এই পত্রিকার দ্বারা।
অসাধারণ তথ্য সম্বলিত প্রতিবেদন।
অনেক কিছু জানতে পারলাম এক অসামান্য মানুষ সম্পর্কে।
লেখকের কাছে আরও অনেক কিছু জানার প্রত্যাশা রইলো।