রবিবার | ৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | সকাল ৮:১৬
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্মৃতিবেলা : শিশুবেলা : ড. শিবশঙ্কর পাল ইবোলা ভাইরাস দ্রুত ছড়ালেও আতঙ্ক ছড়াবেন না, সতর্ক থাকাই একমাত্র পথ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পরিবেশ দিবসে রবীন্দ্রনাথ : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সিন্ধুসভ্যতা বিশেষজ্ঞ র‍্যান্ডাল ল’-র সুতকাগেনদোর-সফরের নির্যাস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘পঞ্চাশ নম্বরে নাম’ ক্ষয়িষ্ণু পুরুষ লেখক সসীম কুমার বাড়ৈ আলোচক সুতপা দত্ত দাশগুপ্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতার হকার, উচ্ছেদ অভিযান, ইতিহাসের প্যারাডক্স : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিনোদিনী দিন ফিরিবার নয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আইসক্রিমের দারুন স্বাদে গরম হোক উধাও : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-এর ছোটগল্প ‘পদ্মপাতার জল’ নজরুলের চোখে ক্ষুদিরাম : শৌনক ঠাকুর ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ইতিহাসসাধক স্বদেশরঞ্জন মণ্ডল : দিলীপ মজুমদার এবারে দশহরাতে আরামবাগের মনসাডাঙ্গার মনসা মাতার পূজায় ছাগবলি বন্ধের সিদ্ধান্ত : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বরেন্দ্র ও গৌড়ীয় ব্রাহ্মণ সমাজের ইতিহাস, কুলপঞ্জি ও অভিলিখনের সমন্বয়ে একটি পুনঃপাঠ : অত্রি ভট্টাচার্য ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘ছেঁড়া জামার ঈশ্বর’
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

স্মৃতিবেলা : শিশুবেলা : ড. শিবশঙ্কর পাল

ড. শিবশঙ্কর পাল / ৫৫ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

পিঠে ব্যাগভর্তি বই আর ঠাসা ক্লাসের দিন তখনও আসেনি। তখনও রুটিন ধরে আঁকা— নাচা— সাঁতার কাটার রেওয়াজ হয়নি শুরু। প্রথম হতেই হবে এ-বোধও দেওয়া হয়নি গেঁথে। বা এই চাপ। তখন সকাল ছিল ফুরফুরে। দুপুর ছিল ফড়িং ধরার। পুকুরে স্নান করার। বিকেল ছিল মাঠে ঘাটে প্রকৃতি থেকে নেওয়ার। দেখার। বোঝার। সোহাগ খাওয়ার। গলায় শালুক ফুলের মালা ঝোলানো। মাথায় পাতার মুকুট পড়া। গামছা ছেঁকে মাছ ধরার। পাখির ডাক চেনার। কোথায় কি ফল ধরেছে তার খোঁজ রাখার। সময়টা খুব পিছনের নয়। তিন দশক পিছলেই এই চিত্র ছিল খুব চেনা। শিশুদের জীবনছন্দে ওটাই ছিল রেওয়াজ। যদিও প্রথাগত বিদ্যালয় তখনও ছিল। ছিল বেত। ঘন্টা। কিন্তু চাপের চাপ ছিলনা। সে সময়ের শিশু জীবন ছিল অনেকটাই প্রকৃতি ঘেঁষা। সেসব দিনের কথা অনেকের কাছেই সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে রাখা মতো। যা এখনকার ছেলেবেলা বা মেয়েবেলার সঙ্গে মেলানো বেশ মুশকিল। সেসব নিয়েই কয়েকটি কথা—

আঁস্টে ফল। আশ-শেওড়া গাছে ধরতো। একটু আঁস্টে গন্ধযুক্ত। দেখতে গোল। ঘন কালো রঙ। ভিতরে থাকত সাদা থকথকে জেলির মতো রসালো অংশ। যা গোগ্রাসে গিলতো ছোটরা৷ এসব ফল এখন আর দেখাও যায়না। অথচ সেসময় মাঠে ঘাটে হামেশায় দেখা যেত আঁস্টে ফলের গাছ। সে ফল খেলে বাড়ির বকুনি খেতে হতো ঠিক। কিন্তু তার লোভ কিছুতেই এড়ানো যেত না। থোকা থোকা আঁস্টে ফল নিয়ে গোল হয়ে বসে পরা হতো। সে এক মহাভোজ। রসে টইটম্বুর ফলাহার। প্রকৃতির এরকম অকৃপণ দানে ছেলেবেলা মেতে থাকত। বকুল গাছকে বলা হতো বোল গাছ। তার ফলও বোল ফল। অনেকটা করমচার মতো দেখতে। পেকে উঠলে তার রঙ হতো কমলা। বোল ফলের উপরের কমলা খোসাটা ছাড়ালেই পাওয়া যেত ঘন শাঁস। যা মুখে একটু কষো কষো ঠেকত। কিন্তু ঘন ক্রিমের মতো বোল ফলের শাঁস হতো খুব মিস্টি। যা খেতে পাগল হতো ছোটরা। এখন হয়তো ছেলেপুলে ওসব ফলের রঙও চেনে না। তার স্বাদ পাওয়া তো দূরের কথা। এভাবেই কাটতো ছোলবেলা। স্কুলের ফাঁকে, ছুটির দিনে, বর্ষায় ভিজে ফল কুড়াতে যাওয়াও ছিল একটা খেলা। একটা প্রতিযোগীতা। এভাবেই হয়তো তারা প্রকৃতির হাত ধরে প্রতিযোগীতা শিখে যেত। প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করে নেওয়ার বিদ্যা রপ্ত করতো।

‘ফলসা বনের গাছে গাছে

   ফল ধরে মেঘ ঘনিয়ে আছে।’

জিলিপি গাছ। হয়তো অনেকে নামটাই শোনেনি। তখন জিলিপি বলে এক ধরনের ফল ধরতো। জিলিপির মতো আকৃতি। প্যাঁচানো প্যাঁচানো। গোটা গাছে কাঁটাও থাকত। কাঁচায় যা সবুজ। পাকলে হয়ে উঠত লাল। জিলিপি ফলের উপরের খোসা ছাড়ালে ভিতরে পাওয়া যেত মেওয়ার মতো সাদা-লাল অংশ। ভারি মিস্টি সেই শাঁস। ঢিল মেরে পাড়া হতো সে ফল। তারপর সবাই মিলে ভাগ করে চলতো ভোজন পর্ব। জিলিপি ফল যারা না খেয়েছে তারা এর মাহাত্ম্য বুঝবে না। কোন জঙ্গলে কোথা জিলিপি ফল ধরে আছে তাও হিসেব করে রাখা হতো। সময় হলেই তাক মেরে ছোড়া হতো ঢিল। তাতেই হয়তো নিশানার হাতেখড়ি হয়ে যেত ওসব ছেলেপুলের। তালগাছে উঠে তালপাড়া বা তালকাটাও ছিল এক অ্যাডভেঞ্চার। এতে একটু বড়ো ছেলেদের দরকার হতো। আর সাহায্যের বিনিময়ে ছোটরা পেত কচিকচি তালবিচি। অনেকেই হয়তো জানে না যে তালের আঁটিতে একটা আশ্চর্য ভোজ্য বস্তু লুকিয়ে থাকত। তাল-আঁটি প্রায় একবছর পুরনো হয়ো গেলে তার ভিতরে ওটা পাওয়া যেত। যেটাকে বলা হতো আঁকুড়। তাল-আঁটিকে কাটারি দিয়ে কেটে বার করা হতো আঁকুড়। যা দেখতে ধবধবে সাদা। ফাঁপা। নরম স্পঞ্জের মতো। খেতে অতি মিস্টি। কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর দিন এখনও গ্রামাঞ্চলে তাল আঁকুড় খাওয়া হয়। এরমই ছিল তখনকার ছোলবেলার খাওয়া দাওয়া। আর এসব করতে গিয়ে নানা কাণ্ডকারখানাই ছিল তখনকার খেলাধূলা। শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সুষ্ঠ বৃদ্ধি এভাবেই হয়ে যেত। গাছে চড়া, সাঁতার কেটে শালুক ফুল তোলা, দৌড়ে মাঠ পার হওয়া, লাফিয়ে নালা ডিঙানো এসবেই হয়ে যেত ব্যায়ামের ক্লাস। কাগজ ফুলের পাঁপড়ির মতো পাতলা, অনেকটা গোলাকৃতি একটা ফল। চাকলদা গাছে ধরতো। চারিদিকে কাগজের মতো পাতলা পাঁপড়ি। মাঝে শক্ত খোলার ভিতরে থাকত বাদাম ফল। যা চ্যাপ্টা, পাতলা, শক্ত। স্বাদ ছিল অনেকটা বাদামের মতো। সেই বাদাম ফল কুড়িয়ে খাওয়া ছিল আরেক মজা! মজার জীবন! পকেটে মুড়ির নাড়ু ভরে খেলতে যাওয়া ছিল অন্য আনন্দ। ঘরে ভাজাপুলি পিঠে হলে গণ্ডা কয়েক পকেটে পুরে ছেলেরা ছুটতো মাঠে। খুব পিপাশা পেলে দিঘির কাঁচ-কালো জল খেলেও তেমন কিছু হতো না। এ কারনেই হয়তো সুকুমার রায় লিখেছিলেন—

‘চট করে মনে পরে মটকার কাছে

   আধখানা মালপোয়া কাল থেকে আছে।’

টক-টক শেয়ালকুল খাওয়া বা নদীর পাড়ে খুদি-জাম গাছের জাম খাওয়া চলতো দেদারে। ওসব গাছের মালিকালা বলেও কিছু হতো না। কাঁচা খেজুর পেড়ে এনে জলে চুবিয়ে পাকাতে দেওয়া হতো। আর গাছের পাকা খেজুর গাছের নিচে বসেই সাবার করা হতো। আবার অনেকেই হয়তো জানেনা পাকা ডুমুরের কি অদ্ভুত স্বাদ। গন্ধ। খেজুর গাছ কাটলে তার গোঁড়ার দিকে একেবারে ভিতরের সাদা, কচি অংশ চিবিয়ে কি সুখ! আমড়ার (টক স্বাদের) মুকুল চেবানো, পদ্মের চাকার ভিতরের সাদা অংশও খেত সবাই। মাঠের খেত থেকে পাকা পাকা বাঙি বা ফুট-এর ছিল অন্য স্বাদ৷ সেসময় ঘরেও খাওয়া হতো বাঙি বা ফুট। খেত থেকে কাঁচা ছোলা, কচি মটর তুলে খেয়ে কি আনন্দ। এমনকি খেতের পাকা টমেটো, টক পালঙ পাতাও বাদ যেতনা। আখের জমিতে চুরি করে আখ ভাঙা। খাওয়া। তা নিয়ে ধরা পড়ার ভয়। অথচ লোভ সামলাতে না পারার শিশুবেলা কি আনন্দমধুর! আবার ধরা পরলে বাবামায়ের পিটুনি-বকুনির হরেক ঝক্কি। কাঁঠাল বীজ পোড়া, আলুর জমিতে আলু পোড়ানো, ধান সিদ্ধ হাঁড়িতে মাটি মাখিয়ে ডিম সিদ্ধ করা, খেজুর গাছ হতে খেজুর-রস পেড়ে খাওয়া— এসব নানা কাণ্ড ছিল রোজজীবনের অঙ্গ। এসব করেই কেটে যেত শৈশব। এসব কাণ্ড করা শিশুরাও হয়ে উঠত বড়ো মাপের মানুষ। যারা ছোট থেকে একে অপরের পাশে দাঁড়াতে শিখত, দুঃখ বিপদে ছুটে যেত, একসাথে কাজ করার বীজমন্ত্র আয়ত্ব করে নিত শৈশবেই।

সেসব দিনের খেলাধুলোও আর নেই। পাট শাকের বীজ দিয়ে পিচকিরি লোড করা, গুলতির নিশানায় ফল পাড়াও আর নেই। কলার ভেলা করে পুকুরের জলে মাতামাতি করেনা কেও আর। আম আঁটির ভেঁপু বানানো ও বাজানো। ষোল কটে, ন’কটে খেলতেও দেখা যায়না ছোটদের। যা খেলতে রীতিমতো বুদ্ধি খরচ করতে হতো। বাঘবন্দী খেলা বা কবাডি খেলার সে এক সময় ছিল। তাল নবমীর দিনে কাদা মেখেও তাল কাড়াকাড়ি খেলা ছিল শারীরিক কসরতের। খেজুর পাতার কাঁটা দিয়ে আরেকটা খেজুরপাতাকে গেঁথে দেওয়াও ছিল তখনকার খেলার অংশ। খেজুর পাতা ছিঁড়ে নকশা করা, তালপাতার সেপাই বানানো, পাতা দিয়ে মুকুট বানানো হতো তখন। রঙ করার জন্য ব্যবহার করা হতো অপরাজিতা ফুল (নীল), নটকোন ফল (লাল), কাঁচা হলুদ (হলুদ)। বরুল ফলের আঁঠা বা বাবলা গাছের আঁঠা দিয়ে ছেঁড়া বইয়ের পাতা জোড় লাগানো হতো। ডিগ খেলা ছিল আরেক দক্ষতার খেলা। ভাঙা মাটির গোড়া বা গুঁড়াকে টুকরো টুকরো করে কেটে বানান হতো ডিগ। গোলাকৃতি। কেও একজন ডিগ দিত ছুড়ে। একটু দূরে। অন্যজনকে দূর থেকে সেই ডিগের কাছে তার নিজের ডিগকে পৌঁছে দিতে হতো। হাতের টিপ দিয়ে তারপর মাপযোগ করে খেলা করা হতো। পিট্টু ছিল অনেকটা নিশানার খেলা। কয়েকটা খোলামকুচিকে পরপর উঁচু করে সাজানো হতো। তারপর কাগজের তৈরী বল মেরে ওই খোলামকুচির সিরিজকে ভাঙা হতো। তা ভেঙে গেলে ছুটে পালাতে হতো। আর যে ভেঙেছে তার দিকে কাগজের বলটি ছুড়ে মারতে হতো। মারতে পারলে সে ‘মোর’ হয়ে যেত। তার ‘দান’ হতো শেষ। শুরু হতো অন্যজনের ‘দান’। মোর মানে ধরা পড়া। দান মানে নিজের খেপ বা নিজের খেলার সময়, টার্ন। খড়ের গাদায় লুকিয়ে লুকোচুরি খেলা, বুড়ি তোর জলকে নেমেছি, আলুন বালুন চালুন দে, ঘর কাটাকাটি প্রভৃতি হরেকরকম খেলা ছিল সেসময়। আঁধার কাঠি দিয়ে মাছ ধরা ছিল অন্য মাত্রার মজা। আজ সন্ধ্যায় পুকুরে আঁধার কাঠি দিয়ে তারপরের দিন সকালে দেখা হতো তাতে মাছ লেগেছে কিনা! হোঁড়্যা দিয়েও মাছ ধরা হতো। হোঁড়্যা হলো দুটো বড়ো তালপাতাকে বেঁধে তার ভিতরে কিছু ডালপালা রেখে জলে চুবিয়ে রাখা। দিন দুই রেখে তা তুলে আনলে তা থেকে পাওয়া যেতো গুগলি, চিংড়ি, কই প্রভৃতি ছোটখাটো মাছ। খালের ধারে আড়া পাতা, মশারি দিয়েও মাছ ধরা চলত। ছোটরা খুটিম, কাঠকয়লাকে খেলার প্রয়োজনে চক হিসাবে ব্যবহার করতেও জানত। নিমকাঠি, ভেরেণ্ডার ডাল দিয়ে মাজত দাঁত। শুকনো বাঁদরলাঠিকে ঝুনঝুনি হিসাবে বাজান হতো। আমাগাছ হতে আমপোঁকা ধরে দেশলাই বক্সে ভরে রাখা হতো। আম পোঁকার ঝিঁঝিঁ বরের লোভে ওসব করা হতো। পুরনো বট গাছের কোটর থেকে পাড়া হতো টিয়াপাখির বাচ্চা। পুকুরের ধারে তিনকাঠি ফাঁদ দিয়ে ধরা হতো বক। আখ জমিতে জাল বিছিয়ে শিকার করা হতো বকরা পাখি। যার মাংস সুপাচ্য ও সুস্বাদু। বনে গিয়ে কুড়ানো হতো লাল-কালো কুঁচ ফল। পুকুর নদীর মাটি তুলে বানান হতো পুতুল। বর-বউ। গ্রীষ্মকালে পুকুরের জল কমে গেলে, পুকুরের ধারে জমির মতো কাদা তৈরী করে লাগানো হতো শুশুনি শাক। ঘরের ফেলে দেওয়া পাট শাকের ডাঁটা। শীতকালে পাকা ধান কাটা হয়ে গেলে জমি থেকে ধান কোড়ানো। তা বিক্রি করে গুড়ঝুড়ি ভাজা খাওয়া। আলের মাথায় বসে গামছায় মুড়ি মাখিয়ে খাওয়া। বর্ষাকালে খেতে খেতে ঘুড়ে ধরা হতো কাঁকড়া। শুনতে পাওয়া যেত ব্যাঙের ডাক। নাম না জানা কীটপতঙ্গের রব। ডাবুক পাখির ডাক। পানকৌড়ির মাছ ধরা। সন্ধে নামলেই প্যাঁচার ডাক। ঝোঁপ আলো করে জ্বলে ওঠা জোনাকির ঝাঁক।

এখন আর নেই সেসব ফল (গুরুম বেগুন), গাছ (বোল, জিলিপি গাছ)। নেই প্রকৃতির সে রূপ। নেই ফাঁকা মাঠের প্রসারতা। আছে শুধু বিচ্ছিন্ন হয়ে, প্রায় গৃহবন্দী হয়ে, বাবামায়ের চোখের নজরে বড়ো হওয়া। আর একগাদা হোমওয়ার্ক। সীমাহীন প্রতিযোগীতা। চাপের চাপ। তাই খেলতে খেলতে শিশুদের আর বলতেজ শোনা যায়না—

‘ইচিঙ বিচিঙ চিচিঙ চাঁই

প্রজাপতির মাথা নাই।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন