‘মুক্তধারা’ : জলযুদ্ধ, নদীবাঁধের প্রতিবাদ, যন্ত্রই যন্ত্রণা
রবীন্দ্রনাথের ‘মুক্তধারা’ নাটকটি রচিত হয় ১৯২২ সালের প্রথম দিকে। এই রূপক-সাংকেতিক নাটকে বিশ শতকের যে তিনটি সমস্যা প্রতিফলিত হয়েছে, তার রূপ রবীন্দ্রনাথ প্রত্যক্ষ করেছিলেন ইউরোপ-আমেরিকায় এবং কিছুটা জাপানে। এই তিন সমস্যা তখনও (১৯২২ সাল)পর্যন্ত ভারতবর্ষে ছিল না। এই তিন সমস্যার স্বরূপ বুঝতে হলে নাটকের কাহিনিটি জানা দরকার।
‘মুক্তধারা’র কাহিনি
উত্তরকূটের রাজা রণজিৎ। শিবতারই-এর প্রজাদের আয়ত্তে আনতে পারছেন না তিনি। তাই হাতে না মেরে ভাতে মরতে চাইলেন তিনি। মুক্তধারা ঝরনার জলে শিবতরাই-এর লোকেদের পিপাসা নিবারণ হত, চাষাবাদের কাজ চলত। রণজিৎ সে জল আটকে দিতে চাইলেন। (এটা প্রথম সমস্যা। এর নাম জলযুদ্ধ।)
ডাক পড়ল যন্ত্ররাজ বিভূতির। মুক্তধারাকে বেঁধে ফেলতে হবে। অনেক চেষ্টায় বিভূতি বিরাট এক লৌহযন্ত্রের বাঁধ নির্মাণ করলেন। (এটা দ্বিতীয় সমস্যা। এর নাম নদীবাঁধ নির্মাণ। পরে বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হবে)। বাঁধ নির্মাণ সহজ ছিল না। বহু অর্থব্যয় হয়েছে। বহু তাজা প্রাণকে বলিদান দিতে হয়েছে। পুত্রহারা অম্বার কান্না শেষ হয় নি। নাতিহারা বটুক ঘুরে বেড়াচ্ছে পাগলের মতো।
যুবরাজ অভিজিৎকে শিবতরাই-এর শাসনভার দিয়েছিলেন রাজা। কিন্তু অভিজিৎ ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ। রণজিতের ডিএনএ তাঁর মধ্যে ছিল না। (আসলে অভিজিৎ রণজিতের নিজের সন্তান নন, তাঁকে মুক্তধারার কাছে ঝরনাতলায় কুড়িয়ে পেয়েছিলেন রণজিৎ, সন্তানস্নেহে মানুষ করেছিলেন)। তিনি শিবতরাই-এর মানুষদের অপকারের বদলে উপকার করলেন। উত্তরকূটের মানুষের অন্নজীবী হয়ে থাকবার দুর্গতি থেকে মুক্ত করার জন্য বহুকালের রুদ্ধ নন্দিসংকটের পথ কেটে দিলেন। অভিজিতের কার্যকলাপ দেখে রাজা বুঝলেন যে যুবরাজকে দিয়ে তাঁর অভীষ্ট সিদ্ধ হবে না। সেখান থেকে তাঁকে সরিয়ে এনে শিবতরাই-এর শাসনভার ভার দিলেন নিজের শ্যালককে। নতুন শাসক শিবতরাই-এর প্রজাদের নিত্য নতুন অত্যাচারে জর্জরিত করতে লাগলেন।
উত্তরকূটের প্রজারা ভাবলেন যুবরাজ অভিজিৎ শিবতরাই-এর পক্ষে। তাই তাঁরা তাঁর বিরুদ্ধে রেগে আগুন। রাজা বাধ্য হয়ে যুবরাজকে বন্দি করে রাখলেন। একদিন বন্দিশালায় আগুন লাগল। দেখা গেল যুবরাজ বন্দিশালায় নেই। কোথায় গেলেন তিনি? তাঁকে সাহায্য করার জন্য ছুটে এলেন শিবতারাই-এর মানুষজন। এদিকে প্রতিশোধ নেবার জন্য শিবতরাই-এর মানুষেরাও খুঁজে বেড়াচ্ছেন যুবরাজকে। এমন সময়ে অন্ধকারের বুকের ভেতর থেকে কে যান খিল খিল করে হেসে উঠল। না সে মানুষ নয়। সে যে বাঁধভাঙা জলের উচ্ছ্বাস। কুমার সঞ্জয় খবর আনলেন। কি বললেন তিনি? বললেন, ‘অভিজিৎ মুক্তধারার বাঁধ ভেঙেছেন। মুক্তধারার স্রোতে তাঁকে কোথায় নিয়ে গেল, আমরা তাঁকে পেলুম না। ওই বাঁধের একটি ত্রুটির সন্ধান কি করে তিনি জেনে ফেলেছিলেন। সেইখানেই তিনি যন্ত্ররাজকে আঘাত করলেন, যন্ত্রাসুর তাঁকে সে আঘাত ফিরিয়ে দিল। তখন মুক্তধারা তাঁর সেই আহত দেহকে মায়ের মতো কোলে তুলে নিয়ে চলে গেল।
প্রথম সমস্যা : জলযুদ্ধ
ভবিষ্যতের পৃথিবীতে জল নিয়ে যে যুদ্ধ হবে, সে কথা কি রবীন্দ্রচেতনায় ধরা পড়েছিল? ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক ইন্সটিটিউটের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০১৪ থেকে ২০২৩এর মধ্যে জল নিয়ে ১০৬৩টি সংঘাত ও বিবাদের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। মাত্র ১০ বছরে এই ধরনের ঘটনার সংখ্যা ২০১৪ সালের ৪৯টি থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ১১৭টিতে দাঁড়িয়েছে।
গান্ধীনগরের ওয়াটার অ্যাণ্ড ক্লাইমেট ল্যাবরেটরির তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সালে এশিয়ার নথিভুক্ত জল-সংক্রান্ত বিবাদের ৪৩% ঘটেছিল ভারতে। সে বছর সেচের জল ও পানীয় জল নিয়ে বিবাদ তীব্রতর হয়; ঘটনাগুলি ঘটেছিল অন্ধ্রপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ও পাঞ্জাবে। ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর মতে ২০১৯ সালে দেশের ১১টি রাজ্য জুড়ে জল-সংক্রান্ত ৭৯৩টি বিবাদ দেখা যায়।
দ্বিতীয় সমস্যা : নদীবাঁধ ও তার প্রতিবাদ
বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলসেচ ইত্যাদির কারণে নদীতে বাঁধ বঁধেছে মানুষ। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সে বাঁধ আরও মজবুত হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদদের দৃষ্টিতে নদীবাঁধের ক্ষতিকারক দিকগুলিও ধরা পড়েছে অনতিবিলম্বে। সে ক্ষতিগুলি এই রকম :
ক] জলজ বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি
খ] পলি ও পুষ্টির অভাব
গ] জলবদ্ধতা ও নিষ্কাশন সমস্যা
ঘ] মোহানা ও বদ্বীপ অঞ্চলের ক্ষতি
ঙ] কৃত্রিম বন্যা ও ভাঙন
আমাদের ভারতেও নদীবাঁধ বিরোধী আন্দোলন হয়েছে বহুবার। [ক] উত্তরাখণ্ডে ভাগীরথী নদীর উপর তেহরি বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয় সুন্দরলাল বহুগুণার নেতৃত্বে। [খ] গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নর্মদা নদীর উপর বেশ কয়েকটি বাঁধ নির্মাণের (সর্দার সরোবর প্রকল্প, মহেশ্বর বাঁধ) বিরুদ্ধে মেধা পাটকর, অরুন্ধতি রায়ের, বাবা আমতের নেতৃত্বে শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন। [গ] ওড়িশার মহানদীর উপর হিরাকুদ বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে জি রঙ্গাইয়া ও দামোদরণ পূজারীর নেতৃত্বে আন্দোলন। [ঘ] কেরালা শাস্ত্র সাহিত্য পরিষদের নেতৃত্বে সাইলেন্ট ভ্যালি আন্দোলন।
নদী ও নদীবাঁধ নিয়ে যিনি কাজ করেছেন, সেই বিখ্যাত বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে যত্র তত্র বাঁধ দেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করে গিয়েছেন।
এবার বলি ‘ড্যাম রিমুভ্যাল ইউরোপ’এর কথা। এটি সাম্প্রতিককালের একটি সংগঠন। পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে এই সংগঠন ইউরোপের সব নদীবাঁধ তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। ৩০ হাজারের মতো বাঁধ জলের আধারগত দুরবস্থার জন্য দায়ী। বাঁধের কারণে মাছের ক্ষতি হচ্ছে। স্যামন ও স্ট্যারজেন মাছ হারিয়ে যেতে বসেছে। মাটির গুণগত মানের পরিবর্তন হচ্ছে। পলি ও অন্যান্য পরিপোষক পদার্থ বিভিন্ন কাঠামোতে আটকে যাওয়ায় নদীর জলে মিশে ছড়িয়ে যেতে পারছে না।
তৃতীয় সমস্যা : যন্ত্রই যন্ত্রণা
রবীন্দ্রনাথ কি বিজ্ঞানবিরোধী? না, নিশ্চয়ই নয়। আমাদের মাস্টারমশাই ক্ষুদিরাম দাস রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানভাবনা নিয়ে যে বইটি লিখেছেন, সেটি পড়লে বোঝা যায়। তাহলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্বন্ধে তাঁর বক্তব্যটা কি? ‘স্বাধিকারপ্রমত্তঃ’ প্রবন্ধে তিনি লিখছেন :
‘বিজ্ঞান যেখানে সর্বসাধারণের দুঃখ ও অভাবমোচনের কাজে লাগে, সেখানে তার দান বিশ্বজনের কাছে গিয়ে পৌঁছায়, সেখানেই বিজ্ঞানের মহত্ব পূর্ণ হয়। কিন্তু যেখানে সে বিশেষ ব্যক্তি বা জাতিকে ধনী বা প্রবল করিয়া তুলিবার কাজে বিশেষ করিয়া নিযুক্ত হয়, সেখানেই তার ভয়ংকর পতন।’
আর যন্ত্র?
যন্ত্র যখন প্রাণকে আঘাত করে তখনই শুরু হয় প্রাণের দুর্দশা। রবীন্দ্রনাথ একবিংশ শতকের চেহারাটা দেখে যেতে পারেন নি। দেখে যেতে পারেন নি বিবিধ ইলেকট্রনিক গ্যাজেট, স্মার্ট ফোনের চ্যাটিং, এ আইএর কার্যকলাপ। দেখে যেতে পারেন নি আবেগের মৃত্যু, প্রাণের কোমল বৃত্তিগুলির চরম অবক্ষয়, নৈর্ব্যক্তিকতার বিস্ফোরণ। কিন্তু যন্ত্রদানবের প্রতিক্রিয়ার একটা আভাস তিনি পেয়েছিলেন। তাই আসুন, যন্ত্ররাজ বিভূতির মতো আমরা যন্ত্রের স্তবে মুখর হই :
নমো যন্ত্র নমো যন্ত্র, নমো যন্ত্র, নমো যন্ত্র।
তুমি চক্রমুখরমন্দ্রিত, তুমি বজ্রবহ্নিবন্দিত,
তব বস্তুবিশ্ববক্ষোদংশ ধ্বংসবিকট দন্ত।।
তব দীপ্ত-অগ্নি-শত- শতঘ্নী-বিঘ্নবিজয় পন্থ।
তব লৌহগলন শৈলদলন অচলচলন মন্ত্র।।
কভু কাষ্ঠ্রলোষ্ট্র –ইষ্টক দৃঢ় ঘনপিনব্ধ কায়া,
কভু ভূতল-জল-অন্তরীক্ষ-লঙ্ঘন লঘু মায়া।
তব খনি – খনিত্র – নখ- বিদীর্ণ ক্ষিতি বিকীর্ণ অন্ত্র।
তব পঞ্চভূতবন্ধনকর ইন্দ্রজালতন্ত্র।
অপূর্ব প্রতিবেদন।
আরও অনেক এই ধরনের লেখা লেখকের কাছ থেকে পাওয়ার আশা রইলো!