রেগুলেটিং অ্যাক্ট বা নিয়ন্ত্রণ আইনের খসড়া তৈরিতে আরও একটা ত্রুটি ছিল; এটা এমন এক ত্রুটি যা বাংলার গ্রামীণ প্রশাসনের ওপর বড় প্রভাব ফেলে ছিল। গভর্নর-জেনারেল আর তাঁর কাউন্সিলের ওপর “উক্ত প্রেসিডেন্সির সমগ্র বেসামরিক ও সামরিক শাসনভার; এবং সেই সাথে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা রাজ্যের অধীনস্থ ভূখণ্ড ও রাজস্বের ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা ও শাসনভার” ন্যস্ত করা হয়েছিল। এই “ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি”-র প্রকৃতি সম্পর্কে বলা হয়েছিল, এটি “ঠিক সেই একই পদ্ধতিতে ও সর্বতোভাবে কার্যকর হবে, যেভাবে বর্তমানে বা অতীতে যেকোনো সময়ে প্রেসিডেন্ট ও কাউন্সিল কিংবা ‘সিলেক্ট কমিটি’র পক্ষ থেকে সেটা প্রযুক্ত হয়ে আসছিল।” অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টকে “মহামান্য সম্রাটের যেকোনো প্রজার ঘটানো বা ভবিষ্যতে ঘটবে এমন যেকোনো অপরাধ, অসদাচরণ অথবা নিপীড়নের অভিযোগ শোনা আর নিষ্পত্তির সম্পূর্ণ ক্ষমতা আর এখতিয়ার” দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া, “বাংলা, বিহার, ওডিসায় মহামান্য সম্রাটের যেকোনো প্রজার বিরুদ্ধে যেকোনো রকমের মামলা বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া, শোনা ও নিষ্পত্তির ক্ষমতাও তাদের দেওয়া হয়েছিল। এমনকি, এমন যেকোনো ব্যক্তি — যিনি কোনো ঋণ, মামলার কারণ বা অভিযোগ ওঠার সময়ে আলোচ্য ‘ইউনাইটেড কোম্পানি’-র অধীনে কর্মরত ছিলেন কিংবা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাদের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন — তার বিরুদ্ধেও যেকোনো মামলা, আইনি পদক্ষেপ বা অভিযোগ গ্রহণের ক্ষমতা তাদের ছিল।” এই আইন স্পষ্টভাবে আর বিতর্কের ঊর্ধ্বে গিয়ে এই বিষয়টা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হল, কাউন্সিলের ওপর ন্যস্ত “ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি”-র বিষয় আদালতের এখতিয়ারমুক্ত হবে, নাকি হবে না। এটা একটা সর্বজনবিদিত সত্য যে, রাজস্ব আদায়ের প্রক্রিয়াটাই ছিল “উপরিউক্ত ইউনাইটেড কোম্পানি”-র সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তির জনগণের ওপর নিপীড়ন চাপিয়ে দেওবার সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র। বিষয়টা নিয়ে কাউন্সিল আর সুপ্রিম কোর্ট অবিলম্বে পারস্পরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ল। কাউন্সিলের অবস্থান ছিল, রাজস্ব আদায়ের কাজে তাদের কর্মকর্তারা যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, সেই সংক্রান্ত বিষয়ে আইন তাদের আদালতের এখতিয়ার থেকে অব্যাহতি দিয়েছে; উল্টোদিকে সুপ্রিম কোর্ট বলল, রাজস্ব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ কার্যকলাপের অভিযোগ উঠলে সেই মামলার শুনানি আর নিষ্পত্তি করাই ছিল সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। এখানে, যেমনটি দেখা যাচ্ছে, শাসন বিভাগ আর বিচার বিভাগের মধ্যে তীব্র সংঘাত বা বিরোধের ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছিল। চার বিচারকের মধ্যে, একজন ছিলেন ইমেরিটাস ভাইনেরিয়ান অধ্যাপক সম্ভবত একমাত্র ব্যক্তি, যিনি আইনশাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী; কিন্তু মনে হয় তিনি স্বভাবগতভাবে কিছুটা ভীরু প্রকৃতির ছিলেন এবং ব্যক্তিগত প্রভাবের কাছে অতিমাত্রায় নতি স্বীকার করতেন – হাইড ছিলেন কঠোর পরিশ্রমী ও কর্তব্যপরায়ণ কর্মী — যদিও ইম্পের কথা বিশ্বাস করলে বলতে হয়, তিনি কোনো এক ধরণের “শারীরিক অসুস্থতার” শিকার ছিলেন — তবে তাঁর মধ্যে পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার প্রবণতা ছিল। অন্যদিকে, উচ্ছৃঙ্খল লর্ড স্যান্ডউইচের আশ্রিত লেমেস্ট্রের মধ্যে বিচক্ষণতার গুণ একেবারেই অনুপস্থিত ছিল। হাইড এবং লেমেস্ট্রের মতবাদ ছিল অত্যন্ত চরমপন্থী; প্রধান বিচারপতির কঠোর হস্তক্ষেপে তাঁদের অতি কষ্টে নিবৃত্ত করা গিয়েছিল — নইলে তাঁরা এই অবস্থান গ্রহণ করতে উদ্যত হয়েছিলেন যে, ‘রেগুলেটিং অ্যাক্ট’-এর ফলে রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা তাঁদের নিজস্ব দপ্তরের আওতাধীন সমস্ত বিচার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হলেন। আমাদের ইতিহাস পাঠে আগেই জেনেছি যে, ক্ল্যাভারিং, মনসন এবং ফ্রান্সিস তাঁদের প্রতিপক্ষদের প্রতি কীরূপ মনোভাব পোষণ করবেন বলে আশা করা যেতে পারে; তাঁদের হাতে পড়লে, এমনকি অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত ও সংযত বিষয়গুলোও অনিবার্যভাবে অযৌক্তিক ও উগ্র রূপ ধারণ করত। সুপ্রিম কোর্টের সাথে চলা বিতর্কের এক পর্যায়ে, হেস্টিংস এবং ফ্রান্সিস — এই দুজনই একমত পোষণ করেছিলেন; এমতাবস্থায় এই বিষয়টা নির্ণয় করা অত্যন্ত কঠিন যে, হেস্টিংসের স্বভাবসিদ্ধ শান্ত ও সংযত বিচারবুদ্ধি তাঁর কাউন্সিলের উত্তপ্ত ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশের প্রভাবে কতটা বিচলিত বা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছিল — বিশেষত যখন তিনি দেখলেন যে, যেসব ব্যক্তি অন্য সব বিষয়ে তাঁর বিরোধিতা করার জন্য জোটবদ্ধ ছিলেন, তাঁরাই এই বিশেষ ক্ষেত্রে তাঁকে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছেন।
সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠার ফলে স্বাভাবিকভাবেই ‘মেয়র্স কোর্ট’ বা নগর আদালতের অস্তিত্ব এর গর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যে, কলকাতা শহরে তাঁদের নিজস্ব আদালত ছাড়া ফৌজদারি বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষমতাধর অন্য কোনো আদালতের অস্তিত্ব থাকতে পারবে না। এই সিদ্ধান্তের ফলে ‘ফৌজদারি আদালত’-এর কার্যক্রম কার্যত স্থগিত হয়; যেহেতু তখন এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল — কিংবা বিষয়টি স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছিল — যে কলকাতার সব অধিবাসীই ব্রিটিশ প্রজা, তাই বিচারের দায়িত্ব পালনের জন্য এই ফৌজদারি আদালতের হাতে আর কোনো কাজই অবশিষ্ট রইল না। (১৭৭২-এ, মুর্শিদাবাদের ‘কম্পট্রোলিং কাউন্সিল’ বিলুপ্ত হওয়ার পর, ‘নিজামত আদালত’ — বা দেশীয় ফৌজদারি মামলার সর্বোচ্চ আদালতটিকে কলকাতায় স্থানান্তরিত করা হয় এবং একজন দারোগার তত্ত্বাবধানে ন্যস্ত করা হয়; এই দারোগা আবার কাউন্সিলের প্রেসিডেন্টের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিলেন। ১৭৭৫-এর অক্টোবরে, নিজামত আদালতকে পুনরায় মুর্শিদাবাদে ফেরত পাঠানো হয় এবং ‘নায়েব নাজিম’ হিসেবে মহম্মদ রেজা খানের ওপর দেশীয় ফৌজদারি আদালতগুলোর নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়।) সরকারের সাথে সুপ্রিম কোর্টের বিরোধের ফলে ‘সদর দেওয়ানি আদালত’-এর কাজ স্থগিত হয়ে যাওয়ার মতো একটা গুরুতর পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়; কার্যত ১৮৮০ পর্যন্ত এই আদালতের কার্যক্রম অচল অবস্থাতেই পড়ে ছিল। ঠিক যেমন আগে উল্লেখ করা হয়েছে, জেলা দেওয়ানি আদালতগুলোর তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব প্রাদেশিক রাজস্ব কাউন্সিলগুলোর ওপর ন্যস্ত ছিল।
নির্বাহী সরকার এবং সুপ্রিম কোর্টের মধ্যকার সংঘাত স্বাভাবিকভাবেই মিলের ‘হিস্ট্রি অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে একটা উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। স্যার জে. এফ. স্টিফেন অবশ্য বলেছেন যে, মিল এই বিষয়টি নিয়ে “মারাত্মকভাবে ভুল বুঝেছেন ও ভুলভাবে উপস্থাপন করেছেন” — যেখানে তাঁর রচনার “অত্যধিক নীরসতা ও কাঠিন্য এমন এক নির্ভুলতা ও গভীর গবেষণার ছাপ সৃষ্টি করে, যা মূল নথিপত্র বা প্রামাণ্য উৎসগুলো অধ্যয়ন করলে কোনোভাবেই সমর্থিত হয় না।” বাংলায় ইংরেজ প্রশাসনের ইতিহাস রচনার যেকোনো প্রচেষ্টায় এই বিষয় অত্যন্ত মৌলিক গুরুত্ব বহন করে। ‘রেগুলেটিং অ্যাক্ট’-এর খসড়া প্রণয়নের ত্রুটিগুলো নির্দেশ করতে গিয়ে মিল লিখেছেন: “মূল বিষয়টির ক্ষেত্রে, সংসদ বরাবরের মতোই প্রায় অন্ধের মতো পদক্ষেপ নিয়েছিল। তারা অনুধাবন করতে পারেনি যে, তারা ভারতে দুটি স্বাধীন ও পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির প্রতিষ্ঠা করছে — একটা হলো সুপ্রিম কাউন্সিল এবং অপরটি সুপ্রিম কোর্ট; তারা এই দুই শক্তির সীমানা নির্ধারণের জন্য কোনো বিভাজনরেখা টেনে দেয়নি; এবং তারা পরবর্তীকালে উদ্ভূত ভয়াবহ পরিণামগুলোও আঁচ করতে পারেনি — যা ছিল একের পর এক ক্ষমতা-লঙ্ঘন ও বিবাদের এক দীর্ঘ ধারা, যা সরকারের প্রশাসনিক ক্ষমতাকে পঙ্গু করে দিয়েছিল এবং তাদের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলেছিল।” অন্যদিকে, স্যার জে. এফ. স্টিফেনের অবস্থান হলো এই যে — ব্যক্তিবিশেষের দু-একটা মাঝে মাঝে অগ্রহণযোগ্য উক্তি (যেমন: “লেমেস্টারের চরিত্রের নির্বোধসুলভ উগ্রতা” ইত্যাদি) সত্ত্বেও — সুপ্রিম কোর্টের কার্যকলাপ ‘রেগুলেটিং অ্যাক্ট’-এর প্রণেতাদের মূল অভিপ্রায় দ্বারা সম্পূর্ণভাবে সমর্থিত ছিল; এবং রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে সংঘটিত “কঠোরতা” বা বাড়াবাড়িগুলোর বিষয়ে বিচার এখতিয়ার প্রয়োগ করার একটা প্রশ্নাতীত অধিকার তাদের ছিল।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ