বাংলার জন্য পরিকল্পিত নতুন শাসনব্যবস্থা প্রসঙ্গে একটা কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ‘রেগুলেটিং অ্যাক্ট’ (Regulating Act) সম্পর্কে মিলের সমালোচনা, আসল পরিস্থিতির মৌল বাস্তবতা স্পর্শ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। শাসনব্যবস্থার যে পুরোনো কাঠ্যামো এই আইন তৈরি করার পর বিলুপ্ত করা হল, তার একটা মৌলিক ত্রুটি ছিল। সেটা হলো, এই ব্যবস্থায় কোম্পানির কর্মচারীরাই নিজেদের মামলার চূড়ান্ত বিচারক হিসেবে গণ্য হতেন। কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে এতদিন সেই ব্যক্তিরাই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যাদেরই অব্যবস্থাপনা বা দমনমূলক আচরণের তদন্ত করা কিংবা তা সংশোধন করাই ছিল কাউন্সিলের মূল দায়িত্ব; এমতাবস্থায়, এমনভাবে গড়ে তোলা একটা সংস্থার পক্ষে প্রয়োজনীয় কঠোরতা দেখানো ছিল প্রায় অসম্ভব। মিল এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন এবং কেবল সেই পুরোনো তত্ত্বই নতুন করে আউড়ে সন্তুষ্ট থেকেছেন যে — কর্মচারীদের বেশি বেতন দেওয়া হলে, সেই অতিরিক্ত অর্থ, অবৈধ উপায়ে বাড়তি অর্থ উপার্জনের প্রলোভন থেকে তাদের রক্ষা করার একটা নিশ্চয়তা হিসেবে কাজ করে। অবশ্য, রেগুলেটিং অ্যাক্টের সমালোচনার ক্ষেত্রে মিল একবারই যথার্থ আর জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেন, যখন তিনি এই বিষয়টা তুলে ধরে বলেন যে — নতুন প্রতিষ্ঠিত ‘সুপ্রিম কোর্ট অফ জুডিকেচার’-এর বিচার পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট বিধিনির্দেশ বা নিয়মাবলি নির্ধারণ না করাই ছিল আইনের অন্যতম বড় ব্যর্থতা। কিন্তু যখন তিনি বলেন, শাসন বিভাগকে (Executive Government) বিচার বিভাগের এখতিয়ারভুক্ত করার অর্থ হবে বিচারালয়কেই কার্যত শাসকে পরিণত করা — তখন তিনি সেই সাংবিধানিক নীতিগুলোর অস্তিত্ব উপেক্ষা করেন, যে নীতির বদৌলতেই ইংল্যান্ডে স্বয়ং রাজশক্তিকেও (Crown) তাদের নিজস্ব বিচারালয়ে কোনো মামলার একটা পক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো সম্ভব হয়।
নতুন ভারতীয় শাসনতন্ত্রের যে বৈশিষ্ট্য বাস্তবে সমালোচকদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল, সেটা হলো সেই বিশেষ ব্যবস্থা — যার অধীনে কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের গভর্নর-জেনারেলের গৃহীত নীতি বা সিদ্ধান্তকে নস্যাৎ করে দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। অভিজ্ঞতাই খুব তাড়াতাড়ি এই ভুলের বিষয়টা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল; যার ফলে, ১৭৮৬-এ লর্ড কর্নওয়ালিসকে কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করার বা ‘ওভাররুল’ করার অধিকার অতি সহজেই দেওয়া হলো। (পরে ১৭৯৩-এ এই নীতি মাদ্রাজ আর বোম্বাইয়ের গভর্নরদের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত করা হয়।) ১৭৭৪ থেকে ১৮৮১-র মাঝের সময়ে কাউন্সিল-সভায় তৈরি হওয়া তীব্র মতবিরোধ আর সংঘাতের ফলে ভারত যে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পতিত হয়েছিল — হেস্টিংস তাঁর ‘কাস্টিং-ভোট’ বা নির্ণায়ক ভোট অত্যন্ত সাহসিকভাবে প্রয়োগ করার ফলেই যে দেশ সেই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছিল, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। যেসব প্রশাসনিক পদক্ষেপের সাফল্য নির্ভর করত পূর্ণ গোপনীয়তা ও দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর — সেগুলোকে অকাল প্রকাশ, নিরর্থক বিতর্ক এবং প্রাণঘাতী বিলম্বের হাত থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে গভর্নর-জেনারেলকে যেসব কৌশল বা ‘উপায়ান্তর’ অবলম্বন করতে হয়েছিল — সেই কৌশলগুলোই পরবর্তীতে হেস্টিংসের বিরুদ্ধে আনীত অভিশংসন (impeachment) মামলার পরিচালকদের উদ্দেশ্য সাধনে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল। স্যার জন স্ট্রেচি যখন কাউন্সিল বোর্ডের মধ্যে সব সময় পরিবর্তনশীল এক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সাম্রাজ্য শাসনের পরিকল্পনা ‘অসম্ভব’ এবং ‘মূর্খামি’ হিসেবে অভিহিত করেন, তখন তিনি মোটেও অত্যুক্তি করেন না।
স্যার জে. এফ. স্টিফেন ‘রেগুলেটিং অ্যাক্ট’-এর প্রণেতাদের তুলনা করেছেন ১৮৮৫-র এমন এক কাল্পনিক রাষ্ট্রনায়কদের সাথে, যারা তখন চেষ্টা করছিলেন — “সুলতান বা খেদিভের কর্তৃত্বকে প্রকাশ্যে লঙ্ঘন না করে, কিংবা রানির সার্বভৌমত্বকে স্পষ্টভাবে দাবি না করেই মিশরের দক্ষ ও সুশাসন নিশ্চিত করতে।” (The Story of Nuncomar and the Impeachment of Sir Elijah Impey., খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১২-১৩)। এই তুলনা খুব একটা প্রাসঙ্গিক নয়; কারণ লর্ড নর্থের মন্ত্রিসভা প্রকাশ্যে বা ঘোষিতভাবে বাংলার জন্য কোনো নতুন শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ নেয়নি। সুপ্রিম কাউন্সিল আর আদালতের এখতিয়ার বা বিচারিক সীমার আওতাভুক্ত যে ব্যক্তিরা ছিলেন, তাঁরা বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় বসবাসরত ভারতের সাধারণ অধিবাসী ছিলেন না; বরং তাঁরা ছিলেন “গ্রেট ব্রিটেনের প্রজা — অর্থাৎ আমাদের, আমাদের উত্তরাধিকারী এবং পরবর্তী শাসকদের প্রজা।” এত উচ্চ গুরুত্বসম্পন্ন আইনি নথিপত্রে, অন্তত একজন আইনজীবী নিশ্চয়ই এমন কিছু সতর্কতার সাথে প্রণীত ধারার প্রত্যাশা করতেন, যা দেশীয় আদালতগুলোর এখতিয়ারকে সুরক্ষিত রাখবে — যে এখতিয়ারে হস্তক্ষেপ করার অভিপ্রায়ই এই আইনের প্রণেতাদের ছিল না। দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো থেকে উদ্ভূত এখতিয়ারসমূহে অনধিকারচর্চা করার কিংবা প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিতে যাদের মুঘল সম্রাটের প্রজা হিসেবে গণ্য করা হতো, তাদের ইংরেজ শাসনের অধীনে নিয়ে আসার কোনো উদ্দেশ্য না থাকায় — এই আইন এবং সুপ্রিম কোর্টের সনদটি সেইসব ব্যক্তি ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব ছিল, যা এই আইনের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়নি। আমরা যদি শুরুতেই ‘রেগুলেটিং অ্যাক্ট’কে সমগ্র বাংলার সুশাসনের লক্ষ্যে প্রণীত একটা পদক্ষেপ হিসেবে দেখতে শুরু করি, তবে আমরা এটি দেখে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ব যে, এই আইন —
(১) গভর্নর-জেনারেলকে সুপ্রিম কোর্টের সম্মতিক্রমে কেবল কলকাতা শহরের জন্য উপবিধি (byelaws) প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া ছাড়া, গভর্নর-জেনারেল ও কাউন্সিলকে আর কোনো আইন প্রণয়নের ক্ষমতা প্রদান করেনি; এবং
(২) এই আইন কলকাতা ও এর অধীনস্থ বসতিগুলোর বাইরে সুপ্রিম কোর্টের স্থানীয় বা ব্যক্তিগত এখতিয়ারের কোনো সুরাহা করেনি, কিংবা সেখানে কোন আইন প্রয়োগ করা হবে — তাও নির্ধারণ করে দেয়নি।
‘রেগুলেটিং অ্যাক্ট’-এ গভর্নর-জেনারেল ও কাউন্সিল শুধুই আগের ‘প্রেসিডেন্ট-ইন-কাউন্সিল’ আর ‘সিলেক্ট কমিটি’র স্থান নেন মাত্র। অনেকটাই সুবিন্যস্ত আর বিস্তৃত কাঠামোর মধ্য দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট পুরাতন ‘মেয়রস কোর্ট’-কে প্রতিস্থাপিত করে। কার্যত, কোম্পানির প্রশাসনিক পরিধি এতটাই প্রসারিত হয়েছে যে, বর্তমানে দেশের কোনো অধিবাসী ‘উক্ত কোম্পানির সুরক্ষাধীনে’ আছেন কি নেই — তা পার্থক্য করা প্রায় দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে; আইনগতভাবে বলতে গেলে, যারা এই নতুন বিচারের এখতিয়ারের আওতাভুক্ত নন, তাদের পরিচয় পরোক্ষভাবে নির্ধারিত হয় তাদের সংজ্ঞার মাধ্যমে — যারা এই এখতিয়ারের আওতাভুক্ত। সনদ অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের দেওয়ানি এখতিয়ারের আওতাভুক্ত ছিল — “বাংলা, বিহার এবং ওড়িশায় বসবাসরত সকল ইউরোপীয় ও ব্রিটিশ প্রজা।”
সুপ্রিম কোর্ট চালু হওয়ার দুই বছর পর লিখতে গিয়ে ফিলিপ ফ্রান্সিস উল্লেখ করেন, প্রকৃত সার্বভৌমত্বের বিষয় — যা এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন — এখনও অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। তিনি বলেন, “আমাদের এখানে কলকাতায় একটা ‘সুপ্রিম কোর্ট অফ জুডিকেচার’ (সর্বোচ্চ বিচারালয়) রয়েছে; মহামান্য সম্রাটের নামে এই আদালতের জারি করা নির্দেশনামা বা ‘রিট’ এই প্রদেশগুলোর প্রতিটি প্রান্তে কার্যকর হয়। এই নির্দেশনামাগুলো নির্বিশেষে ব্রিটিশ প্রজাদের — যারা সম্রাটের প্রতি আনুগত্যের সূত্রে আবদ্ধ — এবং স্থানীয় অধিবাসীদের — যাদের ওপর গ্রেট ব্রিটেনের রাজার পক্ষ থেকে সার্বভৌমত্বের কোনো অধিকার এখনও দাবি বা ঘোষণা করা হয়নি — উভয়কেই উদ্দেশ্য করে জারি করা হয়।” (চার্টারের ৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী, বিচারকগণকে “বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা — উক্ত প্রদেশ, জেলা ও অঞ্চলসমূহ এবং তার প্রতিটি অংশের — ’বিচারক, শান্তি-রক্ষক ও করoner’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের এমন এখতিয়ার ও কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে, যা গ্রেট ব্রিটেনের অন্তর্গত ‘ইংল্যান্ড’ ভূখণ্ডে প্রচলিত সাধারণ আইন (Common Law) অনুযায়ী, আমাদের ‘কিং’স বেঞ্চ’ আদালতের বিচারকগণ বৈধভাবে প্রয়োগ করতে পারেন।” স্যার জে. এফ. স্টিফেন এ বিষয়ে মন্তব্য করেন এভাবে: “এই বিধানটিকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব ছিল, যার ফলে আদালত বাংলার প্রতিটি বিচারালয়ের উদ্দেশ্যে ‘ম্যান্ডামাস’, ‘প্রহিবিশন’ ও ‘সার্টিওরাই’ জাতীয় নির্দেশনামা জারি করতে পারত; এমনকি কোনো স্থানীয় অধিবাসীর উদ্দেশ্যে ‘হেবিয়াস কর্পাস’ জারি করে তার অন্দরমহলে (জেনানায়) অবস্থানরত নারীদের আদালতে হাজির করার নির্দেশও দিতে পারত।” Op. cit. খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১২৫-২৬।)
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ