৪৪. রবীন্দ্রনাথের পালিতপুত্র সন্তোষচন্দ্র মজুমদার
রবীন্দ্রনাথের পুত্রের নাম রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একটিই পুত্র রবীন্দ্রনাথের। কিন্তু শান্তিনিকেতনে এসে লেনার্ড এলেমহার্স্ট সন্তোষচন্দ্রের সঙ্গে রথীন্দ্রনাথের মাখামাখি দেখে, সন্তোষচন্দ্রের প্রতি রবীন্দ্রনাথের স্নেহাদর দেখে মনে করেছিলেন যে সন্তোষচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের পালিত পুত্র।
খুব একটা ভুল মনে করেন নি এলেমহার্স্ট।
রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন শ্রীশচন্দ্র মজুমদার (১৮৬০-১৯০৮), সন্তোষচন্দ্র ছিলেন সেই শ্রীশচন্দ্রেরই পুত্র। বন্ধু পুত্র তো পুত্রেরই মতো।
শ্রীশচন্দ্র ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। তরুণ বয়েসে তাঁর সঙ্গে আড্ডা দিতেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে দেখা করতে যেতেন বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে। যেতেন সাবিত্রী লাইব্রেরিতে। কোন আলোচনাসভাতেও দেখা যেত দুই বন্ধুকে। বন্ধু না এলে কৌতুক করে রবীন্দ্রনাথ লিখতেন :
শামলা আঁটিয়া নিত্য
তুমি কর ডেপুটিত্ব
একা পড়ে মোর চিত্ত
করে ছটফট।
কখনও বা বন্ধুকে আমন্ত্রণ জানাতেন এইভাবে : ‘লয়ে দাড়ি লয়ে হাসি/অবর্তীর্ণ হও আসি।’
প্রাচীন ভারতের তপোবনের আদর্শে ১৯০১ সালের ডিসেম্বর মাসে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠা করেন ব্রহ্মচর্যাশ্রম। সেদিন এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রেবাচাঁদ, ব্র্হ্মবান্ধব উপাধ্যায়, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রভৃতিরা। এই ব্রহ্মচর্যাশ্রমের প্রথম পাঁচ ছাত্র হলেন রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গৌরগোবিন্দ গুপ্ত, প্রেমকুমার গুপ্ত, অশোককুমার গুপ্ত, সুধীরচন্দ্র নান। কিছুদিন পরে বন্ধুপুত্র সন্তোষচন্দ্র মজুমদার ব্রহ্মচর্যাশ্রমে যোগ দেন।
মীরাদেবী তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন :
‘সন্তোষদার কথা বিশেষভাবে মনে আছে। লম্বা চওড়া গৌরবর্ণ; বেশ চোখে পড়বার মতো চেহেরা। তারপর তিনি আমাদের ঘরের ছেলের মতো হয়ে যান। ’
এখানে উল্লেখ করার মতো বিষয় হল তিন আচার্য ব্রহ্মচর্য দীক্ষা দিয়েছিলেন তিন ছাত্রকে — ভূপেন্দ্রনাথ সান্যাল দীক্ষা দেন সরোজচন্দ্রকে, মোহিতচন্দ্র সেন দীক্ষা দেন রথীন্দ্রনাথকে আর স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ দীক্ষা দেন সন্তোষচন্দ্রকে।
পিতার বদলির কারণে সন্তোষচন্দ্রের পড়াশোনের ক্ষতি হয়েছিল। শান্তিনিকেতনে পড়তে আসার পর রবীন্দ্রনাথ লক্ষ্য করেছিলেন যে ইংরেজি ছাড়া অন্য বিষয়গুলিতে তিনি কাঁচা। সেইসব অভাব পূর্ণ করে তাঁকে এন্ট্রান্স পরীক্ষার উপযোগী করে তোলা হয়। রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে তিনি ১৯০৪ সালে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। রথীন্দ্রনাথ প্রথম বিভাগে, সন্তোষচন্দ্র দ্বিতীয় বিভাগে। রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছা ছিল বিজ্ঞানের কোন বাস্তব-প্রয়োগ-সম্ভব বিভাগে রথীন্দ্রনাথ ও সন্তোষচন্দ্র শিক্ষা লাভ করুন। শ্রীশচন্দ্রকে তিনি এক চিঠিতে লিখেছেন :
‘এন্ট্রেন্স পাস করিয়েই রথীকে আমি জাপানে mining অথবা অন্য কোন practical বিষয়ে শিখতে পাঠাব। আমার উদ্দেশ্য এই যে, শেখে এসে সে শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ে ওই সকল বিষয়ে শিক্ষাদান করতে পারবে। সন্তোষকে পাঠাও না! বেশি খরচ নয় — মাসে ৬০টাকা মাত্র। তুমি যেকোন বিষয়ে তাকে পারদর্শী করতে চাও সেখানে তার সুবিধা আছে। বুঝতেই পারছ বাঙালিদের চাকরি প্রভৃতি সমস্ত দুর্লভ হয়ে উঠেছে — ভবিষ্যুৎ অন্ধকারময়, — তেমন একটা কোন অর্থকরী শিল্পবিদ্যা না শিখতে পারলে উপায় নেই।’
রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে আমেরিকা গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি ও গোপালনবিদ্যা শিক্ষা করেন। স্নাতক হন। দেশে ফিরে শান্তিনিকেতনে গোশালা স্থাপন করেন। কিন্তু এতে সফলতা আসেনি। বীরভূমের মাটি রুক্ষ, এতে যথেষ্ট পশুখাদ্য উৎপাদন সম্ভব ছিল না। তখন রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ব্রহ্মচর্যবিদ্যালয়ে মাসিক ২০০টাকার বৃত্তিতে নিযুক্ত করেন শিক্ষক হিসেবে।
১৯১৯ সালে তিনি বিশ্বভারতীর কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য হন। ১৯২২ সালে শ্রীনিকেতনে পল্লি সংগঠন বিভাগে নিযুক্ত হন। এলেমহার্স্টের অনুপস্থিতিতে তিনি শ্রীনিকেতনের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। ১৯২৪ সালের ১ জুলাই রবীন্দ্রনাথ সন্তোষচন্দ্রের গৃহপ্রাঙ্গণে একটি অবৈতনিক, আবাসিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। যার নাম শিক্ষাসত্র। এখানে বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, বিজ্ঞান ইত্যাদির সঙ্গে বয়নশিল্প, দারুশিল্প, চর্মশিল্প, কৃষিকাজ ইত্যাদি শিক্ষা দেওয়া হত। দুটি বছর নিষ্ঠার সঙ্গে সন্তোষচন্দ্র সে দায়িত্ব পালন করেন। তারপরে তাঁর অকাল মৃত্যু হয়।