২. ‘চকেরাইন জমিন’ বা চাকরান জমি — অর্থাৎ গ্রাম ও বৃহত্তর এলাকাগুলোকে দস্যুদের হাত থেকে রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত ‘থানাদার’ ও ‘পাইক’দের সেবার বিনিময়ে বরাদ্দ করা জমির — পুনরুদ্ধার বা বাজেয়াপ্তকরণ। এভাবে জীবিকা থেকে বঞ্চিত হওয়া বহু মানুষ নিজেরাই দস্যুবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়েছে। আমাদের সাম্প্রতিক প্রবিধান অনুযায়ী অনুমোদিত যে-সব মাসিক বেতনভুক্ত কর্মচারী তাদের নির্ধারিত বেতন নিয়মিত পায়, তারা সম্পূর্ণভাবেই কৃষকদের রাজস্ব আদায়ের কাজে নিয়োজিত থাকে; কিন্তু আমি নিশ্চিত হয়েছি যে, এদের অধিকাংশেরই বেতন সম্পূর্ণভাবে আটকে রাখা হয়; ফলে জনসমাজের কোনো কাজেই তারা আসে না। নিজ নিজ এলাকায় সংঘটিত বিশৃঙ্খলা ও অপরাধের বিষয়ে কৃষকদের নীরব থাকার পেছনে সম্ভবত এটিই মূল কারণ।
“৩. ইজারা প্রথা (Farming system) যদিও এই প্রথা রাষ্ট্র আর জনগণের সামগ্রিক কল্যাণের জন্য উপকারী, তবুও মফস্বল এলাকার বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান উৎস এই প্রথা। এর অন্যতম কারণ হলো — সেই অধিকার বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া, যা সুপ্রাচীন প্রথা অনুযায়ী জনগণ পূর্বে ভোগ করত; আর তা হলো — দস্যুরা সেই এলাকায় যেকোনো ক্ষয়ক্ষতি বা লোকসান করে, তার ক্ষতিপূরণ স্থানীয় জমিদারদের থেকে আদায় করার অধিকার। জমিদারদের হাতে এখন আর সেই পূর্বের মত ক্ষমতা না থাকায়, তারা আর আগের মতো এই বিশৃঙ্খলার পরিণামের জন্য দায়ী বা জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকেন না — যদিও মাথায় রাখতে হবে সরকার তাদের সেই অধিকার বা ক্ষমতা আনুষ্ঠানিকভাবে কখনোই প্রত্যাহার করে নেয়নি। জমিদারদের স্থলাভিষিক্ত হওয়া ইজারাদারদেরই মূলত তাদের অবহেলার কারণে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী করা উচিত; কিন্তু এ বাবদ তাদের ওপর যে অর্থদণ্ডই আরোপ করা হোক না কেন, বছরের শেষে তা তাদের রাজস্বের বকেয়া হিসেবেই গণ্য হবে এবং পরিণামে সেই আর্থিক দায়ভার সরকারের ওপরই বর্তাবে। (বাংলায় ওয়ারেন হেস্টিংসের বসবাসের প্রথম পর্বে, ১৭৬৮-তে বাকেরগঞ্জ জেলায় তাঁর ব্যক্তিগত বাণিজ্যের এক প্রতিনিধি খুন হয়েছিলেন। এই ঘটনার দায়ে স্থানীয় জমিদারের ওপর যে অর্থদণ্ড আরোপ করা হয়েছিল, তা রাজস্ব হিসাবের বকেয়া হিসেবেই রয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সেই বকেয়া হিসেবেই তা মওকুফ করে দেওয়া হয়।)
“৪. দস্যুবৃত্তির প্রকোপ বৃদ্ধির কারণগুলোর তালিকায় আমাদের নবপ্রতিষ্ঠিত বিচারালয়গুলোতে প্রবর্তিত সেই ‘নিয়মানুবর্তিতা’ ও ‘সুনির্দিষ্ট কার্যপদ্ধতি’কে অন্তর্ভুক্ত করতে হচ্ছে দেখে আমি অত্যন্ত দুঃখিত।” সাধারণ মানুষের মনে ডাকাতদের নিয়ে যে গভীর ভীতি কাজ করে — এবং মুসলিম আদালতে, যেখানে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য প্রতিটি মামলায় দুজন প্রত্যক্ষ সাক্ষীর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক, সেখানে এই ধরনের কুখ্যাত অপরাধীদের দোষী সাব্যস্ত করা যে অত্যন্ত কঠিন কাজ — এই দুই বিষয়ই ডাকাতদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এক প্রকার দায়মুক্তির নিশ্চয়তা দেয়; কারণ তারা সাধারণত রাতের আঁধারে কিংবা ছদ্মবেশ ধারণ করে অপকর্ম সম্পাদন করে থাকে। ডাকাতির দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়া অপরাধীদের বিচার-প্রক্রিয়ার নথিপত্র ঘেঁটে আমি এমন একটিও দৃষ্টান্তের কথা স্মরণ করতে পারছি না, যেখানে তাদের অপরাধ কেবল সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রমাণিত হয়েছে; বরং প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের দোষ প্রমাণিত হয়েছে একমাত্র তাদের নিজেদের স্বীকারোক্তির মাধ্যমেই। “এবং এমন ঘটনা এত অধিকবার ঘটেছে যে, আমার মনে এই সন্দেহ জাগাটা অমূলক নয় যে, এসব ফলাফল কোনো অনুচিত বা অসৎ উপায়েই হাসিল করা হয়েছে।”
পূর্ববর্তী একটি চিঠিতে (১লা জুলাই, ১৭৭৩ তারিখের চিঠি; যা ৩রা আগস্ট, ১৭৭৩ তারিখের কাউন্সিল কার্যবিবরণীতে লিপিবদ্ধ আছে), হেস্টিংস মুসলিম আইন দ্বারা সৃষ্ট কতিপয় জটিলতার বর্ণনা দিয়েছিলেন — যেমন :
১. যখন এমন কোনো যন্ত্র বা বস্তু ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হতো, যা মূলত রক্তপাত ঘটানোর উদ্দেশ্যে তৈরি নয়, তখন এমন রায় দেওয়া হতো যে — হত্যাকারীর হত্যার অভিপ্রায় বা উদ্দেশ্য প্রমাণিত হয়নি; ফলে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে তাকে কেবল অর্থদণ্ড বা জরিমানা করা হতো। (হেস্টিংস এ প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত দৃষ্টান্তটি তুলে ধরেছেন: “উপরে উল্লিখিত কার্যবিবরণী থেকে আমি একটি ঘটনার উদ্ধৃতি দেওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করছি। এক ব্যক্তি একটি শিশুর মাথা জলের তলায় চেপে ধরে রাখে, যতক্ষণ না শ্বাসরুদ্ধ হয়ে শিশুটির মৃত্যু ঘটে; এরপর সে শিশুর পরিহিত কাপড় আর ছোট ছোট রূপোর অলঙ্কার লুঠ করে নেয়। দিনের আলোর মতো স্পষ্ট ছিল, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল কেবলই ডাকাতি বা লুঠতরাজ করা; আর সেই ডাকাতি সম্পন্ন ও পরবর্তীতে তা গোপন করার উপায় হিসেবেই সে হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছিল। এ বিষয়ে সন্দেহ করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে যে — যে অস্বাভাবিক পন্থায় এই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছিল, তার নেপথ্যে কাজ করেছিল আলোচ্য আইনের সেই বিশেষ বিধানটি; যে বিধানের সুবাদে সে কেবল ‘সাধারণ ডাকাতি’র অপরাধের জন্য নির্ধারিত দণ্ড ছাড়া অন্য কোনো কঠোরতর শাস্তির সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকিতে ছিল না। অথচ, সে যদি কোনো ছুরি বা তলোয়ার দিয়ে নিহত ব্যক্তিকে হত্যা করত — এমনকি সেই হত্যাকাণ্ড যদি আকস্মিক আবেগের বশেও ঘটে থাকত এবং তার পেছনে কোনো পূর্বপরিকল্পিত অভিপ্রায় না-ও থাকত — তবুও তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হতো। অথচ, এমন জঘন্য ও সুপরিকল্পিত অপরাধ সংঘটন করা সত্ত্বেও তাকে কেবল ‘নরহত্যা’ বা ‘ম্যানস্লটার’-এর দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হলো এবং তাকে ‘রক্তমূল্য’ (blood-money) পরিশোধের দণ্ড দেওয়া হলো; যার পরিমাণ সর্বদা ৩,৩৩৩-৫-৪ মুদ্রায় নির্ধারিত বলে প্রতীয়মান হয়।”)
২. নিহত ব্যক্তির নিকটাত্মীয়দের জন্য আইনে বরাদ্দ সেই বিশেষ অধিকার — যার বলে তারা হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিতে পারত। এহেন আইনের অস্তিত্ব থাকলে, কোনো ব্যক্তির পক্ষে নিজের পিতাকেই গুপ্তহত্যার মাধ্যমে সরিয়ে দেওয়া বা হত্যা করানো তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত সহজ হয়ে পড়ে। (১৭৮৯-এর ২৪শে ডিসেম্বর, বিহারের কালেক্টর লিখেছিলেন: “বর্তমানে প্রতিটি অপরাধের বিচার মুসলিম আইন অনুসারে করা হয়, কারণ মুঘলরা বিজয়ী হিসেবে তাদের নিজস্ব আইনকানুন প্রবর্তন করেছিল। মুসলিম আইনের যে অংশ বাদীর হাতে খুনকে ক্ষমার যোগ্য করে তোলে, তার কুফল তুলে ধরার জন্য ফৌজদারি দপ্তরে লেখা আমার একাধিক ব্যক্তিগত চিঠির উল্লেখ করা বাহুল্য। বস্তুত, সমাজের বিরুদ্ধে অপরাধ এবং ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের মধ্যে পার্থক্য করতে খুব বেশি যুক্তির প্রয়োজন হয় না। খুনের শাস্তি উত্তরাধিকারীদের নিবৃত্ত করার জন্য, যারা….একটি বেদনাদায়ক অধিকার ত্যাগ করতে পারলে খুশি হবে, যা ভীরু মনকে জড়িত করে, কারণ এর কারণ হিসেবে তাদের কঠোরতাকে দায়ী করা যেতে পারে; তারা একজন দণ্ডিত অপরাধীর তাড়া খাওয়ার ভয়, অথবা তার প্রত্যাখ্যাত আত্মীয়দের রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধের আশঙ্কা করতে পারে…. মৃত্যুদণ্ডের যোগ্য প্রতি পাঁচশ জনের মধ্যে একজনেরও এই শাস্তি কার্যকর করা হয় না: প্রমাণিত অপরাধের জন্য ভোগান্তির নিশ্চয়তা নিষ্ঠুর শাস্তির চেয়ে অপরাধ সংঘটন প্রতিরোধে অধিক কার্যকর। অতএব, যখন এমন একটা ব্যবস্থা পাওয়া যায় যা সহজে আবিষ্কার করা যায় এবং দ্রুত দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যায়, আমি আশা করি, খুঁটিতে বাঁধা যন্ত্রণাকাতর ছটফট করা প্রাণী দেখে মানবতা হতবাক হবে না, যদি উচ্চতর বিচারবুদ্ধি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে আংশিক নির্যাতন সার্বিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি করে না। আইন: কিছু সাম্প্রতিক ব্যবস্থার রূপরেখা, পৃষ্ঠা vii-viii)
৩. সেই বিধান — যাতে বলা হয়েছে যে, নিহত ব্যক্তির নিকটাত্মীয়কেই হত্যাকারীর ওপর দণ্ড কার্যকর করতে হবে। হেস্টিংস লিখেছেন, “এমন কোনো দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া কঠিন, যা বর্তমানের এই ঘটনাটির চেয়েও অধিক জোরালোভাবে উক্ত বিধানের অযৌক্তিকতাকে তুলে ধরতে পারে — যেখানে একজন মাকে তাঁর স্বামীর হত্যার দায়ে স্বয়ং তাঁর নিজের সন্তানদের হাতেই প্রাণদণ্ড বরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সন্তানদের বয়সের কোনো সুনির্দিষ্ট উল্লেখ নথিপত্রে নেই; তবে বিচারের কার্যবিবরণীতে উঠে আসা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি দেখে মনে হয়, তারা অত্যন্ত অল্পবয়স্ক। তারা তাদের মাকে ক্ষমা করে দিয়েছে। বস্তুত, তারা যদি মানবিকতাবোধের প্রতিটি অনুভূতি থেকে এতটাই বর্জিত হতো যে, যে মা তাদের জীবন দান করেছেন, তাঁর ওপরই তারা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে সক্ষম হতো — তবে সেক্ষেত্রে স্বয়ং তাদেরই মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার যোগ্য বলে গণ্য করা যেত।”
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ