৪৩. বাণিজ্যে লক্ষ্মীর বাস / জানতেন আলামোহন দাশ
১৮৯৫ সাল। হাওড়া জেলার উদয়নারায়ণপুরের বড়ুইপুর গ্রামের এক গরিব কৃষক পরিবার বড় সংকটে পড়েছে। গোপীমোহন দাশ ও বিরাজময়ীদেবীর ছেলে দারুণ অসুস্থ। বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার সাধ্য নেই পরিবারের। তাই ছেলেকে নিয়ে যাওয়া হল গ্রামের কবিরাজের কাছে। তিনি নাড়ি টিপে গম্ভীরমুখে বললেন, ‘এ ছেলে তো মরে গেছে।’
কান্নায় ভেঙে পড়লেন তার মা-বাবা।
শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হল ছেলেকে। আর তারপরে ঘটল এক অলৌকিক ঘটনা। ঠিক যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জীবিত ও মৃত’ গল্পের মতো। সে গল্পে মৃত ভেবে কাদম্বিনীকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল শ্মশানে। সেখানে সে বেঁচে ওঠে। গোপীমোহন আর বিরজাসুন্দরীরে সন্তানও বেঁচে উঠল শ্মশানে। ছেলের ঠাকুরমা বললেন,’ এ তো অ্যলা ছেলে।’‘অ্যলা’ লোকমুখে হয়ে গেল ‘আলা’। আলামোহন দাশ। এ ছেলের পিতৃদত্ত নাম অবশ্য সুরেন্দ্রমোহন। কিন্তু সে ছেলে পরিচিত হল আলামোহন নামে।
আলামোহন দাশ ( ১৮৯৫-১৯৬৯)।
আলাদের জীবনে আর একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল। তখন তাঁর আট বছর বয়েস। প্রাথমিক শিক্ষায় নিযুক্ত তিনি। গ্রামে লাগল মহামারি। আলার পরিবারের লোকেরাও বাদ গেলেন না। গোপীমোহনের যায় যায় অবস্থা। ঘরে ফুটো কড়ি নেই। হঠাৎ ঘরের কোণ থেকে পাওয়া গেল বস্তায় বাঁধা কিছু টাকা। তাই দিয়ে কোনভাবে বাঁচল পরিবার। হঠাৎ পাওয়া টাকা ফুরিয়ে গেল বছর কয়েকের মধ্যে।
উপার্জনের আশায় চোদ্দ বছরের আলামোহন এলেন কলকাতায়। কাকার কাছে। শুরু করলেন মুড়ির ব্যবসা। রতিকান্ত দে-র কাছ থেকে খই আর মুড়ি কিনে বেচতে লাগলেন। সকাল থেকে সন্ধ্যে। তারপরে শুরু করলেন খাদ্যশস্যের দোকান। অল্প পুঁজির দোকান। কিন্তু বুদ্ধি আর সাহস আর বিচক্ষণতায় সে দোকান বিশাল আকার ধারণ করল ধীরে ধীরে।
ব্যবসাবিমুখ বাঙালির কাছে আলামোহন সত্যই এক আদর্শ। বিরাট পুঁজি না হলে ব্যবসা হয় না — এই ধারনাকে তিনি মিথ্যে প্রমাণিত করেছেন। আচার্য প্রফুল্লকুমার রায়ের সুযোগ্য শিষ্য তিনি। সামান্য মুড়ি দিয়ে যাঁর যাত্রা শুরু, তিনি হলেন এক বিরাট উদ্যোগপতি। হেমেন্দ্রমোহন বসু, মতিলাল শীল, বটকৃষ্ণ পাল, গৌরমোহন দত্তের মতো আলামোহন দাশও ব্যবসাবিমুখ বাঙালির কাছে আদর্শ।
কলকাতার চিত্রা সিনেমা হলটি সে সময়ে ছিল ‘আনন্দময়ী আয়রন ওয়ার্কস’ নামক একটি কারখানা। এই কারখানার সামনে বসে আলামোহন চাল বিক্রি করতেন। দর্জিপাড়ার পি এন দত্তের সঙ্গে এখানেই তাঁর পরিচয়। পি এন দত্তই আলামোহনকে নিজস্ব ব্যবসাকেন্দ্র গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা দেন। পি এন দত্তের অ্যাসিড কারখানার পরিচালক শিখরচন্দ্র হাজরাও আলামোহনকে অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন। ১৯১৮ সালে আলামোহন একটি ছোট কারখানা গড়ে তোলেন কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে। সেখান থেকে তিনি চলে আসেন ৬৪ খসরু রোডে।
হাওড়ায় কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি স্থাপনের মাধ্যমে শিল্পপতি হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ। শিখর হাজরার সঙ্গে তিনি গড়ে তুললেন ‘দ্য হাওড়া কেমিক্যাল ওয়ার্কস’।
১৯৩০ সাল।
হাজার বিঘা জমির উপর গড়ে উঠল ‘ইণ্ডিয়া মেশিনারি কোম্পানি’। এই কারখানায় তৈরি হত লেদ, ওজন যন্ত্র, ছাপার যন্ত্র ইত্যাদি। ১৯৩৭ সালে হাওড়ার শানপুরে তৈরি করলেন ‘ভারত জুট মিল’। এই মিলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের নাম। তিনিই এই কারখানা উদ্বোধন করেন। ১৯৪১ সালে তৈরি হল ‘হাওড়া ইনসওরেন্স কোম্পানি’, ১৯৪২ সালে স্থাপন করলেন ‘এশিয়া ড্রাগ কোম্পানি’।
‘আরতি কটন মিল’ আর ‘দাশ সুগার কোম্পানি’ তাঁর অন্যতম কীর্তি। আরতি কটন মিল সে সময়ে দেশের পাট শিল্পের প্রধান কেন্দ্র ছিল। ১৯৪৫ সালে তিনি স্থাপন করেন ‘দ্য ইণ্ডিয়া স্টিম নেভিগেশন কোম্পানি’। ব্যাঙ্কের ব্যবসাও করেছিলেন তিনি। বাংলায় তাঁর ব্যাঙ্কের ১২/১৪টি শাখা ছিল।
স্বার্থপর শিল্পপতি ছিলেন না আলামোহন। দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি ছিল অগাধ ভালোবাসা। তাঁর কারখানায় নিয়োগ করতেন বাঙালি কর্মী। নিজের উদ্যোগে দেশজ পদার্থ উৎপাদন ও দেশের মানুষের রুটি-রোজগারের দিকে দৃষ্টি ছিল তাঁর।
তাঁর নামেই গড়ে উঠেছে হাওড়ার দাশনগর।
দাশনগর চাপলাদেবী হাইস্কুল সংলগ্ন আলামোহন দাশের বাড়িটি এখনও আছে। কিন্তু তাঁর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের বেশির ভাগই বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। ভারত জুট মিল এখন পশ্চিমবঙ্গ কৃষি-শিল্প কর্পোরেশনের মালিকানাধীন, আরতি কটন মিল এখন ন্যাশনাল টেক্সটাইল কর্পোরেশন দ্বারা পরিচালিত আর এশিয়া ড্রাগ এখন ন্যাশনাল টুল রুমের অধীন।
আলামোহন দাশের কথা অনেকেই মোটামুটি জানেন মনে হয়। তাঁর বড় হয়ে ওঠার কাহিনী হয়ত ততখানি জানা নেই। যাইহোক আপনার এই লেখার মাধ্যমে কিছু জানা হল।
আপনার এই সিরিজের লেখাগুলি পড়ে যেমন অনেক কিছু জানা যায়, আমি এই ব্যতিক্রমী মানুষদের উদ্যম প্রচেষ্টার কথা জেনে খুব বিস্ময়ের সঙ্গে আনন্দিত হই। বর্তমান সময়ে ও নিশ্চয়ই এমন সব মানুষ আছেন। এইসব মানুষদের সাহায্যেই সমাজ সংস্কৃতির উন্নতি হয়।