৮ম। যে ভৃত্য অগ্রিম মজুরি গ্রহণ করার পর প্রভুর সেবা করার কাজ ছেড়ে চলে যাবে, অথবা অনুমতি ব্যতিরেকে কাজ থেকে পালিয়ে যাবে, তাকে তার অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী বেত্রদণ্ড দেওয়া হবে এবং ততদিন পর্যন্ত কারারুদ্ধ রাখা হবে, যতদিন না সে অগ্রিম গৃহীত অর্থ পরিশোধ করতে পারে; এই পরিশোধযোগ্য অর্থের পরিমাণ হবে — যে দিন থেকে সে অনুপস্থিত হয়েছে, সেই দিন থেকে শুরু করে অগ্রিম অর্থের বিনিময়ে তার যে সেবা প্রদান করার কথা ছিল, সেই সেবার মেয়াদ শেষ হওয়ার সময়কাল পর্যন্ত প্রাপ্য অর্থের সমান। এছাড়া, যে ভৃত্য অনুমতি না নিয়ে তার প্রভু বা প্রভুপত্নীকে পথের মাঝে বা তাদের বাসস্থানের অনেক দূরে ফেলে চলে যাবে, তাকে বেত্রদণ্ড দেওয়া হবে — এমনকি পালিয়ে যাওয়ার সময় উক্ত ভৃত্যের এক মাসের বেশি নয় এমন কোনো বকেয়া মজুরি পাওনা থাকলেও।
৯ম। যে ব্যক্তি কোনো পুরুষ, নারী বা শিশুকে জোর করে আটকে রাখবে অথবা দাস হিসেবে বিক্রি করবে — যদি না তার কাছে এমন কোনো ‘কোবালা’ বা দলিল থাকে যা দাসটির মালিকের কেনার অঞ্চলের কাজির (Cauzy) প্রচলিত রীতি অনুযায়ী প্রত্যায়িত; অথবা যে ব্যক্তি কোনো শিশু তার পরিবার বা বাসস্থান থেকে প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যাবে বা চুরি করবে — তাকে সেই আইন অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হবে, যে আইনের আওতাধীন সে পড়ে।
১০ম। ১৭৭৪-এর ১লা জুলাই (যা বাংলা রবীউস সানি মাসের ২১ তারিখ বা আষাঢ় মাসের ১১ তারিখের সমতুল্য) থেকে, এমন কোনো দাস কেনাবেচার অনুমতি কাউকে দেওয়া হবে না, যে ব্যক্তি পূর্ববর্তী কোনো বৈধ ক্রয়ের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই দাস হিসেবে গণ্য নয়। উক্ত তারিখের পর কোনো কাজি যদি কোনো দাস বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে কোনো ‘কোবালা’ বা দলিল প্রদান করেন, তবে তাকে তার পদ থেকে বরখাস্ত করা হবে এবং সেই কোবালাটি বাতিল বা অকার্যকর বলে গণ্য হবে। “পূর্ববর্তী দুটি প্রবিধান সম্পর্কে এই মন্তব্য করা আবশ্যক যে, পিতামাতার থেকে শিশুদের চুরি করে দাস হিসেবে বিক্রি করার প্রথা এই দেশে দীর্ঘকাল প্রচলিত ছিল এবং এখানে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে তা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইংরেজ নামের সাথে যুক্ত প্রভাব — যা জন্ম, ভাষা বা এমনকি অভ্যাসের সুবাদে যে কোনো ব্যক্তিকে ইংরেজ শাসনের বিশেষ সুবিধাসমূহের অংশীদার হওয়ার অধিকার প্রদান করে — এবং দেশের প্রাচীন আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বিচক্ষণ সতর্কতামূলক ব্যবস্থাগুলোর অবহেলা — যা নির্দেশ করে যে, কাজির (Qazi) প্রত্যায়িত ‘কোবালা’ বা দলিল ছাড়া কোনো দাস বিক্রি করা যাবে না (যে দলিলে শিশুর বাসস্থানের উল্লেখ থাকবে; এবং যদি তা প্রথম বিক্রয় হয়, তবে পিতামাতার নাম, বিক্রেতা ও ক্রেতার নাম এবং উভয়ের শারীরিক গঠনের বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ থাকবে) — এই বিষয়গুলোই মূলত এই বর্বর বাণিজ্যের পথকে অত্যন্ত সুগম করে তুলেছে। এই বাণিজ্যের ফলে অসংখ্য শিশু ডাচ এবং বিশেষ করে ফরাসি জাহাজযোগে দেশের বাইরে পাচার করা হচ্ছে; পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেটদের দৃষ্টি থেকে শিশুদের আড়াল করার গোপন প্রচেষ্টার কারণে বহু শিশুর প্রাণহানি ঘটছে। এমতাবস্থায়, এই ভয়াবহ ব্যাধির প্রতিকারের আর কোনো সম্ভাব্য উপায় দেখা যাচ্ছে না, একমাত্র উপায় হলো এর মূলে আঘাত হানা এবং দাসপ্রথার অধিকারকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করা — তবে সেইসব ক্ষেত্র বাদে যেখানে সরকারের কর্তৃত্ব পৌঁছাতে পারে না; উদাহরণস্বরূপ, যেসব ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন দাসপ্রথাকে অনুমোদন দিয়েছে এবং যেখানে প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞার পূর্বেই ক্রয়ের মাধ্যমে দাসরা বৈধ সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে।
“এই বিষয়ে দেশের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় মুসলিম ও হিন্দু অধিবাসীদের মতামত গ্রহণ করা হয়েছে। তাঁরা দাস বিক্রয়ের অনুমোদিত প্রথাটিকে তীব্র নিন্দা করেছেন এবং একে কোরআন ও শাস্ত্রের (Shaister) নির্দিষ্ট বিধানাবলির পরিপন্থী, সাধারণ মানুষের প্রতি নিপীড়নমূলক এবং দেশের সামগ্রিক কল্যাণের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে অভিহিত করেছেন।”
বিভিন্ন জেলা থেকে ইংরেজ কালেক্টরদের প্রত্যাহার করে নেওয়ার ফলে ১৭৭২-এ প্রতিষ্ঠিত বিচারব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন আনা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল; কারণ স্মরণ করা যেতে পারে সেই বিচারব্যবস্থার অধীনে কালেক্টররাই মফস্বলের দেওয়ানি আদালতের (Civil Mufassal Diwani Adalat) সভাপতিত্ব করতেন এবং ফৌজদারি আদালতে (Criminal Faujdari Adalat) তত্ত্বাবধানের সাধারণ ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন। ২৩শে নভেম্বরের প্রবিধানমালার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত নতুন বিচারব্যবস্থায় নিম্নরূপ বিধান রাখা হয়েছিল (প্রবিধান সংখ্যা ২০) : —
“প্রতিটি প্রাদেশিক পরিষদের (Provincial Council) অধীনস্থ জেলাসমূহের ‘নায়েব’রা (Naibs), বর্তমান প্রবিধানমালা অনুযায়ী দেওয়ানি আদালত পরিচালনা করবেন এবং তাঁদের বিচারিক কার্যক্রমের বিবরণী প্রাদেশিক পরিষদসমূহে প্রেরণ করবেন।” তবে সব ক্ষেত্রেই, পাঁচ শতাংশ ফি ব্যতিরেকে, এই আদালতসমূহ থেকে সংশ্লিষ্ট বিভাগের ‘প্রাদেশিক সদর আদালত’-এ আপিল করার অনুমতি থাকবে। এই প্রাদেশিক সদর আদালত পর্যায়ক্রমে এমন সব সদস্যের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে, যাঁরা ‘ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল’-এর সদস্য নন; এই আদালত ১,০০০ টাকার অনধিক মূল্যের সব মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করবে (এর অন্তর্ভুক্ত হলো মালগুজারি জমি — যার জমা বা বার্ষিক উৎপাদন ১,০০০ টাকার বেশি নয় — এবং হস্তান্তরিত বা নিষ্কর জমি, যার জমা ১০০ টাকার বেশি নয়)। যে সকল মামলার মূল্যমান উক্ত সীমার অধিক, সেগুলোর ক্ষেত্রে বর্তমান ব্যবস্থানুযায়ী ‘সদর দেওয়ানি আদালত’-এ আপিল করার সুযোগ থাকবে। সকল ক্ষেত্রেই, সামগ্রিকভাবে প্রাদেশিক কাউন্সিলসমূহ তত্ত্বাবধায়ক সদস্যের দেওয়া রায় অথবা সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার ক্ষমতা রাখবে। রাজস্ব সংক্রান্ত কার্যাবলিতে প্রধান ইজারাদার, জেলার নায়েব, জমিদার এবং সরকারের অন্যান্য প্রধান কর্মকর্তাদের আচরণের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রাদেশিক কাউন্সিনে নিষ্পত্তি করা হবে এবং তাদের কার্যবিবরণীতে লিপিবদ্ধ থাকবে; যদি তাঁদের মধ্যে কেউ নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত বা সংক্ষুব্ধ মনে করেন, তবে তাঁরা অবিলম্বে কলকাতার ‘উচ্চতর রাজস্ব কাউন্সিল’-এর নিকট আবেদন করতে পারবেন।
ফৌজদারি আদালতগুলোর (Foujedary Adauluts) বিষয়ে নিম্নোক্ত বিধানগুলো নির্ধারিত হল —
“(XXII)। ফৌজদারি আদালতের কর্মকর্তাদের মফস্বল এলাকায় কোনো জমিদারি বা ইজারা গ্রহণ কিংবা অন্য কোনো সরকারি পদ ধারণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে; তাঁদের নিজ নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করা বাধ্যতামূলক হবে — ব্যত্যয় ঘটলে তাঁদের চাকরি বা পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে; এবং এমন কোনো ব্যক্তির পক্ষে ফৌজদারি আদালতে ‘নায়েব’ বা ‘গোমস্তা’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে, যাঁর মূল নিয়োগকর্তা বা ‘প্রিন্সিপাল’ স্বয়ং সেখানে অবস্থান করেন না।
“(XXIII)। ফৌজদারি আদালতের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা যেকোনো অভিযোগ সরাসরি গভর্নরের কাছে পেশ করতে হবে; তারপর গভর্নর সেই অভিযোগ তদন্ত ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য ‘সদর নিজামত আদালতে’ (Sudder Nizamut Adaulut) পাঠাবেন।”
১৭৭২-এ মুর্শিদাবাদে থাকার সময়, ওয়ারেন হেস্টিংস বেগম সাহেবার কাছে একটা প্রস্তাব পেশ করে তাঁর সম্মতি প্রার্থনা করেছিলেন। প্রস্তাবটা ছিল — এমন এক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া, যিনি “নবাবের প্রতিনিধি হিসেবে কলকাতায় থাকবেন এবং নিজামত আদালতের রায় বা দণ্ডাদেশ কার্যকর করার লক্ষ্যে জারি করা পরোয়ানায় নবাবের পক্ষে নিজামত-এর সীলমোহর ও স্বাক্ষর প্রদানের ক্ষমতা রাখবেন।” এর উদ্দেশ্য ছিল, “আদালতের ‘ফতোয়া’ বা রায়গুলো নবাবের কাছে পাঠিয়ে তাঁর পরোয়ানা ও স্বাক্ষরের অপেক্ষায় থাকার যে দীর্ঘসূত্রিতা বা বিলম্ব এতদিন প্রচলিত ছিল, তা দূর করা; পাশাপাশি নবাবের অপ্রাপ্তবয়স্ক থাকাকালীন তাঁর পারিপার্শ্বিক প্রভাবশালীদের দ্বারা এই ক্ষমতার যে অপব্যবহারের আশঙ্কা ছিল, তা প্রতিরোধ করা।” ১৭৭৩-এর ২৩শে নভেম্বর কাউন্সিল (পরিষদ) হেস্টিংসের এই পদক্ষেপ অনুমোদন করে। সেই অনুযায়ী, পূর্বনির্ধারিত ব্যক্তি — সদর-উল-হক খানকে “নিজামত ব্যবস্থার এই নির্দিষ্ট শাখার ‘নায়েব’ (Neabut) হিসেবে নিয়োগ করা হয়” এবং “নিজামত আদালতের দারোগা হিসেবে তাঁর বর্তমান বেতনের সাথে অতিরিক্ত ৫০০ টাকা যুক্ত করা হয়।” কাউন্সিল আরও “সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, নিজামত-এর সীলমোহর উক্ত নায়েবের জিম্মায় অর্পণ করা হবে; এবং কাউন্সিলের প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ জানানো হবে যেন তিনি নায়েবের প্রশাসনিক কার্যক্রমের ওপর — তা আদালতের রায় পুনর্বিবেচনার বিষয়ই হোক কিংবা পরোয়ানা জারি ও সীলমোহর প্রদানের বিষয়ই হোক — সরাসরি তত্ত্বাবধান করেন।”
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ