৪০. বাংলার বুলবুল উমা বসু
১৯৩৮ সালের এপ্রিল মাস। শরৎচন্দ্র বসুর ৩৮/২ এলগিন রোডের বাড়ি সরগরম। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক উপলক্ষ্যে সেখানে চাঁদের হাট। গান্ধিজি এসেছেন। এসেছেন হরেকৃষ্ণ মহতাব, পট্টভি সীতারামাইয়া, জওহরলাল নেহেরু, আবুল কালাম আজাদ, বল্লভভাই প্যাটেল, জে বি কৃপালনী; শরৎচন্দ্র এবং সুভাষচন্দ্র বসু তো আছেনই। সংগীতস্রষ্টা দিলীপকুমার রায়ও আসেন যখন তখন। গান্ধিজি একদিন দিলীপকুমার রায়কে বললেন যে তিনি গান শুনতে চান; তিনি কোন গায়ক বা গায়িকাকে নিয়ে আসতে পারবেন কি না।
পরের দিন দিলীপকুমার নিয়ে এলেন তাঁর এক শিষ্যাকে। মেরেকেটে সতেরো বছর বয়েস। রোগা। লাজুক এক কিশোরী। নাম জানতে চাইলেন গান্ধিজি। দিলীপকুমার বললেন, এর নাম হাসি। ভালো নাম উমা বসু।
মীরার ভজন (ঝিঝিট — একতাল) শুরু করলেন হাসি :
মেরে তো গিরিধর গোপাল দুস্রো ন কোঈ।
যাকে সিরে মোর মুকুট মেরো পতি সোঈ।
শঙ্খ-চক্র-গদা- পদ্ম কণ্ঠমাল হোঙ্গ।।
তাত মাত ভ্রাত বন্ধু আপনো নহি কোঈ।।
গান শুনে মুগ্ধ গান্ধিজি। নিজের হাতে লিখে হাসিকে উপাধি দিলেন ‘নাইটিঙ্গেল অব বেঙ্গল’। বাংলার বুলবুল। উল্লেখযোগ্য যে হাসি গান্ধিজিকে আর একবার গান শোনাবার সুযোগ পেয়েছিলেন। ১৯৩৫ সালে পেশোয়ারে আবদুল গফফর খানের বাড়িতে তিনি গান্ধিজিকে শুনিয়েছিলেন ‘আজ সখি কৌন বজাত বাঁশুড়িয়া’ গানটি।
উমা বসু (১৯২১-১৯৪২)। যাঁকে সবাই ‘হাসি’ নামেই চিনতেন। বাবা ধরণীধর বসু, মা প্রভা বসু (মিত্র)। বাবা পেশায় স্থপতি। সচ্ছল পরিবার। গানের চর্চা ছিল বাড়িতে। সংগীতানুষ্ঠান হত। আসতেন দিলীপ রায়, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, শচীনদেব বর্মন, হিমাংশু দত্ত, হরেন চট্টোপাধ্যায়, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, কায়মতৌল খান প্রভৃতিরা। গানের কান তৈরি হয়ে গিয়েছিল হাসির। তখন তাঁর বয়েস মাত্র আট, মাসির সঙ্গে ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউটে শুনে এলেন আবদুল করিম খাঁর গান। আবিষ্ট হলেন। গানের টানে প্রথাগত পড়াশুনোর প্রতি আগ্রহ হারালেন।
প্রতিবেশী কুমুদেশ সেনের পরামর্শে হরেন চট্টোপাধ্যায়ের কাছে গানের তালিম নিতে শুরু করলেন। সে কালের নামি শিল্পী ছিলেন হরেন চট্টোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে হাসির গানের রেকর্ড বেরোল। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর দেখা হয় দার্জিলিং বেড়াতে গিয়ে। হাসির গলায় ‘এখনও গেল না আঁধার’ শুনে খুব আনন্দিত হন রবীন্দ্রনাথ। ‘মনে কি দ্বিধা’ গানটি রবীন্দ্রনাথ হাসিকে শিখিয়েছিলেন। ১৯৩৫ সালে হাসির রবীন্দ্র সংগীতের রেকর্ড বেরোয়। দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিচালনায় হাসি গেয়েছিলেন দুটি গান — ‘সেই ভালো সেই ভালো’, এবং ‘তোমার সুর শুনায়ে’।
তারপর হাসির জীবনের রঙ্গমঞ্চে দিলীপকুমার রায়ের আবির্ভাব। হাসি হয়ে উঠলেন দিলীপকুমারের মানসকন্যা। স্বপন সোম লিখেছেন,
‘রেকর্ডে নানা রচয়িতার নানা ধরনের গান গাইলেও হাসির প্রধান আশ্রয় দিলীপকুমার রায়ের গান। সে গান কথায়-সুরে-ছন্দে একেবারেই অন্য গোত্রের। বিশেষত অভিনব অপ্রত্যাশিত স্বরবিন্যাসে, তান-অলঙ্কার প্রয়োগে দিলীপকুমারের সুর স্বভাব্তি স্বতন্ত্র। উপরন্তু তাঁর নিজস্ব গায়ন। একের পর এক গান শিখিয়ে হাসিকে রেকর্ড করিয়েছেন, স্বাভাবিকভাবে তাঁর বিশেষ গায়নের ছায়া পড়েছে হাসির গানে। এককভাবে ও দিলীপকুমারের সঙ্গে যুগ্মকণ্ঠে হাসি গেয়েছেন দিলীপকুমারের রচনা, তাছাড়া দিলীপকুমার সুরারোপিত অন্যান্য কবির রচনাও।’
কালানুযায়ী হাসির কয়েকটি গানের কথা উল্লেখ করি :
১] প্রকৃতির ঘোমটাখানি খোলো (১৯৩৭)
২] আজি তোমার কাছে ভাসিয়া যেয়ে (ওই)
৩] সোম তুমি কৃষিকাজ জাননা (ওই)
৪] আজ ফাগুনের প্রথম দিনে (১৯৩৮)
৫] চাঁদ কহে চামেলিগো (ওই)
৬] ঝরানো পাতার পথে (ওই)
৭] ও আমার মন ভোলানো (১৯৩৯)
৮] মধু মুরলী বাজে (১৯৪০)
৯] নির্ঝরিণী (১৯৪০)
১০] জীবন মরণে এসো (ওই)
১১] নীল পরি (ওই)
১২] রূপে বর্ণে গন্ধে (ওই)
১৩] অন্ধকারের দোরে গাঁথা (১৯৪১)
১৪] আকাশের চাঁদ মাটির ফুলেতে (১৯৪৩)
১৫] রাঙা জবা্য় কাজ কি মা তোরে (ওই)
জীবনের শেষ পর্বে হাসি উচ্চাঙ্গ সংগীতের প্রথাগত তালিম পেয়েছিলেন ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে। কিন্তু দিলীপকুমারের মতো ভীষ্মদেবও চলে গেলেন পণ্ডিচেরী। উচ্চাঙ্গ সংগীত চর্চায় ছেদ পড়ল। এদিকে হাসির ভাগ্য দেবতাও ছক তৈরি করছিলেন। আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করে তাঁকে পর্যুদস্ত করে দিতে। নাম তাঁর হাসি। কিন্তু কান্নায় ভরে গেল তাঁর জীবন।
১৯৩৯ সাল। শিলচরের এক জলসায় যোগ দিতে যাচ্ছিলেন হাসি। সঙ্গে ছিলেন তাঁর বাবা। আর ছিলেন দিলীপকুমার রায়, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, পাহাড়ী সান্যাল। শিলং থেকে শিলচর যাবার পথে বাস দুর্ঘটনা। মারা গেলেন হাসির বাবা। ঠিক পরের বছর, ১৯৪০ সালে টাইফয়েডে চলে গেলেন হাসির একমাত্র ভাই বাবলু। আর তার পরের বছর হাসি পেলেন মৃত্যু দেবতার ডাক।
Very nice