বৃহস্পতিবার | ১৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | সকাল ৭:৩২
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নিউরাল কারেন্সি’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কালীঘাট পটচিত্রের ইতিকথা : মনোজিৎকুমার দাস খোলাখাম : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ জামা, জামি, জামাইষষ্ঠী : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় পলিসি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন আবশ্যক : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পলাশীর যুদ্ধ ও একটি সিদ্ধান্ত (শেষ পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পলাশীর যুদ্ধ ও একটি সিদ্ধান্ত (প্রথম পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিজুরিকা চক্রবর্তী-র ছোটগল্প ‘একাকিনী’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী-র ছোটগল্প ‘আবহমান’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সুস্বাদু ও রসালো আলুবোখারা–প্রকৃতির এক অনন্য উপহার : রিঙ্কি সামন্ত প্রবাস বাংলা কালচারাল সোসাইটির অনবদ্য সুরঞ্জলি রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী : ফারজানা নাজ শম্পা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্মৃতিবেলা : শিশুবেলা : ড. শিবশঙ্কর পাল ইবোলা ভাইরাস দ্রুত ছড়ালেও আতঙ্ক ছড়াবেন না, সতর্ক থাকাই একমাত্র পথ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পরিবেশ দিবসে রবীন্দ্রনাথ : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সিন্ধুসভ্যতা বিশেষজ্ঞ র‍্যান্ডাল ল’-র সুতকাগেনদোর-সফরের নির্যাস : অসিত দাস
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

লিটল ম্যাগাজিন ও একটি সমীক্ষা : প্রসেনজিৎ দাস

প্রসেনজিৎ দাস / ১১৩৩ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৩

“লিটল ম্যাগাজিন মানেই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো” — আমার এক শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মহাশয় হাসতে হাসতে কথাটি বলেছিলেন ‘স্বপ্নের ভেলা’ পত্রিকা প্রকাশ করার আর্জি নিয়ে যখন তাঁর কাছে পরামর্শ চাইতে গিয়েছিলাম তখন। কথাটা একেবারে সত্য না হলেও অনেকাংশে যে সত্যি তা ‘স্বপ্নের ভেলা’ দু-বছর প্রকাশ পেতে না পেতেই বুঝতে পেরেছি, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে কোনো এক দুর্দমনীয় আবেগ কাজ করে এর মধ্যে। আর এই আবেগের তাড়না থেকেই লিটল ম্যাগাজিনগুলির জন্ম।

কলমের অনুষঙ্গে অনেকসময় ‘ব্যারেল’, ‘কার্টিজ’ ইত্যাদি শব্দ শোনা যায়। এগুলি আসলে বন্দুকের এক একটি অংশ। তেমনি বন্দুকের যে অংশে বারুদ ভরা থাকে তাকে বলে ম্যাগাজিন। তাই ম্যাগাজিনকে ‘বারুদশালা’ বললেও কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। সেই অর্থে লিটল ম্যাগাজিন একটা বারুদের ভাণ্ডার।

বারুদে আগুন দিতেই যেমন তা দপ করে জ্বলে ওঠে, তেমনি লিটল ম্যাগাজিনের মধ্যেও এমন এক বারুদের শক্তি সঞ্চিত থাকে যা যেকোনো মুহূর্তে জ্বলে ওঠে মশাল হয়ে।

এই বারুদ অবশ্যই তার মধ্যে থাকা লেখা। ‘দেশ’ পত্রিকায় দেওয়া ১৯৫৩ সালের মে মাসের সংখ্যায় ‘সাহিত্য পত্র’ প্রবন্ধে বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন, — “এক রকমের পত্রিকা আছে, যা আমরা রেলগাড়িতে সময় কাটাবার জন্য কিনি, আর গন্তব্য স্টেশনে নামার সময় ইচ্ছে করে গাড়িতে ফেলে যাই, যদি না কোনো সতর্ক সহযাত্রী সেটি আবার আমাদের হাতে তুলে দিয়ে বাধিত ও বিব্রত করেন। আর এক রকমের পত্রিকা আছে যা স্টেশনে পাওয়া যায় না, ফুটপাথে কিনতে হলেও বিস্তর ঘুরতে হয়, কিন্তু যা একবার আমাদের হাতে এলে আমরা চোখ বুলিয়ে সরিয়ে রাখি না, চেয়ে দেখে আস্তে আস্তে পড়ি, আর পড়া হয়ে গেলে গরম কাপড়ের ভাঁজের মধ্যে ন্যাপথলিনগন্ধী তোরঙ্গে তুলে রাখি, জল, পোকা আর অপহারকদের আক্রমণ থেকে বাঁচাবার জন্যে। যেসব পত্রিকা এই দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তর্গত হতে চায়, কৃতিত্ব যেটুকুই হোক, অন্ততপক্ষে নজরটা যাঁদের উঁচুর দিকে, তাঁদের জন্যে নতুন একটা নাম বেরিয়েছিল মার্কিন দেশে, চলতি কালের ইংরেজি বুলিতে এদের বলা হয়ে থাকে — ‘লিটল ম্যাগাজিন’।

বাংলা সাময়িকপত্রের জন্ম ১৮১৮ সাল থেকে, জন ক্লার্ক মার্শম্যানের সম্পাদনায় ‘দিগদর্শন’। যদিও এগুলোকে লিটল ম্যাগাজিন না বলে বলা হত ‘সাময়িকপত্র’। লিটল ম্যাগাজিন ও সাময়িকপত্র দুটির মধ্যে পার্থক্যও যথেষ্ট। লিটল ম্যাগাজিনের পেছনে কোন ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য থাকে না। এর পেছনে থাকে আবেগ, উৎসাহ আর উদ্দীপনা। নিছক সাহিত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই এগুলির জন্ম। অপরপক্ষে সাময়িক পত্রের মধ্যে থাকে একাধিক উদ্দেশ্য। জ্ঞান, বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্প ইত্যাদি নানা উদ্দেশ্য সাধিত হয় সাময়িক পত্রের মাধ্যমে। তাছাড়া সাময়িকপত্রগুলি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য সাধন করে। তাই এই দুটিকে এক করে ফেলা কখনোই উচিত নয়। ঈশ্বর গুপ্ত সম্পাদিত ‘সংবাদ প্রভাকর’কে অনেকে লিটল ম্যাগাজিন বলে দাবী করেন। তবে ১৯১৪ সালে প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত ‘সবুজপত্র’ পত্রিকা থেকেই যথার্থ লিটল ম্যাগাজিনের যাত্রা শুরু হয়।

অনেকটা আবেগের বশে কোনো উদ্দেশ্য ব্যতীতই প্রচুর লিটল ম্যাগাজিনের জন্ম। অনেকটা ছেলেমানুষি খেলার মত। ইচ্ছে হল একটা পত্রিকা করা দরকার, করে ফেললাম গোছের আর কি। কিন্তু সবসময় কথাটা কিন্তু সত্য নয়। লিটল ম্যাগাজিন নামে লিটল হতে পারে কিন্তু কাজের দিক থেকে সবসময় লিটল নয়। এর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বারুদ, যা যে কোনো মুহূর্তে সব কিছুকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে পারে। এরও থাকে একটা উদ্দেশ্য। শুধুমাত্র আবেগের বসে একটি পত্রিকাকে দীর্ঘদিন চালিয়ে নিয়ে যাওয়া কার্যত অসম্ভব। শুধু আবেগের বশে পত্রিকা করলে তা হয় ক্ষণস্থায়ী। ১২৯২ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাস থেকে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী তথা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেজ বৌঠান জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর সম্পাদনায় জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি থেকে ‘বালক’ নামে একটি ছোট্ট পারিবারিক পত্রিকা প্রকাশিত হতো। তবে এই পত্রিকাটির কার্যাধ্যক্ষ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’-তে লিখছেন — “বালকদের পাঠ্য একটি সচিত্র কাগজ বাহির করিবার জন্য মেজ বউ ঠাকুরানীর বিশেষ আগ্রহ জন্মিয়াছিল।”

কিন্তু পত্রিকাটি দীর্ঘায়ু হয়নি। মাত্র এক বছর চলেছিল। পরে ‘ভারতী’র সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। তাঁর সম্পাদক হয়েছিলেন স্বর্ণকুমারী দেবী। তার আয়ু কাল ছিল সাত বছর।’বালক’ পত্রিকা প্রকাশিত হওয়ার পর ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকার সম্পাদক সজনিকান্ত দাস তাঁর পত্রিকায় ব্যঙ্গ করে লিখেছিলেন — “ভ্রাতা ভগিনী মিলিয়া যে বালকের জন্ম দিল, সে বালক কি দীর্ঘায়ু হইবে না তার অকালে জীবনাবসান ঘটিবে?”

প্রকৃতপক্ষে অনেক লিটল ম্যাগাজিনও তাই, শরতের মেঘের মত ক্ষণস্থায়ী। তবুও সাহিত্যক্ষেত্রে এর গুরুত্বকে অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই।

কবি ও প্রাবন্ধিক বিদ্যুৎ হালদার মহাশয় তাঁর ‘বিবিধ প্রসঙ্গ’ বইয়ের ‘লিটল ম্যাগাজিনঃ সীমাবদ্ধতা ও দায়বদ্ধতা’ প্রবন্ধে লিখছেন — “লিটল ম্যাগাজিন বলতে আমরা এমন সব পত্র-পত্রিকাকে বুঝি যেসব পত্র-পত্রিকার কোন ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য থাকে না। স্বল্প পুঁজি নিয়ে মূলত আন্তরিকতা, সততা ও নিষ্ঠার উপর ভিত্তি করেই নির্মিত হয় লিটল ম্যাগাজিন। অনেক সময় একটি বা দুটি সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পর বন্ধ হয়ে গেলেও সাহিত্যক্ষেত্রে এর গুরুত্বকে কখনোই অস্বীকার করা যায় না। কেউ কেউ মনে করেন লিটল ম্যাগাজিন হলো তরুণ লেখকদের লেখা মক্সো করার জায়গা। কথাটা মোটেই পুরোপুরি ঠিক নয়। কারণ তারুণ্যে ভরপুর হলেও সাহিত্যহীন কোন লেখাকে প্রশ্রয় দেওয়া লিটল ম্যাগাজিনের কাজ নয়। বরং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বাইরে এই সব পত্র-পত্রিকা সাহিত্যে নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার দুঃসাহস দেখায় এবং কোনো মৌলিক লেখাকে ছাপানোর জায়গা করে দেয়।”

এ প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ে গেল। আমার শিক্ষক শ্রী লোকেশ চন্দ্র বিশ্বাস মহাশয় একটা গল্প করছিলেন আমার সঙ্গে। আমি তাঁর কথাকেই উদ্ধৃত করছি — “লিটল ম‍্যাগাজিন কবি, গল্পকার, উপন‍্যাসিক, প্রাবন্ধিকদের আঁতুর ঘর। বেশির ভাগ কবি সাহিত‍্যিকরা বিকশিত হয়েছে লিটল ম‍্যাগাজিন থেকে।”

একটা গল্প শুনেছিলাম সাহেবনগর স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক প্রিয়গোপাল বিশ্বাসের কাছ থেকে। ছয়ের দশকের শেষ দিকে প্রিয়দারা কয়েক বন্ধু মিলে রাণাঘাট থেকে ‘ভাইরাস’ নামক একটা পত্রিকা বের করবেন ঠিক করলেন। ওনারা সকলে তখন রাণাঘাটে থাকতেন। চারিদিকে প্রচার করা হল। এক দিন এক আত্মভোলা কিশোর চায়ের দোকানে বসা ভাবী সম্পাদকের দিকে একটা কাগজ বাড়িয়ে বললো কবিতাটি বের করবেন? সম্পাদক কবিতা পড়ে জিজ্ঞাসা করল কে লিখেছে? উত্তর আমি।

সময়টা শরতের বিকেল। পরিবেশ একটু মায়াবী। সম্পাদক সন্দেহ জনক ভাবে কিশোরের দিকে কাগজ কলম বাড়িয়ে বললো এই পরিবেশের উপর একটা কবিত লেখ তো।

কিশোর একটু ভেবে নিয়ে কবিতা লিখে দিলো।

সম্পাদক বললো তুই আমাদের এখানে আসিস। তোর কবিতা ছাপবো। ‘ভাইরাস’ যতদিন বের হয়েছিল প্রতি সংখ‍্যায় কিশোরটির এক বা একাধিক কবিতা থাকতো।

সে দিনের সেই কিশোরটিই হল আজকের দিনের বিখ‍্যাত কবি জয় গোস্বামী।”

তাই লিটল ম্যাগাজিনের মাধ্যমেই ভাবী কালের কবি, লেখক, প্রাবন্ধিকরা উঠে আসেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য একজন কবি, লেখক বা প্রাবন্ধিক প্রথমেই ‘দেশ’ কিংবা নতুন ‘কৃত্তিবাস’-এর মতো বড় বড় পত্রিকায় লেখা পাঠালেও তা গৃহীত হয় না। তাই তাদের প্রাথমিক ভরসা এই লিটল ম্যাগাজিনগুলো। তবে হ্যাঁ ভালো লেখার কদর তো থাকবেই, যদি তা ‘দেশ’ বা ‘কৃত্তিবাস’-এর মত বড় বড় বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলিতে প্রকাশও পায় তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এমন অনেক লেখক আছেন যাদের লেখা সরাসরি ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আমার বক্তব্য হচ্ছে এই-ছোটো পত্রিকাগুলি (লিটল ম্যাগাজিন) কবি লেখকদের একটা হাতিয়ার। তাঁদের লেখাগুলিকে আরও শান দেওয়ার জন্য, আরও যুগোপযোগী করে তোলার জন্য বিশেষ একটা জায়গা। তার মানে এই নয় যে, এটা লেখা অভ্যাস করার জায়গা। মানের উপর যথেষ্ট নজর দেওয়া হয় লিটল ম্যাগাজিনগুলোতে। তাই লিটল ম্যাগাজিন মানেই আবেগ নয়। এক একটি পত্রিকাকে দেখলেই বোঝা যায় সম্পাদক কত যত্ন নিয়ে সেগুলোকে সাজিয়েছেন! নদিয়ার করিমপুর থেকে প্রকাশিত সম্পাদক দেবজ্যোতি কর্মকারের ‘দর্পণ… মুখের খোঁজে’ পত্রিকা, কৃষ্ণনগর থেকে প্রকাশিত অমৃতাভ দে সম্পাদিত ‘জীবনকুচি’, সঞ্জীব প্রামাণিক সম্পাদিত ‘বাংলা ভাষা’, দেবাশীষ সিংহের ‘মৈত্রী’, সুব্রত পাল সম্পাদিত ‘ঋগ্ধ’, চাপড়া থেকে প্রকাশিত সেলিম মণ্ডল সম্পাদিত ‘তবুও প্রয়াস’, বেথুয়াডহরী থেকে প্রকাশিত দিলীপ মজুমদার সম্পাদিত ‘বনামি’ সাহিত্য পত্রিকাগুলি অতি সাধারণের মধ্যেও অসাধারণ। কোনটাই উদ্দেশ্যই হয়তো ব্যবসায়িক নয়, তবে লিটল ম্যাগাজিনকে টিকিয়ে রাখতে গেলে প্রথমে যেটা প্রয়োজন, সেটা হল অর্থ। তাই কিছু কিছু লিটল ম্যাগাজিন বিক্রি করে সম্পাদক প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে পরের সংখ্যা করার কাজে লেগে পড়েন ‘ব্যোম কালী’ বলে। তাই আকার বা আয়তন নয় বা বিজ্ঞাপন নয়, মানই হোক লিটল ম্যাগাজিনের আদর্শ।

লিটিল ম্যাগাজিনের সমস্যার দিকটা অনেক। প্রথমত অর্থনৈতিক সমস্যা। প্রথমেই বলেছি লিটল ম্যাগাজিনগুলি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য নির্মিত নয়। তাই এতে কোনো বিজ্ঞাপন থাকে না বললেই চলে। নিজের গাঁটের টাকা খরচ করে পত্রিকা চালাতে হয়। চলতি কথায় বলে ‘ভূতের বেগার’। তাছাড়া বর্তমানে ছাপানোর খরচ যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে সম্পাদককে বা পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত সকলকে খুবই সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়। এমনকি অনেক পত্রিকার সম্পাদক কবি বা লেখকদের একটি করে সৌজন্য সংখ্যা দেন। এটা তাঁর অধিকার, এজন্য তাঁর কাছে থেকে কোনো বিনিময় মূল্য চাইতে পারেন না। অনেক পত্রিকার সম্পাদক আবার আগে থেকেই বলে দেন সৌজন্য সংখ্যা আপনি পাবেন। পাশাপাশি একটি বা দুটি পত্রিকা যদি আপনি কিনে নেন তাহলে আমাদের পত্রিকার তরফ থেকে আমরা কৃতজ্ঞ থাকব। কিন্তু অনেকেই পুরোপুরি ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি নিয়ে লিটল ম্যাগাজিন চালান। টাকা ফেলুন তবে পত্রিকায় আপনার লেখা প্রকাশিত হবে, তা আপনার লেখা যতই খারাপ হোক বা ভালো হোক। এমনকি সম্পাদককে টাকা জমা দিয়ে মেকি পুরস্কার ও শংসাপত্র নিয়েও অনেক কবি সাহিত্যিক লোভের ফাঁদে পা বাড়াচ্ছেন।

আবার কোনো কোনো পত্রিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এক একটা লেখক গোষ্ঠী। গোষ্ঠীর বাইরে কোনো কবি বা সাহিত্যিক লেখা পাঠালেও খুব একটা ছাপা হয় না। এটা এক ধরনের অসুখ। লিটল ম্যাগাজিন হোক সততা নিয়ে, আন্তরিকতা নিয়ে, হোক নিষ্ঠা নিয়ে, তার নিরপেক্ষতা বজায় থাকুক। তবেই বাড়বে এর জনপ্রিয়তা। তবে গোষ্ঠী মানেই একেবারে খারাপ ভাবারও কারণ নেই। এক একটি পত্রিকাকে বা একটি লিটল ম্যাগাজিনকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় এক একটা গোষ্ঠী। গোষ্ঠী চেতনা ও চিন্তাভাবনার প্রতিফলন দেখা যায় ম্যাগাজিনগুলির পাতায়।

কোন একটা উদ্দেশ্য বা নির্দিষ্ট লক্ষ্য ব্যতীত কোন পত্রিকায় দীর্ঘদিন স্থায়ী হতে পারে না। একটি বা দুটি সংখ্যা বের করেই অনেক পত্রিকা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। সুতরাং লিটল ম্যাগাজিনের একটি উদ্দেশ্য আগে থেকে স্থির করতে হবে। তবেই তা দীর্ঘস্থায়ী হবে।

লিটল ম্যাগাজিনের আরেকটি সমস্যা হচ্ছে প্রতিষ্ঠানিক বিরোধ। সম্পাদকের সঙ্গে অন্যান্য সদস্যদের বা যে কোন সূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে মাঝে মাঝে মতবিরোধ হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রেই এই বিরোধ ইচ্ছাকৃত নয়। তাদের নিজ নিজ স্বকীয়তা এর জন্য দায়ী। অনেক সময় বিরোধ চরমে উঠলে কিছু সদস্য গোষ্ঠী পরিত্যাগ করে ও হয়তো জন্ম হয় আরেকটি লিটল ম্যাগাজিনের। এজন্য একটি লিটল ম্যাগাজিনের দায়বদ্ধতাও অনেক।

১) আয়তন নয় মানই হোক এর আদর্শ।

২) কবি বা লেখকদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব বর্জন করে ভালো লেখাকে প্রাধান্য দেওয়া।

৩) প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধ দমন করে একটি মজবুত সংগঠন গড়ে তোলা।

৪) লিটল ম্যাগাজিনের একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকবে। একটা আন্দোলন, একটা নতুন ভাবনা ও কর্মের মধ্য দিয়ে তার প্রতিফলন ঘটানো। যেমন — ‘সবুজপত্র’। এর উদ্দেশ্য ছিল বাংলা ভাষাকে সাধু ভাষার প্রভাব মুক্ত করে চলিত ভাষাকে সাহিত্যের ভাষা হিসেবে গড়ে তোলা। প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক প্রমথ চৌধুরীর কাছে এ ছিল এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। এই দায়বদ্ধতাও লিটিল ম্যাগাজিনের আদর্শ।

৫) যেসব কবি বা সাহিত্যিকদের লেখা তাতে প্রকাশিত হচ্ছে তাঁদের কোনো বিনিময় মূল্য ছাড়াই একটি সৌজন্য সংখ্যা প্রদান করা।

৬) লেখা নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটি নিরপেক্ষ কমিটি তৈরি করা, যাঁরা নির্দিষ্ট কোনো কবি বা লেখক বা প্রাবন্ধিকের প্রতি পক্ষপাত বর্জন করে পত্রিকার জন্য লেখা নির্বাচন করবেন।

৭) প্রুফ দেখার সময় নির্দিষ্ট বানানরীতি অনুসরণ করা আবশ্যক। তাড়াহুড়ো করে নয়, প্রয়োজনে বারবার দেখা প্রয়োজন।

৮) লিটল ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদটাও আকর্ষণীয় হলে ভালো হয়। অনেক প্রচ্ছদ বিমূর্ত ধারণাকে নির্ভর করে তৈরি করা হয়, যাতে তার আকর্ষণ বাড়ে। এ সম্পর্কে অবহিত হওয়াটাও সম্পাদক বা পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত সকলের কর্তব্য।

এই দায়বদ্ধতার উপরেই লিটল ম্যাগাজিনগুলির স্থায়িত্ব ও জনপ্রিয়তা নির্ভর করে। শুধুমাত্র ব্যবসায়িক স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে লিটল ম্যাগাজিন গুলি যাতে তার মূল উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হয়, সেটা দেখাও সম্পাদকের কর্তব্য। তার উপরেই লিটল ম্যাগাজিনগুলির সাফল্য নির্ভর করে।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জীঃ

১) ‘হারিয়ে যাওয়া পত্রিকার কথা’ প্রবন্ধ, বারিদবরণ ঘোষ, নতুন ‘কৃত্তিবাস’ বিশেষ সংখ্যা।

২) ‘বিবিধ প্রসঙ্গ’, বিদ্যুৎ হালদার।

৩) ‘বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত’ — ড. অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়।

৪) উইকিপিডিয়া।


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন