| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্বাধীনতা — অর্জন নয়, দায়িত্বও : যশোবন্ত রায় চোখের বালি যখন চোখের বালিশ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বিশ্বচরাচরের আনন্দ : অমর মিত্র

Reporter
অমর মিত্র / ৫৯৬ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২

সারা বছর কায়ক্লেশে বেঁচে থাকি, উৎসব নিয়ে আসে তা থেকে মুক্তি। বাঙালির জীবনে বারো মাসে তেরো পার্বণ। এর ভিতরেই বড় উৎসব হিন্দুর দুর্গোৎসব আর মুসলমানের ইদুল ফিতর, খুশির ইদ, আর খ্রিস্টানের বড় দিন। তিন মহা উৎসব বাদ দিয়ে ধর্মীয় এবং লোকপুরাণের সঙ্গে যুক্ত আরো কত যে উৎসব, টুসু, ভাদু, নবান্ন, থেকে নানা ব্রত শবে বরাত, পীর ফকিরের উরস—সব। সমস্ত উৎসবই আনন্দের, সমস্ত উৎসবই আত্মীয় বান্ধব, অবান্ধবে মিলনের। দুর্গোৎসবের পশ্চাতে শরতের চালচিত্র, ভয়ানক গ্রীষ্ম আর তিনমাস বর্ষার পর শরৎকাল আশ্বিন মাস আসে আনন্দের ধ্বজা উড়িয়ে। ধানের ক্ষেতে রৌদ্র ছায়ায় লুকোচুরি খেলা,আকাশ নীল বরণ, তার ভিতরে পুঞ্জ পুঞ্জ সাদা মেঘের ভেলা, নদীর তীর খোলা মাঠের ধারে কাশবন, পুজো আসছে। প্রকৃতির ভিতরেও মুক্তির আনন্দ। যদি শহর থেকে দূরে যান, ঢাকের শব্দ ভেসে আসবে। শারদোৎসবের জানান দেয় ঢাকিরা। কত দূর থেকে ভেসে আসে ঢ্যাম কুড়কুড় কুড়, ঢাকের শব্দ। আমাদের এই উৎসবের সঙ্গে প্রকৃতির যোগ। প্রকৃতিই আনন্দ নিয়ে আসে, উৎসবে তা পূর্ণতা পায়।

আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ,

আমরা বেঁধেছি শেফালিমালা,

নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে সাজিয়ে এনেছি ডালা।

এসো গো শারদলক্ষ্মী, তোমার শুভ্র মেঘের রথে,

এসো নির্মল নীল পথে।

মানুষের জীবন প্রকৃতিরই অংশ। প্রকৃতি এই জীবন-জন্মকে নিয়ন্ত্রণ করে। শরৎ এলে তা স্পষ্ট হয়। মনের ভিতরে নীলাকাশ, কাশের বন আর শেফালি ফুল ছায়া ফেলে। আনন্দের দিন এসেছে বলে প্রস্তুত হই আমরা। আমাদের পুরাণ, যা কি না শাস্ত্র বলে মানা হয় তা কবি কল্পনায় পূর্ণ। সেই পূর্ণতার ছায়া এসে পড়ে দৈনন্দিনতায় ক্লিষ্ট মানুষের জীবনে। শারদোৎসব যতটা না ধর্মীয়, ততটাই হয়ে উঠেছে লোক জীবনের। অন্তত এখন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারি পাওয়া জমিদার গৃহে দুর্গা পুজো মহারানি ভিক্টোরিয়ার বন্দনা কি না সেই কূট তর্কে না গিয়ে বলি সদর-মফস্‌সল এখন দুর্গোৎসবকে জনমানসের উৎসব করে তুলেছে। এমন আনন্দের উৎসব আর নেই। ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে দুর্গোৎসবে নিজেকে শামিল করতে চায়। দেবীর চালচিত্র, দেবীর সঙ্গে দুই পুত্র দুই কন্যা, আর আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যে যে প্রাণী জড়িত তারা তাঁদের বাহন। মহিষ, ইঁদুর, হাঁস, পেঁচা তো এই বঙ্গ জীবনের সাথি। আর ময়ূর তো বাঁকুড়া পুরুলিয়ার জঙ্গলে দেখা যায়। ছেলেবেলায় পেটমোটা হাতির মাথা বসান গণেশ ঠাকুর ছিল সবচেয়ে আনন্দের। অতবড় গণেশ ঠাকুর, তার চেলা ওইটুকুনি মূষিক। এর চেয়ে বড় আনন্দের আর কী আছে। বাল্যকালে মা দুর্গা, লক্ষ্মী সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ—সকলকে প্রথমে প্রণাম। তারপর রক্তাক্ত নিহত মহিষাসুরকে প্রণাম, তারপর সিংহ হয়ে পেঁচা, হাঁস, ময়ূর এবং ইঁদুর ঠাকুরকে। বিশ্বাস হ’ত না মহিষাসুর সত্যি সত্যি নিহত হত। তাহলে পরের বছর কী করে আসেন? মা যেমন আসেন তাঁর সন্তানাদি নিয়ে, তেমনি আসেন মহিষাসুরকে নিয়েও। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। আমাদের এপারের গ্রামের নাম দণ্ডিরহাট। সেই গ্রামে ছেলেবেলা কেটেছে। পুজোর আনন্দ শুরু হ’ত সেই রথযাত্রার দিনে কাঠামো কাটা শুরু হতে। বসু জমিদার বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপে ঠাকুর তৈরি আরম্ভ হ’ত সেই রথযাত্রার দিন থেকে। আমাদের ইস্কুলের পাশেই সেই চণ্ডীমণ্ডপ। প্রতিদিন ইস্কুলের ছুটির ঘণ্টা পড়ে গেলে দেখতে যেতাম আনন্দের জন্ম। কাটামোয় খড় বাঁধা হচ্ছে, আনন্দ। মৃৎ শিল্পীরা বসে গল্প করছে, আনন্দ। কাঠামোয় মাটি পড়ছে, আনন্দ। খড়ের কাঠামোয় দেখতে পাচ্ছি মায়ের আদল, আনন্দ। বর্ষাকাল চলছে, তার ভিতরেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে মা দুগগার পরিবার। সমস্তটাই আনন্দ। মৃৎশিল্পীরা যদি একবার বলেন, খোকা ওটা দাও, এটা ধরো, জীবন ধন্য, আনন্দ। আমাদের সহপাঠী রমানাথ পণ করেছিল ঠাকুর গড়ার শিল্পী হবে। সে একবার, তখন ক্লাস সিক্স, সরস্বতী ঠাকুর গড়েছিল। মূর্তি যা গড়ার গড়েছিল, কিন্তু মুখখানি তো পারেনি, কেন না ছাঁচ কোথায় পাবে? থ্যাবড়া মতো হয়েছিল, মোঙ্গলয়েড মুখ, তাও নয়, শ্রীহীন, কিন্তু “নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর খাসা”, সেই মূর্তিতেই কত আনন্দ। রমানাথ পরে এই লাইনে আসেনি। ঠিকেদার হয়ে প্রভূত আয় করেছে। ঠাকুর না গড়ে পুজোর প্যান্ডেল বানিয়েছে কি না আমি জানি না। যাই হোক, খুড়তুতো ভাই বোন মিলে দশ দশ কুড়িজন। তার ভিতরে বড়জন অধ্যাপনা করেন রানিগঞ্জে। আমরা তিনজন, পবন, ডাকু ও আমি কাছাকাছি বয়সের। আমাদের তিনজনের জন্য একই থান কেটে জামা, একই রকম হাফ প্যান্ট। ইউনিফর্ম। পুজোর আনন্দ নতুন জামা কাপড়ে।

আশ্বিনের মাঝামাঝি, উঠিল বাজনা বাজি

পুজোর সময় এল কাছে

মধু বিধু দুই ভাই ছুটাছুটি করে তাই

আনন্দে দুহাত তুলি নাচে।

পিতা বসি ছিল দ্বারে, দুজনে সুধালো তারে,

‘কী পোশাক আনিয়াছ কিনে’?…।

আমরা ভাই বোনেরা পুজোর আনন্দে বিধুই। কিন্তু মধুর মতো ফুলকাটা সাটিনের জামার বায়না করতাম না কেউ। যা পেয়েছি নতুন তাই ভালো। একবার, তখন আমি কলকাতায়। পিতামহ-র খুব অসুখ। পুজোর আগে জলের মতো টাকা গেছে বাবার। পুজোয় কিছুই হয়নি। চোখে জল। শেষ অবধি ফুটপাত থেকে জামা, প্যান্ট আর রবারের হাওয়াই চটি কিনে দেওয়া হল ষষ্ঠীর দিনে। দাম সর্ব মোট দশ টাকা। আমি গিয়েছিলাম সঙ্গে, মনে আছে তাই। কিন্তু তাতেই কী আনন্দ! উপরের বালক রেয়নের প্যান্ট পরেছে, টেরিলিনের শার্ট পরেছে, আমার সস্তার জামা প্যান্টের আনন্দ ম্লান হয়নি তাতে। বাল্যকালে খুব পছন্দের ছিল রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতা। আশ্বিনের মাঝামাঝি…। শেষ কয়টি পঙ্‌঩ক্তি এখনও মনে আছে—

আয় বিধু, আয় বুকে, চুমো খাই চাঁদ মুখে

তোর সাজ সবচেয়ে ভালো।

দরিদ্র ছেলের দেহে দরিদ্র বাপের স্নেহে

ছিটের জামাটি করে আলো।

পুজো আসে অনেকদিন ধরে। এই আনন্দের কোনও তুলনা হয় না। একদিনের দুদিনের বা চারদিনের নয় এই উৎসব। সেই রথযাত্রা থেকে আরম্ভ হয়ে বিজয়া দশমীতে শেষ। আনন্দ কেমন, না ইস্কুল চলছে, হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা চলছে, কিন্তু তার ভিতরেই দেবী গড়ে উঠছেন। একটু একটু করে আনন্দের দিন এগিয়ে আসে। মনে পড়ে দুর্গোৎসব একটা সময় ছিল সার্বিক আনন্দের উৎসব। কেমন তা বুঝিয়ে বলি। পুজোর গান আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। সেই গানের অপরূপ লিরিক লিখতেন কবি বিমলচন্দ্র ঘোষ, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, মুকুল দত্তরা, সুর দিতেন, গাইতেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, শ্যামল মিত্র, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়রা। গাইতেন লতা, সন্ধ্যা, আরতি, প্রতিমা, বনশ্রী সেনগুপ্তরা। পুজোর গানে পুজোর আনন্দ। সলিল চৌধুরির সুরে হেমন্ত গাইলেন ‘ পথ হারাব বলেই এবার পথে নেমেছি…।’ মুকুল দত্তর লিরিকে হেমন্ত সুর দিলেন ও গাইলেন, তারপর ? তার আর পর নেই, নেই কোনো ঠিকানা…। বুক ভরে যায় এখনও। পুজোর গানে ছিল পুজোর আনন্দ। পুজোর সিনেমা। উত্তম মাধবী অভিনীত প্রেমের ছবি শঙ্খবেলা। ‘চৌরঙ্গী’ মুক্তি পেল পুজোয়। ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ পুজোয়। দল বেঁধে চলো যাই গানে গানে ভরা বাংলা সিনেমা দেখতে। উত্তম, সৌমিত্রর ছবি মুক্তি পেয়েছে। আর তখন রঙ্গমঞ্চেরই বা কত প্রতাপ। পেশাদারি রঙ্গমঞ্চ যেমন, গ্রুপ থিয়েটার তেমন। সত্তর বা একাত্তর সালে রঙ্গনা থিয়েটার তৈরি হল। পুজোর সময় নান্দীকার নিয়ে এল ভালো মানুষ, মঞ্জরী আমের মঞ্জরী, শের আফগান…। পুজোর আনন্দ নাটক দেখে। সপরিবারে দেখতে গেছি গিরিশ মঞ্চে, ‘মাধব মালঞ্চী কন্যে।’ এখন ছুটি থাকে সরকারি রঙ্গমঞ্চ। সুতরাং নাটক বন্ধ। বেসরকারি মঞ্চ প্রায় শেষ। পুজোয় এত বিকিকিনি, হল বন্ধ রেখে নাটক বন্ধ রেখে নাটকের কি ভালো হল? আনন্দটা যে মুছে গেল।

বাল্যকালে ফিরি। পুজো বার্ষিকীতে পুজোর আনন্দ। ছোটদের বার্ষিকী একটা পেতাম। তার ভিতরে মা দুগগা তার ছেলেমেয়েকে পড়ে শোনাতেন হেমেন্দ্রকুমার রায়, আশাপূর্ণা দেবী, লীলা মজুমদার, ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্যর লেখা। পরে সত্যজিৎ হয়েছিলেন প্রথম পাঠ্য, তখন কিশোরবেলা শেষ। সে কী আনন্দ পুজো বার্ষিকী পেয়ে। হ্যাঁ, দেব সাহিত্য কুটির ছিল এই বার্ষিকীতে অগ্রগণ্য। এই আনন্দ এখনও আছে। এখন ছোটদের কত ভালো ভালো পুজো বার্ষিকী। বড়দেরও। লিটল ম্যাগাজিনও। ভালো মন্দ দুরকম লেখা আগেও থাকত, এখনও থাকে। কিন্তু এইটা সত্য পুজো সংখ্যার আনন্দ কম নয়। সবই কৈলাস থেকে দেবীর নাইওরে আসার সঙ্গেই জড়িত। নাইওর পূর্ববঙ্গের রীতি। বিবাহিতা কন্যার বৎসরান্তে বাপের বাড়ি আসাই নাইওর। শচীন দেববর্মণের সেই গান স্মরণ করুন।

“কে যাস রে ভাটির গাঙ বাইয়া

আমার ভাইধনরে কইয়ো নাইওর নিত কইলা…।”

গাঙের ধারে দাঁড়িয়ে গ্রাম বধূটি (যে মা দুগগাই) ডাকছে বয়ে যাওয়া নৌকার মাঝিকে। মা দুগগা তো সন্তানদের নিয়ে বাপের বাড়িই আসেন। সঙ্গে অসুর ঠাকুর। দেবীর আগমন একেবারে আমাদের জীবনের নানা অনুভূতির সঙ্গে জড়িয়ে। এ বড় আনন্দের। এ বড় সুখের। সারা বছর কত কষ্টে যায়, কত উদ্বেগে যায়, এই পুজোর কটা দিন আনন্দের দিন। আমাদের বাল্যকালে রেশন না তুলে উপায় ছিল না। লাইন দিতে হ’ত চাল, গম, চিনি কিনতে। পুজোর সপ্তাহে বরাদ্দ ডবল। তাতেই আনন্দ। চাল চিনি আক্রা। ১৯৬৫-৬৬-র কথা বলছি। খাদ্যের খুব অভাব হয়েছিল তখন। তবু পুজোয় ডবল চাল, চিনি, গম। সঙ্গে সুজি। তাতেই ভালো মন্দ রান্না করতেন সব সংসারের মা দুগগা। যার যেমন সাধ্য। সেই আনন্দ এখনও আছে। হত দরিদ্র ঘরেও ভালো মন্দ পাতে পরিবেশন করতে চান মা অন্নপূর্ণা। পুজোর আনন্দ এই। আরো আনন্দের ভিতরে পুজোয় সকলের হাতে কিছু অতিরিক্ত আসে। হ্যাঁ, হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান—সকলের হাতে। পোশাক শিল্প এই সময় ফুলে ফেঁপে ওঠে, বড় কোম্পানি, বড় পোশাকের মল থেকে হাওড়া হাট, হরি সা হাটের হকার নৈমুদ্দিন, আর নেপেন মণ্ডলও বেচা-কেনা করে অনেক লাভ করে। সব কিছু কেনা-বেচা হয় পুজোর কত আগে থেকে। সবাই প্রস্তুত হয় তার জন্য। কয়েক দশক আগেও পাড়ার দর্জিদের খুব দাম ছিল। ছোট ছোট পুঁজির দর্জি, তিন মাস আগে থেকে অর্ডার ধরত। অষ্টমী এমনকী নবমীতেও জামা, প্যান্ট, পাঞ্জাবি, ফ্রক ডেলিভারি দিত ছোট ছোট খদ্দেরকে। এখন তারা বিলুপ্ত প্রাণী। রেডি মেডের বাজার। তারা বড় বড় কারখানা করে নির্মাণ করছে বিপুল পরিমাণ পোশাক। সেখানে যারা সেলাই মেশিনের সামনে বসে আছে, তারা কর্মচারী। স্বাধীন ব্যবসায়ী নয়। পুজোর এই আনন্দ চলে গেছে। প্যাণ্ট বা শার্ট তৈরি করতে দিয়ে ট্রায়াল দেওয়াতেও সেই কিশোর কিংবা যুবকের আনন্দ ছিল, পুজোর আনন্দ নতুন জামায়। পুজোয় সবই নতুন। পুজো মানে নতুনের আনন্দ। পুজো বার্ষিকী প্রকাশের জন্য এই সময় ছাপাখানা, বাঁধাইখানায় খুব চাপ। এই সময় উপার্জন হয় অনেক। পুরানো পাওনা মেটাতে হয় প্রকাশককে। বাঁধাইখানার একটি বালককে দেখেছি ক’দিন আগে, বছর দশ। উদলা গা। বালকটি বই বাঁধাইখানার ভয়ানক গুমোটে সমস্তদিন মেশিনের চাকা ঘুরোচ্ছে বা ভাঁজ করা বইয়ের ফর্মা সাজাচ্ছে। সে পত্রিকার বান্ডিল কচি মাথায় বয়ে পত্রিকা অফিসে এল। কিছু পাবে। তিনবার এসে দশ টাকা তার অতিরিক্ত আয়। কী আনন্দময় হয়ে উঠল তার মুখখানি। সে তো মা অন্নপূর্ণার সন্তান। তার আনন্দে বিশ্বচরাচর হেসে উঠবে। পুজোর আনন্দ সকলের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া হোক। আর অতিরিক্ত বৈভব আর উল্লাস প্রদর্শন না করে দরিদ্র, নাচার মানুষকেও এই আনন্দের ভাগ দিন সদর মফসলের পুজো কমিটি।

প্রথম প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭

ছবি : চয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev