বুধবার | ১০ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | দুপুর ১২:৩৫
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিজুরিকা চক্রবর্তী-র ছোটগল্প ‘একাকিনী’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী-র ছোটগল্প ‘আবহমান’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সুস্বাদু ও রসালো আলুবোখারা–প্রকৃতির এক অনন্য উপহার : রিঙ্কি সামন্ত প্রবাস বাংলা কালচারাল সোসাইটির অনবদ্য সুরঞ্জলি রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী : ফারজানা নাজ শম্পা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্মৃতিবেলা : শিশুবেলা : ড. শিবশঙ্কর পাল ইবোলা ভাইরাস দ্রুত ছড়ালেও আতঙ্ক ছড়াবেন না, সতর্ক থাকাই একমাত্র পথ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পরিবেশ দিবসে রবীন্দ্রনাথ : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সিন্ধুসভ্যতা বিশেষজ্ঞ র‍্যান্ডাল ল’-র সুতকাগেনদোর-সফরের নির্যাস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘পঞ্চাশ নম্বরে নাম’ ক্ষয়িষ্ণু পুরুষ লেখক সসীম কুমার বাড়ৈ আলোচক সুতপা দত্ত দাশগুপ্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতার হকার, উচ্ছেদ অভিযান, ইতিহাসের প্যারাডক্স : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিনোদিনী দিন ফিরিবার নয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আইসক্রিমের দারুন স্বাদে গরম হোক উধাও : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-এর ছোটগল্প ‘পদ্মপাতার জল’ নজরুলের চোখে ক্ষুদিরাম : শৌনক ঠাকুর ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ইতিহাসসাধক স্বদেশরঞ্জন মণ্ডল : দিলীপ মজুমদার
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

দেবী সরস্বতী (প্রথম পর্ব) : স্বর্ণাভা কাঁড়ার

স্বর্ণাভা কাঁড়ার / ৯৮২ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২

মুনি বাল্মীকির তপোবন। সময় প্রভাত। ‘অম্বরে অরুণোদয়’ তথে বয়ে চলেছে তটিনী তমসা। তরুশাখায় মনের সুখে খেলা করছে ক্রৌঞ্চ-ক্রৌঞ্চী। বাল্মীকি ঘুরে ঘুরে বনশোভা দেখছেন। সহসা ব্যাধ বাণ নিক্ষেপ করল। মাটিতে লুটিয়ে পড়ল নিহত ক্রৌঞ্চ। তাকে ঘিরে ক্রৌঞ্চীর ক্রন্দনরোল। বাল্মীকির মনে করুণার ঢেউ বয়ে গেল। সেই মুহূর্তে তাঁর ললাটদেশে আবির্ভূতা হলেন এক জ্যোতির্ময়ী কন্যা। তিনি ধীরে ললাট থেকে নেমে দাঁড়ালেন বাল্মীকির সামনে। ক্রৌঞ্চীর ক্রন্দনে তিনিও উতলা হলেন। সকরুণ স্বরে বেজে উঠল তাঁর হাতের বীণা। বাল্মীকির অন্তরে করুণার তরঙ্গ।

ঘটনাটি ‘সারদামঙ্গল’ কাব্যে পদ্যছন্দে বর্ণনা করেছেন কবি বিহারীলাল। বাল্মীকির ললাট মণ্ডলে আবির্ভূতা করুণারূপিণী জ্যোতির্ময়ী এই কন্যাই দেবী সরস্বতী। তাঁরই প্রভাবে করুণ-হৃদয় বাল্মীকির কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল করুণরসের ব্যঞ্জনাময় ‘মা নিষাদ’ শ্লোক। এই শ্লোকেরই বিস্তার বাল্মীকি প্রণীত রামায়ণ। সেই থেকে লোকে বলে দেবী সরস্বতীর বরেই বাল্মীকি এদেশের ‘আদি কবি’।

রবীন্দ্রনাথও তাঁর ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ গীতনাট্যে দেখিয়েছন, দস্যু বাল্মীকির কণ্ঠে বিহগ-বিরহে দেবভাষায় সুললিত বাণীতে যে ‘মা নিষাদ’ শ্লোক নির্গত হয়েছিল, তার প্রেরণা বীণাপাণি সরস্বতী। দেবী বন উজ্জ্বল করে মূর্তিমতী হয়ে বাল্মীকিকে দেখা দিয়ে তাঁর হাতের বীণাখানি তাঁকে উপহার দিয়ে আশীর্বাদ করেছিলেন,

যে করুণ রসে আজি ডুবিল রে ও হৃদয়

শত স্রোতে তুই তাহা ঢালিবি জগৎময়।

বাল্মীকি রামায়ণে ঘটনাটি অন্যরূপ। ক্রৌঞ্চ নিহত হলে বাল্মীকির অজ্ঞাতসারে অকস্মাৎ তাঁর মুখ থেকে পাদবদ্ধ পদ উচ্চারিত হয়। শোক থেকে জন্ম বলে পদ্যের নাম হয় ‘শ্লোক’। ব্রহ্মা বলেন, তাঁর ইচ্ছাতেই বাল্মীকির কণ্ঠে সরস্বতী ভর করেছিলেন। মূল রামায়ণে স্বরস্বতী মূর্তি ধরে দেখা দেননি। প্রতিমা-প্রতীকে দেবতার প্রকাশ পরবর্তীকালে কল্পনা।

আসল কথা, দেবী সরস্বতীই কাব্য-প্রেরণা। যে বাক্‌সমষ্টি নিয়ে কাব্য-সাহিত্য রচিত হয়, তিনিই তাঁর নিয়ন্ত্রী। তাঁর প্রসাদেই রত্নাকর দস্যু কবি হন, মূর্খ কালিদাসের কণ্ঠ ছন্দে মুখল হয়ে উচ্চারণ করে — ‘আস্তি কশ্চিদ্‌ কাগ্‌বিশেষঃ’। আর বাংলার কবি কৃত্তিবাস গৌড়েশ্বরের সভায় অনর্গল শ্লোক উচ্চারণ করতে করতে অনুভব করেন, ‘সরস্বতী অধিষ্ঠান আমার শরীরে’।

দেবী সরস্বতী যেমন কবিত্বের উৎস, তেমনই তিনি স্বর-সঙ্গীত তাল-মানেরও কারণ-রূপিণী। রায় গুণাকর ভারতচন্দ্র বলেন, তিনি ‘নৃত্যগীত বাদ্যের ঈশ্বরী’। ছয় রাগ, ছত্রিশ রাগিণী, বিবিধ অনুরাগ — সপ্তস্বর, তিন গ্রাম, একুশ মূর্ছনা তাঁরই আজ্ঞায় গায়েক কণ্ঠে বিচিত্র সুর সৃষ্টি করে। বাদ্যযন্ত্রের বোল, তান, মান, লয় তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন। নৃত্যের সুষম ছন্দও জেগে ওঠে তাঁরই নির্দেশে। তাই কিন্নর-কিন্নরী, গান্ধর্ব-অপ্সরী সরস্বতীর সেবক-সেবিকা। বিশ্বের চারুকলায় চারুহাসিনী দেবার বিচরণ।

ভাস্বতী ভারতী দেবী শুধু কাব্য বা সঙ্গীতকলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী নন, তিনি যাবতীয় বিদ্যা, বুদ্ধি, জ্ঞানেরও দেবী। শাস্ত্রমতে এদেশের সকল বিদ্যা অষ্টাদশ বিদ্যায় (চার বেদ, ছয় বেদাঙ্গ, ইতিহাস-পূরাণ, চার উপবেদ মীমাংসা ও ন্যায়বিস্তর) সমীকৃত। দেবী নিজেই একাধারে ‘বিদ্যা বিদ্যাধি দেবতা’। তিনিই মেধা, স্মৃতি, প্রতিভা, তিনিই ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত, অর্থ, তিনিই বিচার ও শিষ্য-প্রবোধিকা শক্তি। তিনিই জ্ঞান, জ্ঞানাগ্নির অরণি, জ্ঞানের আলো জ্যোতীরূপা সনাতনী। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর আরাধ্যা দেবী সরস্বতী।

দেবী সরস্বতীর এত গুণ, এত ক্রিয়া, এত উপাধি। মনে প্রশ্ন জাগে, আসলে ইনি কে, ইনি কী?

প্রকৃতি-প্রত্যয়গত অর্থে সরস্বতী হলো উদক নাম। সরস্‌ এর সঙ্গ ‘বতু’ যুক্ত হয়ে স্ত্রীলিঙ্গে ‘ঈ’ যোগে সরস্বতী পদটি নিষ্পন্ন। অর্থ জলবতী নদী। বস্তুত সরস্বতী বৈদিক যুগের একটি বিখ্যাত নদী। বৈদিক আর্যগণ যে ব্রহ্মাবর্ত দেশে প্রথম নিবাস স্থাপন করেছিলেন, সেটি হলো দৃষদ্বতী ও সরস্বতী নদীর মধ্যবর্তী দেশ। সরস্বতী নদীর তীরেই পূণ্য যাগ-যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হতো। সরস্বতীর নির্মল জলে স্নান করে ঋষিরা পবিত্র হতেন, তাঁদের দেহমল দূরীভূত হতো, মন আনন্দে পূর্ণ হতো। সরস্বতীর স্বচ্ছ জলে যাজ্ঞকর্ম নির্বাহ হতো, সরস্বতীর সুধারায় ভূমি শস্যশালিনী হয়ে উঠত। তাই ঋষিরা কৃতজ্ঞতায় আনন্দে সরস্বতীর স্তবে মুখর হয়ে তাঁকে ‘নদীতথে’, ‘অম্বীতথে’ বলে সম্বোধন করতেন।

বেদের বিভিন্ন মণ্ডলে, বিভিন্ন সূত্রে, পৃথক পৃথক ঋকে নদীরূপা সরস্বতীর বন্দনা ছড়িয়ে আছে। ঋষি ভরদ্বাজ বলেছেন,

সরস্বতী প্রবলবেগে পর্বত সানু ভগ্ন করেন, তাঁর ঊর্মি সমূহ উভয়কূল প্লাবিত করে। সরস্বতী ‘পারাবতথ্রী’ — তাঁর উন্মুলনকারিণী।

ঋষি বশিষ্ঠ সরস্বতীকে বন্দনা করে বলেছেন, তিনি উদক ধারণ করেন। তিনি গিরি থেকে সমুদ্র পর্যন্ত পথে গমন করেন। তিনি সেচন সমর্থা ও অভীষ্টবর্ষী। তাঁর ঊর্মিসমূহ ‘মধুমন্তো ঘৃতশ্চূতঃ — মধুর ও শক্তির উৎস। পাশ্চাত্য পণ্ডিতেরা মনে করেন, সরস্বতী আসলে জলবতী নদী।

তাই বলে সরস্বতী শুধু জড়প্রকৃতি জল নন। বৈদিক ঋষিরা প্রকৃতি-প্রেমিক হলেও কেবল জল পদার্থের বন্দনা করেননি। তাঁরা সরস্বতীর আর এক রূপের কথা জানতেন। যে রূপে সরস্বতী চিন্ময়ী ও দ্যোতনশীলা। সেই রূপটিকেই তাঁরা দেবতা জ্ঞানে আবাহন করতেন, তাঁর প্রতি স্তুতি নিবেদন করতেন। মধুচ্ছন্দা ঋষির কণ্ঠে মধুর গায়ত্রীছন্দে ঝঙ্কৃত হয়েছে এই দেবী বন্দনা —

পাবকা নঃ সরস্বতী বাজেভিধাজিনীবতী।

যজ্ঞং বষ্টু ধিয়ংবসুঃ ।।

কোদয়িত্রী সুনৃতানাং চেতন্তী সুমতীনাং ।

যজ্ঞং দধে সরস্বতী ।।

—পাবমানী, অন্নবতী, যজ্ঞে ধনদাত্রী সরস্বতী আমাদের যঞ্জভাগ গ্রহণ করুন।

পরম সত্য বাক্যের প্রেয়য়িত্রী, শুভমতির উদ্বোধকারিণী সরস্বতী যজ্ঞ ধার ধারণ-করে আছেন। এখানে সরস্বতী বাগদেবতা। তিনি শক্তির আধার, জ্ঞানের উৎস। শুভ বুদ্ধির প্রেরণা। ঋষি বশিষ্ঠও এই দেবতার কাছে প্রার্থনা করে বলেছেন, কল্যাণী বাগদেবী কল্যাণ বিধান করন। শোভনগমনা সরস্বতী কল্যাণ বিধান করুন। শোভনগমনা সরস্বতী প্রজ্ঞা উৎপাদন করেন।

মহর্ষি যাস্ক ঠিকই বলেছেন, বৈদিক বাক্যে সরস্বতী নদী ও দেবতা দুই রূপেই প্রতিষ্ঠিতা আছেন, সরস্বতীর ‘নদীবদ্‌ দেবতাবচ্চ নিগমাভবন্তি’। তিনি আরও বলেন, দেবতারূপে সরস্বতী বাগর্থে প্রযুক্তা হন।

বেদে স্থান ও অবস্থান বেদে বাগদেবতার তিনটি নামভেদের কথা বলা হয়েছে। দ্যুলোকে তিনি ‘ভারতী’, সূর্যতেজ বা দৈবী বাক্, ভূলোকে তিনি অগ্নিশিখা ‘ইলা’ এবং অন্তরিক্ষ লোক তিনি ‘সরস্বতী’ — মাধ্যমিকা বাক্ বিদ্যুৎ বা মেঘধ্বনি। বৈদিক সংহিতায় বাক্ বা শব্দের চারটি রূপভেদের কথাও বলা হয়েছে। ব্যক্ত ও অব্যক্ত, শ্রুত ও অশ্রুত ধ্বনিরূপে বাকের অবস্থান। পরমা বাকের তিনটি পদ গুঢ়, গুহাতিত। কবি মণীষীরাই তাঁকে জানতে পারেন। চতুর্থ প্রকারের বৈখরী বাক্ কথায় ব্যবহার করে সকল মানুষ — ‘তুরীয়ং বাচং মনুষ্যা বদন্তি’।

বৈখরী বাক্ ভাষাশিক্ষার প্রথম সোপান। এই বাক্যকেই বুদ্ধির চালুনী দিয়ে ছেঁকে বুদ্ধিমান মানুষেরা ব্যবহার করেন। শুদ্ধ বাক্যেই সখ্য স্থাপিত হয়, বাক্যেই বাস করেন ভদ্রা লক্ষ্মী। ভাষেতেই ছন্দিত হয় সপ্তছন্দ। কেউ বাক্‌কে দেখেও দেখেন না। কেউ শুনেও ঠিক শোনেন না, কারো কাছে আবার এই বাক্‌ সুবেশা জায়ার মতো স্বেচ্ছায় প্রকাশিত হন। শুদ্ধ বাক্য যশ ও সৌভাগ্যের কারণ, শুদ্ধ বাক্যই বিচার সভায় জয় আনয়ন করে। বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা বজ্ঞ করেই শুদ্ধ পবিত্র ভাষার পথ অবগত হন।

আচার্য সায়ন ঋগ্বেদের ১, ৩, ১২ ঋকের ভাষ্যে মন্তব্য করেছেন, ‘দ্বিবিধা’ হি সরস্বতী বিগ্রহবদ্‌ দেবতা নদীরূপা চ’ — সরস্বতী দুই প্রকার। কোথাও মূর্তিমতি, কোথাও নদীরূপা। বৈদিক সূত্রে সরস্বতীকে শুভ্রবর্ণা বলা হয়েছে, কোথাও বা তাঁরগুণ ও ক্রিয়ার বর্ণনা করা হয়েছে, কিন্তু এক নদীর প্রতীক ব্যতীত কোথাও তাঁর বিগ্রহবতী মূর্তির উল্লেখ নেই। বেদে দেবতাকে আবৃতিবিশিষ্ট রূপে বর্ণনা করা হলেও, তাঁরা প্রতিমা বা বিগ্রহরূপে স্তুতির বিষয় হননি। প্রাকৃত সরস্বতী নদীরূপা, পরমার্থে তিনি ভাবরূপিণী বিদ্যা, জ্ঞান বা প্রজ্ঞার প্রতীক।

সরস্বতী মূর্তি ধরে প্রকট হয়েছেন তন্ত্রে ও পুরাণে। পুরাণে তাঁর বদীরূপ বাধিত না হলেও সরস্বতী মূর্তিমতী প্রতিমা। তাঁর উৎপত্তি ও জীবনকাহিনীও চমকপ্রদ। এক এক পুরাণে তাঁর উৎপত্তির বিবরণ এক এক প্রকার। শ্রীমদ্‌ভাগবত পুরাণে (৩/১২) দেখা যায়, বিশ্বস্রষ্টা ব্রহ্মার মন থেকে বাক্‌ নাম্নী এক মনোহারিণী কন্যা উৎপন্না হয়েছিলেন। পিতা হয়েও ব্রহ্মা সেই কন্যাকে কামনা করেছিলেন, কিন্তু সে কন্যা তাঁকে কামনা করেননি। মরীচি প্রমুখ ঋষিগম পিতার অধর্ম প্রবৃত্তি দেখে প্রতিবাদ করেন। ব্রহ্মা লজ্জিত হয়ে নিজেকে সংযত করেন এবং তাঁদের সামনেই অশুদ্ধ বোধে তাঁর কাম-প্রবৃত্ত অনুকে ত্যাগ করেন। কালিকা পুরাণ মতে, এই কন্যার নাম সন্ধ্যা বা সায়ংসন্ধ্যা। ইনিই সরস্বতী। ব্রহ্মা নিজেকে সংবরণ করলেও প্রকারান্তরে ইনিই হলেন ব্রহ্মাণী। এই ‘চারুরূপা বরাঙ্গনা’ গায়ত্রীরূপে সায়ংসন্ধ্যায় দ্বিজগণের ধ্যানের বিষয়। (চলবে)

পেইন্টিং রাজা রবি ভার্মা


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন