রবীন্দ্রনাথের মানসলোকে বৈশাখ বিশেষভাবে ধরা দিয়েছে। বাংলাদেশের বৈচিত্রময় ষড়ঋতু রবীন্দ্রনাথের মানসপটে নানা অনুষঙ্গ আর আবহে সমুপস্থিত। রবীন্দ্রনাথ কবিতা, গান, গল্প প্রবন্ধে ষড়ঋতুর রূপ রূপ মাধুর্য অপূর্ব ভাষা ছন্দে বর্ণিত ও বন্দিত হয়েছে। বাংলা সনের প্রথম মাস বৈশাখ ,রবীন্দ্রনাথের মানসে বৈশাখ কিভাবে উঠে এসেছে তা স্বল্প পরিসরে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।
রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি পর্যায়ের গান, কবিতা ও প্রবন্ধে বিভিন্ন ঋতুর বন্দনা অতুলনীয়। বৈশাখের আবাহন আমরা দেখতে পাই তাঁর গানে এভাবে: এসো হে বৈশাখ, এসো এসো। /তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে, /বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক যাক। /এসো এসো…এসো হে বৈশাখ, এসো এসো /এসো হে বৈশাখ, এসো এসো /যাক পুরাতন স্মৃতি,/যাক ভুলে যাওয়া গীতি/যাক অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক/যাক যাক/এসো এসো…/এসো হে বৈশাখ—
রবীন্দ্রনাথ তাঁর বৈশাখ কবিতায় বৈশাখের দ্বৈতরূপকে অপূর্ব ভাষা ও রূপ মাধুর্যে তুলে ধরেছেন। যার মাঝে ধ্বংস ও সৃজনের ধারা বিধৃত হয়েছে।পুরাতন বছর শেষে নতুনের বার্তা নিয়ে আসে নতুন বছরের নতুন মাস বৈশাখ নবপ্রেরণার উৎস হয়ে। রবীন্দ্রনাথের কবি মানসে বৈশাখের আগমন এভাবে ধরা দিয়েছে: ‘হৃদয় আমার, ওই বুঝি তোর বৈশাখী ঝড় আসে।/ বেড়া-ভাঙার মাতন লাগে উদ্দাম উল্লাসে—
রবীন্দ্রনাথ বৈশাখের ভাঙ্গনের উদ্দাম উল্লাস আর নব উন্মাদনার আভাস আবিষ্কার করেছেন। কবির কাছে বৈশাখের আবির্ভাব রুদ্র ও মোহন বেশে। তাই তো তিনি বৈশাখ কবিতায় বলেছেন— তোমার মোহন এল ভীষণ বেশে, আকাশ ঢাকা জটিল কেশে/বুঝি এল তোমার সাধনধন চরম সর্বনাশে।/বাতাসে তোর সুর ছিল না, ছিল তাপে ভরা।/পিপাসাতে বুক-ফাটা তোর শুষ্ক কঠিন ধরা।’
রুদ্রবেশে বৈশাখের আবির্ভাব হলেও রবীন্দ্রনাথ হতাশা ও অবসাদের বাঁধনকে টুটিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এভাবে:এবার জাগেরে হতাশ, আয় রে ছুটে অবসাদের বাঁধন টুটে— /বুঝি এল তোমার পথের সাথি বিপুল অট্টহাসে—
রবীন্দ্রনাথ বৈশাখের ভৈরব মূর্তি প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি তার কবিতায় বৈশাখের ভয়াল রুদ্রমূর্তিকে তুলে ধরেছেন এভাবে : হে ভৈরব, হে রুদ্রবৈশাখ!/ধুলায় ধূসর রুক্ষ উড্ডীন পিঙ্গল জটাজাল,/তপঃক্লিষ্ট তপ্ত তনু, মুখে তুলি বিষাণ ভয়াল/কারে দাও ডাক/হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ! —
রবীন্দ্রনাথ বৈশাখের ভয়াল রুদ্রমূর্তিও রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে কাল বৈশাখের অনুচরদের ভয়াল মূর্তিকে উপস্থাপন করেছেন। রবীন্দ্রনাথের মনে তাদের রূপ এভাবে ধরা দিয়েছে : ছায়ামূর্তি যত অনুচর/দগ্ধতাম্র দিগন্তের কোন্ ছিদ্র হতে ছুটে আসে!/কী ভীষ্ম অদৃশ্য নৃত্যে মাতি উঠে মধ্যাহ্ন-আকাশে/ নিঃশব্দ প্রখর/ ছায়ামূর্তি তব অনুচর!
রবীন্দ্রনাথের মনে বৈশাখের রূপ রুদ্র। তিনি বৈশাখকে জটাজুটধারী ভৈরব অর্থাৎ শিবের সঙ্গে তুলনা করেছেন। বৈশাখের ভয়াল রূপ প্রতিভাত হয়েছে রবীন্দ্র মানসে। পানি শূন্য নদী ,শস্য শূন্য মাঠঘাট, চারিদিকে খরতাপ। কবি বৈশাখের আসল চেহারা ফুটিয়ে তুলেছেন। এক পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ বৈশাখকে বৈরাগী বলে সম্বোধন করে তাকে বলেছেন— হে বৈরাগী , করো শান্তি পাঠ।হে বৈরাগী, করো শান্তিপাঠ। উদার উদাস কণ্ঠ যাক ছুটে দক্ষিণে ও বামে/যাক নদী পার হয়ে, যাক চলি গ্রাম হতে গ্রামে,/পূর্ণ করি মাঠ।/হে বৈরাগী, করো শান্তিপাঠ—
তিনি কিন্তু এখানে বৈশাখের রুদ্ররূপের পরিবর্তে বৈশাখকে দেখেছেন অন্য রূপে — দীপ্তচক্ষু হে শীর্ণ সন্ন্যাসী,/পদ্মাসনে বস আসি রক্তনেত্র তুলিয়া ললাটে,/শুষ্কজল নদীতীরে শস্যশূন্য তৃষাদীর্ণ মাঠে/ উদাসী প্রবাসী/ দীপ্তচক্ষু হে শীর্ণ সন্ন্যাসী!
বৈশাখের দ্বৈতসত্তা কবি মানসে বার বার উদ্ভাসিত হয়েছে। ভয়ালরূপী কালবৈশাখী রুদ্ররূপ আর মৌনী তাপসরূপী বৈশাখের মধ্যে ফারাক অনেক । তিনি তাঁর লেখা কবিতা ও গানে বৈশাখের দুরূপের বর্ণনা করেছেন। বৈশাখের তাপস মূর্তির জন্যই রবীন্দ্রনাথ কালবৈশাখী বরণ করে নেওয়ার আহ্বন জানিয়েছেন এভাবে: ভয় কী তোর ভয় করে দ্বার খুলে দিস চারধারে—
তাপদগ্ধ বৈশাখের রুদ্রমূর্তি এক সময় শান্ত মূর্তি ধারণ করে। একদা বৈশাখ কেশর ফোলা সিংহের মতো গর্জন তুলে হাজির গাছপালা, বৃক্ষলতা আর ঘরবাড়ি লন্ডভন্ড করে ফেললেও এক সময় মৌনী তাপস রূপে প্রতিভাত। রবীন্দ্র মানসে বৈশাখ শুধুমাত্র রুদ্ররূপের প্রতীকই নয়। ‘বৈশাখের এই ভোরের হাওয়া বহে কিসের হর্ষ, — চাঁপার বনের কাঁপন ছলে লাগে আমার বুকের আরেক দিনের প্রভাত হতে হৃদয় দোলার স্পর্শ।’ বৈশাখের শান্ত সমাহিত রূপও আমরা প্রত্যক্ষ করি রবীন্দ্র মানসের বৈশাখের গান।
মনোজিৎকুমার দাস, মাগুরা, বাংলাদেশ