সপ্তদশ শতকের একজন প্রতিভাবান কবি রামদাস আদক। তাঁর জন্ম ১৬৩৫ খ্রিস্টাব্দে হুগলি জেলার আরামবাগ মহকুমার হিয়াৎপুর গ্রামে। তিনি ১৬৬২ খ্রিস্টাব্দে “অনাদি মঙ্গল” নামে ধর্মমঙ্গলের একটি পুঁথি রচনা করেছিলেন। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে এই পুঁথিটি সম্পাদনা করে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশ করেন অধ্যাপক বসন্ত কুমার চট্টোপাধ্যায়। সেই প্রকাশিত গ্রন্থ টির উপর নির্ভর করে বাংলা সাহিত্যে রামদাস আদকের গুরুত্ব নির্ধারণ করেছেন সাহিত্য গবেষকরা। এখান থেকেই রামদাসের দুর্ভাগ্যের শুরু।

অধ্যাপক বসন্ত কুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর গ্রন্থ সম্পাদনার সময় অনাদি মঙ্গলের কোন পুথি হাতে পাননি। সেই এলাকা থেকে সংগ্রহ করা গায়কদের খাতার উপর নির্ভর করেই রামদাসের অনাদি মঙ্গলের পালা গুলি তিনি লিপিবদ্ধ করেন। ফলে সেই লেখার মধ্যে অন্য অনেকের লেখা প্রক্ষিপ্ত হয়েছে যা সাহিত্য গবেষকদের বিভ্রান্ত করেছে এবং তাঁরা সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, রামদাস আদক অতিমাত্রায় প্রভাবিত এবং অন্য লেখকদের লেখা আত্মসাৎ করেছেন। এই অপবাদ এর ফলেই বাংলা সাহিত্যে ব্রাত্য থাকতে হয়েছে এই জনপ্রিয় কবি কে। আচার্য ডঃ সুকুমার সেন কে অনুসরণ করে ডঃ আশুতোষ ভট্টাচার্য, বাঃ তমোনাশচন্দ্র দাসগুপ্ত, ডঃ অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ সাহিত্য গবেষকরা প্রায় একই কথার পুনরাবৃত্তি করেছেন।

বর্তমানে শ্রী দেবাশিস শেঠ রামদাস আদক সম্পর্কে আমাদের অনেক নতুন কথা শুনিয়েছেন। তিনি রামদাসের বংশধরদের কাছ থেকে মূল পারিবারিক পুঁথিটি উদ্ধার করেছেন। সুকুমার সেনের সংগ্রহে থাকা পুঁথি যা বর্তমানে ন্যাশনাল লাইব্রেরি তে সংরক্ষিত সেগুলি পাঠোদ্ধার করেছেন। দুই পুথির পাঠ মিলিয়ে নতুন পাঠ নির্মাণ করেছেন। যার ফলে রামদাস এর মূল লেখাটিকে আলাদা করা গেছে । এতে অদ্ভুত একটি বিষয় নজরে এসেছে তা হল, রামদাস এর মূল পুঁথির তুলনায় অধ্যাপক চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদিত বইয়ে ২০০০ লাইন বেশি আছে। ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এই লাইনগুলোর সঙ্গে রামদাস এর মূল লেখার অনেক পার্থক্য আছে। এর থেকেই প্রমাণ করা যায় অন্যান্য জনপ্রিয় লেখকদের থেকে এই ২০০০ লাইন প্রক্ষিপ্ত হয়েছিল রামদাসের লেখায়।
রামদাস আদক ও তাঁর সময়ে এলাকায় যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিলেন। নিজের গ্রামের ধর্ম ঠাকুর যাত্রা সিদ্ধির সামনে প্রথম ধর্মের গান করেন তিনি। তারপর দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর খ্যাতি। বর্ধমানের জারগ্রামে ধর্ম ঠাকুর কালু রায়ের বাৎসরিক গাজনের আসরে গান গাইতে যেতে হতো। এখানে তার জনপ্রিয়তা সম্পর্কে এখনো মানুষের মনে নানা গল্পগাথা ছড়িয়ে আছে।

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য প্রধানত গেয় কাব্য-কবিতার সমাহার। সেকালে গনমাধ্যমের প্রধান অবলম্বন ছিল দুটি, লেখন ও গায়ন।
প্রথমটি লিপিকর নির্ভর মুষ্টিমেয় শিক্ষিত মানুষের পাঠের জন্য পুঁথিপত্র, দ্বিতীয় টি হল সেই পুথিকে অবলম্বন করে আসরে কন্ঠ নির্ভর পাঠ, পাঁচালী গান কথকতা ইত্যাদি বহু মানুষের শ্রবণ এর জন্য। কবি ও কাব্য বিষয় অন্ত্যজ জাতি সম্পৃক্ত বলে হয়ত বর্ণবৈষম্যের কারণে রামদাসের অনাদি মঙ্গলের পুঁথি নকলের তেমন চাহিদা ছিল না । সেই কারণে কাব্যটি লিপিকরদের দ্বারা বেশী লিপিকৃত হয় নি। কিন্তু স্বয়ং কবি গায়েন হওয়ায় এবং রাজারাম অভিরামের মত দুজন দোহার তাকে সঙ্গ দেওয়ায় প্রথম থেকেই কাব্যটি কন্ঠ নির্ভর গণমাধ্যমকে আশ্রয় করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। গায়েন দের মুখে মুখেই ফিরতে থাকে তার গান। পুঁথির ক্ষেত্রে মূল রচনা যেমন “সাত নকলে আসল খাস্তা” হয়ে যায় তেমনি ধর্ম দেবতার জনপ্রিয় পালা গায়েনদের মুখে মুখে ফিরতে ফিরতে লৌকিক ছাড়ার মতো কামচারিতা কামরূপধারিতার প্রকৃতির নিয়মে রামদাসের ভনিতাটুকু ছাড়া কাব্য বস্তুর কোন কোন অংশ হারিয়ে যেতে থাকে।

রামদাস এর মোট ২৪টি পালার মধ্যে মাত্র ৯ টি পালার পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে কবির উত্তরপুরুষের কাছে রক্ষিত পুঁথির থেকে ৯১৩ ছত্র বেশী বসন্ত কুমার চট্টোপাধ্যায়ের ব্যবহৃত পুথিটির মধ্যে।
রামদাস আদকের কাব্য আলোচনা করলে আমরা বুঝব যে, তাঁর পরবর্তীকালে বিশেষ করে অষ্টাদশ শতকের কাব্য কবিতায় যে পরিশীলিত নৈপুণ্যের ছাপ পাওয়া যায় তাঁর কাব্যে তা অনুপস্থিত। নিতান্তই চলতি এবং অপরিশীলিত ভাষা ব্যবহার রামদাস আদকের কাব্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অনুপ্রাসের ঘনঘটায় ঘোমটা টেনে নেই তার কাব্য লক্ষী। বরং তা স্বতোৎসারিত। কোন আরোপিত চেষ্টা বা কল্পনার ভঙ্গিমা ছাড়াই নিজস্ব পরিমণ্ডল এবং সমকালীন ইতিহাস কে তিনি মিশিয়ে দিতে পেরেছেন তাঁর রচনায় ফলে তা সৎ এবং আন্তরিক। ঈর্ষণীয় সারল্যে তার রচনা তাই গ্রাম বাংলার মাটি মাখা মানুষগুলির মন ছুঁয়ে গেছে সহজেই। তিনি গান বাধতেন পথে-প্রান্তরে নিম্নবর্গের মানুষ এর জন্য। তাই তাদের পছন্দের রেঢ়ো বুলি এবং ছড়ার ছন্দ বারবার প্রভাবিত করেছে রামদাসের রচনাকে।

পুঁথি লেখক রামদাস আদকের উত্তরপুরুষ যাঁর কাছে তাঁর পুঁথিটি এখনো স্বযত্নে সংরক্ষিত আছে।
সংস্কৃতি কর্মী, কবি, প্রাবন্ধিক দেবাশিস শেঠের সম্পাদনায় হুগলীর ধর্মমঙ্গলের কবি রামদাস আদকের কাব্যসঞ্চয়ন ‘রামদাস আদকের অনাদিমঙ্গল ও সমকাল’ প্রকাশ অনুষ্ঠান হয়েগেল। জীবনানন্দ সভাঘরে সুসম্পাদিত বই উদ্বোধন করলেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শুভাপ্রসন্ন। উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শুভাপ্রসন্ন, লেখক এবং লোকসংস্কৃতি গবেষক সুখেন্দু হীরা, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুরঞ্জন মিদ্দে, প্রাবন্ধিক, গবেষক, সংগঠক বিশ্বেন্দু নন্দ এবং প্রশাসন আর সংস্কৃতি জগতের নানান ব্যক্তিবর্গ, গবেষক প্রমুখ। সভামুখ্য ছিলেন, হুগলী জেলাপরিষদের সভাধিপতি কবি আলহজ্ব সেখ মেহেবুব রহমান। পুস্তক উন্মোচন করে শুভাপ্রসন্ন বলেন, এই স্থানীয় ইতিহাসেই লুকিয়ে আছে বাংলা আর বাঙালির ইতিহাসের রেণূগুলি। সেগুলি উন্মোচন করা যে কোনও দেশপ্রেমিকের অবশ্য কর্তব্য। তিনি সম্পাদক দেবাশিস শেঠের সম্পাদনার প্রভূত্র প্রশংসা করে বইটির বহুল প্রচার কামনা করেন।
বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া রামদাসের অনাদি মঙ্গল পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার জন্য সঙ্কলক দেবাশীষ শেখ মহাশয়কে অসংখ্য ধন্যবাদ।
আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। দেবাশিস শেঠ