| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্বাধীনতা — অর্জন নয়, দায়িত্বও : যশোবন্ত রায় চোখের বালি যখন চোখের বালিশ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বাংলা সাহিত্যে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম কৃষিজমি রক্ষা আন্দোলন : ড. কার্তিককুমার মণ্ডল

Reporter
ড. কার্তিককুমার মণ্ডল / ২৬৭৬ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ২১ নভেম্বর, ২০২১

বাংলা সাহিত্যে কৃষিজীবী মানুষের গণ-আন্দোলনের কথা নানাভাবে মূর্ত হয়ে উঠেছে। এতে যেমন উঠে এসেছে নীলবিদ্রোহ (১৮৫৯), তেভাগা আন্দোলন (১৯৪৬), নকশালবাড়ি আন্দোলন (১৯৬৭-৭২) প্রভৃতির কথা, তেমনই তাতে তেতাল্লিশের (১৯৪৩) দুর্ভিক্ষ থেকে খাদ্য আন্দোলনের (১৯৫৯, ১৯৬৬) পরিচয় বর্তমান। সেদিক থেকে একুশ শতকের সূচনা দশকে কৃষিজমি রক্ষা আন্দোলনকে (২০০৬-২০০৭) কেন্দ্র করে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের কথা যেভাবে বাংলা সাহিত্যে উঠে এসেছে তা শুধু অভূতপূর্ব নয়, তীব্র আবেদনেও প্রকাশমুখর। বিশেষ করে কৃষি বনাম শিল্পের দ্বৈরথে কৃষিজমি রক্ষা আন্দোলন যেভাবে জনমানসকে তীব্র অস্থিরতায় সক্রিয় করে তোলে, তার প্রভাব বাংলা সাহিত্যের মধ্যেও প্রতিভাত হয়। শুধু তাই নয়, সাহিত্য হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা। স্বাভাবিকভাবেই সাহিত্যেও তার প্রভাব সুগভীর ও সুদূরপ্রসারী হয়ে ওঠে। একুশ শতকে গণমাধ্যমের ছোঁয়ায় পূর্বের আন্দোলনের চেয়েও তার তীব্রতা অনেক বেশি সক্রিয়তা লাভ করে। সিঙ্গুরে জোর করে জমি অধিগ্রহণের নামে দমন-পীড়ন ও নন্দীগ্রামের ১৪ মার্চের (২০০৭) গণহত্যার খবর রাজ্য ছাড়িয়ে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা প্রতিবাদে সামিল হন। সংবাদপত্র-সাময়িকপত্রে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের সংবাদের পাশাপাশি সেই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রচিত কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, রিপোটার্জ, কলাম প্রভৃতি জায়গা করে নিয়েছে। আন্দোলনের প্রভাব জনমানসে কতটা প্রসারিত হয়েছিল, সেই সময়ের বাংলা সাহিত্যের দিকে লক্ষ করলেই বোঝা যায়। কীভাবে ও কেন সাহিত্যের মতো সংবেদনশীল শিল্প মাধ্যমে আন্দোলনের কথা তাৎক্ষণিক ভাবে নিবিড়তা লাভ করে বা করে চলেছে, তা আপনাতেই ভাবিয়ে তোলে। সেক্ষেত্রে বাংলা সাহিত্যে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলনের ভূমিকা অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে। বাংলা সাহিত্যের ধারায় এই আন্দোলনের প্রভাব ও প্রাসঙ্গিকতা বিষয়ে আলোচনায় অগ্রসর হব।

আধুনিক পরিসরে শিল্পায়নের প্রভাব অত্যন্ত নিবিড়। সেখানে কৃষি বনাম শিল্পের দ্বন্দ্ব অনিবার্য হয়ে উঠে। সেদিক থেকে কৃষিজমি রক্ষা আন্দোলন ছিল সময়ের অপেক্ষামাত্র। এদেশে নীল শিল্পের জন্য নীলচাষে বাধ্য করার ইতিহাস দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’(১৮৬০)-এ অত্যন্ত প্রকট। উনিশ শতকেই কৃষি বনাম শিল্পের দ্বৈরথ লক্ষণীয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চিত্রা’(১৮৯৬) কাব্যের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতায় জমি হারানোর বেদনাই প্রকট হয়ে ওঠে। অন্যদিকে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘মহেশ’ (বঙ্গবাণী, আশ্বিন ১৩২৯) গল্পে কৃষকের দুর্দশার কথা তুলে ধরেছেন। গল্পে শোষিত কৃষক শ্রেণির প্রতিনিধি গফুর জমিদারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করলেও বিধাতার কাছে নালিশ করে গ্রাম ছেড়ে শিল্পশ্রমিক হওয়ার পথে অগ্রসর হয়। আবার স্বাধীনতার পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে কৃষিনির্ভর এই বাংলায় কৃষি ও কৃষিজীবী মানুষকে কেন্দ্র করে ঘটে গেছে দু-দুটি বৃহত্তর আন্দোলন। একটি তেভাগা আন্দোলন (১৯৪৬,) অন্যটি নকশালবাড়ি আন্দোলন (১৯৬৭-৭২)। স্বাভাবিকভাবেই এই দুই আন্দোলন বাংলা সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছে প্রবলভাবে।

তেভাগা আন্দোলন, নকশালবাড়ি আন্দোলনের পথ বেয়ে একুশ শতকের প্রথম দশকে(২০০৬-০৭) সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের কৃষিজমি রক্ষা আন্দোলনও বাংলা সাহিত্যের বিষয়-আশয় হয়ে উঠেছে। কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে, নাটকে ও প্রবন্ধ সাহিত্যে এই আন্দোলনের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বাংলা সাহিত্যে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের কৃষিজমি রক্ষা আন্দোলন এসেছে নানাভাবে, নানারূপে। সমকালীন রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতিতে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সাহিত্যে তার বিস্তার সহজ ও স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এইসময়ের সাহিত্য হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের হাতিয়ার। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের সমকালীন সাহিত্যে জনকণ্ঠের প্রতিবাদী স্বর যেমন কোথাও প্রত্যক্ষে, তেমনি কোথাও পরোক্ষে উঠে এসেছে। আবার সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে আন্দোলনের ধারাবিবরণীও বর্তমান। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলির ছায়া সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় কায়ারূপ লাভ করেছে।

বাংলার সঙ্গে কবিতার যোগ সুনিবিড়। স্বাভাবিকভাবেই তাই কবিতায় এই আন্দোলনের প্রভাব সর্বাধিক। এই সময়ের প্রেক্ষিতে জয় গোস্বামী (১৯৫৪- ) ২০০৭ এর এপ্রিলে লিখলেন ‘শাসকের প্রতি’ কাব্যগ্রন্থ। যা তৎকালীন পরিসরে বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ২০০৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আরও তিনটি সংস্করণ প্রকাশিত হয় এই বইয়ের। এই বইয়ের উল্লেখযোগ্য কবিতা ‘ভরত মণ্ডলের মা’ জন মানসে ব্যাপক সাড়া জাগায়। তাই কবিতাটি উল্লেখের দাবি রাখে—

“বৃদ্ধা বললেন:

‘আমার এক ছেলে গেছে আরেক ছেলেকে নিয়ে যাক

জমি আমি দেব না ওদের।

এই যে হাত দুটো দেখছ বাবা…’

ব’লে তার কাঁপা কাঁপা শিরা ওঠা হাত দু’টি উঠিয়ে

দেখালেন : ‘এ দু’টো হাতে ক্ষেতের সমস্ত কাজ এতদিন করেছি, এবার

এই হাত দু’টো দিয়েই জমি কেড়ে নেওয়া আটকাবো।”

জমি রক্ষার আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠেন বৃদ্ধা, কবিতাই হয়ে ওঠে মস্ত বড় প্রতিবাদ। আধুনিক কবিতার দুর্বোধ্যতার চাদর কবিতা হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের হাতিয়ার। তাপসী মালিক হত্যা, ১৪ মার্চের গণহত্যা কথা তুলে ধরে ‘শাসকের প্রতি’ কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় যেন তিনি জবাব দিহি চাইছেন। ছোট্ট এই কবিতার বইটি তৎকালীন পরিসরে যেন আন্দোলনের ইস্তাহার হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে মৃদুল দাশগুপ্তের (১৯৫৫- ) ‘ধানখেত থেকে’ (প্রথম প্রকাশ ২০০৭), বিশ্বজিৎ মাইতির ‘বারো হাত কাঁকুড়ের দেশ’ (২০১০) , বিশ্বনাথ গরাই –এর ‘গ্রাম সিঙ্গুরের আমি’ (২০০৭), ‘আঁচ’ (২০০৮), বাপ্পাদিত্য জানা’র ‘আমার নন্দীগ্রাম আমার প্রেম’ (২০০৮) প্রভৃতি কাব্যে আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি মূর্ত হয়ে উঠেছে। উচ্চমাধ্যমিকের বাংলা (ক ভাষা) পাঠ্যতালিকায় (সাহিত্য চর্চা, দ্বাদশ শ্রেণি ) ২০১৪ সালেই স্থান পেয়েছে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা কবিতা। বর্তমানে পাঠ্য ‘ক্রন্দনরতা জননীর পাশে’ কবিতাটি মৃদুল দাশগুপ্তের ‘ধানখেত থেকে’ (প্রথম প্রকাশ : ২০০৭ , কলম প্রকাশনী, দ্বিতীয় প্রকাশ : জানুয়ারি ২০১১, সপ্তর্ষি প্রকাশন) কাব্য থেকে নেওয়া। কবিতাগুলি ২০০৬-০৭ সালে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় লেখা। বইটির ভূমিকায় কবি লিখেছেন, ‘‘২০০৬ এর হেমন্তের দুপুরে বাজেমেলিয়ার উদ্ভাসিত ধানখেতের দিকে তাকিয়ে উদ্বেগের পরে মনে আসে ক্রোধ। হুগলির এই জমিকে ‘ওঁরা’ বলেছেন, এক ফসলি, অনাবাদী। এতে সুফলা হুগলি জেলার অপমান হয়েছে। হুগলিতে একফসলি জমি নেই। মাতৃহত্যার সমতুল অপরাধ করেছে রাজ্যের বামফ্রন্ট সরকার।… ২০০৬ -এর নভেম্বর-ডিসেম্বরে ক্রোধে কয়েকটি কবিতা লিখেছিলাম। … এরপর ঘটে সিঙ্গুরে দমন- পীড়নের ঘটনা। নন্দীগ্রামে গণহত্যা। ‘ধানখেত থেকে’ বইয়ের নতুন সংস্করণে সংযোজিত হল সেই সময়ের আরও কয়েকটি কবিতা’’। কৃষকের জমি কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছিল নন্দীগ্রাম। সেই নন্দীগ্রাম নিয়েও মৃদুল দাশগুপ্তে লেখনী জেগে উঠেছে এই কাব্যের অন্য একটি কবিতায়। মাটির গভীরে পোঁতা শিশু কঙ্কালগুলির আর্তনাদ তিনি যেন শুনতে পেয়েছেন। “ভেসে আসা শব, পরিচয়হীন / কী তোমার নাম ? / – নন্দীগ্রাম’’। এর পরের কবিতাতেই ‘ক্রন্দনরতা জননীর পাশে’ থাকার জন্য কবির মূল্যবোধ জেগে উঠেছে। কবি বলেন :

“ক্রন্দনরতা জননীর পাশে

এখন যদি না থাকি

কেন তবে লেখা , কেন গান গাওয়া

কেন তবে আঁকাআঁকি ?”

সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সমকালে কবি সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী তথা শিল্পীদের প্রতিবাদের কথা মনে করিয়ে দিলেও কবিতটি যে কালোত্তীর্ণ হয়ে উঠেছে একথা অনস্বীকার্য।

সাম্প্রতিক বাংলার কবিকুলের শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব শঙ্খ ঘোষের (১৯৩২-২০১৯ ) ‘স-বিনয় নিবেদন’ কবিতাটি সেই সময় সাড়া জাগিয়েছিল। কবিতাটি প্রথম আনন্দবাজার পত্রিকায় ১৮ মার্চ ২০০৭-এ প্রকাশিত হলেও পরবর্তীকালে বিভিন্ন পত্রিকা ও সংকলনে পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল। আবার তাঁর সেই সময়ে লেখা ‘বহিরাগত’ কবিতাটি জনমানসে সাড়া জাগিয়ে তুলেছিল। সেটিও বিভিন্ন পত্রিকায় ও সংকলনে পুনর্মুদ্রিত হয়। পরবর্তীতে তাঁর বেশ কিছু এই সমগোত্রীয় কবিতার সঙ্গে উক্ত কবিতা দুটি সংকলিত হয় ‘মাটিখোঁড়া পুরোনো করোটি’( প্রথম প্রকাশ জানুয়ারি ২০০৯)। এছাড়াও তাঁর ‘শুনি শুধু নীরব চিৎকার’ (২০১৫) কবিতা সংকলনে অনেক কবিতাই নন্দীগ্রাম প্রসঙ্গ ঘুরে ফিরে এসেছে।

দেশের প্রতি ভালোবাসা ও দেশের শ্রমজীবী মানুষদের প্রতি মমত্ব্ববোধে কবি নির্মল ব্রহ্মচারী সুদূর নরওয়েতে বসেও অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও ধিক্কারে সোচ্চার হয়েছেন তাঁর ‘পিশাচেরা ঘোরে ফেরে’ (প্রথম প্রকাশ জুন ২০০৭) কাব্যের প্রতিটি কবিতায়। প্রতিটি কবিতায় নন্দীগ্রামে গণহত্যার বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী ধিক্কার যেমন ধ্বনিত হয়েছে তেমনি প্রতিশোধের রাস্তাও বাতলে দিয়েছেন। ‘নন্দীগ্রামে গণহত্যা’ কবিতায় তাই নন্দীগ্রামে গণহত্যাকারীদের কবি ক্ষমা করতে চান না, কুশপুত্তলিকা দাহ করতেও চান না। তিনি চান, ‘…ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে/ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক শয়তানদের এই মুহুর্তে। /…আমার মা-বোনেদের ধর্ষণকারী হত্যাকারী/ এই নৃশংস ঘাতকের ধর, আহ্লাদে দাও ফাঁসি!’ অন্যদিকে নকশালপন্থী কবি কাঞ্চন কুমার (১৯৩৬- ) নন্দীগ্রামের উত্তাল গণ আন্দোলনের পুরো সময়টাই বিছানায় বন্দি থাকলেও কবিতার মধ্যেদিয়ে মিছিলে হেঁটে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের গণসংগ্রামের সঙ্গে সহমর্মী হয়েছেন। একথা তিনি তাঁর ‘সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের মিছিলে’ (প্রথম প্রকাশ ১ সেপ্টম্বর ২০০৭) কবিতার বইয়ের ‘কৈফিয়ত’ অংশে জানিয়েছেন। উক্ত বইয়ের কবিতার ছত্রে ছত্রে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলনের ছবি উঠে এসেছে জীবন্তভাবে। ‘খবরে প্রকাশ’ কবিতায় ২৫ সেপ্টেম্বর সিঙ্গুরে পুলিশি আক্রমণের কথা উঠে এসেছে এভাবে, “বিডিও অফিস / জালিয়ানয়ালাবাগ হল/ মাঝরাতের পর।/ লোডশেডিং করে ঝাঁপিয়ে পড়ে বর্বর পুলিশ/ প্রতিবাদের ওপর।”

এছাড়াও আন্দোলনের সমকালে বা অব্যবহিত পরিসরে এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে লেখা হয়েছে বেশ কিছু কাব্যগ্রন্থ। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- প্রসূন ভৌমিকের ‘ভদ্দরলোক’ (২০০৭), ‘মাটির মানুষ’ (২০০৮), মানস সরকারের ‘এখন অসম্ভব রক্তিম সূর্যের রং’ (২০০৮), মধুমঙ্গল বিশ্বাসের ‘এখানে মৃত্যু : বর্গিরা বারবার’ (২০০৮), ‘জীবন যখন তালপাটি খালে’ (২০০৯); অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের ‘আলো, আরো আলো’ (২০০৯), শুভেন্দু মজুমদারের ‘বামজমানা’ (২০১২) প্রভৃতি। শুধু তাই নয় ‘অর্কুট ও ফেসবুক প্রতিবাদী কবিতা কমিউনিটি’ প্রকাশিত ‘প্রতিবাদী কবিতা’ (২০১৫) সংকলনে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের প্রতিবাদে যেভাবে কবিতায় প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর উঠে এসেছে, তাতে একুশ শতকে সোশ্যাল মিডিয়াতেও যে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে, সে কথা প্রমাণিত হয়ে পড়ে।

শুধু তাই নয় এই আন্দোলন চলাকালীন (২০০৭) সময় থেকে আন্দোলন পরবর্তী (২০১৮) সময়েও লেখা হয়েছে বেশ কয়েকটি ছোটগল্পও। তার সংখ্যাটাও পঞ্চাশের কম নয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য জয়ন্ত দে’র ‘নির্বাণ’গল্পটি। এতে ১৪ মার্চ ২০০৭এর ঘটনা ২৫ মার্চ ২০০৭-এ ‘বর্তমান’ পত্রিকায় যেন তার লাইভ ছবি উঠে এসেছে। মীনাক্ষী সেনের ‘অবতার’ (‘বর্তিকা’, উৎসব সংখ্যা আষাঢ়-ভাদ্র ১৪১৪), অমর মিত্রের ‘একা এবং কয়েকজন’ (‘বারোমাস’, শারদীয় ২০০৭), উৎপল ঝাঁ’র ‘বিষফোঁড়া’, সমীর রক্ষিতের ‘জন্মক্রন্দন’, মধুময় পালের ‘সেই মেয়েটা জ্বলছে’, নলিনী বেরার ‘চুপ, এক মিনিট নীরবতা চলছে’, অর্ধেন্দুশেখর গোস্বামী’র ‘হাইওয়ে’ (‘ভুমধ্যসাগর’, নভেম্বর ২০১৬), দেবাশিস মুখোপাধ্যায়ের ‘ক্ষতিপূরণ’ (শারদীয়া আলাপপর্ব ১৪১৯), ‘বোলান’ (‘আরশি নগর’, বইমেলা জানুয়ারি ২০১৮) প্রভৃতি গল্পে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের কথা ঘুরেফিরে এসেছে। গল্পগুলির অভিনবত্ব এখানেই যে সমসাময়িক ঘটনা অতিদ্রুততার সঙ্গে শিল্পরূপ পেয়েছে, যা ইতিপূর্বে বাংলা সাহিত্যে লক্ষণীয় ততটা নয়। গল্পগুলিতে আন্দোলনের ধারাবিবরণী যেমন উঠে এসেছে (সৌমেন্দ্র গোস্বামীর ‘এবং তৃতীয় বার’, উবুদশ, মার্চ ২০০৭), তেমনি কৃষি বনাম শিল্পের দ্বৈরথে ইচ্ছুক-অনিচ্ছুক জমিদাতা নিয়ে দ্বন্দ্ব (জীবনময় দত্তের ‘জমি’, উবুদশ মার্চ ২০০৯), থেকে শুরু করে জমি বিক্রিতে দালাল চক্রের সক্রিয়তা, (উৎপল ঝা’র ‘বিষফোঁড়া’, আলো, পূজা সংখ্যা ২০০৭), শিল্পায়নের নামে চাকরির প্রতারণা বা দেহ ব্যবসার চাকরি (দীপঙ্কর দাসের ‘চাকরি’, বর্তমান, ৮ এপ্রিল ২০০৭), জমি বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হয়ে আত্মহত্যা, (পঙ্কজ চক্রবর্তীর ‘হারাধন বাগের জন্মভূমি’, দৈনিক স্টেট্‌সম্যান, ১০ জুন ২০০৭), বা জমি হারিয়ে নিজের জমিতেই ভাগচাষিতে পরিণত হওয়া( অচিন্ত্য সেনের ‘ভাগচাষি’, উবুদশ, মার্চ ২০০৯), বা সিমেন্টে বালি আচ্ছাদিত হয়ে জমি ফেরতের সংকট (গোবর্ধন অধিকারীর ‘সিঙ্গুর’, এবং পরিচয়, শারদ সংখ্যা ১৪১৯) সবেতেই কৃষিজীবী মানুষের আত্মসংকটের কথা ঘুরে ফিরে এসেছে। অন্যদিকে শিল্পায়নের পক্ষে সমীর রক্ষিত তাঁর ‘জন্মক্রন্দন’ (‘সৃষ্টির একুশ শতক’, উৎসব সংখ্যা ১৪১৪) গল্প সওয়াল করেছেন। শিল্পায়নের পথ রুদ্ধ করলে উন্নয়নের প্রয়াস ব্যহত হবে এরকম বার্তা তাঁর গল্পে উঠে এসেছে। লেখকদের মধ্যে পক্ষে–বিপক্ষের দ্বন্দ্ব কতটা প্রবল হয়ে উঠেছিল তার প্রতিফলন পাই অমর মিত্রের ‘একা এবং কয়েকজন’ (‘শারদীয়া বারোমাস’, ২০০৭) গল্পে। কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ‘বাঘে ছাগলে’ (শাণিত প্রহর, উৎসব ১৪১৫) গল্পে জমি অধিগ্রহণের প্রসঙ্গ রূপকথার মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন।

শুধু কবিতা, গল্পে নয় এই আন্দোলন উঠে এসেছে কথাসাহিত্যের বৃহত্তর পরিসরে, উপন্যাসেও। ‘অমৃতলোক’ পত্রিকার ২০০৮-এর শারদ সংখ্যায় দীপঙ্কর দাসের ‘ধর্মযুদ্ধ’ উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্বে উঠে এসেছে নন্দীগ্রাম আন্দোলনের ছবি। মানিক মণ্ডল তাঁর ‘ভালো নেই’ উপন্যাসে সিঙ্গুরের জমি আন্দোলনে এক কৃষক কন্যার মৃত্যু ও তার পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের ছবি তুলে ধরেছেন শৈল্পিক নিপুণতায়। আবার তিনিই ‘চোখের পানি’ (২০১২) উপন্যাসে ২০০৭ সালের মে- জুন থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত নন্দীগ্রামে ঘটে যাওয়া ঘটনার শিল্পরূপ দিয়েছেন। মহাশ্বেতা দেবী তাঁর ‘তিনকন্যা ও অধবা’ (২০০৯) নামক দুটি অনু-উপন্যাসে নন্দীগ্রামের হাড়হিম করা সন্ত্রাসের যেমন ছবি এঁকেছেন তেমনি তুলে ধরেছেন লাশ নিয়ে সিপিএমের রাজনীতিকেও। ‘তিনকন্যা’ আসলে নন্দরানি, চন্ননী ও বাসনাবালা আর ‘অধবা’ হল সরস্বতীর মর্মন্তুদ কাহিনি। রাজনীতি যখন জনকল্যাণের পথ ছেড়ে দলকল্যাণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন সমাজকে অবক্ষয়ের কোন নরকে পৌঁছে দেয় তারই নিরাভরণ চিত্র উঠে এসেছে এই দুই নভেলেট-এ। সমরেশ মজুমদারের ‘আত্মপক্ষ’ (২০০৯) উপন্যাসেও নাম না করে উঠে এসেছে জমি অধিগ্রহণ প্রসঙ্গে অত্যাচারের ছবি। তাঁর অনিমেষ চতুষ্কের চতুর্থ উপন্যাস ‘মৌষলকাল’ (২০১৩) এ উঠে এসেছে সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম আন্দোলনেরর কথা। অনিমেষ পুত্র অর্ক নন্দীগ্রাম আন্দোলনে জড়িয়ে গেছে সরাসরি। প্রতিবাদ মিছিলে হাটা থেকে শুরু করে নন্দীগ্রামের বিপ্লবীকে আশ্রয় দেওয়া সবেতেই সে জড়িয়ে পড়েছে আষ্টেপৃষ্ঠে। সুচিত্রা ভট্টাচার্য (১৯৫০–২০১৫) তাঁর ‘আঁধারবেলা’ (২০১০) উপন্যাসে নামপাল্টে সিঙ্গুরের জমি আন্দোলনকেই তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের (১৯৭৩- ) ‘ধুলোখেলা’ (২০১৪), শ্রী নির্মাল্য-এর ‘হে রাম’ (২০১৬) উপন্যাসে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলন পরোক্ষে উপন্যাসের আধারে উঠে এসেছে। এছাড়া বেশ কিছু উপন্যাসে সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের কথা এসেছে প্রসঙ্গক্রমে। এছাড়া সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের ‘সংক্রান্তি’ (২০১৩), অশোককুমার মুখোপাধ্যায়ের (১৯৫৫- ) ‘আটটা-ন’টার সূর্য’ (অক্টোবর, ২০১৩), জয়ন্ত সিংহের ‘নন্দীগ্রামের বউ’ (২০১৩), কিন্নর রায়ের (১৯৫৩–) ‘পতনের পর’ (এপ্রিল ২০১২), রাজীব সিংহের (১৯৬৯–) ‘দ্রোহপর্ব’ (প্রথম প্রকাশ, শারদীয় ‘কবিতা পাক্ষিক’ ২০১৪) উপন্যাসে সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের কথা প্রসঙ্গক্রমে উল্লিখিত হয়েছে। এভাবে বাংলা উপন্যাসের ধারায় সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলন যেভাবে উঠে এসেছে তা শুধু জনমানসে আবেদক্ষম হয়ে ওঠেনি, কথাসাহিত্যের ধারাটিকেও সমৃদ্ধ করে তুলেছে। সেটা গল্প-উপন্যাসেই প্রতীয়মান হয়ে ওঠে।

গণ-আন্দোলনের অন্যতম হাতিয়ার নাটক। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের গণ-আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে বেশ কিছু নাটক। তবে সেগুলো মূলত পথনাটক। আর তা শুধু রচিতই হয়নি অভিনয়ের মধ্য দিয়ে আন্দোলনকেও প্রভাবিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। নাটকের মতো শক্তিশালী গণমাধ্যমে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম উঠে আসায় তৎকালীন রাজ্য সরকার বেশ কিছু নাটকের অভিনয়ে বাধার সৃষ্টি করে। যেমন জর্জ অরওয়েল-এর ‘অ্যানিম্যাল ফার্ম’-এর কাহিনি নিয়ে অর্পিতা ঘোষ ‘পশুখামার’ নাটক অভিনয় করে জনমানসে সাড়া জাগাতে সচেষ্ট হলে সরকারের রোষদৃষ্টি ওই নাটকের ওপর বর্ষিত হয়। এই নাটকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম প্রসঙ্গ না থাকেলেও প্রতিষ্ঠান বিরোধী কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয়েছে। আর সেটা শাসকের দৃষ্টি এড়ায় নি। অর্পিতা ঘোষের অন্য একটি নাটক ‘সহজ প্রশ্নের বর্ণমালা’য় (প্রথম প্রকাশ ‘অনুষ্টুপ’ ৪২ বর্ষঃ ২য়-৩য় সংখ্যা, ২০০৮) সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আর রিজওয়ানুর জীবন্ত হয়ে ওঠে। তবে সরাসরি সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামকে কেন্দ্র করে নাটক খুব বেশি না হলেও একেবারেই কম নয়। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে গিয়ে মানিক মণ্ডলের ‘বাজে থিয়েটার’ গ্রুপ ‘রাম রাবণের যুদ্ধ’, ‘বুদ্ধ নয় শান্তি চাই’ প্রভৃতি নাটক অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে জনগণকে সচেতন করায় ব্রতী হয়েছেন। তেমনি অমল রায়ের ‘উন্নততর লাশ বিপণি’ (২০০৭) নাটকে ১৯৭২-২০০৭ সময় পর্বের উল্লেখযোগ্য ঘটনা কাশীপুর-বরানগর-আর সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম যেন একাকার হয়ে গেছে। অন্যদিকে নাট্যকার চন্দন সেনের ‘শহিদ শিখর’ নাটকে উঠে এসেছে জমি অধিগ্রহণের প্রসঙ্গ। তেমনি ব্রাত্য বসুর ‘কমরেড কথা’ (‘অনুষ্টুপ’ ৪২ বর্ষঃ ২য়-৩য় সংখ্যা, ২০০৮), রানা সরকারের ‘ওম্‌ শান্তি ওম্‌’ (২০০৮) প্রভৃতি নাটকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ঝরে পড়েছে। অন্যদিকে শিল্পায়নের পক্ষে রচিত প্রদীপ চক্রবর্তীর ‘আপনপর’ (‘গণনাট্য’, নভেম্বর-ডিসেম্বর, ২০০৭) নাটকটিতে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে কলকারখানার স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলার পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের হয়ে বানানো খবর পরিবেশনের জন্য মিডিয়াকে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করা হয়েছে। তেমনি রতন ভট্টাচার্যের ‘পরাণ মণ্ডলের গল্প’(‘গণনাট্য’, নভেম্বর-ডিসেম্বর, ২০০৭), শিবংকর চক্রবর্তীর ‘আমরা শান্তির সাথে’ (‘গণনাট্য’, নভেম্বর-ডিসেম্বর, ২০০৭), সুখেন্দু বেরার ‘রক্তে ভেজা মাটি’ (‘গণনাট্য’,মার্চ-এপ্রিল, ২০০৮) প্রভৃতি নাটকে শিল্পয়ায়নের পক্ষের মত উঠে এলেও নাটকগুলি সেভাবে জনমানসে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি।

সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন সংবাদ-সাময়িক পত্রে প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য, প্রবন্ধ-নিবন্ধ-রিপোটার্জ, যেগুলিতে লেখকের উঠে এসেছে লেখকের নিজস্ব মতামত। সেই সময় মহাশ্বেতা দেবীর (১৯২৬-২০১৬)) মতো প্রবাদপ্রতিম কথাসাহিত্যিক, সমাজকর্মীর প্রতিবাদী কলাম ‘দৈনিক স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এগুলি হয়ে উঠেছে আন্দোলনের খতিয়ান। সুকুমার মিত্রের মতো সাংবাদিকের কলমে উঠে এসেছে নন্দীগ্রাম আন্দোলনের কথা। সজল রায় চৌধুরী ও অনুপ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘উন্নয়ন সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম – তথ্য, তত্ত্ব ও দলিল সংকলন’ বইটিতে অম্লান দত্ত, শাঁওলী মিত্র, জয়া মিত্র, অপর্ণা সেন, সুনন্দ সান্যাল, বিভাস চক্রবর্তী, শুভাপ্রসন্ন, অশোক মিত্র, সুজাত ভদ্র, ব্রাত্য বসু প্রমুখের লেখা প্রবন্ধ-নিবন্ধ-রিপোটার্জ সংকলিত করে সময়কে তুলে ধরায় ব্রতী হয়েছেন। আবার গৌতম ঘোষ দস্তিদার, ব্রাত্য বসু সম্পাদিত, ‘দুঃসময় – নন্দীগ্রাম বিতর্ক’, (জানুয়ারি ২০০৮) সংকলনের বিভিন্ন রচনায় নন্দীগ্রাম পর্ব জীবন্তভাবে উঠে এসেছ। শুধু সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলনের তথ্যধর্মী প্রবন্ধ, নিবন্ধ, রিপটার্জই নয় আন্দোলনকেন্দ্রিক সাহিত্য নিয়েও সিরিয়াস আলোচনার মাধ্যম হয়ে উঠেছে প্রবন্ধ। দৈনিক ‘উত্তরবঙ্গ সংবাদ’ (২৩ ডিসেম্বর ২০০৭)-এ ‘এই সময়ের গল্প : সিঙ্গুর থেকে নন্দীগ্রাম’ প্রচ্ছদ নিবন্ধে ড. স্বপন কুমার মণ্ডল সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত গল্পগুলির রসগ্রাহী আলোচনা করেছেন। ‘উবুদশ’ (নভেম্বর, ২০০৯) পত্রিকায় পার্থ চট্টোপাধ্যায়, দিলীপ সামন্ত যথাক্রমে সিঙ্গুর- নন্দীগ্রাম সমকালীন বাংলা ছোটগল্প ও কবিতা নিয়ে নিবন্ধ রচনা করে তার প্রভাব ও প্রাসঙ্গিকতা বিশ্লেষণে ব্রতী হয়েছেন। ড. শেখ জাহির আব্বাস তাঁর ‘পথ নাটকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম’ (পূর্বাশা এখন, শারদ সংখ্যা, ২০১৫) নিবন্ধে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামকেন্দ্রিক পথনাটকের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরায় প্রয়াসী হয়েছেন। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম আন্দোলন নিয়ে যে পরিমান প্রবন্ধ-নিবন্ধ-আলোচনা, রিপোটার্জ প্রকাশিত হয়েছে তা বিস্ময়কর।

বাংলা সাহিত্যে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের কৃষিজমি রক্ষা আন্দোলন নানাভাবে উঠে এসেছে। শুধু আন্দোলনের পরিসরেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েনি, আন্দোলনের বেশকিছু দিন পরে, যখন তার ক্ষত শুকিয়ে গেছে, তখনও সাহিত্যিকের কলমে তার দগদগে উপস্থিতি ভিন্ন মাত্রা লাভ করেছে। আন্দোলনের পরিসরে সাহিত্য যেমন প্রতিবাদের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, তেমনই আন্দোলনের পরবর্তীতে সাহিত্যরসে জারিত হয়ে তা ভাবনার আধার হয়ে। বাংলা সাহিত্যের বিস্তৃত পরিসরে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলন প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে, এবিষয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সঙ্গে সাহিত্যের যোগ সুনিবিড় হয়ে উঠেছে তা বলাইবাহুল্য।

তথ্যসূত্র

১. জয় গোস্বামী, ‘শাসকের প্রতি’, জয় গোস্বামী, কবিতা সংগ্রহ ৪, আনন্দ ২০১৩, পৃষ্ঠা-৪৮৫

২. মৃদুল দাশগুপ্ত, ‘ধানখেত থেকে’, সপ্তর্ষি প্রকাশন, জানুয়ারি, ২০১১, পৃষ্ঠা-৫

৩. তদেব, পৃষ্ঠা- ২৪

৪. নির্মল ব্রহ্মচারী, ‘পিশাচেরা ঘোরে ফিরে’ (প্রতিবাদী কবিতা), আন্তর্জাতিক প্রকাশন(কলকাতা শাখা), জুন ২০০৭, পৃষ্ঠা- ২৬

৫. কাঞ্চন কুমার, ‘সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের মিছিলে’, ঈক্ষণ, ১ম প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০০৭, পৃষ্ঠা-৬

প্রবন্ধে অনুল্লেখিত গ্রন্থ ঋণ

১. গার্গী সেনগুপ্ত ও চন্দনা মিত্র (সংকলন ও সম্পাদনা), ‘সিঙ্গুর- প্রতিরোধের সূচনা’, অহল্যা প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি ২০০৭

২. গৌতম ঘোষ দস্তিদার, ব্রাত্য বসু সম্পাদিত, ‘দুঃসময় – নন্দীগ্রাম বিতর্ক’, সবুজপত্র, কলকাতা, জানুয়ারি ২০০৮

৩. দিলীপ চক্রবর্তী ও অনুপ বন্দ্যোপাধ্যায় সংকলিত, ‘এই সময়ের কবিতা’(১ম খণ্ড), শিল্পী-সাংস্কৃতিককর্মী- বুদ্ধিজীবী মঞ্চ, কলকাতা, ১ মার্চ ২০০৯

লেখক পরিচিতি : ড. কার্তিক কুমার মণ্ডল সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম গবেষক ও পুরুলিয়ার মণিপুর স্বামী বিবেকানন্দ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev