| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্বাধীনতা — অর্জন নয়, দায়িত্বও : যশোবন্ত রায় চোখের বালি যখন চোখের বালিশ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কল্পতরু শ্রীরামকৃষ্ণ : লিখেছেন প্রণবেশ চক্রবর্তী

Reporter
প্রণবেশ চক্রবর্তী / ২২৬৯ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ১ জানুয়ারি, ২০২২

সেই সময় ইউরোপীয় শিল্প বিপ্লবের প্রভাব যেমন ঐতিহ্য-অনুসারী ভারতীয় চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, তেমনি ধ্যান-ধারণাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে বিজ্ঞানের অগ্রগতি। সেই সঙ্গে নাস্তিক্যবাদের প্রভাবও সেই যুগে নতুন প্রজন্মের জীবনে হয়ে উঠেছিল প্রবল। সেই সংশয়াচ্ছন্ন ও অবিশ্বাসী ঊনবিংশ শতকের শেষপ্রান্তে মানুষের অবলুপ্ত চেতনা ও অপহৃত চৈতন্যকে জাগ্রত করার জন্যই যেন হুগলি জেলার কামারপুকুর থেকে সত্যাশ্রয়ী ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের পুত্র শাশ্বত ভারতের প্রতিনিধি গদাধর চট্টোপাধ্যায় এলেন কলকাতায়। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে রচিত হল তাঁর সাধনক্ষেত্র, আর কলকাতা হয়ে উঠল তাঁর নবয়ুগ প্রতিষ্ঠার লীলা-ক্ষেত্র।

দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের কুঠিবাড়ির সর্বসাধনায় সিদ্ধিপ্রাপ্ত শ্রীরামকৃষ্ণ কলকাতার দিকে মুখ করে ছাদে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় ব্যাকুল-কণ্ঠে ডাকতেন, ‘তোরা কে কোথায় আছিস, আয়, আয়।’ চৈতন্যহারা সে যুগের মানুষকে তিনি ডাকতেন, আবার দক্ষিণেশ্বর মন্দির থেকে কলকাতায় যেতেন সে-যুগের বিশিষ্ট মানুষদের কাছে।

শেষ পর্যন্ত চিকিৎসার প্রয়োজনে তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসা হল। অথবা বলা যায়, যুগ প্রবর্তনের প্রয়োজনে তিনি নিজেই অসুস্থতার আবরণ সৃষ্টি করে চলে এলেন কলকাতায়—সে যুগের প্রাণকেন্দ্র, ব্রিটিশ ভারতের রাজধানীতে। গল-রোগের চিকিৎসার প্রয়োজনে প্রথমে তিনি এলেন ৫৫ নম্বর শ্যামপুকুর স্ট্রিটে এক ভাড়া বাড়িতে। তাঁর ভক্ত কালীপদ ঘোষের প্রচেষ্টায় ভাড়া নেওয়া এই বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণ ১৮৮৫ সালের ২ অক্টোবর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭০ দিন অবস্থান করেছিলেন।

তারপর উত্তর কলকাতার কাশীপুরে বিখ্যাত লালাবাবুর পত্নী রানী কাত্যায়নীর জামাতা গোপাল ঘোষের উদ্যানবাটি ভক্ত সুরেন্দ্রনাথ মিত্র ভাড়া নিলেন। চিকিৎসকরা শ্রীরামকৃষ্ণকে উন্মুক্ত পরিবেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেছিলেন। সেইদিক থেকে এই উদ্যানবাটি ছিল উপয়ুক্ত। এই বাড়িতেই ১৮৮৫ সালের ১১ ডিসেম্বর শ্রীরামকৃষ্ণকে শ্যামপুকুর বাটি থেকে নিয়ে আসা হয়। বর্তমান এই বাড়িতে রামকৃষ্ণ মঠের এক শাখা কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে এবং বাড়িরি বর্তমান ঠিকানা ৯০ কাশীপুর রোড, কলকাতা-৭০০ ০০২।

এই ঐতিহাসিক বাড়িতেই শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর অন্ত্যলীলায় অবস্থান করেছিলেন, এই বাড়িতেই শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর ত্যাগী শিষ্যদের নিয়ে নরেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে ভাবী সন্ন্যাসী সঙ্ঘের ভিত্তি-ভূমি রচনা করেছিলেন, আবার এই বাড়িতেই তিনি তাঁর অবতাররূপের পূর্ণ প্রকাশ ঘটিয়ে গৃহী ভক্তদের সামনে কল্পতরু হয়েছিলেন।

১৮৮৫ সালের রথযাত্রার দিন শ্রীরামকৃষ্ণ বাগবাজারে বলরাম বসুর বাড়িতে অবস্থানের পর দক্ষিণেশ্বরে ফিরে এসে জননী সারদামণিকে বলেছিলেন ‘যখন দেখবে অধিক লোক এসে (শ্রীরামকৃষ্ণকে) দেবজ্ঞানে মানবে, শ্রদ্ধাভক্তি করবে, তখন জানবে এর (নিজের) অন্তর্ধানের সময় হয়ে এসেছে।’ আবার দক্ষিণেশ্বরে অবস্থানকালে ভক্তদের শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, ‘যাবার (সংসার পরিত্যাগ করবার) আগে হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিযে যাব (অর্থাৎ স্বীয় দেব-মানবত্ব সকলের সামনে প্রকাশ করে দেব।)’

শ্রীরামকৃষ্ণের এই দুটি ভবিষ্যৎবাণীর সার্থক প্রকাশ দেখা গেল ১৮৮৬ সালের পয়লা জানুযারি। তিনি তাঁর আত্মপ্রকাশ, অথবা কল্পতরু রূপে প্রতিষ্ঠার দিন হিসেবে ইংরেজি নববর্ষের প্রথম দিনটিকেই কেন নিয়েছিলেন, সেই রহস্য আজও অনাবৃত। তবে এমন কথা মনে করার সঙ্গত কারণ আছে যে—ইংরেজি শিক্ষিত নব্যবঙ্গের মানুষকে তিনি ইংরেজি নববর্ষের দিনটিকে নতুন মহিমায় প্রতিষ্ঠা করে দিতেই চেয়েছিলেন। আজও তাই এই দিনটিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ এসে সমবেত হন কাশীপুর উদ্যানবাটিতে, দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে, শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রণাম জানিয়ে ধন্য হতে, পবিত্র হতে।

কিন্তু ১৮৮৬ সালের পয়লা জানুযারি কী ঘটেছিল?

সেই ঘটনা জানার আগে সেদিনের কাশীপুর উদ্যানবাটি সম্পর্কে কয়েকটা কথা জেনে নেওয়া ভালো। প্রায় চোদ্দ বিঘা জমির উপর এই বাগানবাড়ি যথার্থই খুব রমণীয় ছিল। উদ্যানের উত্তরদিকে প্রাচীরের সংলগ্ন ছিল কয়েকটি ছোটবড় ঘর। ওই ঘরগুলির সামনেই উদ্যান-পথের আরেক দিকে এক দোতলা বাড়ি। বাড়িটির নিচে চারখানি ও উপরে দু’খানি ঘর। নিচের ঘরগুলির মধ্যে মাঝের ঘরটিই ছিল বড়। এর উত্তরে পাশাপাশি দুটি ঘর। পশ্চিমের ঘর থেকে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি এবং পুবের ঘরটিতে অবস্থান করতেন জননী সারদামণি। একতলার বড় ঘরিটির মাথায় যে সমান মাপের ঘর—সেটাতেই অবস্থান করতেন রোগশয্যায় শায়িত শ্রীরামকৃষ্ণ। ওই ঘররি দক্ষিণদিকে একটা ছোট ছাদ—যেখানে শ্রীরামকৃষ্ণ পদচারণা করতেন। বসতবারি পশ্চিমে একটা ছোট পুকুর। উত্তর-পূর্ব কোণে এক বড় পুকুর।

এই উদ্যানেই শ্রীরামকৃষ্ণ অগ্রহায়ণ মাসের শেষে আসেন এবং বাংলা ১২৯২ সালের শীত ও বসন্তকাল এবং ১২৯৩ সালের গ্রীষ্ম ও বর্ষা ঋতু অতিবাহিত করেন। এই আটমাস কালব্যাধি যেন প্রতিনিয়ত বাড়তে বাড়তে তাঁর দীর্ঘ বলিষ্ঠ শরীরকে ‘জীর্ণ ভগ্ন করিয়া শুষ্ক কঙ্কালে’ পরিণত করেছিল। তবু এরই মধ্যে নরেন্দ্র, রাখাল, বাবুরাম, নিরঞ্জন, যোগীন্দ্র, লাটু, তারক, গোপাল দাদা, কালী, শশী, শরৎ এবং হুলো গোপালকে নিজের কাছে রেখে ত্যাগী জীবনের পথে সঞ্চালিত করার জন্য নিরলস প্রয়াস চালিয়ে গেছেন। হরি, তুলসী ও গদাধর তখনও পর্যন্ত বাড়ি থেকেই যাতায়াত করত।

একদিকে যখন ত্যাগী-যুবক ভক্তরা রোগ-জীর্ণ শ্রীরামকৃষ্ণের সেবায় জীবনপাত সাধনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন এবং এই সেবার মাধ্যমেই ভাবীকালের সন্ন্যাসী-সঙ্ঘ গড়ে তোলার ক্ষেত্রটিকে প্রস্তুত করেছিলেন, অন্যদিকে তেমনি গৃহী ও সংসারী ভক্তরাও শ্রীরামকৃষ্ণকে সাক্ষাৎ-অবতারজ্ঞানে ভক্তি করতেন, সেবা করতেন। রামচন্দ্র দত্ত, সুরেন্দ্রনাথ মিত্র, বলরাম বসু বা গিরিশচন্দ্র ঘোষ—সকলেই ঠাকুরের জন্য চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন।

দেখতে দেখতে পৌষ মাসের অর্ধেক পার হয়ে গেল। সে দিনটা ছিল ১৮৮৬ সালের পয়লা জানুয়ারি। ইংরেজি নববর্ষের ছুটি বলে সেদিন গৃহী ভক্তরা দুপুরের একটু পরেই একে একে এসে উপস্থিত হলেন কাশীপুর উদ্যানবাটিতে। উদ্যানবাটিতে নানারকম ফল ও ফুলের গাছ ছিল। তাঁরা ছোট ছোট দলে বিভিন্ন গাছতলায় বসে শ্রীরামকৃষ্ণ-প্রসঙ্গেই আলোচনা করতে থাকেন।

রামচন্দ্র দত্তের লেখা থেকে জানতে পারি, এর আগের সপ্তাহে জনৈক ভক্ত সেবক হরিশ মুস্তাফির পরিত্রাণের জন্য ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা জানিয়েছিলেন। সেদিন শ্রীরামকৃষ্ণ কোনও উত্তর দেননি। কিন্তু পয়লা জানুযারির দিন হরিশবাবু পরমহংসদেবের কাছে গেলে তিনি হরিশবাবুকে কৃপা করেন, কৃতার্থ করেন। হরিশ আনন্দে উন্মাদের ন্যায় কাঁদতে কাঁদতে নিচে এসে ওই ভক্ত সেবককে বললেন, ‘ভাইরে, আমার আনন্দ যে ধরে না! এ কি ব্যাপার! জীবনে এমন ঘটনা একদিনও দেখিনি।’ সেবক-ভক্তের চোখেও তখন অশ্রুধারা। তিনিও বললেন, ‘ভাই, প্রভুর অপূর্ব মহিমা!’ কিন্তু সেদিন হরিশবাবু কী পেয়েছিলেন কল্পতরু শ্রীরামকৃষ্ণের কাছ থেকে—সেই রহস্যের উন্মোচন তিনি আর করেননি।

উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় খুবই গরিব। চিৎপুরে তাঁর একটা ছোট দোকান। কোনও মতে সংসার চালান, তবে শ্রীরামকৃষ্ণকে ঈশ্বরজ্ঞানে ভক্তি করেন। পয়লা জানুয়ারি তিনিও গেলেন ঠাকুরের কাছে, শোনালেন স্বীয় অভাবের কথা, প্রার্থনা করলেন অর্থ। শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁকে কৃপা করে বললেন, ‘তোর ছোট দরজা বড় হয়ে যাবে, তোর অর্থ হবে’ (আমার জীবন কথা, স্বামী অভেদানন্দ)। তারপরই বিস্ময়করভাবে উপেন্দ্রনাথের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে থাকে। উপেন্দ্রনাথ (১৮৬৮-১৯১৯) ‘সাপ্তাহিক বসুমতী’ এবং ‘দৈনিক বসুমতী’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা এবং তাঁর হাতে গড়া বসুমতী সাহিত্য মন্দির বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে এক অনন্য প্রতিষ্ঠান।

কল্পতরু শ্রীরামকৃষ্ণের কৃপায় সবই হয়, সবই সম্ভব। ভাই ভূপতি (জন্ম রাজবল্লভ পাড়ায়) শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে ‘সমাধি’ প্রার্থনা করেছিলেন। কৃপাময় ঠাকুর তাঁকে বলেছিলেন, ‘তোর সমাধি হবে।’ হয়েও ছিল (আমার জীবনকথা)। পরবর্তীকালে ভাই ভূপতির শিষ্যরাই বারাসতের হৃদয়পুরের কোঁড়া অঞ্চলে ‘ঋষভ আশ্রম’ প্রতিষ্ঠা করেন।

উদ্যানবাটির গাছতলায় সরল ভক্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছেন। এমন সময় পরমহংসদেব দেবেন্দ্রকে ডেকে পাঠালেন (শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জীবন বৃত্তান্ত—রামচন্দ্র দত্ত।) সঙ্গে সঙ্গে দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৮৪৪-১৯১১) দোতলায় ঠাকুরের ঘরে গিয়ে উপস্থিত হলেন। দেবেন্দ্র সেখান থেকে ফিরে এসে অপেক্ষমান ভক্তদের বললেন, পরমহংসদেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘রাম (রামচন্দ্র দত্ত) যে আমায় অবতার বলে, এ-কথাটা তোমরা স্থির করো দেখি। কেশবকে তাঁর শিষ্যরাও অবতার বলত।’ কিন্তু তিনি যে কেন এ কথা বললেন, তাঁর কারণ কারও কাছেই স্পষ্ট ছিল না।

শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যম অগ্রজ রামেশ্বর চট্টোপাধ্যায়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র রামলাল (ভক্তদের রামলাল দাদা) মাঝে মাঝেই কাশীপুরে আসতেন শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন ও সেবা করতে। রামেশ্বরের মৃত্যুর পর তিনিই দক্ষিণেশ্বরে ভবতারিণীর পূজকের পদে নিয়ুক্ত হন এবং আজীবন সেই দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ভালো গান গাইতে পারতেন এবং শ্রীরামকৃষ্ণকেও গান শোনাতেন।

রামলাল দাদার সাক্ষ্য থেকে জানতে পারি, পয়লা জানুয়ারি তিনিও এসেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন ও সেবা করতে। হঠাৎই সেদিন বিকেলে ঠাকুর তাঁকে বললেন, ‘দেখ রামলাল, আজ ভালো আছি বলে মনে হচ্ছে, তা চল একটু নিচে বেড়িয়ে আসি।’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ, আপনি তো ভালোই আছেন। চলুন যাই।’ ঠাকুর একটা ঢাকা টুপি পরলেন, হাতে একটা ছড়ি নিলেন। আর রামলাল দাদা তাড়াতাড়ি গায়ে একটা চাদর দিয়ে (তাঁর হাতে গামছা গাড়ু আছে) ঠাকুরকে উপর থেকে ধরে নিচে নিয়ে এলেন।

সেদিন শ্রীরামকৃষ্ণের দেবদুর্লভ রূপের বর্ণনা দিতে গিযে রামচন্দ্র দত্ত বলেছেন, ‘সেইদিনকার রূপের কথা স্মরণ হইলে আমরা এখনও আশ্চর্য হইয়া থাকি। তাঁহার সর্বশরীর বস্ত্রাবৃত এবং মস্তকে সবুজ বনাতের কান-ঢাকা টুপি ছিল, কেবল মুখমণ্ডলের দিব্যজ্যোতিতে দিকমণ্ডল আলোকিত হইয়াছিল। মুখের যে অত শোভা হইতে পারে, তাহা কাহারও জ্ঞান ছিল না (সেই রূপ আর একদিন ইতিপূর্বে নবগোপাল ঘোষের বাড়ীতে সঙ্কীর্তনের সময় দেখা গিয়েছিল।)’

‘শ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথিতে’ অক্ষযকুমার সেন বলেছেন—

“আজি মনোহর বেশ প্রভুর আমার।

বারেক দেখিলে কভু নহে ভুলিবার।

পরিধান লালপেড়ে সুতার বসন।

গায়ে বনাতের জামা সবুজ বরণ।।

সেই কাপড়ের টুপি কর্ণমূল ঢাকা।

মোজা পায়ে চটি জুতা লতাপাতা আঁকা।।”

দুই

১৮৮৬ সাল। পয়লা জানুযারি। বিকেল তিনটে। শ্রীরামকৃষ্ণ বেড়াবার জন্য দোতলা থেকে নিচে নেমে এলেন। তাঁকে দেখেই উদ্যানে সমবেত ভক্তরা সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়ালেন, প্রণাম করলেন। তিনি নিচের হলঘরের পশ্চিম দিকের দরজা দিযে উদ্যানের পথে নেমে দক্ষিণমুখে ফটকের দিকে ধীর পদক্ষেপে অগ্রসর হতে থাকেন। ভক্তরা কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে তাঁকে অনুসরণ করতে থাকেন। ঠাকুর যে দোতলা বাড়িটাতে থাকতেন—সেই বাড়ি ও মূল ফটকের ঠিক মধ্যবর্তী স্থানে এসে ঠাকুর গিরিশ ঘোষ, রামচন্দ্র দত্ত, অতুল ঘোষ (গিরিশের ভাই) প্রভৃতি কযেকজনকে পশ্চিমের গাছতলায দেখতে পেলেন। তাঁরাও বিস্ময়-মাখা আনন্দে শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকেই প্রণাম করলেন। তারপর এগিয়ে এলেন তাঁর কাছে।

কারোর মুখে কোনও কথা নেই। সকলেই আনন্দ-ঘন মুগ্ধ-বিস্ময়ে তাকিয়ে আছেন শ্রীরামকৃষ্ণের জ্যোতির্ময় রূপের দিকে। রোগজর্জর দেহ, জীর্ণ-শীর্ণ চেহারা—সে-সব যেন মন্ত্রবলে অদৃশ্য হয়ে গেছে। হঠাৎ ঠাকুরই গিরিশচন্দ্রকে সম্বোধন করে বললেন, ‘গিরিশ তুমি যে সকলকে এত কথা (ঠাকুরের অবতারত্ব সম্বন্ধে) বলে বেড়াও, তুমি (আমার সম্বন্ধে) কী দেখেছ, কী বুঝেছ?’ এই প্রশ্নে অদ্বিতীয় নট ও নাট্যকার গিরিশচন্দ্র বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে তাঁর পদপ্রান্তে ভূমিতে জানু, সংলগ্ন করে বসে পড়লেন, তারপর ঊর্ধ্বমুখে করজোড়ে গদগদস্বরে বলে উঠলেন, ‘ব্যাস-বাল্মিকী যাঁর ইয়ত্তা করতে পারেননি, আমি তাঁর সম্বন্ধে অধিক আর কি বলতে পারি?’ গিরিশের শুদ্ধ অন্তরের সরল বিশ্বাস তাঁর প্রতি শব্দ উচ্চারণ ব্যক্ত হওয়ায় শ্রীরামকৃষ্ণ খুশি হলেন এবং গিরিশকে উপলক্ষ করে সেখানে সমবেত সকল ভক্তকে বললেন, ‘তোমাদের আর কী বলব? আশীর্বাদ করি চৈতন্য হোক।’ ভক্তগণের প্রতি প্রেম ও করুণায় বিগলিত হয়ে তিনি ওই কথাগুলি বলামাত্রই ভাবাবিষ্ট হয়ে পড়লেন।

স্বামী সারদানন্দ তাঁর কালজয়ী অমরগ্রন্থে ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গে’ ওই প্রেম ও করুণা বিতরণের প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘স্বার্থগন্ধহীন তাঁহার সেই গভীর আশীর্বাণী প্রত্যেকের অন্তরে প্রবল আঘাত প্রদানপূর্বক আনন্দস্পন্দনে উদ্বেল করিয়া তুলিল। তাহারা দেশ-কাল ভুলিল। ঠাকুরের ব্যাধি ভুলিল। ব্যাধি আরোগ্য না হওযা পর্যন্ত তাঁহাকে স্পর্শ না করিবার তাহাদের ইতি পূর্বের প্রতিজ্ঞা ভুলিল এবং সাক্ষাৎ অনুভব করিতে লাগিল যেন, তাহাদের দুঃখে ব্যাথিত হইয়া কোনও এক অপূর্ব দেবতা হৃদয়ে অনন্ত যাতনা ও করুণা পোষণপূর্বক বিন্দুমাত্র নিজ প্রয়োজন না থাকিলেও মাতার ন্যায় তাহাদিগকে স্নেহাঞ্চলে আশ্রয় প্রদান করিতে ত্রিদিব হইতে সম্মুখে অবতীর্ণ হইয়া তাহাদিগকে সস্নেহে আহ্বান করিতেছেন।’

তারপরই ভক্তদের মধ্যে সঞ্চারিত হল এক স্বর্গীয অনুভূতি। শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রণাম ও তাঁর পদধূলি গ্রহণের জন্য তাঁরা যেন ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তাঁদের কণ্ঠে বার বার ধ্বনিত হতে থাকে শ্রীরামকৃষ্ণের জয়ধ্বনি। সবাই যেন সবাইকে ডেকে বলতে চান, ‘এসেছে এক নতুন মানুষ, দেখবি যদি আয় চলে।’ মানুষ? তাই বা বলি কেমন করে? এই দিব্যজ্যোতিতে উদ্ভাসিত মানুষ কি যথার্থই মানুষ, না দেবতা? ইনি অবতার, না কল্পতরু? সকলেই তাঁকে প্রণাম করে মানব জীবন ধন্য করতে চায়, কল্পতরুর পদমূলে সমর্পণ করতে চায় নিজের চাওয়া-পাওয়ার অতিরিক্ত কিছু। সেটা কী? ভক্তি, শুধুই ভক্তি। অবতার-দর্শনের এই দুর্লভ সুযোগ কি মানুষের জীবনে বার বার আসে?

কাশীপুর উদ্যানবাটিতে কল্পতরু শ্রীরামকৃষ্ণ পাশে হৃদে।

এভাবে ভক্তরা যখন অশ্রুসজল নয়নে কৃতার্থ হৃদয়ে ঠাকুরকে প্রণাম করে চলেছেন, তখন শ্রীরামকৃষ্ণের করুণাধারাও যেন সকল বন্ধন ছিন্ন করে, সকল সীমাকে অতিক্রম করে এক অদৃষ্টপূর্ব ঘটনার সঙ্গে গিয়ে সংযোজিত হল। স্বামী সারদানন্দ বলছেন, ‘কোন কোন ভক্তের প্রতি করুণায় ও প্রসন্নতায় আত্মহারা হইয়া দিব্য শক্তিপূত স্পর্শে তাঁহাকে কৃতার্থ করিতে আমরা ইতিপূর্বে দক্ষিণেশ্বরের ঠাকুরকে প্রায় নিত্যই দেখিয়াছিলাম, অদ্য অর্ধবাহ্যদশায় তিনি সমবেত প্রত্যেক ভক্তকে ওইভাবে স্পর্শ করিতে লাগিলেন।’

এ তো এক অপ্রত্যাশিত ও অযাচিত আনন্দ যজ্ঞ। ভক্ত হৃদয়ের চূড়ান্ত কামনার ধন তাঁরা না চাইতেই হাতে হাতে পেয়ে গেলেন শ্রীরামকৃষ্ণরূপ কল্পতরুমূলে দাঁড়িয়ে। বলাবাহুল্য, শ্রীরামকৃষ্ণের ওই রূপ আচরণে সেখানে উপস্থিত ভক্তগণের আনন্দের অবধি রইল না। তাঁরা বুঝলেন, আজ থেকে শ্রীরামকৃষ্ণ নিজে দেবত্বের কথা শুধুই তাঁদের কাছে নয়, গোটা সংসারের কাছে আর লুকিয়ে রাখবেন না। এবার তাহলে ‘হাটে হাঁড়ি ভেঙে’ দেওয়ার সময় এসেছে। এখন থেকে পাপী তাপী সকলেই সমভাবে শ্রীরামকৃষ্ণের অভয়পদে আশ্রয় লাভ করতে সমর্থ হবে—নিজ নিজ ত্রুটি, অভাব ও অসামর্থ্যবোধ থেকে মুক্তিলাভের ব্যাপারে তাদেরও আর বিন্দুমাত্র সংশয় রইল না।

শ্রীরামকৃষ্ণের ওই অপরূপ রূপ দর্শন করে, ‘তোমাদের চৈতন্য হোক’ আশীর্বাদ লাভ করে কেউ কেউ নির্বাক মুগ্ধতায় কেবলমাত্র অপলক নয়নে শ্রীরামকৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে রইলেন, কেউ কেউ বাড়ির ভিতরে অবস্থানরত সকলকে ঠাকুরের কৃপালাভে ধন্য হওয়ার জন্য চিৎকার করে আহ্বান জানাতে থাকেন, আবার কেউ কেউ নিকটবর্তী ফুল গাছ থেকে মুঠো মুঠো ফুল তুলে এনে মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে শ্রীরামকৃষ্ণের চরণে অঞ্জলি দিতে থাকেন। ভক্ত এবং ভগবান, সমবেত গৃহীরা এবং শ্রীরামকৃষ্ণ এই পার্থিব জগতে দাঁড়িয়েও এক অপার্থিব জগতে চলে গেলেন—সকলেই তখন ভাবাবিষ্ট। ভক্তগণ সমবেতভাবে নবরূপে অবতীর্ণ অবতারকে পূজা করে এই কলি যুগে এক নতুন ইতিহাস রচনা করলেন।

স্বামী সারদানন্দ বলেছেন, ওইদিন ঘটানাস্থলে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, সেই ভাগ্যবানদের মধ্যে মাত্র আট-দশজনের নামই স্মরণে আছে। তাঁরা হলেন গিরিশ, অতুল, রাম, নবগোপাল, হরমোহন, বৈকুণ্ঠ, কিশোরী (রায়), হারান, রামলাল, অক্ষয় এবং সম্ভবত কথামৃতকার মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত। এদের মধ্যে অক্ষয়কুমার সেন (১৮৫৪-১৯২৩) বাঁকুড়া জেলার ময়নাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করে। ‘কল্পতরু’ হওয়ার দিন ঠাকুর অক্ষয়কুমারকে নিজের কাছে ডেকে এনে তাঁর বক্ষ স্পর্শ করে কানে ‘মহামন্ত্র’ দান করেছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁর মধ্যে অপরূপ কবিত্বশক্তির বিকাশ ঘটে এবং ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথি’ পদ্যাকারে রচনা করে এক অক্ষয় কীর্তি স্থাপন করেন। অবতারের আশীর্বাদ মূকও যে কথা বলতে পারে—এটা তারই জ্বলন্ত প্রমাণ। শুধু তাই নয়, তিনি ‘শ্রীরামকৃষ্ণ মহিমা’ নামে অপর এক গ্রন্থ রচনা করেও স্বীয় প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন।

অতুল হচ্ছেন অতুলচন্দ্র ঘোষ—নট ও নাট্যকার গিরিশচন্দ্রের কনিষ্ঠ ভ্রাতা—যিনি পরমহংসদেবকে পরিহাস করে ‘রাজহংস’ বলতেন এবং ঠাকুরের সঙ্গে সব সময় দূরত্ব বজায় রাখতেন। কিন্তু ‘কল্পতরু’ শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকেও কৃপা করেন। আর নট ও নাট্যকার গিরিশচন্দ্র শ্রীরামকৃষ্ণের কৃপায় ভক্তভৈরব গিরিশচন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণের অবতারত্বে তাঁর জ্বলন্ত বিশ্বাস ছিল। শ্রীরামকৃষ্ণের করুণা-গঙ্গার পুণ্য প্রভাব ও মহিমা বুঝতে হল গিরিশচন্দ্রের মহাজীবনটিকে অবশ্যই অনুধাবন করা প্রয়োজন।

নবগোপাল হচ্ছেন নবগোপাল ঘোষ (১৮৩২-১৯০৯)—হুগলি জেলার বেগমপুর গ্রামে জন্ম—ছিলেন বাদুড়বাগানের বাসিন্দা। তাঁর বাড়ি ঠাকুরের পদধূলি এবং নৃত্যগীতে ধন্য হয়। নবগোপাল ঠাকুরের মধ্যে ‘শ্রীচৈতন্য রূপ’ দেখতে পান। ‘কল্পতরু’ শ্রীরামকৃষ্ণ সমাধিস্থ অবস্থায় নবগোপালকে বার বার তাঁর নাম উচ্চারণ করতে বলেন। তারপর থেকে সব সময নবগোপালের মুখে ‘জয় রামকৃষ্ণ’ ধ্বনি লেগেই থাকত। ১৮৯৮ সালে হাওড়ায় নবগোপালের নবনির্মিত বাড়িতে স্বামী বিবেকানন্দ শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতিকৃতি স্থাপন করেন এবং সেই বাড়িতে বসেই শ্রীরামকৃষ্ণের প্রণাম মন্ত্র রচনা করেন।

সবথেকে বিস্ময়ের ব্যাপার, শ্রীরামকৃষ্ণ যখন কল্পতরুরূপে তাঁর গৃহী ভক্তদের অযাচিত করুণা বিতরণ করে চলেছেন, তখন সেখানে তাঁর কোনও সন্ন্যাসী-শিষ্য বা ত্যাগী-ভক্ত উপস্থিত ছিলেন না। নরেন্দ্রনাথ ও অন্যান্যরা পূর্ব রাত্রে দীর্ঘ সময় সাধন-ভজনে নিয়ুক্ত ছিলেন বলে সেই সময় ঘুমিয়ে ছিলেন। লাটু মহারাজ এবং স্বামী সারদানন্দ দোতলার বারান্দা থেকে ওই ঘটনা প্রত্যক্ষ করলেও তাঁরা কেউই ঘটনাস্থলে যাননি। প্রকৃতপক্ষে সেদিন শ্রীরামকৃষ্ণ সংসারী জীবের প্রতিই করুণা করেছিলেন, যাঁদের একজন ছিলেন বৈকুণ্ঠনাথ, যিনি বার বার শ্রীরামকৃষ্ণের কৃপা পাওয়ার জন্য তাঁর কাছে ছুটে ছুটে গেছেন। ‘কল্পতরু’ শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর বক্ষস্থল স্পর্শ করার পর তাঁর মধ্যে ভাবান্তর দেখা দিল। তিনি লিখছেন, ‘আকাশ, বাড়ি, গাছপালা, মানুষ ইত্যাদি যেদিকে যাহা কিছু দেখিতে লাগিলাম তাহারই ভিতরে ঠাকুরের প্রসন্ন হাস্যদীপ্ত মূর্তি দেখিতে লাগিলাম।’ কিন্তু এই অবস্থা তিনি বেশিদিন সহ্য করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত আবার ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা জানিয়ে পূর্বাবস্থায় ফিরে যান এবং পরে এই প্রার্থনা জানানোর জন্য চরম অনুতপ্ত হন। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর ভাইপো রামলালকেও কৃপা করেন, বুকে হাত বুলিয়ে দেওয়ার পর রামলালদা দেখছেন আর বলছেন, ‘আহা সে যে কি রূপ, কি আলো, কি জ্যোতি, সে আর কি বলব!’ কিন্তু তিনি হরমোহনকে কৃপা করেননি, বলেছিলেন, ‘এখন থাক।’ কেন যে বলেছিলেন সো অজ্ঞাতই থেকে গেছে। চৈতন্যহারা বিশ্ব যখন বিজ্ঞান আর নাস্তিকতায় ভর করে এগিয়ে চলার ব্যর্থ চেষ্টায় বিব্রত, তখন শ্রীরামকৃষ্ণের আশীর্বাদ ‘তোদের চৈতন্য হোক’ সমগ্র বিশ্ব মানবের জন্যই হয়েছে বর্ষিত।

তিন

‘কল্পতরু’ হচ্ছে কল্পান্তস্থায়ী তরু। দেবতা ও অসুররা মিলে যখন সমুদ্র মন্থন করেছিলেন, সেই সময় সমুদ্র গর্ভ থেকে এই তরু উঠে এসেছিল এবং কল্পান্ত (ব্রহ্মার এক অহোরাত্রের অবসান) হলে পুনরায় সমুদ্রগর্ভে নিমতি হয়। সর্বকামনা পূরণকারী কল্পিত দিব্যবৃক্ষ এই অচিন তরু যুগযুগান্ত ধরে ভক্তদের কাছে মনোবাসনা পূর্ণ করার প্রতীকরূপে বিরাজ করছে। পুরাণ অনুসারে দেবরাজ ইন্দরের স্বর্গোদ্যানে নাকি এই কল্পতরুর অবস্থান। মানুষের বিশ্বাস, এর কাছে যে যা চায়, এই তরু তাকেই সেটা প্রদান করে। মানুষ এই বিশ্বাসের উপর নির্ভর করেই বেঁচে আছে আশা-আকাঙ্ক্ষা, কামনা-বাসনার জটিল সংসারে।

বাঞ্ছাপূরণকারী এই পৌরাণিক তরুটির কথা ভাগবতে, রঘুবংশে, হিতোপদেশে এবং বিভিন্ন বৈষ্ণব শাস্ত্রে আমরা পাই। ‘শিবাষ্টকম’ স্ত্রোত্রে আছে, ‘প্রণমামি শিবম শিব কল্পতরুম’—অর্থাৎ সেই মঙ্গলময় কল্পতরুস্বরূপ শিবকে প্রণাম করি।

শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, ‘ভগবান কল্পতরু। কল্পতরুর কাছে বসে যে-যা চাইবে, তাই পাবে। এ জন্য সাধন-ভজনের দ্বারা যখন মন শুদ্ধ হয়, তখন সাবধানে কামনা ত্যাগ করতে হয়। কেমন জান? একজন লোক কোন সময়ে ভ্রমণ করতে করতে খুব বড় মাঠে গিয়ে উপস্থিত হল। পথে রোদে অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে বিশ্রামের জন্য একা গাছের তলায় বসল। মনে মনে ভাবল যে, ‘এই সময় একা ভালো বিছানা পাই, তাহলে তাতে শুয়ে ঘুমুই।’ সে যে একটা কল্পতরুর নিচে বসেছিল, তা সে জানতই না। মনে মনে যে-ই এই বাসনা হল, তখনই এক উত্তম বিছানা এসে পড়ল। এই ঘটনায় সে খুবই আশ্চর্য হয়ে সেই বিছানায় শুলো, আর মনে মনে ভাবতে লাগল, ‘এই সময় এক স্ত্রীলোক এসে যদি আমার পদসেবা করে, তাহলে খুব সুখে নিদ্রা যাই।’ এই মনে হওয়া মাত্রই এক যুবতী এসে তার পদ সেবা করতে লাগল। তখন তার আর আনন্দের সীমা রইল না। তারপর তার খুব ক্ষিদে পেল। তখন সে মনে ভাবলে ‘যা যা চাইলুম, সবই তো পেলুম, তবে কিছু খাবার পাবো না?’ বলতে না বলতেই তার কাছে অমনি নানারকম খাবার এসে জুল। সে সেইগুলো খেয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগল, ‘এই সময় যদি একা বাঘ এসে পড়ে তাহলে কি হয?’ যেমন এই মনে হওয়া অমনি এক প্রকাণ্ড বাঘ লাফ দিয়ে এসে তাকে মেরে ফেলল। এই সংসারে জীবেরও ঠিক এইরূপ দশা ঘটে থাকে। ঈশ্বর-সাধন করতে গিয়ে, বিষয়, ধন, জন, অথবা মান-যশ ইত্যাদি কামনা করলে তা কিছু কিছু লাভ হয় বটে, কিন্তু শেষে বাঘেরও ভয় থাকে,—অর্থাৎ রোগ, শোক, তাপ, অপমান ও বিষয়নাশরূপ বাঘ স্বাভাবিক বাঘ হতেও লক্ষ গুণে কষ্টদায়ক।’ (শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথাসার, ৬-৭)

চার

শুধুই কি ১৮৮৬ সালের পয়লা জানুয়ারি? শ্রীরামকৃষ্ণ কি তার আগেও সংসার জ্বালায় ক্ষত বিক্ষত দুঃখী মানুষের কাছে ‘কল্পতরু’ হয়ে দেখা দেননি? এই প্রসঙ্গে আমরা ১৮৬৯ সালের এক ঘন্টার কথা স্মরণ করতে পারি। তখনও শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের ‘ছোট ভটচাজ’ নামেই পরিচিত—মা ভবতারিণীর পূজারী। অবশ্য রানী রাসমণি তাঁকে চিনেছিলেন, চিনেছিলেন রানীর জামাতা মথুরনাথ বিশ্বাসও। রানীমার মৃত্যুর পর মথুরবাবুই জমিদারির দেখাশুনা করছেন। সেই সময় খবর এল, নদীয়া জেলার এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ঘোর অনাবৃষ্টি দেখা দিয়েছে, পর পর দু’বছর গেছে অজন্মা, সর্বত্র দেখা দিয়েছে দুর্ভিক্ষের করাল ছায়া। তাই প্রজারা খাজনা দিতে পারছে না।

এই দুঃসংবাদ পেয়ে মথুরবাবু ঠিক করলেন, তিনি নিজেই যাবেন জমিদারি দেখতে। সঙ্গে নিলেন শ্রীরামকৃষ্ণকে—যাঁকে মথুরবাবু গুরুর মতো ভক্তিশ্রদ্ধা করতেন, ডাকতেন ‘বাবা’ বলে। পাইক-বরকন্দাজ পরিবৃত হয়ে জমিদারের বজরা নৌকার বহর এসে থামল দুরন্ত চূর্ণী নদীর তীরে কলাইঘাটা (রাণাঘাটের কাছেই) গ্রামে। এখানেই জমিদারের কুঠিবাড়ি। নৌকা থেকে নেমে মথুরবাবু তাঁর নায়েব-গোমস্তাদের নিয়ে এগিয়ে চললেন কুঠিবাড়ির দিকে। সকলের অলক্ষে নৌকা থেকে নেমে এলেন একজন দরিদ্র ব্রাহ্মণ। সেই দরিদ্র ব্রাহ্মণ নদীর তীরে তাকিয়ে দেখেন, নদী তীরে জমায়েত হাজার হাজার কোটরগত ম্লান চোখ তাকিয়ে আছে জমিদারের যাত্রা পথের দিকে। কেউ খেয়াল করছেন না, ওই হাজার হাজার মানুষের চোখে জল, যন্ত্রণায় ভেঙে যাচ্ছে বুকের পাঁজর, অনাহারে নুইয়ে পড়েছে দেহের মেরুদণ্ড। তাঁদের নির্বাক চাহনিতে মূর্ত হয়ে উঠেছে বহুদিনের এক অব্যক্ত যন্ত্রণার করুণ ছায়া।

দুঃখী মানুষের ‘কল্পতরু’ অপলক নয়নে তাকিয়ে আছেন তীরে দাঁড়ানো সারি সারি কঙ্কালসার মানুষের দিকে। ততক্ষণে মথুরবাবু বেশ কিছুটা এগিয়ে গেছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ নদী তীরের নরম মাটিতে দাঁড়িয়ে সজল নয়নে প্রত্যক্ষ করছেন তাঁর সামনে দাঁড়ানো দুর্ভিক্ষের গুহা থেকে সদ্য বেরিয়ে আসা অসংখ্য মানুষকে। এবার প্রেমের ঠাকুর গিয়ে গতিরোধ করলেন সে-কালের অন্যতম প্রতাপশালী জমিদারের। শ্রীরামকৃষ্ণ অশ্রুরুদ্ধকণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, ‘এরা কারা? ওই যে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি বস্ত্রহীন, অন্নহীন, রুক্ষ কঙ্কালসার মানুষ, ওরা কারা?’

—ওরা আমার প্রজা। মথুরবাবু সহজভাবেই কথাটা বললেন।

—এরাই তোমার প্রজা? তুমি এদের কাছ থেকে জোর করে খাজনা আদায় করবে? বেদনার্ত কণ্ঠে রামকৃষ্ণ বললেন, কিন্তু মথুর, একবার ভালো করে চেয়ে দেখ, ওদের পেটে ভাত নেই—ওরা নিজেরাই খেতে পায় না।

নদীর নরম মারি বুকে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদে কঠিন হয়ে উঠলেন তিনি। ক্ষুধার্ত মানুষের কাছ থেকে জোর করে অর্থ আদায় করে এবং মানুষের অশ্রুসিক্ত অর্থ দিয়ে যেখানে মা ভবতারিণীর পূজা হয়—সেখানে তিনি আর পূজারী থাকতে রাজি নন। একদিকে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে প্রতিষ্ঠিতা তাঁর আরাধ্যা দেবী মা ভবতারিণী, অন্যদিকে কলাইঘাটার অসহায় দুঃখী মানুষ—এই দু’য়ের মধ্যে সেদিন শ্রীরামকৃষ্ণ বেছে নিয়েছিলেন দুর্ভিক্ষ পীড়িত অশ্রুসজল মানুষকেই। ক্ষুধার্ত মানুষই সেদিন তাঁর আরাধ্য দেবতা হয়ে উঠেছিল।

শেষ পর্যন্ত মথুরবাবু শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে নতি-স্বীকার করেছিলেন। দরিদ্র প্রজাদের খাজনা মকুব করে দিয়েছিলেন, প্রত্যেককে শ্রীরামকৃষ্ণের হাত দিয়ে কাপড় দিয়েছিলেন এবং একটানা সাতদিন অন্ন দিয়ে সেবা করেছিলেন। ‘কল্পতরু’ শ্রীরামকৃষ্ণ সেদিন ওই কলাইঘাটার মাটিতেই ‘শিবজ্ঞানে জীব সেবার মহাব্রত’ পালন করেছিলেন, প্রমাণ করেছিলেন, অচল বিগ্রহে যদি পূজা হয়, সচল বিগ্রহে কেন হবে না? কলাইঘাটার দুঃখী মানুষ শ্রীরামকৃষ্ণরূপ কল্পতরুর কাছে কিছু প্রার্থনা করেনি, শ্রীরামকৃষ্ণ অযাচিতভাবেই তাঁদের দুঃখমোচনে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তাই কলাইঘাটা নবযুগের সেবা তীর্থে পরিণত।

ইংরেজি বছরের প্রথম দিন এখন আমাদের কাছে এক নতুন তাৎপর্য ও মাত্রা নিয়ে উপস্থিত। এই দিন মানুষের চৈতন্য উদয়ের মাহেন্দ্রক্ষণ। তাই যন্ত্রনির্ভর এই সভ্যতা যখন ভোগবিলাসের উপকরণ সাজিয়ে মানুষের চৈতন্যকে অপহরণ করার এক অদম্য নেশায় আক্রান্ত, তখন অসহায় মানুষ সেই হারিয়ে যাওয়া চৈতন্যের সন্ধানে কাশীপুর উদ্যানবাটিতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন, কলাইঘাটার পুণ্য ভূমিতে গিয়ে আত্ম-আবিষ্কারের পথ খোঁজেন। শ্রীরামকৃষ্ণ পদার্পণ স্মারক সমিতি রাণাঘাট ও কলাইঘাটায় সেই চেতনালোক সৃষ্টিতেই উদ্যোগী। কলাইঘাটায় প্রতি বছর তাঁরাই এক কল্পতরু উৎসব পালন করেন। এখন সেখানে শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দির নির্মাণে উদ্যোগী। লক্ষ মানুষের প্রণামে পবিত্র হয়ে ওঠে কলাইঘাটার মা।

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “কল্পতরু শ্রীরামকৃষ্ণ : লিখেছেন প্রণবেশ চক্রবর্তী”

  1. SUBHASH CHAKRABARTY says:

    ভালো লাগলো। তবে ভুল ছবি দিয়েছেন। এই ছবি কাশীপুর উদ্যানবাটির নয়। হৃদয় ওখানে যায়নি। ঐ ছবি কেশব চন্দ্র সেনের বাড়িতে তোলা হয়েছিল। ধন্যবাদ ।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev