রবিবার | ৩০শে মার্চ, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | বিকাল ৩:০৪
Logo
এই মুহূর্তে ::
আত্মশুদ্ধির একটি বিশেষ দিন চৈত্র অমাবস্যা : রিঙ্কি সামন্ত চাপড়া বাঙ্গালঝি মহাবিদ্যালয় : ড. দীপাঞ্জন দে রায়গঞ্জে অনুষ্ঠিত হল জৈব কৃষি বিপণন হাট অশোকবৃক্ষ, কালিদাসের কুমারসম্ভব থেকে অমর মিত্রর ধ্রুবপুত্র : অসিত দাস কৌতুকে হাসতে না পারলে কামড় তো লাগবেই : তপন মল্লিক চৌধুরী জাতিসংঘ মহাসচিবের সফর ও রোহিঙ্গা সংকটে অগ্রগতি : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন এথেন্সের অ্যাগনোডাইস — ইতিহাসের প্রথম মহিলা চিকিৎসক : রিঙ্কি সামন্ত সন্‌জীদা খাতুন — আমার শিক্ষক : ড. মিল্টন বিশ্বাস হিমঘরগুলিতে রেকর্ড পরিমাণ আলু মজুত, সস্তা হতে পারে বাজার দর : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় শিশুশিক্ষা : তারাপদ রায় জঙ্গলমহল জৈন ধর্মের এক লুপ্তভুমি : সসীমকুমার বাড়ৈ ওড়িশা-আসাম-ত্রিপুরার অশোকাষ্টমীর সঙ্গে দোলের সম্পর্ক : অসিত দাস পাপমোচনী একাদশী ব্রতমাহাত্ম্য : রিঙ্কি সামন্ত ভগত সিংহের জেল নোটবুকের গল্প : কল্পনা পান্ডে নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘অমৃতসরী জায়কা’ মহিলা সংশোধনাগারগুলিতে অন্তঃসত্ত্বা একের পর এক কয়েদি, এক বছরে ১৯৬ শিশুর জন্ম : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ‘শোলে’র পঞ্চাশ বছর : সন্দীপন বিশ্বাস বিভাজনের রাজনীতি চালিয়ে হিন্দুত্ববাদীরা ইতিহাস পালটাতে চায় : তপন মল্লিক চৌধুরী অশোক সম্পর্কে দু-চারটে কথা যা আমি জানি : অসিত দাস চৈত্রের শুরুতেই শৈবতীর্থ তারকেশ্বরে শুরু হলো সন্ন্যাস মেলা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় প্রথম বাঙালি পরিচালকের প্রথম নির্বাক লাভ স্টোরি : রিঙ্কি সামন্ত গোপিনী সমভিব্যাহারে রাধাকৃষ্ণের হোলি ও ধ্যানী অশোকবৃক্ষ : অসিত দাস শেখাওয়াটির হোলী-হাভেলী : নন্দিনী অধিকারী সংস্কৃত সাহিত্যে অশোকবৃক্ষ যখন দোহলী : অসিত দাস প্রাণগৌরাঙ্গের প্রিয় পঞ্চব্যঞ্জন : রিঙ্কি সামন্ত ‘দ্য স্টোরিটেলার’ — শিল্প এবং বাজারের মধ্যে দ্বন্দ্ব : কল্পনা পান্ডে অপুষ্টি আর দারিদ্রতা ঢাকতে সরকার আর্থিক উন্নয়নের পরিসংখ্যান আওড়ায় : তপন মল্লিক চৌধুরী দোহলী মানে অশোকবৃক্ষ, তা থেকেই দোল ও হোলি : অসিত দাস সিনেমা প্রেমীদের হোলির গান : রিঙ্কি সামন্ত দোলের আগের দিনের চাঁচর নিয়ে চাঁচাছোলা কথা : অসিত দাস
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোলপূর্ণিমা ও হোলি ও বসন্ত উৎসবের  আন্তরিক শুভেচ্ছা শুভনন্দন।  ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

গণনাট্য আন্দোলন ও তার পরিণতি : স্বর্ণাভা কাঁড়ার

স্বর্ণাভা কাঁড়ার / ৩৪৬৮ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ১২ অক্টোবর, ২০২২

গণনাট্য আন্দোলনের জনক ভারতীয় গণনাট্য সংঘ। সংক্ষেপে আই.পি.টি.এ — নামে পরিচিত। এই আন্দোলনের ভাবাদর্শগত বনিয়াদ ১৯৩৬ সালে প্রগতি লেখক সংঘ তৈরী করে। ওই বছরের এপ্রিল মাসে জাতীয় কংগ্রেসের লক্ষ্নৌ অধিবেশনের প্রায় পাশাপাশি প্রগতি লেখত সংঘের প্রথম সর্বভাবতীয় অধিবেশন হয় — যেখানে কবি হিসাবে কংগ্রেস নেত্রী সরোজিনী নাইডু এবং মওলানা হসরৎ মোহানী উপস্থিত ছিলেন। লেখক সংঘের ঘোষণাপত্রে ছিল : “আমাদের সমাজ যে নবরূপ ধারণ করছে তাকে সাহিত্যে প্রতিফলিত করা এবং বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদকে সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত করে প্রগতিকামী মননধারাকে বেগবান করা… আমাদের লেখকদের কর্তব্য। তাঁদের উচিৎ সাহিত্য বিচার ক্ষেত্রে এমন দৃষ্টিভঙ্গির অবতারণা করা যা পারিবারিক, যৌন, ধর্ম চিন্তাগত, যুদ্ধ-বিগ্রহাদি সমস্ত সাহিত্য প্রসঙ্গ থেকে প্রগতিবিমূখ ও পশ্চাদগামী মনোবৃত্তিকে উন্মিলিত করবে এবং সাম্প্রদায়িকতা, জাতি বিদ্বেষ, যৌন স্বৈরাচার, সামাজিক অবিচারের যে ছায়া সাহিত্যে পড়েছে তার অপসারণের জন্য তাঁদের সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে। আমরা চাই জনসাধারণের জীবনের সঙ্গে সর্ববিধ কলার নিবিড় সংযোগ। আমরা চাই যে সাহিত্য প্রাত্যহিক জীবনের চিত্র ফুটিয়ে তুলুক আর যে ভবিষ্যতের কল্পনা করছি তাকে এগিয়ে আনুক।… আমরা বিশ্বাস করি যে ভারতে নবীন সাহিত্যকে আমাদের বর্তমান জীবনের মূল সমস্যা — ক্ষুধা, দারিদ্র্য, সামাজিক পরাঙ্মুখতা, রাজনৈতিক পরাধীনতাকে নিয়ে আলোচনা করতেই হবে।”

সাম্রাজ্যবাদ, ফ্যাসিবাদ এবং সম্ভাব্য বিশ্বযুদ্ধের বিরুদ্ধে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন থেকে যে জাতীয় যুক্তফ্রন্ট গঠনের আহ্বান দেওয়া হয়েছিল — উদ্ধৃত ঘোষণাপত্র তারই সাংস্কৃতিক প্রতিধ্বনি — এমন অনুমান অসঙ্গত নয়। কার্যত পণ্ডিত জহরলাল নেহরু এই লেখক সংঘের ক্রিয়াকলাপে যুক্ত হয়েছিলেন। কংগ্রেস সোসাসিল্ট পার্টির জয়প্রকাশ নারায়ণ, আচার্য নরেন্দ্র দেব এবং ড. জেড এ আহমেদ সোসালিস্ট বুক ক্লাব গঠন করে সেখান থেকে মার্ক্স ও লেনিনের রচনার সঙ্গে গর্কির সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধের একটি বইও প্রকাশ করেন। প্রগতি লেখক সংঘের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন — সংগ্রেস সোসালিস্ট পার্টির ন্যাশনাল একসিকিউটিভের সদস্য সজ্জাদ জবীর। এই প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার যে কংগ্রেস সোসালিস্ট পার্টি তৈরী হয় ১৯৩৪ সালে এবং কংগ্রেসের লক্ষ্নৌ অধিবেশনের সম-সাময়িক কালে সারা ভারত কৃষক সভা (১১ ই এপ্রিল ১৯৩৬) প্রগতি লেখক সংঘের পরের দিন তৈরী হয় — এবং ভারতের ছাত্র পেডারেশন তৈরী হয় — ১২ আগস্ট ১৯৩৬ সাল। গণনাট্য আন্দোলনের সংগঠনে এইসব আন্দোলনের যোগাযোগ তার জন্মকাল থেকেই। কারণ তরুণ ছাত্র, লেখত এবং কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলনের কর্মীরাই প্রথমে নতুন আদর্শের ভিত্তিতে গান, নাটিকা এবং নৃত্য রচনা ও পরিবেশন করতে থাকেন। কলকাতার আশেপাশের জেলাগুলিতে ছাত্র ফেডারেশনের কর্মীরা পোস্টার নাটক করেন ১৯৩৯-৪০ সালের মধ্যেই। প্রগতি লেখক সংঘের দ্বিতীয় সর্বভারতীয় সম্মেলন ১৯৩৮-এ ডিসেম্বরে কলকাতাতে অনুষ্ঠিত হয়। এর অল্পকালের মধ্যে ‘অগ্রণী’ কাগজ প্রকাশিত হয় — সেখানে প্রকাশিত খ্যাতনামা সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষের ‘ফসিল’ গল্প বাংলা সাহিত্য জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করে। গণনাট্য সংঘের নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য, গীতিকার জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র প্রভৃতি লেখকরা আত্মপ্রকাশ করেন। ‘ফসিল’-কে ইউথ কালচারাল ইনস্টিটিউটের সুনীল চ্যাটার্জী (যিনি পরে কলকাতা গণনাট্য সংঘের প্রথম যুগের সভ্য ছিলেন।) ‘অঞ্জনগড়’ নামে নাট্যরূপ দিয়ে অভিনয় করান এবং তৎকালীন সময়ের কলকাতার মেয়র কমল বসু সেই নাটকে অভিনয় করেছিলেন — একটি সাহেবের ভূমিকায়। প্রায় সমসাময়িক কালে লক্ষ্নৌ প্রগতি লেখক সংঘের মামুদ জাফর এবং তাঁর স্ত্রী ডাঃ রসিদা জাহান (তাঁর উর্দু ছোট গল্পের জন্য খ্যাত) গ্রুপ থিয়েটার নামে একটি নাটকের দল গড়েন। ১৯৪০ সালে বাঙ্গালোর শহরে সিংহলের কন্যা অনিল ডি সিলভা, নর্তক রামকুমার এবং তরুণ বৈজ্ঞানিক হোমী জে ভাবা (ইনি কখনো সামনে আসেননি) ‘পিপিলস থিয়েটার’ নাম দিয়ে একটি সাংস্কৃতিক দল গঠন করেন এবং পুলিশের উৎপাতে উত্যক্ত হয়ে অনিল বোম্বাইয়ে এসে খাজা আহমদ আব্বাস প্রভৃতির সহযোগে শ্রমিকদের নিয়ে পিপল্‌স থিয়েটার গঠন করেন। এই নামই ১৯৪৩ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় সন্মোলনে গৃহীত হয়। এর কিছু আগে পণ্ডিত জহরলাল নেহরু বোম্বাই গ্রুপের কাছে এক বিবৃতিতে বলেন যে ভারতে গণনাট্য আন্দোলন সৃষ্টির ব্যাপারে তাঁর বেশ আগ্রহ আছে এবং এই আন্দোলন জনগণ ও তাদের ঐতিহ্যকে ভিত্তি করলে প্রসার লাভ করবে। অন্যথায় হাওয়ার উপর ভাসবার সম্ভাবনা। জনগণের যোগাযোগের উপর গুরুত্ব দেওয়াতে তিনি খুশী। চিন ও স্পেনে এই ধরনের পরিস্থিতি ছিল। ভারতের পরিস্থিতি এখনো (তৎকালীন সময়ে) সেইরূপ নয়। তথাপি এই দিকে চেষ্টা করা উচিত বলেই এই আন্দোলনের তিনি সাফল্য কামনা করেন। ১৯৪৩-এ সরোজিনী নাইডুও উৎসাহ দিয়েছিলেন — সমগ্র আন্দোলনকে বিশেষ করে জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের ‘নবজীবনের গান’কেও।

কিন্তু ১৯৩৬ ও ১৯৪৩ সালের মধ্যে ভারতে এবং পৃথিবীতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গিয়েছিল। জাতীয় কংগ্রেসের ত্রিপুরী অধিবেশন থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার মধ্যে জাতীয় যুক্তফ্রন্টে ভাঙন ধরেছে — সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত, কংগ্রেস সোসালিস্ট পার্টি ও জহরলাল নেহরুর ক্রমান্বয়ে সুভাষ বিরোধী জাতীয় নেতৃত্বের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ, ফরোয়ার্ড ব্লক সৃষ্টি, কংগ্রেস সোসালিস্ট পার্টির মধ্য থেকে কমিউনিস্টদের বহিষ্কার এবং সমগ্র বামপন্থী আন্দোলনের মধ্যে বিভেদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যে পর্যায়ে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিটলার জার্মানীর দ্বার আক্রান্ত হল — এবং মিত্র শক্তি সোভিয়েতের পক্ষে গেল — তার ৬ মাস পরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ‘জনযুদ্ধ’ নীতি ঘোষণা করায় রাজনৈতিক মঞ্চের মত সাংস্কৃতিক মঞ্চেও সর্বভারতীয় তৎপরতা হ্রাস পেল। অবশ্য ইতিপূর্বে প্রগতি লেখক সংঘের কোন কোন সংগঠককে ভারত রক্ষা আইনে গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং পুলিসের দৃষ্টির বাইরেও কিছু লোককে গোপনে থাকতে হয়েছিল। কিন্তু জাপানের বর্মা আক্রমণের পর চট্টগ্রাম ও কলকাতায় বোমা বর্ষণ এবং স্ট্যালিনের সামনে হিটলারের বিপুল সৈন্য সমাবেশ এদেশের সাধারণ মানুষকে সচকিত করেছিল — কারণ চিনে জাপানের অত্যাচার এবং বর্মা থেকে পলাতক ভারতীয়দের দুর্দশার বিবরণ এদেশের সাধারণ মানুষকে ফ্যাসিজমের স্বরূপ সম্পর্কে ধীরে ধীরে মোহমুক্ত করছিল। এই সময় ঢাকাতে তরুণ কলেখক সোমেন চন্দের হত্যা বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের ফ্যাসিজম সম্পর্কে ঐক্যবদ্ধ হতে প্রেরণা দেয়। কলকাতায় ফ্যাসিস্ট বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয় — যার মধ্যে সে যুগের অধিকাংশ লেখত ও শিল্পীরা এসেছিলেন। এই সংঘের গণনাট্য বিভাগ প্রকৃত পক্ষে পুরনো প্রগতি লেখক সংঘ, ইউথ কালচারাল ইনস্টিটিউট এবং ছাত্র ফেডারেশনের শিল্পগুণ সম্পন্ন কর্মীদের দ্বারা গঠিত। ছাত্র ফেডারেশনের সাংস্কৃতিক দল এবং ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী বিনয় রায় ইউথ কালচারাল ইনস্টিটিউট-এর সভ্যদের সাহায্যে গানের দল গঠন করেন। ১৯০৩-০৮ সালের স্বদেশী যুগে গানের যে ঐতিহ্য সৃষ্টি হয়েছিল — তাকে ভিত্তি করে রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ, নজরুলের গানের সঙ্গে গ্রাম ও শহরের তরুণ লেখকদের ফ্যাসিস্ট বিরোধী দেশপ্রেমের গান, একাঙ্ক নাটক এবং কবিতা আবৃত্তি জনসভার মঞ্চ থেকে শোনানো হতে লাগল। প্রায় এ ধরনের ঘটনা আসাম, যুক্তপ্রদেশ, পাঞ্জাব, মালাবার, অন্ধ্র ও বোম্বাইয়ে হতে থাকে — নিজ নিজ অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে। তারই ফলশ্রুতিতে বোম্বাই শহরে ১৯৪৩ সালের মে-জুন মাসে অনুষ্ঠিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম কংগ্রেসের প্রাক্কালে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সর্বভারতীয় সংগঠন তৈরী হয়।

লক্ষ্য করার বিষয় যে প্রগতি লেখক সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল — জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনের পাশে — কিন্তু গণনাট্য সংঘ সৃষ্টি হলো — ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি সম্মেলনের পাশে। তাছাড়া এই সংঘের প্রথম কার্যকরী সমিতিতে সংস্কারপন্থী শ্রমিক নেতা এন এম জোশী (সভাপতি) ছাড়া কমিউনিস্ট নেতা এস এ ডাঙ্গে, বঙ্কিম মুখার্জী, ছাত্র কমিউনিস্ট নেতা অরুণ বোস এবং প্রগতি লেখক সংঘের সম্পাদক কমিউনিস্ট নেতা সজ্জাদ জহীর ছিলেন যথাক্রমে ট্রেড ইউনিয়ন, কৃষক, ছাত্র ও লেখক সংঘের। প্রধান প্রধান নেতারা প্রথম সর্বভারতীয় কমিটিতে ছিলেন। অবশ্য প্রথম সর্বভারতীয় কমিটিতে ছিলেন। অবশ্য প্রথম সর্বভারতীয় কমিটেতে  খাজা আহমদ আব্বাস, মামা ওয়ারেরকর ও মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য প্রভৃতিও ছিলেন যাঁরা কখনো কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হননি। পরবর্তী সম্মেলনে সর্বভারতীয় কমিটিতে মহাকবি ভালাথল, রবিশঙ্কর, অধ্যাপক ধুর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, ডাঃ শওফৎউল্লা আনসারীর নাম পাওয়া যায় — যাঁদের মধ্যে রবিশঙ্কর সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সংগঠনের দৈনন্দিন কাজের দায়িত্ব কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরাই ছিলেন। ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী বিনয় রায় বাংলার জেলায় জেলায় ঘুরে গানের দল তৈরী করেছেন, মহা মন্বন্তরে পীড়িত বাংলার জন্য রিলিফ সংগ্রহে পাঞ্জাব-দিল্লি-আগ্রাতে সাংস্কৃতিক দল নিয়ে গেছেন — যাতে কবি হারীন চট্টোপাধ্যায়ও ছিলেন। পরে শম্ভু মিত্রকে নিয়ে অন্ধ্র, বোম্বাই ও গুজরাটে ‘ভয়েস অব বেঙ্গল’ নামে একটি প্রোগ্রামে একাংক, গান ও নাচের অনুষ্ঠান করেছেন। শম্ভু মিত্র তখনো কমিউনিস্ট হননি। কেরালাতে এ কে গোপালনের মত প্রথম সারির কমিউনিস্ট নেতা নাটকে অংশগ্রহণ করেছেন এবং ডা. গঙ্গাধর অধিকারীর মত কমিউনিস্ট তাত্ত্বিক গান বেঁধেছেন এবং তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কমিউনিস্ট আন্দোলনের দলিলগুলি সম্পাদনা করার সঙ্গে সঙ্গে সারা ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় লেখা গান সংগ্রহ করছিলেন — যে গানে জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামের কথা আছে। সে যুগের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক পি সি যোশী — এই আন্দোলন সম্পর্কে ব্যক্তিগত ভাবেও বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ইতিপূর্বে ভারতের ইতিহাসে কোন সংগঠিত রাজনৈতিক দল এমন আন্তরিকতার সঙ্গে সারা ভারতে সংস্কৃতি আন্দোলন গড়ে তুলতে অগ্রসর হয়নি-যদিও বহু শিল্পী ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেক প্রগতিশীল শিল্পকলা আন্দোলন করেছেন। গণনাট্য সংঘের প্রথম ঘোষণাপত্রে আছে অতীতের প্রগতিশীল ধারাকে অগ্রসর করা। সর্ববিধ কলার সঙ্গে সাধারণ মানুষের নিবিড় সংযোগ সাধন করা — অর্থাৎ শ্রমিক, কৃষক ও মধ্যবিত্তের মধ্যে যে সৃজন-প্রতিভা অবহেলিত তার স্ফূরণের ব্যবস্থা করা এবং সেই কাজে দর্শক ও স্রোতা এবং স্রষ্টাদের মধ্যে যে পার্থক্য আছে তা ঘুচিয়ে সমাজে পরিবর্তনে উভয়ের মধ্যে সক্রিয় সম্বন্ধ স্থাপন করা।

১৯৪২ থেকে ১৯৪৮-এর মধ্যে নাটকের ক্ষেত্রে মৃচ্ছকটিক, মুদ্রারাক্ষস, নীলদর্পণ, বুড়োশালিখের ঘাড়ে রোঁ, কুলীন কুলসর্বস্ব, কৃষ্ণকুমারী, চাকর দর্পণ, সুরেন্দ্র-বিনোদিনী, কফন থেকে আগুন, ল্যাবরিটরী, জবানবন্দী, নবান্ন, পথিক, ছেঁড়া তার, রক্তকরবী প্রভৃতি যে নাটকগুলির প্রদর্শন হয়েছে — তা গণনাট্য সংঘ বা এককালে তার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্বারাই হয়েছে। এক পয়সার ভেঁপু (জ্ঞান মজুমদার, অভিজিৎ, অনল, দিলীপ সেনগুপ্ত ও শম্ভু ভট্টাচার্য), রানার (শম্ভু ভট্টাচার্য) প্রভৃতি নৃত্যনাট্য উদয় শংকরের ঐতিহ্যকেই কেবল বাস্তবায়িত করেনি — তিনি নিজেও নামমাত্র প্রবেশমূল্যে বোম্বাইয়ের শ্রমিক দর্শকদের কাছে গণনাট্য সংঘের প্রয়োজনায় নাচ দেখিয়েছিলেন। ভারতের নৃত্যকলার ইতিহাসে এই ঘটনা অভূতপূর্ব। কেন্দ্রীয় ব্যালে স্কোয়াড কলকাতায় যখন প্রদর্শন করে তখন হরেন ঘোষের মত এই অনুষ্ঠানকে সফল করার জন্য সকলরকমে সাহায্য করেছেন এবং পণ্ডিচারী নিবাসী সঙ্গীতজ্ঞ দিলীপকুমার রায় একটি প্রবন্ধে উদয়শংকরের উত্তরসূরী হিসাবে গণনাট্য সংঘের কেন্দ্রীয় নাচের দলকে গণ্য করেন। উদয়শংকর প্রবর্তিত গণনাট্য সংঘের দিল্পী ও বাংলা শাখা ব্যবহার করে এবং ‘শহীদের ডাক’ মঞ্চস্থ দ্বারা বাংলার জেলায় জেলায় ঘুরে এই মাধ্যমটির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করে। এখানেও উদয়শংকর কেন্দ্রের অনাদি, ঘনশ্যাম ও পিনাকীর শিক্ষকতার সঙ্গে জ্ঞান মজুমদার ছিলেন — যাঁরা কোনদিন কমিউনিস্ট ছিলেন না। গণনাট্য সংঘের সাধারণ সম্পাদক খাজা আহমদ আব্বাসের পরিচালনায় চলচ্চিত্র ‘ধরতি কে লাল’, যাতে বলরাজ সাহনী, শম্ভু মিত্র ও তৃপ্তি মিত্র অভিনয় করেন, তার পরে গণনাট্য সংঘের অভিনেতা নিমাই ঘোষের ‘ছিন্নমূল’, গণনাট্য সংঘের ঋত্বিক ঘটক, মৃনাল সেন এবং সংঘের বিশেষ সমর্থক সত্যজিৎ রায় ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে যে পরিবর্তন আনলেন — তা নিশ্চয় প্রগতিশীল ধারাকে বেগবান করেছে। এমন কি ফিল্‌ম সোসাইটি আন্দোলন তৈরীর সূচনাতে গণনাট্য সংঘের কর্মী ও দরদীদের উদ্যোগ ছিল। বেতার, চলচ্চিত্র, গ্রামোফোনের রেকর্ড এবং মঞ্চ শিল্পীদের ট্রেড ইউনিয়ন গড়ার পিছনেও গণনাট্য সংঘের কর্মীদের প্রত্যক্ষ সংযোগ ছিল। এই দুটি ট্রেড ইউনিয়নে একমাত্র শিশিরকুমার ভাদুড়ি ছাড়া সকল শিল্পী ও চলচ্চিত্রের কলাকুশলী ছিলেন — যাঁদের মধ্যে প্রমথেশ বড়ুয়া ও দেবকীকুমার বোসের ক্রিয়াকলাপ প্রায় সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক নেতাদের মত হয়ে উঠেছিল। গণনাট্য সংঘের শেষ সর্বভারতীয় কমিটির সভাপতি নাট্যকার শচীন সেনগুপ্ত সুযোগ পেলেই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কোন কোন কাজকে প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন। কিন্তু তার জন্য দুই লক্ষের একত্র কাজ করতে কোন অসুবিধা হয়নি। বিখ্যাত চিত্র পরিচালক বিমল রায়ও শচীন সেনগুপ্তের আগে  ৫ বছর গণনাট্য সংঘের সর্বভারতীয় কমিটির সভাপতি ছিলেন — যেমন হেমন্ত মুখার্জী ছিলেন — কার্যকরী সমিতির সদস্য।

১৯৪৫ সালে মহম্মদ আলি পার্কে ফ্যাসিস্ট বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ এবং গণনাট্য সংঘের রাজ্য সম্মেলন হয় — নানা কারণে তা একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এই প্রথম শহরের খ্যাতনামা লেখক, শিল্পী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে গ্রামের কবিয়াল শেখ গোমানীকে সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য করা হয়। তারপর চট্টগ্রামের কবিয়াল রমেশ শীল ও গোমানীর কবির রলড়াই, রংপুরের অন্ধ দোতারা বাদক টগর অধিকারীর বাজনা, সিলেটের নির্মল চৌধুরী ও খালেদ চৌধুরী সম্প্রদায়ের লোকসঙ্গীত (হেমাঙ্গ বিশ্বাস এবং নির্মল চৌধুরী আসাম গণনাট্য সংঘের গোড়াপত্তন করেছেন) পরবর্তী যুগের ‘বঙ্গ সংস্কৃতি সন্মেলনের’ সূত্রপাত করে। পূর্ণ দাস ‘বঙ্গ সংস্কৃতি সন্মেলন’-এ কলকাতা এলেও তাঁকে সারা ভারতে পরিচয় ঘটায় গণনাট্য সংঘ। মালাবার, অন্ধ্র, আসাম, বোম্বাই, পাঞ্জাব ও উত্তর প্রদেশে লোককলার বহু শিল্পী এই যুগে কেবল নিজ নিজ রাজ্যে নয় — সারা ভারতে জনগণের সৃজনশীল প্রতিভার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রাখে। বোম্বাইয়ের দলিত শ্রেণী শ্রমিক শিল্পী আন্নাভাও সাথে, ওমর শেখ, পাঞ্জাবের সুবিন্দর কাউর, আসামের মঘাই ওঝা, মালাবারের কে এস জর্জ ও আম্মাই, অন্ধ্রের গোপাল কৃষ্ণায়া ও নাগভূষণ প্রভৃতি শিল্পীরা কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলন থেকে ন্জ রাজ্য ও অন্য রাজ্যে নিজেদের কৃতিত্ব দেখেয়েছেন। কলকাতাতেও গানের ব্যাপারে ইরসাদ, রহমান,দশরথ লালের সঙ্গে বিড়ি শ্রমিক গুরুদাস পাল — গান এবং গণনাট্য সংঘের প্রথম যাত্রাপালায় স্রষ্টা। পরবর্তী যুগে বীরু মুখোপাধ্যায় রচিত ‘রাহুমুক্ত’ যাত্রাও যাত্রা জগতে ঐতিহ্য সৃষ্টিকারী এবং এই দল থেকে জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায় ও নিবেদিতা দাসের মত শিল্পী আত্মপ্রকাশ করেন। দক্ষিণ কলকাতায় মুক্ত মঞ্চ সৃষ্টিতে নিবেদিতা দাসের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাঙালী পাঠকদের কথা মনে রেখে অন্য রাজ্যের বিবরণ সংক্ষেপ করতে হল।

মোটের ওপর ১৯৪৩ সাল থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত গণনাট্য সংঘ শিল্পকলা ক্ষেত্রে সারা ভারতে যে কাজ করেছে — তার আগে কোন বে-সরকারী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান তা করেছে — এমন সংবাদ নেই। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এই আন্দোলনের দৈনন্দিক কাজ চালাবার মত কর্মী দিয়েছে এবং মাঝে মাঝে কোন কোন নেতা পরামর্শও দিয়েছেন — কিন্তু কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্র আন্দোলনের পরিচালনায় পার্টি যে ধরনের সাংগঠনিক নেতৃত্ব দেয় — তেমন কোন নেতৃত্ব এই আন্দোলন সম্পর্কে দেয়নি। ফলে নাটক, সঙ্গীত, নৃত্য ও লোককলা সম্পর্কে যে তত্ত্বগত অনুসন্ধান, বিতর্ক এবং দিক্‌-নির্দেশনা — তা’ তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের মতামতের উপর নির্ভরশীল ছিল — সাংস্কৃতিক বিশয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার কোন সংঘঠিত চেষ্টা হয়নি।

১৯৪৮ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অতি বাম বিচ্যুতির ফলে পার্টির মধ্যে যে দ্বন্দ্ব শুরু হয় — তার প্রতিক্রিয়ায় পার্টির বাইরের পেশাদার শিল্পী, নাট্যকার, চলচ্চিত্র পরিচালকদের উপর নির্ভর করার প্রবণতা দেখা দেয়। ভারত সরকার সঙ্গীত নাটক একাডেমী গঠন করলে, সেই সংগঠন মারফৎ গণ সংস্কৃতি আন্দোলন প্রসার করার চিন্তাও শুরু হয়। ১৯৭৫ সালে গণনাট্য সংঘের শেষ সর্বভারতীয় সম্মেলনের আগেই গণনাট্য সংঘ তুলে দেওয়া বা তার মধ্যে যে সকল সর্বক্ষণের কর্মী ছিল — তাদের পরিবর্তে অবসর সময়ে কাজ করতে পারে এমনি কর্মী সংগ্রহের কথা ভাবা হতে থাকে। কিন্তু উক্ত সম্মেলনে সারা ভারতের শিল্পী সমাবেশ, রাষ্ট্রপতি রাজ্যন্দ্র প্রসাদের শুভেচ্ছা এবং উপরাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণাণের ভাষণ সাংগঠনিক ভাবে সংঘকে আরো কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখলেও ১৯৬২-৬৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরীণ বিরোধ তার সর্বভারতীয় ক্রিয়াকর্ম বন্ধ করে দেয়।

কিন্তু একটা আদর্শ যদি জনগণের ন্যায্য অভাবকে দূর করার প্রকৃত পথ নির্দেশ করে — তাহলে জনগণ সে আদর্শকে ত্যাগ করে না। গণনাট্য আন্দোলন ভারতের গণতান্ত্রিক বিকাশের আন্দোলনের অংশ। তাই সারা ভারতের নানা জায়গায় কোথাও গণনাট্য, কোথাও প্রজা নাট্য মণ্ডলী বা কোথাও অন্য কোন নামে সেই আদর্শ কাজ করে গেছে। আর গণনাট্য আন্দোলন তো কেবল নাটক নিয়ে নয় — নৃত্য, গীত, নাটকাভিনয়, লোককলা, চলচ্চিত্র প্রভৃতি নিয়ে গণনাট্য। দারিদ্র্য পীড়িত, নিরক্ষর, মধ্যযুগীয় কুসংস্কারের সঙ্গে তথাকথিত ধর্ম, সম্প্রদায় ও অঞ্চলগত সংকীর্ণতায় বিচ্ছিন্ন ভারতবাসীর কাছে ব্যবসায়ী অপসমস্কৃতি এবং সরকারী কলা কৈবল্যবাদী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে গণনাট্য আন্দোলন নতুন পরিণতির জন্য অপেক্ষমাণ।


আপনার মতামত লিখুন :

One response to “গণনাট্য আন্দোলন ও তার পরিণতি : স্বর্ণাভা কাঁড়ার”

  1. SUBIR BANERJEE says:

    1948 সাল থেকে 1964 সাল পর্যন্ত গণনাট্য সংঘের কার্যক্রমের কোনো চিত্র পাওয়া গেল না। পরবর্তী সময়ে নথিসহ লেখা পাঠানোর অঙ্গীকারবদ্ধ হলাম।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ১৪৩১ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন