| | |
এই মুহূর্তে ::
কলকাতায় এমন দুর্গাপুজো দেখিনি তো আগে : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ওঝা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নিখোঁজের দর্শক সংখ্যা’ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘সর্বংসহা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯১/২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাজারাজড়া ও বণিকের দুর্গাপূজায় নিম্নবর্গ ছিল রবাহূত : অসিত দাস প্রজনন অধিকার নিশ্চিত হলেই সুস্থ্য বাংলাদেশ গড়া সম্ভব : নিকোলাস বিশ্বাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯১/১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘জলের অক্ষর’ কতো বড়ো বড়ো পুজোরে বাবা… : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নবপত্রিকা: দুর্গাপূজার অন্তরালে শস্যদেবী ও প্রকৃতির আরাধনা : যশোবন্ত রায় মন্ত্র ভুল বললেও কোনও অসুবিধে নেই… নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সিংহবাহিনী দুর্গা মৃগবাহিনীও : শ্যামলকান্তি চক্রবর্তী দেবদেবীর পূজায় দুর্বার প্রয়োজন কেন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সাহিত্যে নোবেলজয়ী অ্যান কারসন-এর শব্দের ব্যুৎপত্তির ধারণা : অসিত দাস মিয়ানমার সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন কানাডার কবি অ্যান কারসন : অসিত দাস পেজফোরনিউজ-এর শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ প্রকাশিত হল ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই পিতৃ পক্ষের শেষ, মাতৃপক্ষের সূচনা শুভ মহালয়ার আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com, আমাদের পোর্টালের কিছু ছবি বাদে প্রায় সব ছবিই অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। কারুর যদি কপিরাইট থাকে জানাবেন। আমরা সেই ছবি পোর্টাল থেকে ডিলিট করে দেব।

অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নিখোঁজের দর্শক সংখ্যা’

Reporter
অয়ন মুখোপাধ্যায় / ৮৮ Views জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬

অষ্টমীর রাতে ঠিক নটা বেজে সাত মিনিটে লোকটা আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। বলল, ‘আমার মাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। প্লিজ, যেকোনো উপায়ে আমার মাকে খুঁজে দিন। মা আমাকে চিনতে পর্যন্ত পারেন না।’

কথাটা বলেই সে কাঁদতে শুরু করল। এমন কান্না সাধারণত সিনেমায় দেখা যায়। প্রথমে দুটো চোখ ভিজল, তারপর ঠোঁট কাঁপল, শেষে দুই হাতে মুখ ঢেকে ফেলল। পুজোমণ্ডপের বাইরে তখন ঢাক বাজছে। ধুনোর ধোঁয়া উড়ে এসে আলোর মালায় আটকে যাচ্ছে। একচালা প্রতিমার সামনে অঞ্জলি দেওয়ার ভিড় সবে পাতলা হয়েছে। ফুচকার দোকানে মেয়েদের লাইন। সেই ভিড়ের মধ্যে বছর বত্রিশের একটা ছেলে আমার পা ধরে কাঁদছে। কিন্তু তার জামার কলারে ছোট্ট একটা কালো মাইক্রোফোন আটকানো।

পুজো কমিটির পক্ষ থেকে মাইকে ঘোষণা করার এবং দর্শনার্থীদের নানা বিষয়ের খোঁজখবর নেওয়ার কাজটা সেদিন আমার উপরেই পড়েছিল। মণ্ডপের পাশেই আমাদের একটা টেবিল। সেখানে ঘোষণার খাতা, মাইক্রোফোন আর কয়েকটা চেয়ার রাখা। ছেলেটাকে তুলে বসালাম। নাম অদ্রিশ সেন। তার মা ইলাবতী সেন, বয়স আটষট্টি। পরনে নীল পাড় সাদা শাড়ি, কাঁধে বাদামি ব্যাগ। আধঘণ্টা আগে মণ্ডপের সামনে থেকে হারিয়ে গেছেন।

‘আপনার মা কি আগে কখনও এভাবে হারিয়েছেন?’

অদ্রিশ মাথা নাড়ল। তারপর জানাল, মায়ের স্মৃতিশক্তির অসুখ আছে। মাঝেমধ্যে নিজের বাড়িটাকেও চিনতে পারেন না। ছেলেকেও চিনতে ভুল করেন। কথাগুলো বলতে বলতে সে বারবার মোবাইলের পর্দায় তাকাচ্ছিল। একসময় লক্ষ করলাম, সেখানে তার নিজের মুখ দেখা যাচ্ছে। অদ্রিশ সমাজমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করছে। আমাকে তাকাতে দেখে ফোনটা উল্টে রাখল।

‘আমার পেজে অনেক মানুষ আছেন। সবাই মাকে খুঁজতে সাহায্য করবেন।’

আমি আর কথা বাড়ালাম না। মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বৃদ্ধার নাম, বয়স, পোশাকের বিবরণসহ ঘোষণা করতে থাকলাম। কেউ তাঁর সন্ধান পেলে অতিসত্বর যেন পুজো কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করেন, সে কথাও জানালাম। অদ্রিশ হঠাৎ আমার হাত চেপে ধরল।

‘একটা কথা। মাকে নদীর দিকে যেতে দেবেন না। জল দেখলে উনি নদীর ঘাটে চলে যান।’

আমাদের মণ্ডপ থেকে গঙ্গার ঘাট দশ মিনিটের রাস্তা। আমি সঙ্গে সঙ্গে দুজন স্বেচ্ছাসেবককে সেদিকে পাঠালাম।

আধঘণ্টার মধ্যে গোটা পাড়ায় খবর ছড়িয়ে পড়ল। কেউ বলল, বৃদ্ধাকে অটোয় উঠতে দেখেছেন। কেউ বলল, নদীর ধারে এক মহিলা একা একা বসে কাঁদছিলেন। অদ্রিশ ততক্ষণে আবার ফোন নিয়ে বসেছে। তার কান্নার ভিডিও ঘুরছে। পর্দার নীচে অসংখ্য মন্তব্য। কেউ লিখছে, ‘মাকে ফিরিয়ে দাও মা দুর্গা।’ কেউ জানাচ্ছে, ছেলেটির কান্না দেখে সে-ও কাঁদছে।

আমাদের স্বেচ্ছাসেবক রক্তিম এসে কানে কানে বলল, ‘দাদা, একটা জিনিস দেখবেন?’

মণ্ডপের পিছনে পুজো কমিটির অস্থায়ী অফিসে সিসিটিভির পর্দা। আটটা বত্রিশ মিনিটের ছবিতে দেখা গেল, ইলাবতী সেন মণ্ডপের বাঁদিকের গেট দিয়ে বেরোচ্ছেন। পাশে লাল শাড়ি পরা এক মহিলা। মহিলা তাঁর হাত ধরে কিছু একটা বললেন। তারপর দুজনে গলির দিকে চলে গেলেন। একবারও পিছনে তাকালেন না ইলাবতী।

অদ্রিশকে ফুটেজ দেখাতেই সে চেঁচিয়ে উঠল, ‘এই মহিলা! এই মহিলাই মাকে নিয়ে গেছে!’

‘চেনেন ওঁকে?’

‘জীবনে দেখিনি। আপনারা পুলিশ ডাকুন।’

আমরা থানায় খবর দিলাম। রক্তিম গলির মুখে লোক পাঠাল। আমি অদ্রিশকে জল দিলাম। সে এক চুমুক খেয়ে বোতলটা নামিয়ে রাখল। তার আঙুল তখনও কাঁপছে। তবে অদ্ভুত ব্যাপার, ফোনে যখনই কোনও বার্তা আসছে, আঙুলের কাঁপুনি থেমে যাচ্ছে। সে মন দিয়ে বার্তাটা পড়ছে, উত্তর দিচ্ছে, তারপর আবার চোখ মুছছে।

রাত সাড়ে নটায় কাছের ওষুধের দোকান থেকে ফোন এল। দোকানের মালিক জানালেন, নীল পাড় সাদা শাড়ি পরা এক বৃদ্ধাকে পুরনো পদ্মা টেলার্সের ঘরে ঢুকতে দেখেছেন। সঙ্গে আরেকজন মহিলা।

পদ্মা টেলার্স পাঁচ বছর ধরে বন্ধ। মালিক মারা যাওয়ার পর তাঁর মেয়ে মাঝেমধ্যে দোকান খুলে কাপড়ের ব্যবসা করেন। মণ্ডপ থেকে গলিটা বেশি দূরে নয়। অদ্রিশ খবর শুনেই ছুটতে গেল। তাকে থামিয়ে বললাম, ‘পুলিশ আসছে। আমরা আগে দেখে আসি।’

‘আমার মা, আর আমিই যেতে পারব না?’

তার চোখে এমন অসহায় দৃষ্টি ফুটে উঠল যে তাকে আর বাধা দিতে পারলাম না।

তিনজনে গলিতে ঢুকলাম। পুজোর আলোর শেষ প্রান্তে অন্ধকার জমে আছে। নর্দমার ধারে রঙিন কাগজের টুকরো। ভাঙা পাঁচিলের উপর একটা বেড়াল বসে। দূর থেকে ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসছে। পদ্মা টেলার্সের শাটার অর্ধেক নামানো। অদ্রিশ গিয়ে ধাক্কা দিল।

‘মা! মা, আমি এসেছি!’

ভিতর থেকে কোনও সাড়া এল না। আমি পরিচয় দিয়ে ডাকতেই শাটার উঠল। সিসিটিভিতে দেখা লাল শাড়ির মহিলাটি সামনে দাঁড়িয়ে।

অদ্রিশ তাঁকে ঠেলে ভিতরে ঢুকতে গেল। মহিলা পথ আটকালেন।

‘আপনি ঢুকবেন না।’

‘আমার মা কোথায়?’

‘উনি এখানেই আছেন।’

‘তাহলে সরুন।’

লোকটা তাঁর হাত ধরে টানতেই ভিতর থেকে গলা এল, ‘ঊর্মি, ওকে আসতে দে।’

কাপড়ের বস্তার পাশে কাঠের চেয়ারে ইলাবতী সেন বসে আছেন। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। কোলের উপর বাদামি ব্যাগ। তিনি কাগজে মোড়া একটা সিঙাড়া খাচ্ছেন। আমাদের দেখে শেষ টুকরোটা মুখে পুরলেন। তারপর বোতল খুলে জল খেলেন।

অদ্রিশ ছুটে গেল।

‘মা! তুমি এখানে? আমরা পাগলের মতো খুঁজছি!’

ইলাবতী ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী রে, কান্নার দৃশ্যটা শেষ হয়েছে?’

অদ্রিশ থমকে গেল। আমিও কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলাম।

অদ্রিশ বলল, ‘মা, তুমি কী বলছ?’

‘আজ কতজন দেখল?’

‘কী?’

‘তোর কান্না। কতজন দেখল?’

অদ্রিশ আমার দিকে তাকাল। বলল, ‘দেখলেন? মা মাঝেমধ্যে এই রকম উল্টোপাল্টা কথা বলেন।’

ইলাবতী হাসলেন। তারপর বাদামি ব্যাগ থেকে একটা মোটা খাতা বার করলেন। মলাটে ইংরেজিতে লেখা, Content Plan। খাতাটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘একটু পড়ুন।’

প্রথম পাতায় বিভিন্ন তারিখের পাশে কয়েকটা শিরোনাম। ‘মা নিজের জন্মদিন ভুলে গেলেন।’ ‘মা আজ আমাকে চিনতে পারলেন না।’ ‘মায়ের শেষ ইচ্ছা।’ প্রতিটি শিরোনামের পাশে শুটিংয়ের সময়, সম্ভাব্য দর্শকসংখ্যা, বিজ্ঞাপনদাতার নাম। শেষের দিকে একটা পাতায় লাল কালিতে লেখা—

‘পর্ব ১৪। মহাষ্টমীর রাতে মা নিখোঁজ।’

তার নীচে নির্দেশ। আটটা বত্রিশে মা বাঁদিকের গেট দিয়ে বেরোবেন। নটা পাঁচে ছেলে পুজো কমিটির নিরুদ্দেশ সংক্রান্ত ঘোষণা করার অফিসে যাবে। প্রথমে স্বাভাবিক কথা, তারপর কান্না। নটা চল্লিশে পুনর্মিলন। শেষে মাকে জড়িয়ে ধরে সংলাপ—‘তোমাকে আর কখনও হারাতে দেব না।’

আমি ঘড়ি দেখলাম। নটা আটত্রিশ।

অদ্রিশ আমার হাত থেকে খাতাটা ছিনিয়ে নিতে গেল। ইলাবতী বললেন, ‘ছিঁড়িস না। আরেকটা কপি ঊর্মির কাছে আছে।’

ছেলেটা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। কয়েক মুহূর্ত আগে যে মানুষটা নিজের মাকে হারিয়ে পাগলের মতো কাঁদছিল, সে এখন খাতার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে জল নেই।

‘তুই বাড়ি যাবি?’ ইলাবতী জিজ্ঞেস করলেন।

অদ্রিশ গলা নামিয়ে বলল, ‘বাড়িতে কথা বলব।’

‘কেন? এখানে কথা বলতে অসুবিধে কী?’

‘এত লোকের সামনে?’

‘ক্যামেরার সামনে তো আমার সব কথা বলিয়েছিস। আজ ক্যামেরা ছাড়া দুটো কথা বল।’

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার সত্যিই স্মৃতিশক্তির কোনও অসুখ নেই?’

ইলাবতী বললেন, ‘আমার বয়স হয়েছে। চশমা কোথায় রেখেছি ভুলে যাই। বাজারে গিয়ে মাঝেমধ্যে একটা জিনিস না কিনেই ফিরি। তাই বলে নিজের ছেলেকে চিনতে পারব না?’

অদ্রিশ এবার উত্তেজিত হয়ে উঠল। ‘তুমি নিজেই তো রাজি হয়েছিলে!’

‘হয়েছিলাম। তোর চাকরিটা চলে যাওয়ার পরে। প্রথমে রান্নার ভিডিও করতাম। তারপর একদিন তুই বললি, আমি তোকে চিনতে পারছি না। আমাকে শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে হবে। আমি অভিনয় করলাম। ভিডিওটা খুব চলল। তারপর থেকে রোজ আমার একটা একটা করে অসুখ বাড়তে লাগল।’

ইলাবতী একটু থামলেন। তাঁর গলার স্বর আস্তে আস্তে বদলে গেল।

‘সাঁইত্রিশ বছর স্কুলে পড়িয়েছি। কত ছেলেমেয়ের নাম মনে আছে এখনও। অথচ তোর ভিডিওতে আমি নিজের নামটাও বলতে পারি না। সেদিন বাজারে আমার এক ছাত্রী দেখা করে বলল, দিদিমণি, আপনি আমাকে চিনতে পারছেন? মেয়েটা কাঁদছিল। আমি ওর নাম ধরে ডাকতেই অবাক হয়ে গেল। তখন বুঝলাম, তুই আমার সঙ্গে কী করছিস।’

অদ্রিশ বলল, ‘মা, তুমি ভুল বুঝছ। বাস্তবটা বোঝো। ওই টাকায় সংসার চলে, মা। ক্যামেরা, এডিটিং, বিজ্ঞাপন—কত খরচ জানো?’

‘জানি। তাই বলে আমার নামে ডাক্তারি রিপোর্ট বানাবি?’

এবার অদ্রিশের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

ইলাবতীর পাশে দাঁড়ানো মহিলার নাম ঊর্মিমালা দে। পদ্মা টেলার্স তাঁর বাবার দোকান। ছোটবেলা থেকে ইলাবতীকে চেনেন। তিনি ব্যাগ থেকে কয়েকটা কাগজ বার করলেন। তার মধ্যে একটি চিকিৎসকের রিপোর্টের ফটোকপি। রিপোর্টে লেখা, ইলাবতীর স্মৃতিশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও তাঁর নেই।

ঊর্মিমালা বললেন, ‘আমরা ক্লিনিকে গিয়ে খোঁজ নিয়েছি। রিপোর্টে যে ডাক্তারের নাম আছে, তিনি এই মহিলাকে কোনও দিন দেখেননি। তাঁর রেজিস্ট্রেশন নম্বরটাও মেলেনি।’

অদ্রিশ এবার চেয়ারে বসে পড়ল। দীর্ঘক্ষণ চুপ থাকার পরে বলল, ‘আমি মায়ের ভালোর জন্যই সব করেছি।’

ইলাবতী ব্যাগ থেকে আরেকটা কাগজ বার করলেন। শহরের বাইরে একটা বৃদ্ধাবাসের ভর্তি-সংক্রান্ত আবেদনপত্র। সেখানে তাঁর নাম, বয়স, অসুখের বিবরণ লেখা। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জায়গায় অদ্রিশের নম্বর। আবেদনপত্রে ইলাবতীর সম্মতির স্বাক্ষরও আছে।

‘এই সইটা কিন্তু আমার নয়,’ ইলাবতী বললেন। ‘আমাকে বলেছিলি, পুজোর পরে বেড়াতে নিয়ে যাবি। কোথায় নিয়ে যাবি, সেটা আমি নিজেই খুঁজে বার করেছি।’

অদ্রিশ মুখ তুলল না।

‘সেখানে আমাকে রেখে তুই ভিডিও করবি, তাই তো? বলবি, মায়ের চিকিৎসার জন্য টাকা দরকার। গত সপ্তাহে যে লোকটাকে নিয়ে এসেছিলি, সে আমাকে বলে গেছে, পুজোর রাতে পুলিশের সামনে কাঁদতে হবে। তাতে নাকি লোক বেশি দেখবে।’

আমার মনে পড়ল, অদ্রিশই প্রথম পুলিশ ডাকতে বলেছিল।

ইলাবতী এবার আমার দিকে ফিরলেন। ‘আজ সকালে আমি ঊর্মিকে ফোন করি। ওকে সব বলি। ছেলে আটটা বত্রিশে বেরোতে বলেছিল। আমি ঠিক সময়েই বেরিয়েছি। তবে যেখানে দাঁড়িয়ে থাকার কথা ছিল, সেখানে যাইনি। ঊর্মির সঙ্গে এখানে চলে এসেছি।’

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি আগে থেকে সব জানতেন?’

‘জানতাম। তিন বছর ধরে অভিনয় করছি। সংলাপ মুখস্থ করতে আমার কোনও দিন অসুবিধে হয়নি।’

কথাটা শুনে অদ্রিশ একবার মায়ের দিকে তাকাল। তারপর হঠাৎ তাঁর পায়ের কাছে বসে পড়ল।

‘মা, ভুল করেছি। চলো বাড়ি যাই। সব বন্ধ করে দেব।’

ইলাবতী ছেলের মাথায় হাত রাখলেন। চুলগুলো সরিয়ে দিলেন কপাল থেকে। অদ্রিশ তাঁর হাঁটু জড়িয়ে ধরল। ঘরের মধ্যে কিছুক্ষণ কারও কথা শোনা গেল না। বাইরে তখন আরতির ঢাক শুরু হয়েছে।

ঠিক সেই সময় অদ্রিশের ফোন বেজে উঠল।

পর্দায় নাম ফুটে উঠেছে—‘দিব্যেন্দু এডিট’।

সে ফোনটা কেটে দিল। আবার বাজল। ইলাবতী বললেন, ‘ধর। সময় হয়ে গেছে।’

অদ্রিশ ফোন ধরল না।

আমার মোবাইলে রক্তিম একটা ভিডিও পাঠিয়েছে। সঙ্গে লিখেছে, ‘দাদা, দেখুন!’

ভিডিওর শুরুতে আমাদের পুজোমণ্ডপ। তারপর দেখা যাচ্ছে, অদ্রিশ দৌড়ে এসে এক বৃদ্ধাকে জড়িয়ে ধরছে। মহিলার পরনে নীল পাড় সাদা শাড়ি। মুখটা ছেলের কাঁধে ঢাকা। অদ্রিশ কাঁদতে কাঁদতে বলছে, ‘তোমাকে আর কখনও হারাতে দেব না, মা।’

ভিডিওর নীচে শিরোনাম—‘মহাষ্টমীর রাতে মাকে ফিরে পেলাম।’

আমি হতবাক হয়ে ফোনটা নামালাম। ইলাবতী তখনও আমার সামনে বসে আছেন। তাঁর গায়ে সেই একই শাড়ি। কাঁধের পাশে ব্যাগ।

‘এটা কখন তুলেছেন?’ অদ্রিশকে জিজ্ঞেস করলাম।

কোনও উত্তর নেই।

ঊর্মিমালা বললেন, ‘বিকেলে মহড়া হয়েছে। আরেকজন মহিলাকে মাসিমার শাড়ি পরিয়ে রেখেছিল। পিছন থেকে মুখ বোঝা যায় না।’

এবার বুঝলাম, অদ্রিশ পুনর্মিলনের দৃশ্যটাও আগেই তুলে রেখেছে। তার মা সত্যিই ফিরে আসুন বা না আসুন, নটা চল্লিশে দর্শক তাঁকে ফিরে পাবেন। সেই ব্যবস্থা পাকা।

ইলাবতী ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার বদলি মাও জোগাড় করে ফেলেছিস?’

অদ্রিশ এবার আর কোনও উত্তর দিতে পারল না।

আমি ফোনে দেখলাম, ভিডিওর দর্শকসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। একের পর এক মন্তব্য আসছে। কত মানুষ লিখছেন, ‘মা দুর্গা সহায় হয়েছেন।’ কেউ বলছেন, এমন ছেলে ঘরে ঘরে জন্মাক। কেউ আবার নিজের মায়ের সঙ্গে কাটানো পুরনো দিনের কথা লিখছেন। মানুষের ভালোবাসায় ভরে যাচ্ছে একটা সাজানো দৃশ্য।

বাইরে পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। আমরা সবাই বেরিয়ে এলাম। ইলাবতী পুলিশকে জানালেন, তাঁকে কেউ অপহরণ করেনি। তবে তাঁর নামে তৈরি কাগজগুলো নিয়ে তিনি অভিযোগ করতে চান। ঊর্মিমালা তাঁর পাশে দাঁড়ালেন।

অদ্রিশ বলল, ‘মা, তুমি সত্যিই আমার বিরুদ্ধে যাবে?’

ইলাবতী শান্ত গলায় বললেন, ‘কাল থানায় যাব। আজ পুজোটা দেখি।’

‘তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে?’

‘আজ ঊর্মির কাছে থাকব। কাল তোর সঙ্গে কথা হবে।’

তারপর একটু থেমে বললেন, ‘আর একটা কথা। আমার জন্য কাঁদতে ইচ্ছে করলে কাঁদিস। কিন্তু ফোনটা বন্ধ করে।’

পুজোমণ্ডপের সামনে এসে ইলাবতী থামলেন। তখন প্রতিমার সামনে ভিড় কমে গেছে। পুরোহিত প্রদীপ সাজাচ্ছেন। ইলাবতী ব্যাগ থেকে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট বার করে প্রণামির থালায় রাখলেন। হাতজোড় করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই, তিনি দেবীর কাছে কী চাইছেন।

বেরিয়ে এসে বললেন, ‘আপনাদের নিরুদ্দেশ সংক্রান্ত ঘোষণার খাতায় আমার নামটা কেটে দেবেন। আমি হারাইনি।’

আমি পুজো কমিটির টেবিলে ফিরে এলাম। খাতার পাতায় তখনও লেখা—ইলাবতী সেন, বয়স আটষট্টি। নিখোঁজের খবর দিয়েছেন পুত্র অদ্রিশ সেন।

নামের উপর কলম ধরতেই রক্তিম বলল, ‘দাদা, একটা জিনিস লক্ষ করেছেন?’

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী?’

রক্তিম বলল, ‘ভিডিওটা লক্ষ লক্ষ লোক দেখে ফেলেছে। সবাই লিখছে, ছেলেটা মাকে ফিরে পেয়েছে।’

আমি ফোনে আবার ভিডিওটা চালালাম।

অদ্রিশ মাকে জড়িয়ে কাঁদছে। পিছনে ঢাক বাজছে। বৃদ্ধার মাথায় ছেলের হাত। শেষ দৃশ্যে অদ্রিশ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলছে, ‘মাকে কখনও একা ছেড়ে দেবেন না।’

আমি খাতা বন্ধ করলাম।

মণ্ডপের বাইরে তখন ঊর্মিমালার সঙ্গে ইলাবতী বাদামভাজা কিনছিলেন। বাদামওয়ালা তাঁকে দেখে হেসে বলল, ‘দিদিমণি, আমাকে চিনতে পারছেন?’

ইলাবতী বললেন, ‘তুই নারায়ণের ছেলে না? আগে তোর বাবাই এখানে বসত।’

লোকটা অবাক হয়ে হাসল।

‘ঠিক ধরেছেন দিদিমণি। নুন দেব?’

‘দে। তবে বেশি নয়। তোর বাবা বাদামে একটু বেশি নুন দিত।’

ইলাবতী পয়সা মিটিয়ে ঠোঙাটা হাতে নিলেন। ঊর্মিমালার সঙ্গে কথা বলতে বলতে পুজোর ভিড়ে মিশে গেলেন।

অদ্রিশের ভিডিওতে তখনও মা তাঁর বুকে মুখ গুঁজে কাঁদছেন।

সেই রাতে ইলাবতী সেনকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। অথচ পর্দার ভিতরে তাঁর জায়গাটা চিরকালের মতো দখল করে নিয়েছিল অন্য একজন। লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই মুখটিকেই ভালোবাসছিলেন। আমার শুধু মনে হচ্ছিল, মানুষকে অদৃশ্য করতে এখন আর অন্ধকারের প্রয়োজন হয় না। যথেষ্ট আলো আর কয়েক লক্ষ দর্শক থাকলেই চলে।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ-এর নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev