| | |
এই মুহূর্তে ::
কলকাতায় এমন দুর্গাপুজো দেখিনি তো আগে : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ওঝা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নিখোঁজের দর্শক সংখ্যা’ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘সর্বংসহা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯১/২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাজারাজড়া ও বণিকের দুর্গাপূজায় নিম্নবর্গ ছিল রবাহূত : অসিত দাস প্রজনন অধিকার নিশ্চিত হলেই সুস্থ্য বাংলাদেশ গড়া সম্ভব : নিকোলাস বিশ্বাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯১/১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘জলের অক্ষর’ কতো বড়ো বড়ো পুজোরে বাবা… : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নবপত্রিকা: দুর্গাপূজার অন্তরালে শস্যদেবী ও প্রকৃতির আরাধনা : যশোবন্ত রায় মন্ত্র ভুল বললেও কোনও অসুবিধে নেই… নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সিংহবাহিনী দুর্গা মৃগবাহিনীও : শ্যামলকান্তি চক্রবর্তী দেবদেবীর পূজায় দুর্বার প্রয়োজন কেন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সাহিত্যে নোবেলজয়ী অ্যান কারসন-এর শব্দের ব্যুৎপত্তির ধারণা : অসিত দাস মিয়ানমার সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন কানাডার কবি অ্যান কারসন : অসিত দাস পেজফোরনিউজ-এর শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ প্রকাশিত হল ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই পিতৃ পক্ষের শেষ, মাতৃপক্ষের সূচনা শুভ মহালয়ার আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com, আমাদের পোর্টালের কিছু ছবি বাদে প্রায় সব ছবিই অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। কারুর যদি কপিরাইট থাকে জানাবেন। আমরা সেই ছবি পোর্টাল থেকে ডিলিট করে দেব।

বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ওঝা’

Reporter
বিশ্বজিৎ মণ্ডল / ৮৩ Views জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬

লালসালুর মানুষ

ঝাঁঝা প্রতাপপুরে সুনীল ওঝাকে চেনে না — এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন।

প্রতাপপুরের সীমানা ছাড়িয়ে রুকুনপুর, মাগুরা, লস্করপুর, আমতলা, হরিহরপাড়া — আরও কত গ্রাম। কোথাও সাপ দেখা দিলে, কারও শরীর হঠাৎ কাঁপতে শুরু করলে, কিংবা কোনও বাড়িতে অদ্ভুত কিছু ঘটলে, খবর পৌঁছে যায় সুনীলের কাছে।

ছাপ্পান্ন বছরের সুনীলের চেহারায় একটা অদ্ভুত গাম্ভীর্য। তেলচিকচিকে শরীর। কপালে মোটা করে সিঁদুর। গায়ে প্রায় সবসময় লালসালু। গলায় তাবিজ-কবচের গোছা। হাতে পুরনো একটি ঝোলা।

তবে আশ্চর্যের বিষয়, সুনীলের বাপ-ঠাকুরদা কেউ ওঝা ছিলেন না।

ঝাঁঝা প্রতাপপুরের হরিপদ নাপিত ছিলেন তার বাবা।

আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগে সুনীলও বাবার সঙ্গে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে চুল কাটত। তারপর একদিন হঠাৎ সে কেরালায় কাজ করতে যাবে বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।

ফিরেছিল আট বছর পর। কিন্তু তখন সে আর আগের সুনীল নয়।

লালসালু গায়ে দিয়ে সে বলেছিল, “মানুষের বিপদ কাটানোর বিদ্যা শিখেছি। সংসারের অশুভ শক্তিকে নাশ করতে জানি আমি। “

কোথায় শিখেছে? কার কাছে শিখেছে? কীভাবে শিখেছে?

কেউ জানত না।

প্রথম দিকে লোকজন হাসত। কিন্তু এক-দু’টি ঘটনায় কাকতালীয়ভাবে তার কথার সঙ্গে ফল মিলে যাওয়ার পর মানুষের বিশ্বাস জন্মাতে বেশি সময় লাগেনি।

বিশ্বাস একবার জন্মালে তার পেছনে যুক্তি হাঁটে না।

সুনীলের ক্ষেত্রেও তাই হল।

তার উঠোনে ভিড় বাড়তে লাগল।

তাবিজ। কবচ। মন্ত্রপড়া জল। নানা রকম ঝাড়ফুঁক।

সাপের কামড়? সেটা হলে সুনীলের ডাক পড়ত সবার আগে।

এই কারণেই গ্রামের মানুষ তাকে শুধু ওঝা বলত না।

বলত — “সুনীল ওঝা।” যেন ‘ওঝা’ তার পদবি।

কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে সুনীলকে নিয়ে প্রতাপপুরে একটা অদ্ভুত কথা ছড়িয়েছিল।

কেউ জানত না কথাটা কে প্রথম বলেছিল। শুধু শোনা যাচ্ছিল — রাতের বেলা নাকি সুনীলের বাড়িতে দুজন অচেনা লোক আসে। তারা নাকি সাপ ধরে।

যে ছেলেটা হারিয়ে গিয়েছিল

সুনীলের অতীত নিয়ে প্রতাপপুরে গল্পের শেষ নেই।

কিন্তু সত্যিটা জানতেন খুব কম মানুষ।

সুনীলের শৈশব কেটেছিল অভাবের মধ্যে।

হরিপদ নাপিতের সংসারে সন্তান ছিল অনেক। পাড়ায় পাড়ায় চুল কেটে যে সামান্য মজুরি পাওয়া যেত, তাতে সংসারের পেট ভরানোই কঠিন ছিল।

সুনীল তখন বুঝত না দারিদ্র্য কী।

শুধু বুঝত — কেন পাশের বাড়ির ছেলেটার নতুন জামা হয়,  তার হয় না।

কেন পুজোর সময় অন্যরা মাংস খায়, তাদের বাড়িতে আলু সেদ্ধ দিয়ে ভাত হয়।

বাবার সঙ্গে চুল কাটতে গিয়ে একদিন সে বলেছিল,

— “বাবা, তুমি সারাজীবন এই কাজই করবা ?”

হরিপদ ক্ষুরে ধার দিতে দিতে বলেছিলেন,

— “আমাদের কপালে আর কী আছে রে?”

কথাটা সুনীলের মনে গেঁথে গিয়েছিল।

আঠারো বছর বয়সে সে ঘোষণা করল, — “আমি কেরালা যাব।”

হরিপদ অবাক হয়েছিলেন।

— “কী কাজ করবি?”

— “যে কাজ পাব।”

— “চেনাশোনা আছে?”

— “আছে।”

সত্যি কি ছিল? কেউ জানে না।

এক ভোরে সুনীল বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল। তারপর আর কোন সন্ধান নেই। না কোন চিঠিপত্র, না কোন ফোনে যোগাযোগ।

তারপর আট বছর কোনও খবর নেই।

হরিপদ বহুদিন অপেক্ষা করেছিলেন। পরে তিনিও মারা গেলেন।

তারও কিছুদিন পর সুনীল ফিরল।

ফেরার সময় তার গায়ে লালসালু। কপালে সিঁদুর। হাতে ঝোলা।

সে শুধু বলেছিল, — “অনেক কিছু শিখেছি।”

কী শিখেছে, জানতে চাইলে সে হেসেছিল, “সব কথা সবাইকে বলতে নেই।”

সেই একটি বাক্যই যেন তার চারপাশে রহস্যের প্রথম দেওয়াল তুলে দিয়েছিল।

তারপর ধীরে ধীরে সে ওঝা হয়ে উঠল।

কিন্তু গ্রামের বৃদ্ধ নিবারণ ঘোষের মনে একটা প্রশ্ন থেকেই গিয়েছিল।

সুনীল যদি সত্যিই এত বড় ওঝা হয়, তবে তার বিদ্যার গুরু কে?

কেউ কখনও সেই গুরুর নাম শোনেনি।

দুই আজনবী

বর্ষা শেষ হওয়ার পরের এক সন্ধ্যা।

আকাশে চাঁদ নেই। দূরের বাঁশবাগান থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ আসছে।

সুনীলের বাড়ির উঠোনে সেদিনও কয়েকজন মানুষ বসে ছিল।

হঠাৎ দূর থেকে দুটো ছায়ামূর্তি দেখা গেল।

একজনের হাতে বাঁশের ঝুড়ি। আরেকজনের কাঁধে কাপড়ের থলে।

তারা সোজা সুনীলের বাড়ির পেছনের দিকে চলে গেল।

সেদিনই প্রথম তাদের ভাল করে দেখেছিল অরিন্দম।

পরদিন চায়ের দোকানে সে জিজ্ঞেস করল, — “ওরা কারা?”

চায়ের দোকানি বলল, — “সাপুড়ে।”

— “কোথায় থাকে?”

— “গ্রামের শেষ মাথায় একটা একচালা ঘরে।”

— “এখানে কতদিন?”

— “মাস দুয়েক হবে।”

অরিন্দম আর কিছু বলল না। কিন্তু তার চোখে কৌতূহল থেকে গেল।

কারণ সাপুড়েদের সঙ্গে সুনীলের সম্পর্কটা একটু বেশি ঘনিষ্ঠ বলেই মনে হচ্ছিল।

একদিন দুপুরে গদাই আর নিতাইকে দেখা গেল সুনীলের বাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতে।

সুনীল চারদিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলছিল, — “আজ নয়। কাল রাতে এসো।”

অরিন্দম দূর থেকে কথাটা শুনেছিল। আরও কিছু শুনতে পারেনি।

সেদিন রাতে অরিন্দমের ঘুম এল না।

পরদিন সে নিবারণ ঘোষকে বলল, — “কাকু, ব্যাপারটা কেমন যেন লাগছে।”

নিবারণ হেসে উড়িয়ে দিলেন।

— “সব ব্যাপারেই সন্দেহ করলে চলবে?”

— “তা ঠিক। কিন্তু ওরা সুনীলের কাছে এত রাতে যায় কেন?”

নিবারণ একটু চুপ করে থেকে বললেন,

— “সাপের কারবার। কে জানে!”

তারপর বিষয়টি চাপা পড়ে গেল।

কিন্তু কয়েকদিন পর প্রতাপপুরের এক বাড়িতে সত্যিই সাপ দেখা গেল।

গদাই এসে সাপ ধরল। সাপটি খুব একটা নড়ছিল না।

গদাই বলল, — “ভয় নেই।”

কিন্তু সাপটি ধরার সময় তার মুখের ভাব দেখে অরিন্দমের মনে হল — লোকটা যেন সাপটির চেয়েও অন্য কিছুকে নিয়ে চিন্তিত।

সেই রাতে সুনীলকে খবর দেওয়া হল। সুনীল এসে সাপটি দেখেই বলল, — “বিষধর।”

বাড়ির সবাই পিছিয়ে গেল।

সুনীল চোখ বন্ধ করে মন্ত্র পড়তে লাগল।

কতক্ষণ পড়েছিল কেউ জানে না।

শেষে বলল, — “এবার ভয় নেই।”

লোকজন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

কিন্তু অরিন্দম লক্ষ করেছিল —

সুনীলের চোখ একবারও সাপটির দিকে যায়নি।

বরং বারবার যাচ্ছিল গদাইয়ের দিকে।

যে সাপটি ফিরে এসেছিল

ঘটনাটা ঘটল কার্তিক মাসের এক রাতে।

প্রতাপপুরের দক্ষিণপাড়ার স্কুলশিক্ষক বিমলবাবুর বাড়ির উঠোনে একটি সাপ দেখা গেল।

বাড়ির লোকজন চিৎকার শুরু করতেই সুনীলকে খবর দেওয়া হল।

সুনীল এল। তার সঙ্গে গদাইও।

সাপটি ঝোপের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল। গদাই বাঁশের লাঠি দিয়ে ঝোপ সরাল।

কিছুক্ষণ পর বলল, — “পেয়েছি।”

কিন্তু সাপটি ধরার পর অদ্ভুতভাবে চুপ হয়ে গেল সবাই।

সুনীল সাপটির দিকে তাকিয়ে বলল,

— “এটাকে এখান থেকে দূরে নিয়ে যাও।”

গদাই সাপটিকে ঝুড়িতে ঢুকিয়ে নিল।

ঘটনা সেখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত।

কিন্তু তিনদিন পর সেই একই বাড়ির পাশের গোয়ালঘরে আবার একটি সাপ দেখা গেল।

বিমলবাবুর স্ত্রী ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,

— “এ তো আবার সাপ!”

সুনীল এল। এবার তার সঙ্গে নিতাই।

সুনীল সাপটি দেখে বলল, — “বাড়ির উপর অশুভ ছায়া আছে।”

বিমলবাবু বললেন, — “কী করতে হবে?”

সুনীল ধীরে ধীরে বলল, — “কিছু ব্যবস্থা করতে হবে।”

তারপর সে একটা মোটা অঙ্কের টাকা চাইল।

বিমলবাবু টাকা দিলেন। অরিন্দম দূর থেকে সব দেখছিল।

তার মনে এবার সন্দেহটা আরও গাঢ় হল।

একই বাড়িতে তিন দিনের ব্যবধানে দুটো সাপ।

দুটো ঘটনাতেই সাপুড়ে। দুবারই সুনীল।

তবু কোনও প্রমাণ নেই। শুধু সন্দেহ।

সেই রাতেই অরিন্দম সাপুড়েদের একচালা ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।

ভেতর থেকে কথা ভেসে এল।

নিতাই বলছিল, — “সব ঠিক আছে তো?”

গদাই বলল, — “চুপ কর। কেউ শুনে ফেলবে।”

তারপর কিছুক্ষণ নীরবতা।

অরিন্দম আর দাঁড়াল না।

পরদিন সে সরাসরি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গেল।

সেখানে কর্মরত চিকিৎসককে সব ঘটনা বলল।

চিকিৎসক শান্ত গলায় বললেন, — “সাপের কামড় নিয়ে কোনও ওঝার ওপর নির্ভর করবেন না। বিষধর সাপের কামড় প্রাণঘাতী হতে পারে। আবার বিষহীন সাপের কামড়েও ভয় থেকে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। নিশ্চিত হওয়ার উপায় চিকিৎসা পরীক্ষা।”

অরিন্দম বলল, — “কিন্তু যদি কেউ ইচ্ছা করে সাপ এনে ছেড়ে দেয়?”

চিকিৎসক কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন, — “তাহলে সেটা শুধু প্রতারণা নয়, অত্যন্ত বিপজ্জনক কাজ।”

অরিন্দম সেদিন একটা সিদ্ধান্ত নিল। এবার তাকে সত্যিটা জানতে হবে।

বিষের রহস্য

পরের ঘটনাটা ঘটল লস্করপুরে। রাত তখন প্রায় দশটা।

চিৎকার শুনে লোকজন ছুটে গেল।

রঘু মণ্ডলকে নাকি সাপে কামড়েছে। তার পায়ে দুটি দাঁতের দাগ।

পরিবারের লোকজন সুনীলকে ডাকতে ছুটল।

অরিন্দমও খবর পেল।

কিন্তু এবার সে সুনীলের আগে পৌঁছে গেল।

রঘুকে সে হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলল।

ঠিক তখনই সুনীল এসে হাজির।

— “হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই।”

অরিন্দম বলল,

— “দরকার আছে।”

সুনীল চোখ কুঁচকে তাকাল।

— “তুমি কি ওঝা?”

— “না।”

— “তাহলে আমার কাজে বাধা দিচ্ছ কেন?”

অরিন্দম বলল,

— “কারণ সাপের বিষ মন্ত্রে নামে না।”

চারপাশে ফিসফাস শুরু হল।

সুনীল গর্জে উঠল, — “তুমি কী জানো?”

অরিন্দম এবার গদাই ও নিতাইয়ের দিকে তাকাল।

— “ওরা যা জানে, তার কিছুটা।”

দুজন সাপুড়ে তখন ভিড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল।

অরিন্দম বলল, — “কয়েক মাস ধরে ওরা এখানে সাপ ধরছে। কিন্তু প্রশ্ন হল — সাপগুলো কোথা থেকে আসছে?”

কেউ উত্তর দিল না।

অরিন্দম হঠাৎ বলল, — “আজ ওদের ঘরটা দেখুন।”

গ্রামের কয়েকজন ছুটে গেল।

একচালা ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল কয়েকটি ঝুড়ি।

তার মধ্যে ছিল সাপ। আরও কিছু সরঞ্জাম।

কিন্তু আসল রহস্যটা বেরিয়ে এল পরে।

একজন অভিজ্ঞ সাপুড়ে ও চিকিৎসাকর্মীর সাহায্যে দেখা গেল — কিছু সাপের বিষদাঁত নেই। সেগুলোর বিষ ঢোকার স্বাভাবিক উপায়ও নেই।

গদাই আর নিতাই তখন ভেঙে পড়ল।

স্বীকার করল, তারা সাপ ধরে এনে রাখত। কিছু সাপের বিষদাঁত আগেই ভাঙা ছিল। তারপর সুযোগ বুঝে সেগুলো বাড়ির আশেপাশে ছেড়ে দেওয়া হত।

সাপ দেখা যেত। আতঙ্ক ছড়াত।

খবর যেত সুনীলের কাছে।

সুনীল এসে মন্ত্র পড়ত, তাবিজ দিত, “বিষ নামানোর” নাম করে টাকা নিত।

মানুষ সুস্থ হয়ে উঠলে কৃতিত্ব যেত সুনীলের।

আর যদি সত্যিই বিষধর সাপের কামড় হত, তখন কী হত?

সেটা কেউ জানত না। কারণ সুনীলের ভাগ্য ভাল ছিল — এতদিন তার সামনে এমন ঘটনা ঘটেনি।

কিন্তু প্রতারণার জাল এবার ছিঁড়ে গেল।

সেদিন বটতলায় গ্রামের সভা বসেছিল।

সুনীল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে।

একসময় যে মানুষটির সামনে গ্রামের লোকজন ভয়ে কথা বলত না, আজ তার দিকে কেউ তাকাতেও চাইছে না।

নিবারণ ঘোষ ধীরে ধীরে বললেন, — “মানুষের বিশ্বাস নিয়ে ব্যবসা করা যায় না।”

সুনীল চুপ।

কার্তিক বলল, — “তুই জানিস, সত্যিকারের বিষধর সাপের কামড়ে কেউ মারা গেলে তার দায় কে নিত?”

কোনও উত্তর নেই।

সিদ্ধান্ত হল — সুনীলকে গ্রাম ছাড়তে হবে।

সাপুড়েদেরও পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হল।

পরদিন ভোরে প্রতাপপুর ছাড়ল সুনীল।

লালসালু তখনও তার গায়ে।

কিন্তু সেই লালসালুর আড়ালে আর কোনও অলৌকিকতা ছিল না। ছিল শুধু প্রতারণার দাগ।

প্রতাপপুরের মানুষও সেদিন একটা কঠিন শিক্ষা পেল — সাপের কামড়ে ঝাড়ফুঁক নয়, দ্রুত চিকিৎসা জরুরি।

কোনও মানুষের পোশাক, তাবিজ কিংবা বড় বড় দাবি দেখে তাকে সত্যিকারের চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ মনে করা যায় না।

কারণ অন্ধ বিশ্বাস শুধু টাকা কেড়ে নেয় না — কখনও কখনও জীবনও কেড়ে নিতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ-এর নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev