
শরতের স্নিগ্ধ বাতাসে শিউলির সুবাস, কাশফুলের দোলা আর ঢাকের বাদ্যি জানান দেয় মা দুর্গার আগমনী বার্তা। দুর্গাপূজার জাঁকজমক, আলোকসজ্জা ও উৎসবের উচ্ছ্বাসের মাঝেও এমন কিছু প্রাচীন আচার রয়েছে, যা বাংলার কৃষিসভ্যতা, লোকবিশ্বাস এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দেয়। তেমনই এক অনন্য ঐতিহ্য হলো নবপত্রিকা পূজা — যার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে শস্যদেবীর আরাধনা ও মাতৃপ্রকৃতির প্রতি মানুষের চিরন্তন শ্রদ্ধা।
‘নবপত্রিকা’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ‘নয়টি পাতা’। কিন্তু বাস্তবে এটি নয়টি বিশেষ উদ্ভিদের সমষ্টি। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, এই নয়টি উদ্ভিদের মধ্যে দেবী দুর্গার নয়টি রূপের প্রতীকী উপস্থিতি কল্পনা করা হয়। উদ্ভিদগুলি হলো — কদলী বা কলা, কচু, হরিদ্রা বা হলুদ, জয়ন্তী, বিল্ব বা বেল, দাড়িম্ব বা ডালিম, অশোক, মানকচু এবং ধান। প্রতিটি উদ্ভিদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এক একজন অধিষ্ঠাত্রী দেবী — যথাক্রমে ব্রহ্মাণী, কালিকা, উমা, কার্তিকী, শিবা, রক্তদন্তিকা, শোকরহিতা, চামুণ্ডা ও লক্ষ্মী। এই নয় দেবী একত্রে ‘নবপত্রিকাবাসিনী নবদুর্গা’ নামে পূজিতা হন।
নবপত্রিকা কেবল উদ্ভিদের সমাহার নয়; এটি বাংলার প্রকৃতি ও কৃষিজীবনের এক প্রতীকী প্রতিচ্ছবি। কলাগাছ, হলুদ, কচু থেকে ধান — প্রতিটি উদ্ভিদই মানুষের খাদ্য, জীবিকা ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
নবপত্রিকার পরিচিত নাম ‘কলাবউ’ বা ‘কলা বউ’। একটি সপত্র কলাগাছের সঙ্গে অপর আটটি উদ্ভিদ একত্র করে শ্বেত অপরাজিতা লতা দিয়ে বাঁধা হয়। এরপর লালপাড় সাদা শাড়ি পরিয়ে ঘোমটা টেনে বধূরূপ দেওয়া হয়। প্রচলিত রীতিতে একজোড়া বেলও এই সাজসজ্জার অংশ।
মহাসপ্তমীর ভোরে নবপত্রিকাকে নদী বা জলাশয়ে নিয়ে গিয়ে শাস্ত্রবিধি অনুসারে স্নান করানো হয়। তারপর নতুন শাড়ি পরিয়ে ঢাকের বাদ্যি, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে পূজামণ্ডপে নিয়ে আসা হয়। সেখানে দেবী দুর্গার ডান দিকে, সাধারণত গণেশের পাশে, তাঁকে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর দুর্গাপূজার বাকি দিনগুলিতেও নবপত্রিকা পূজিত হন।
গবেষকদের মতে, নবপত্রিকা পূজার গভীরে রয়েছে প্রাচীন শস্যদেবীর আরাধনার স্মৃতি। বাংলার কৃষিনির্ভর সমাজে ফসলের প্রাচুর্য, জমির উর্বরতা এবং প্রকৃতির অনুকূলতা ছিল মানুষের জীবনধারণের প্রধান অবলম্বন। তাই শস্য ও উদ্ভিদকে পবিত্র জ্ঞানে পূজা করার প্রথা স্বাভাবিকভাবেই ধর্মীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছিল। গবেষক ড. শশিভূষণ দাশগুপ্ত নবপত্রিকাকে শস্যদেবীর উপাসনার সঙ্গে যুক্ত করে দেখিয়েছেন। তাঁর মতে, “এই শস্যবধূকেই দেবীর প্রতীক গ্রহণ করিয়া প্রথমে পূজা করিতে হয়, তাহার কারণ শারদীয়া পূজা মূলে বোধহয় এই শস্য-দেবীরই পূজা। পরবর্তীকালের বিভিন্ন দুর্গাপূজার বিধিতে এই নবপত্রিকার বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হইয়াছে। … বলাবাহুল্য এই সবই হইল পৌরাণিক দুর্গাদেবীর সহিত এই শস্যদেবীকে সর্বাংশে মিলাইয়া লইবার একটা সচেতন চেষ্টা। এই শস্য-দেবী মাতা পৃথিবীরই রূপভেদ, সুতরাং আমাদের জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে আমাদের দুর্গাপূজার ভিতরে এখনও সেই আদিমাতা পৃথিবীর পূজা অনেকখানি মিশিয়া আছে।” শারদীয়া দুর্গাপূজার অন্তরালে প্রাচীন মাতৃকা ও পৃথিবীর উপাসনার স্মৃতি আজও বহমান। পরবর্তী সময়ে এই শস্যদেবীর ধারণা পৌরাণিক দুর্গার আরাধনার সঙ্গে মিলেমিশে গেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে নবপত্রিকা বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতির বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এখানে কৃষিজীবনের প্রয়োজন, লোকবিশ্বাস এবং পৌরাণিক দেবী-উপাসনা একসূত্রে গাঁথা হয়েছে।
আজকের পরিবেশসংকটের যুগে নবপত্রিকার তাৎপর্য নতুন করে ভাবার অবকাশ রয়েছে। নয়টি উদ্ভিদকে দেবীর প্রতীক হিসেবে পূজা করার মধ্যে প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার একটি গভীর বার্তা নিহিত। উদ্ভিদ এখানে নিছক পূজার উপকরণ নয়, বরং জীবনধারণের সহায়ক এবং পবিত্রতার প্রতীক। নবপত্রিকা মনে করিয়ে দেয়, মানুষের অস্তিত্ব প্রকৃতির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। খাদ্য, ঔষধ, জীবিকা ও পরিবেশের ভারসাম্য — সবকিছুর জন্যই আমরা উদ্ভিদজগতের ওপর নির্ভরশীল। প্রকৃতিকে সম্মান করা তাই নিজের জীবনকেই সম্মান করা।
দুর্গাপূজা যেমন অশুভের ওপর শুভের বিজয় ও পারিবারিক পুনর্মিলনের উৎসব, তেমনই নবপত্রিকা আমাদের কৃষিসভ্যতার শিকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। মহাসপ্তমীর ভোরে শাড়ি পরানো নবপত্রিকা যখন ঢাকের বাদ্যি ও শঙ্খধ্বনির মধ্যে পূজামণ্ডপে প্রবেশ করেন, তখন তাঁর সঙ্গে যেন প্রবেশ করে বাংলার মাটির গন্ধ, ফসলের আশা এবং বহু প্রজন্মের বিশ্বাস।
নবপত্রিকা তাই নয়টি উদ্ভিদের সমাহারমাত্র নয়; এটি বাংলার শস্যদেবীর স্মৃতি, প্রকৃতির জীবনদায়ী শক্তির আরাধনা। দুর্গোৎসবের বিপুল আয়োজনের অন্তরালে এই প্রাচীন প্রথা আজও নিঃশব্দে মনে করিয়ে দেয় — দেবী শুধু প্রতিমায় নন, তিনি বিরাজমান সবুজ পাতায়, ধানের শিষে এবং প্রকৃতির প্রতিটি জীবনদায়ী স্পন্দনে।