
দুর্বা আমাদের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজা বা যে কোন শুভ কাজের এক অপরিহার্য অঙ্গ। কিন্তু কেন দুর্বা ব্যাবহার করা হয় তা আমরা অনেকেই জানি না। দুর্বার উল্লেখ আমরা ঋগ বেদ ও অথর্ব বেদে পাই। ভবিষ্যপুরাণে বর্ণিত আছে দুর্বার জন্ম হয় ভগবান বিষ্ণুর হাত ও উরুর লোম থেকে যখন তিনি সমুদ্র মন্থনে মন্দ্র পর্বতকে সাহায্য করছিলেন। আবার বামন পুরাণে উল্লেখ আছে দুর্বার জন্ম হয় নাগ বাসুকীর পুচ্ছ থেকে যে সময় দেব-আসুরেরা মিলিত ভাবে সমুদ্র মন্থন করছিলেন।
পূজাতে দুর্বা পাতা লাগে তিনটি। তিনটি পাতায় ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর অবস্থান করেন। জগতে কোন শুভ কাজ ত্রিদেবকে ছাড়া সম্ভব নয়। তাই শুভ কাজে দুর্বা ছাড়া আশীর্বাদ হবে না। সেই থেকেই দেবদেবীর পূজায় দুর্বার প্রয়োজন হয়।
দুর্বা পবিত্রতার প্রতীক, দুর্বা পুনর্জীবন, দীর্ঘজীবন ও উন্নতির প্রতীক। তার কারণ হলো দুর্বার একটি ঘাস তুলে নিলেও তার জায়গায় আবার গজিয়ে উঠে নুতুন দুর্বা। দুর্বার সংস্পর্শে যা আসে তাই পবিত্র হয়ে উঠে বলে বিশ্বাস। দুর্বা সকল অশুভ শক্তিকে শোষণ করে শুভ শক্তির বিকিরণ করে তাই সকল পূজায় দুর্বার ব্যাবহার করা হয়ে থাকে।
দুর্বাকে পবিত্র মানার আরেকটি কারণ হলো — দুর্বার গোড়ায় থাকেন স্বয়ং ব্রহ্মা, মধ্যে বিষ্ণু আর অগ্রভাগে মহেশ্বর। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা অষ্টমীকে দুর্বা অষ্টমী হিসেবে পালন করা হয়। ঐ দিন দুর্বার অগ্রভাগ পূর্ব মুখী করে ভগবানকে দুর্বা উৎসর্গ করা হয় এই বিশ্বাসে যে এই অনুষ্ঠানের দ্বারা পূর্ব-পুরুষদের কাছ থেকে দীর্ঘায়ুর আশীর্বাদ পাওয়া যায়।
আমাদের পুরানের পরতে পরতে আছে নানা কাহিনী। তেমনি দুর্বা নিয়েও ভারিসুন্দর একটা গল্প আছে।
দুর্বাসুর নামে এক অসুর ছিলেন। কিন্তু সে অসুর হয়েও কৃষ্ণ ভক্ত ছিলেন। আর দুর্বাসুরের মা কৃষ্ণ বিদ্বেষী ছিলেন। দুর্বাসুরের বাবা, ভাই সকলে দেবতাদের হাতে মারা গিয়েছিলেন। এই জন্য, দুর্বাসুরের মা সবসময় চাইতেন, দেবতাদের স্বর্গ রাজ্য ধ্বংস হোক ও দেবতারা যেন নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
একদিন দুর্বাসুরের মা দুর্বাসুরকে বললেন; তুই ত্রিদেবের তপস্যা করে (ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব) অমরত্ব বর প্রার্থনা কর, তারপর দবতাদের পরাজিত করে ত্রিলোক জয় করে আয় আমি এই ত্রিলোকের রাজ মাতা হবো। তোর উপর এটা আমার আদেশ।
মায়ের কথা মত, দুর্বাসুর নির্জনে গিয়ে কঠোর তপস্যা শুরু করেন। কয়েক যুগ ধরে সেই তপস্যা ভাঙ্গল না। দুর্বাসুরের শরীরের মাংস পচে খসে উইপোকা ও অন্যান্য পোকামাকরে খেয়ে নিয়েছে, তার হাড়ও খসে পড়ে মাটিতে মিশে গেছে তবুও সেই মাটি থেকে ত্রিদেবের নাম উচ্চরিত হচ্ছে। দেবতারাও ভয় পেয়ে গেল দুর্বাসুরের তপস্যায়, তারা তার তপস্যা ভাঙ্গার বিভিন্ন কৌশলের সাহায্য নিয়েও ব্যর্থ হল। অবশেষে ত্রিদেব এসেছে — ব্রক্ষ্মা তাঁর কমন্ডুলের জল ছিটিয়ে দিয়ে রক্ত মাংস এক করে দুর্বাসুরের আগের রুপ দিলেন। এবং বর প্রার্থনা করতে বললেন।

দুর্বাসুর বললেন — “প্রভু আমি মাতৃ আজ্ঞার জন্য এ তপস্যা করেছি। আমার মা বলেছেন — অমরত্বের বর নিয়ে আসতে। তাই আমি এ কঠোর তপস্যা করেছি। আমি জানি “হে নাথ, আমাকে যদি আপনারা অমরত্ব বর দেন তাহলে আমার মা আমাকে দিয়ে আবারো খারাপ কাজ করাবে। তাই হে নাথ! আমাকে আপনারা এমন বর দেন যাতে আমি অমরও হতে পারি আবার আপনাদের সেবায়ও লাগতে পারি, এবং আমার দ্বারা যেন জগতের কারও কোনও অনিষ্ট না হয়।”
দুর্বাসুরের কথায়, ত্রিদেবত্রয় সন্তুষ্ট হয়ে বললেন — “হে দুর্বাসুর! শুধু ত্রিদেব না, জগতের সকল দেব-দেবীর সেবায় তুমি লাগবে, তোমাকে আমরা এই আশীর্বাদ করলাম।
দুর্বাসুর বললেন কিন্তু প্রভু কিভাবে আমি সবার সেবায় লাগবো?
ত্রিদেব বললেন, “হে দুর্বাসুর তুমি দুর্বা ঘাসে পরিনত হবে এবং আমাদের সহ সকল দেবতার পূজায় তোমাকে প্রয়োজন হবে। আজ অক্ষয় তৃতীয়ায় তোমাকে এই অক্ষয় বর প্রদান করলাম। জগতে সবাই মারা যাবে কিন্তু তুমি দুর্বাঘাস রুপি দুর্বাসুর কখনো মারা যাবে না। অমর হয়ে থাকবে তুমি এই ধরণীতে।
পূজা করতে দুর্বার পাতা লাগে তিনটি। এই তিনটি পাতায় ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব অবস্থান করে। এই জগতে যত শুভ কাজ হবে এই ত্রিদেবকে ছাড়া সম্ভব নয়। তাই ভগবান বললেন “আজ থেকে যত শুভ কাজ হবে এই দুর্বা ছাড়া কোন আশীর্বাদ হবে না।”
শিব যেমন বেলপাতায় প্রসন্ন হন। গনেশও তেমনি দুর্বায় তৃপ্ত হন। গনেশকে ২১টি দুর্বা দিয়ে প্রার্থনা করলে গণেশ ঠাকুর প্রসন্ন হন। রামেশ্বরমের মন্দিরে দুর্বা দিয়ে গণেশ কে আপাদমস্তক আবৃত করে দেওয়া হয়। এর পিছনেও আছে এক কাহিনী।
একসময় অনলাসুর নামে এক মহা প্রতাপবান ও অত্যাচারী অসুর ছিল, পুরানমতে অনলাসুর যমরাজ ও অপ্সরা তিলত্তোমার ছেলে। সেই অনলাসুর একবার তপস্যায় দেবাদিদেব মহাদেবকে সন্তুষ্ট করে বর লাভ করেছিল। বর হিসেবে তাঁর চোখ থেকে আগুনের গোলা বের করার ক্ষমতা লাভ করে এবং সেই থেকে তাঁর নাম হয় অনলাসুর। অনল মানে আগুন। এই মহাশক্তিতে বলীয়ান হয়ে অনলাসুর প্রবল অত্যাচারি হয়ে উঠে। নির্দয় ভাবে সে সকলকে হত্যা করতে শুরু করে। সাধু-সন্ন্যাসীদের যাগযজ্ঞ নষ্ট করে নির্বিচারে লুন্ঠন হত্যা করতে থাকে। এমনকি তাঁর হাত থেকে দেবতারাও নিস্তার পেলেন না। অনলাসুরের ভয়ে তাঁরা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পালিয়ে বেড়াতে থাকেন। অনলাসুর তাঁর চোখ থেকে আগুনের গোলা নিক্ষেপ করে চারিদিক ধ্বংস করতে থাকে, স্বর্গ-মর্ত-পাতাল-এ শুরু হয়ে যায় হাহাকার। অনলাসুর স্বর্গ থেকে দেবতাদের তাড়িয়ে দেবরাজ ইন্দ্রকে হত্যা করতে উদ্যত হলে ইন্দ্র সেখান থেকে পালিয়ে যান। ইন্দ্রের পলায়নের পর অনলাসুর স্বর্গ রাজ্যে অধিকার করে বসে।
অনলাসুরের ভয়ে ভীত হয়ে অত্যাচারিত দেবতারা দেবগুরু বৃহস্পতির পরামর্শে গনেশের শরনাপন্ন হলেন। দেবতাদের কাতর প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে গণেশ সকলকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। গণেশ অনলাসুর সম্বন্ধে অবগত ছিলেন। প্রচন্ড পরাক্রমী তাই তিনি অনলাসুর কে বধ করার জন্যে কৌশল অবলম্বন করলেন। গণেশ নিজেকে একটি ছোট্ট শিশুতে পরিনত করে অনলাসুরের সাথে যুদ্ধ শুরু করলেন। অনলাসুরের চোখ থেকে নির্গত আগুনের গোলা কৌশলে এড়িয়ে যেতে থাকলেন কিন্তু সেই ভয়ানক আগুনের গোলা চারিদিক ধ্বংস করতে থাকলো। অনেকক্ষন যুদ্ধের পর অনলাসুর যখন শিশুরূপী গণেশকে গ্রাস করতে উদ্যত হল। গণেশ তখন তাঁর বিরাট-রূপ ধারন করে অনলাসুরকে গিলে ফেললেন।
অনলাসুরকে গিলে ফেলায় গণেশের শরীরের ভিতর প্রচন্ড যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়। যন্ত্রণায় তিনি ছটফট করতে থাকেন। গণেশের এই অবস্থা দেখে স্বর্গের দেবতারা গণেশের যন্ত্রণা দূর করার চেস্টা করতে থাকেন। দেবী পার্বতী গণেশের সর্বাঙ্গে চন্দনের প্রলেপ দিলেন, কিন্তু যন্ত্রণার কোন প্রশমন হল না। দেবাদিদেব মহাদেব তাঁর গলার সাপ দিয়ে গণেশের কোমর বেঁধে দিলেন, কিন্তু তাতেও কোন লাভ হলো না। ভগবান বিষ্ণু পদ্মের জল ছিটিয়ে দিলেন গণেশের সর্বাঙ্গে, সেই থেকে গণেশের এক নাম হয় পদ্মপাণি। তাতেও কোন লাভ হলো না। চন্দ্রদেব গণেশের মাথার উপর অবস্থিত হয়ে শীতলতা প্রদান করতে শুরু করলেন সেই জন্য গণেশের আরেক নাম হয় ভালচন্দ্র। সকল প্রচেষ্টা বিফল হতে দেখে মহামুনি কাশ্যপ ২১টি দুর্বা গণেশের মাথায় নিবেদন করেন এবং সেই দুর্বাগুলিই গণেশের যন্ত্রণার অবসান ঘটালো, সেই দুর্বা গুলি দ্বারাই গণেশের শান্তি ফিরে এলো। এতে সন্তুষ্ট হয়ে গণেশ ঘোষণা করলেন যে দুর্বাই হবে আমার সবচাইতে প্রিয় বস্তু আর যে ভক্ত শ্রদ্ধা সহকারে ২১টি দুর্বা আমাকে নিবেদন করবে তাঁর জীবন ধনধান্যে পরিপূর্ণ হবে ও তাঁর জীবনে নেমে আসবে সুখ-শান্তি। পৃথিবীর সকল প্রকার জ্বালা-এযন্ত্রণা থেকে তাঁর জীবন হবে মুক্ত। আবার এই ২১টি দুর্বার মাহাত্ম্য হিসেবে বর্ণিত আছে যে এই ২১টি দুর্বা কিন্তু প্রতীকী। এই ২১টি দুর্বা হচ্ছে আমাদের মধ্যে পঞ্চ ভুত, পঞ্চ প্রাণ, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়, ও মন এই সকলের প্রতীক।