
৭০. কিশোরীমোহন বাগচীর ব্যবসাবুদ্ধি
অবিভক্ত বাংলার নদিয়া জেলার শান্তিপুরের কাশ্যপাড়া এলাকার ভঙ্গ কুলীন ব্রাহ্মণ প্রাণগোপাল বাগচীর ছেলে পিয়ারিমোহন বাগচী ছিলেন কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির কোষাধ্যক্ষ। পিয়ারিমোহন পরে চলে আসেন কলকাতধায়। শোভাবাজারের কৈলাসদাস লেনে একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন। তাঁর পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ে। বড় ছেলে কিশোরীমোহন (১৮৬৮-১৯২৩)।
প্রথাগত শিক্ষায় কিশোরীমোহন খুব বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেন নি। তাঁর পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। বাবা তাঁকে কোন চাকরি-বাকরির চেষ্টা করতে বলেছিলেন। কিন্তু অন্যের অধীনে তিনি চাকরি করতে চান নি। তাই ব্যবসার দিকে ঝুঁকেছিলেন।
কিসের ব্যবসা করবেন? অনেক ভেবে কিশোরীমোহন কালির ব্যবসার দিকে ঝুঁকলেন। শোভন রায় বলেছেন যে বুদ্ধিমান কিশোরী অবিলম্বে এবোনাইট কলমের জন্য জলে দ্রবণীয় ফাউন্টেন পেনের কালি তৈরি করতে শুরু করলেন। তাঁর কালির ব্র্যাণ্ডের নাম, ছিল ‘সরস্বতী’ আর কালির নাম ছিল ‘আইডিয়াল’। নীল-কালো কালি ও কালির গুঁড়ো, সবুজ/বেগুনি/ লাল / কালো কালি এবং স্টাইলো কলমের জন্য স্টাইলোগ্রাফিক কালি ছিল খুব জনপ্রিয়। স্কারলেট রেড কালি, ব্রিলিয়ান্ট রেড কালিও ছিল তার মধ্যে। প্রধম দিকে কালি থাকত লম্বা বোতলে, পরে ছোট বোতলে কালি ভরা হত।
এই কালির ব্যবসা করতে গিয়ে শ্বশুরমশায়ের সঙ্গে কিশোরীমোহনের বিচ্ছেদ হয়। ১৪, মতান্তরে ২০ বছর বয়সে কিশোরীমোহনের বিয়ে হয় বালি গ্রামের ভাদুড়ি পরিবারের মেয়ে নন্দরানির সঙ্গে। নন্দরানির বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী। যুক্ত ছিলেন পণভ সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে। বিয়ের পরে তিনি কিশোরীমোহনকে নিজের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করেন। পরে শ্বশুরমশাই জানতে পারেন যে তাঁর জামাই তাঁকে না জানিয়ে কালির ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তখন তিনি জামাইকে নিজের ব্যবসা থেকে বাদ দেন।
লেখার কালির কথা যখন উঠল, তখন তার পরবর্তী চিত্রটা জেনে রাখা ভালো। এই কালির ক্ষেত্রে বাগচীরা পথিকৃৎ। তারপর ১৯১০ সালে ড. রাধিকানাথ সাহা প্রথম ফাউন্টেন পেন তৈরি করেন এবং কালির ফর্মুলা নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন। অন্যদিকে শিল্পপতি ফণীন্দ্রনাথ গুপ্ত পেনের কালি তৈরি শুরু করেন। ১৯৩০ সাল। গান্ধীজি স্বদেশি পণ্য ব্যবহারের ডাক দিলেন। লেখার কালির ব্যাপারে তিনি কথা বললেন সতীশচন্দ্র দাশগুপ্তের সঙ্গে। সতীশচন্দ্র তখন প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বেঙ্গল কেমিক্যালসের প্রধান রসায়নবিদ। গান্ধীজির অনুরোধে সতীশচন্দ্র ঘরে বসেই একটি চমৎকার কালো রঙের কালি তৈরি করেন। তার নাম দেন ‘কৃষ্ণধারা’। সতীশচন্দ্র তাঁর কালি তৈরির ফর্মুলাটি তুলে দিলেন রাজশাহির দুই ভাই ননীগোপাল মৈত্র ও শঙ্করাচার্য মৈত্রের হাতে। ১৯৩৪ সালে রাজশাহিতে মৈত্ররা প্রতিষ্ঠা করেন ভারতের প্রথম পূর্ণাঙ্গ স্বদেশি কালির ব্র্যাণ্ড, যা পরবর্তীকালে ‘সুলেখা কালি’ নামে পরিচিত হয়। কালির এই নামটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেওয়া। ১৯৩৯ সালে সুলেখা কালির কারখানা চলে আসে কলকাতায়। প্রথমে কসবায়, পরে যাদবপুরে।
ফিরে আসি কিশোরীমোহনের কথায়।
শুধু কালির ব্যবসা করে কিশোরীমোহন ক্ষান্ত হন নি। ১৮৮৩ সালে কালির ব্যবসার সূত্রাপাত করেই তিনি ‘দর্জিপাড়া কেমিক্যাল ওয়ার্কস’ নামে এক কোম্পানি তৈরি করেন। পরে তার নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘দর্জিপাড়া কেমিক্যাল অ্যাণ্ড রাবার স্ট্যাম্প ওয়ার্কাস’। তার কিছু আগেই তৈরি হয়েছিল বাবার নামে ‘পি এম বাগচী অ্যাণ্ড কোং’। ১৮৮৮ সালে পাথুরিয়াঘাটার ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হল ‘পি এম বাগচীর পঞ্জিকা’, তারপর প্রকাশিত হয় ‘পি এম বাগচীর সচিত্র ভারত নির্দেশিকা’।
কিশোরীমোহন সুগন্ধী ব্যবসায়েও খভাতিলাভ করেন। অনেক সুগন্ধী ফ্রান্সের গ্রাস থেকে আমদানি করে ব্র্যাণ্ডিং করা হত। তাঁর কোম্পানি স্ট্যাম্প প্যাডের কালি, রাবার স্ট্যাম্প, আয়ুর্বেদিক ওষুধ, ফলের রসের সিরাপ, গোলাপ জল, প্রসাধনী, চুলের রং, সাবান, টুথপেস্ট প্রভৃতি উৎপাদন করত।