
ঢল নেমেছে ঘুষপেটিয়ার
বঙ্গজয়ের নীল নকশার কথা বলছিলাম আমরা। সেই নকশায় এস আই আর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু তার জন্য একটি আবহ তৈরি করা দরকার। ঘুষপেটিয়া বা অনুপ্রবেশকারী বা রোহিঙ্গার কথা বলে সেই আবহ তৈরির চেষ্টা হল। কেন্দ্রীয় নেতারা বলতে লাগলেন বাংলায় বহু অনুপ্রেবেশকারী আছে। ইঙ্গিতটা মূলত মুসলমানদের দিকে। তারাই ঘুষপেটিয়া, তারাই রোহিঙ্গা।
বাবু যত বলে পারিষদ দলে বলে তার শতগুণ। কেন্দ্রীয় নেতাদের কথায় বঙ্গের নেতারা উৎসাহিত হয়ে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করলেন। সবাইকে ছাপিয়ে গেলেন বিরোধী দলনেতা। তিনি ডানে-বাঁয়ে, উত্তরে-দক্ষিণে, শয়নে –স্বপনে রোহিঙ্গাদের দেখতে লাগলেন। একদিন তিনি কোন এক মফস্বলে সভা করতে গিয়েছিলেন। তিনি রাস্তা দিয়ে কনভয় নিয়ে যাবার সময় কে যেন স্লোগান দিল তাঁর বিরুদ্ধে। তিনি বীর বিক্রমে গাড়ি থামিয়ে তেড়ে গেলেন তার দিকে। চিৎকার করে বলতে লাগলেন ‘রোহিঙ্গা, রোহিঙ্গা’। তিনি বলে দিলেন বাংলায় আছে ১ কোটি ২০ লক্ষ রোহিঙ্গা বা অনুপ্রবেশকারী।
১ কোটি ২০ লক্ষ!
বাংলার জনসংখ্যা ৯ কোটির মতো। তার মধ্যে ১ কোটি ২০ লক্ষ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী! সাংঘাতিক ব্যাপার। এরাই তাহলে ভুতুড়ে ভোটার! এদের জন্যই জিততে পারছে না বিজেপি।
বিরোধী দলনেতার কথা শুনে একটু খটকা লাগল। তত্ত্ব-তল্লাশ করতে শুরু করলাম। দেখলাম বিরোধী দলনেতা বাংলায় রোহিঙ্গাদের যে সংখ্যার কথা বলেছেন, সারা পৃথিবীর রোহিঙ্গাদের সংখ্যাও তার ধারে-কাছে যায় না।
‘বাংলাদেশ জার্নাল’ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রোহিঙ্গাদের যে তালিকা প্রকাশ করেছেন, তার হিসেবটা এই রকম : ১] বাংলাদেশ — আগে ছিল ৪ লক্ষ, এখন ৭ লক্ষ। খ] পাকিস্তান — ২ লক্ষের মতো। গ] থাইল্যাণ্ড — ১ লক্ষ। ঘ] মালয়েশিয়া — ৫৯ হাজার। যুক্তরাষ্ট্র — ১৩ হাজার। ইন্দোনেশিয়া — ১১ হাজার ৯৪১। নেপাল — ২০০।
সরকারি হিসেব মতে ভারতে আছে ৪০ হাজার রোহিঙ্গা। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছেন যে দেশের ১২ টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে — দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, কর্নাটক, কেরল, তামিলনাড়ু, হরিয়ানা, জম্মু ও কাশ্মীর, রাজস্থান, তেলেঙ্গানা ও পঞ্জাবে আছেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা।
অথচ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য তাঁর বিবৃতিতে একটি ‘নীরব জনতাত্ত্বিক আগ্রাসনে’র কথা বলেছেন। তিনি অভিযোগ করে বলেছেন যে তৃণমূল দল রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি মুসলমানদের জাল নথি পেতে সাহায্য করেছেন। তাঁর মতে ভোটার তালিকায় কোন রোহিঙ্গা বা বাংলাদেশি মুসলমানের নাম থাকা উচিত নয়।। তিনি আরও দাবি করেন যে, দলটি সন্দেহভাজন বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা ভোটারদের ১৩ লক্ষ নাম সনাক্ত করে নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছে, তার মানে তৃণমূল অনুপ্রবেশকারীদের ভোটাধিকার পেতে সাহায্য করেছে। (জাস্টিস ফর অল কানাডা)
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার বলেছেন, ‘ There are several pockets in the state, including the outskirts of the state capital Kolkata, maimly adjacent to the fisheries, where these Rohingya infiltrators have established their settlement receiving the patronage of the ruling (TMC) and the local administration, They even attack people trying to take photographs of their illegal settlement.’ (ওই)
বিজেপি নেতাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংবাদ মাধ্যমেও অনুপ্রবেশকারীদের সম্বন্ধে নানা স্বকপোলকল্পিত সংবাদ পরিবেশন করা হয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ধারণা সঞ্চারিত করে দেওয়ার চেষ্টা হয় যে এই অবৈধ ভোটারদের জোরে শাসকদল নির্বাচনে জয় লাভ করে আসছে।
কিন্তু তারপর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হলে দেখা যায় যে ‘তোমার (রোহিঙ্গার) দেখা নাই গো তোমার দেখা নাই।’ খসড়া ভোটার তালিকায় আছে :
মৃত — ২৪,১৬,৮৫২
অনুপস্থিত — ১২,২০,০৩৮
ঠিকানা বদল — ১৯,৮৮,০৭৬
ডুপ্লিকেট — ১,৩৮,৩২৮
অন্যান্য — ৫৭,৬০৪
লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন
বঙ্গজয়ের নীল নকশায় কেনা-বেচার কথা থাকবে না, তা কি হয়? শ্রীরামকৃষ্ণ আধ্যাত্মিক গৌরবকে আর্থিক গৌরবের উপরে স্থান দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘টাকা মাটি মাটি টাকা।’ কিন্তু ধর্মপ্রাণ বিজেপির কাছে ‘টাকা ভোট ভোট টাকা।’ তাই প্রথমে বিজেপির অর্থভাণ্ডারের খোঁজখবর নিয়ে তারপরে ভোট কেনার ব্যয়ের দিক আলোচনা করব।
অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস-এর (ADR) ১৮.০২.২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে ৪,৩৪০.৪৭ কোটি টাকার বিপুল আয় নিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টি ভারতের সবচেয়ে ধনী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিজেপির এই আয় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, সিপিআইএম, আম আদমি পার্টি, বহুজন সমাজ পার্টি, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির সম্মিলিত মোট আয়ের ৭৪.৫৬%। বিজেপি তার আয়ের মাত্র ৫০.৯৬% ব্যবহার করেছে — যার পরিমাণ ২,২১১.৬৯ কোটি টাকা। বিজেপির আয় ৮৩.৮৫% বৃদ্ধি পে্য়ে ২০২২-২৩ সালের ২,৩৬০.৮৪ কোটি থেকে ২০২৩-২৪ সালে ৪,৩৪০.৪৭ কোটিতে দাঁড়িয়েছে, যা ১,৯৭৯.৬২ কোটির বৃদ্ধি প্রতিফলিত করে। শুধু অনুদান ও চাঁদা থেকে বিজেপি পেয়েছে ৩,৯৬৭.১৪ কোটি টাকা।
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া ব্যয়ের হিসেব অনুযায়ী ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ, অসম, কেরালা, তামিলনাড়ু ও পুদুচেরির নির্বাচনে বিজেপির মোট খরচ (অবশ্যই সাদা টাকা) ৫২৯.৩৮ কোটি টাকা।
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনে কত ব্যয় করেছে বিজেপি? মাত্র ২৮৬.৯৯ কোটি টাকা। এই অঙ্কটা পূর্বোক্ত ৫ রাজ্য এবং পুদুচেরির মোট ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি। পশ্চিমবঙ্গে সাধারণ দলীয় প্রচারে ব্যয় হয়েছে ২১৭.১৬ কোটি টাকা। প্রার্থী ও সংশ্লিষ্ট খাতে ৬৯.৮৩ কোটি টাকা। প্রার্থীদের সরাসরি দেওয়া হয়েছে ৫৮.৮০ কোটি টাকা।
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও ইউটউবারকে প্রচুর টাকা দিয়েছে বিজেপি। তার একটা অসম্পূর্ণ হিসেব তুলে ধরছি :
১] সায়ক চক্রবর্তী — ২.৫ লক্ষ টাকা ২] শমীক অধিকারী — ১৩ লক্ষ টাকা। ৩] ইতি কর্মকার — ৩ লক্ষ টাকা। ৪] আর জে প্রিয়াঙ্কার প্রিয়াঙ্কার সরকার — ১৫ লক্ষ টাকা। ৫] সুব্রত কুণ্ডু (বাবার নামে) — ৩ লক্ষ টাকা। ৬] শিখা কুণ্ডু (সুকান্ত কুণ্ডুর মায়ের নামে) — ৪.৫ লক্ষ টাকা। ৭] সঙ্গে আদিত্যের জ্যোতিরাদিত্য রায় — ১৭.৮ লক্ষ টাকা। ৮] প্রিয় বন্ধু মিডিয়ার শুদ্ধশীল ঘোষ — ৫১ লক্ষ টাকা। ৯] দ্য নিউজ বাংলা — ২২ লক্ষ টাকা। ১০] বাংলা হান্ট — ২২.৫ লক্ষ টাকা। ১১] এন ইনফো মিডিয়া (দ্য ওয়াল নিউজ ) — ৪১.৩ লক্ষ টাকা। ১২ ] পিনাক কি বলছে — ৫.৩ লক্ষ টাকা। ১৩] আজ বাংলা নিউজ — ৫.৩ লক্ষ টাকা। ১৪] রুদ্র বার্তা — ১১ লাখ টাকা। ১৫] সঙ্গীত সরকার — ২ লক্ষ টাকা। ১৬] স্পোর্টা টেকনোলজিস — ১১ লক্ষ টাকা। ১৭] টাইডিংস মেডিয়া অ্যাণ্ড কমিউনিকেশন — ৭.৬৭ লক্ষ টাকা। ১৮] পলিটিক্যাল ডেইলি — ২০.৮ লক্ষ টাকা। মধ্যম কমিউনিকেশন — ২১ লক্ষ টাকা। ২০] ওয়ান নাইনটি সেভেন কমিউনিকেশনস — ২৯.৫ লক্ষ টাকা। ২১] সিএনএক্স মিডিয়া (এক্সিট পোল সংস্থা) — ১৮ কোটি টাকা।
আনন্দবাজার পত্রিকার প্রাক্তন সাংবাদিক প্রসূন আচার্য তাঁর ফেসবুক পোস্টে (২৬.০৯.২৬) লিখেছেন :
“যে সব ইউটিউবার বা কন্টেন্ট ক্রিয়েটার বা সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার বিগত নির্বাচনে বিজেপির পক্ষে নানাভাবে প্রচার করে চেকের মাধ্যমে টাকা নিয়েছেন তাঁদের হিসেবটা নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হিসেবে উঠে এসেছে। কিন্তু বাজারের খবর, এর কয়েক গুণ বেশি টাকা ক্যাশে নিয়েছেন বহু জন। যাঁরা চেকে টাকা নিয়েছেন, তাঁরা অনেকেই আবার ক্যাশ টাকা নিয়েছেন। সেই টাকার কোন হিসেব নেই কমিশনের কাছে।’’
সাংবাদিক প্রসূন আচার্যের এই লেখা পড়তে গিয়ে, মনে হচ্ছে যেন রহস্য–রোমাঞ্চ সিরিজের কোন লেখা পড়ছি। টাকার খেলার কথা পড়তে গিয়ে শিহরিত হয়ে উঠছি বারবার। প্রসূনবাবু লিখছেন :
“কে বা কারা দিয়েছেন, সেটা নিয়ে নানা তথ্য শুনেছি। তবে দক্ষিণ কলকাতার এক হোটেলে ৩৫/৪০ জনকে নিয়ে বৈঠকের পরে একাধিক ক্ষেত্রে দিল্লি যেতে হয়েছে, বা ওড়িশায়। সেখানে বৈঠক হয়েছে। কী করতে হবে, প্রচারে কোন দিক বেশি টেনে করাতে হবে তাই নিয়ে রীতিমতো ক্লাশ নেওয়া হয়েছে। অনেক সময় কন্টেন্ট তৈরি করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। টাকা এসেছে ব্যাগে, বা বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। …..
“যাঁরা চেকে নিয়েছেন বা ক্যাশে, দুই পক্ষের ক্ষেত্রেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তীব্র বিরোধিতার পাশাপাশি দুটি মিল — ক] এঁরা SIR-এর সময় লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দেওয়াকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন এবং খ] এঁরা কলকাতা থেকে গোটা রাজ্য মুসলিম মহিলা-বাচ্চা-পুরুষ-এ ভরে গিয়েছে বলে দিনের পর দিন একটানা প্রচার করেছেন। সঙ্গে দেড় কোটি রোহিঙ্গা বাংলাদেশি মুসলিমের গল্প।…
“সেই টাকায় হুগলি জেলায় কেউ জমি কিনেছেন। হ্যাচারি কিনেছেন। কেউ জলা জমি কিনেছেন। সাবেক মেদিনীপুর জেলায় কোনও মহিলা বিপুল দামি গাড়ি কিনেছেন। দামি ক্যামেরা কিনেছেন। আবার একজন একটু বেশি শিক্ষিত মহিলা ফ্ল্যাট বুক করেছেন। শিক্ষিত জন কেউ নিজের স্টুডিয়ো সাজিয়ে লোক নিয়োগ করেছেন। লোন শোধ করেছেন।…”