
রথ ভাবে আমি দেব, পথ ভাবে আমি
এস আই আর নিয়ে আগেই কিছু কথা বলা হয়েছে। এস আই আর যে একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা ধরা পড়েছে বিজ্ঞজনের বিবেচনায়। কিন্তু এই এস আই আর-এর সিদ্ধান্তটা নিলেন কারা? নির্বাচন কমিশন? জ্ঞানেশ কুমার একা? সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা থেকে (২৯/০৯/২৬) পাওয়া যাবে সে চমকপ্রদ তথ্য।
জিনিসটা শুরু হয় বিহার থেকে। ২০২৫ সালের ২৪ জুন এস আই আরের নোটিশ আসে। জুলাই মাসের ২৮ তারিখে আর টি আই অ্যাকটিভিস্ট অঞ্জলি ভরদ্বাজ নির্বাচন কমিশনের কাছে একটি আর টি আই করে জানতে চান এই এস আই আরের সিদ্ধান্ত কে নিল। জবাবে তাঁকে একটা সার্কুলার পাঠানো হয় –সেই সার্কুলারে এস আই আরের ঘোষণা আছে। অঞ্জলি ভরদ্বাজ তাঁর প্রশ্নের যথাযথ উত্তর না পেয়ে আবার জানতে চান এস আই আরের সিদ্ধান্ত কে নিয়েছেন? নির্বাচন কমিশনের প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি টি সি টম জানান,
‘কমিশন এখনও পর্যন্ত ২০২৫ সালে সারা দেশে এস আই আর শুরু করার কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে নি এবং এইজন্য এই ব্যাপারে কোনও তথ্য দেওয়া যাবে না।’ (‘Appellant is informed that the Commission has so far not taken any decision on initiating a Special Intensive Revision (SIR) across the country in 2025 and hence no information to be provided in this regard .’ — The News Minute, 27/09/26)। অঞ্জলি ভরদ্বাজ তাই দ্য নিউজ মিনিটকে বলেছিলেন :
‘So who made the decision? Was it the PMO or the Ministry of Home Affairs? These are the questions that then arise, and these are serious questions on the independence of this constitutionally mandated body.’ (ওই)
অবাক কাণ্ড!
এস আই আর শুরু হয়ে গেছে, সার্কুলার আসছে, ভোটারদের নাম কাটা যেতে বসেছে, অথচ নির্বাচন কমিশনের কাছে তথ্য নেই এস আই আর কার বা কাদের নির্দেশে করা হচ্ছে।
চলে আসুন বিহারে। ২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর একজন কমিশনারের নোট পাওয়া গেল, সেই নোটে বলা হল : নির্বাচন কমিশনের নামে যে চিঠি ও নির্দেশ পাঠানো হচ্ছে, তা কমিশনের অনুমোদিত নয়।
এ আবার কি!
তার মানে নির্বাচন কমিশন এস আই আরের সিদ্ধান্ত নেয় নি, তার নামে পাঠানো নির্দেশ কমিশনের নয়। তাহলে এস আই আরের নির্দেশ কে বা কারা দিল?
রহস্য ঘণীভূত।
আশ্চর্যের কথা অঞ্জলি ভরদ্বাজের আর টি আই থেকে যে তথ্য বেরিয়ে এসেছে, সে কথা সংবাদ মাধ্যম জানলেও প্রকাশ করে নি। নীরব থেকেছে আদালত। সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় তাই বলেছেন :
“আমাদের মিডিয়া নানা সময়ে অনেক খেলা দেখিয়েছে। কিন্তু এইরকম সম্পূর্ণ জনবিরোধী একটা জিনিসকে (এস আই আর) এইভাবে প্রচার করা এই মিডিয়ার পক্ষেও অভাবনীয় একটা নিচু স্তর। চতুর্থ স্তম্ভকে নিয়ে এত বড় একটা কেলেঙ্কারি ভারতের ইতিহাসে সম্ভবত হয় নি। এবং আদালত। সেখানেও বারবারে উঠেছে এই প্রশ্ন। আদালতের কোথায় কতটা এক্তিয়ার, সে খুব জটিল প্রশ্ন, কিন্তু কার্যত যেটা হয়েছে, পচে যাওয়া এস আই আর এবং নির্বাচন কমিশনের কাজকর্মকে ব্যাণ্ড-এড লাগিয়ে ম্যানেজ দেবার চেষ্টা হয়েছে। আদালত নিয়োজিত আধিকারিকদের দিয়ে এস আই আরকে কোনমতে বৈতরণী পার করানোর চেষ্টা হয়েছে।
“সব মিলিয়ে আদালতের দিকেও প্রশ্নচিহ্ন উঠেছে। আমি তুলছি না। লাইভ ল’ তে পড়লাম, দুদিন আগে দুষ্মন্ত দাভে প্রকাশ্যে বলেছেন — ‘সুপ্রিম কোর্টে প্রচুর দুর্নীতিগ্রস্ত বিচারক আছেন যাঁরা ন্যায় বিচারের ক্ষতি করছেন।’ (দুষ্মন্ত দাভে একজন বরিষ্ঠ আইনজীবী। ‘লাইভ ল’ পত্রিকায় তাঁর বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। ১৭তম কে এম বশির লেকচার দিতে গিয়ে তিনি অভিযোগ করেছেন : ‘The Supreme Court has had many corrupt judges, causing great damage to justice’. He further stated that the judicial system has become skewed in favour of the rich and powerful and has increasingly supported an executive that has become more powerful.’) সিজেপির সৌরভ দাস দেখলাম লম্বা একটা বক্তব্য রেখেছেন টুইটারে। পুরোটা বাংলা অনুবাদ এরকম : ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে এখন হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে একাধিক আবেদন দাখিল করা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, শেষবার যখন নাগরিকরা বিচার বিভাগের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তখন কি ঘটেছিল! নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে সুপ্রিম কোর্ট নিশ্চিত করেছিল যে বাংলায় এস আই আর যেভাবেই হোক করা হবে। যখন গণহারে ভোটার নাম বাদ দেওয়ার পরিণতি উপেক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল তখন সেই বেঞ্চের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এক অসাধারণ মন্তব্য করেছিলেন যে যাঁরা ‘এবার ভোট দিতে পারেন নি তাঁরা পরের বার ভোট দিতে পারবেন’। তাঁকে কে বলবে যে একটি সম্ভাব্য চুরি হওয়া নির্বাচনের জন্য কোন পরের বার নেই? সুতরাং যেহেতু আদালত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, তাই জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে এই নতুন আবেদনগুলি তাঁরা যতবার খুশি শুনুন। তাঁরা যা খুশি আদেশ দিন। কিন্তু জ্ঞানেশ কুমারের জবাবদিহিতার জন্য আমাদের গণতান্ত্রিক দাবি আদালতের ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে না (সাংঘাতিক একটা কথা বলেছেন সৌরভ, এখনও পর্যন্ত কোন বিরোধী দল যা বলতে পারেন নি। আদালত নয়, মানুষের আন্দোলনই শেষ কথা বলে, ইতিহাসকে পালটায়)। জনগণই সিদ্ধান্ত নেবেন। কারণ চূড়ান্তভাবে ভারতীয় গণতন্ত্রের মালিক কোন নির্বাচন কমিশনার বা বিচারপতি নন। এর মালিক আমরা, জনগণ।”
বঙ্গ জয়ের নীল নকশা
২০১৯ থেকে বিজেপি বঙ্গ জয়ের জন্য বড় আকুল। শাসক তৃণমূলের অপকর্ম, দুর্নীতি এসব ছিল হাতিয়ার। হাতিয়ার ছিল কংগ্রেস ও বামেদেরও। কিন্তু তাঁরা তেমন দাগ কাটতে পারেন নি। কেন্দ্রে তাঁদের সরকার থাকলে হয়তো পারতেন। কেন্দ্রে বিজেপির সরকার। শাসক তৃণমূল থেকে বেশ কিছু লোকজনকে কোলে টেনে এনেছেন তাঁরা। সেসব দিয়ে তাঁরা বঙ্গজয়ের যাত্রা শুরু করলেন।
২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনে ফল ভালো হল। দিলীপ ঘোষের নেতৃত্বে লোকসভায় ১৮টি আসন লাভ করলেন। আসন কমল তৃণমূলের। তৃণমূল পেল ২২ টি আসন। এরপর ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচন। ততদিনে শুভেন্দু অধিকারী এসেছেন বিজেপিতে। চরকির মতো ঘুরছেন সারা রাজ্য।
নীলবাড়ি দখলের লক্ষ্যে বিধানসভায় ২০০ আসন চাই। লক্ষ্য বেঁধে দিয়েছেন বিজেপির রণনীতি বিশারদ অমিত শাহ। দলের অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা বলছে টার্গেট থেকে খানিকটা দূরে রয়েছেন তাঁরা। রাজ্যনেতারা চরম আশাবাদী। গত লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের নিরিখে বিধানসভার লড়াইতে সামিল হবেন তাঁরা। শুভেন্দু অধিকারী বলে দিয়েছেন লোকসভা নির্বাচনের ফলের নিরিখে ১২০টি আসনে এগিয়ে রয়েছে বিজেপি, ক্ষমতায় আসতে দরকার আরও ৩০টি আসন, কারণ ম্যাজিক ফিগার ১৪৮। নানা সমীক্ষার রিপোর্টে বিজেপি আশাবাদী। তাঁরা ১৫০ থেকে ১৬০ টি আসনে জিতবেন। কিন্তু ফলাফলে দেখা গেল বিজেপি ৭৭ আসনে আটকে গেল, তৃণমূল পেল ২১৫টি আসন। বিজেপির ভোট শেয়ার কমছে দেখা গেল।
এরপর ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন। ২০১৯-এ বিজেপি ১৮টি আসন পায়, তাদের ভোট শেয়ার ছিল ৪০.৩% ; কিন্তু ২০২৪ সালে বিজেপি পেল ১২ টি আসন, ভোট শেয়ার কমে হল ৩৯.০৯%। কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বাংলায় ৩০-৩৫ টি আসনে জেতার লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হলেও বাস্তব ফলাফল তার ধারে-কাছে পৌঁছাতে পারে নি। গতবারের জেতা মেদিনীপুর, হুগলি, ঝাড়গ্রাম, কোচবিহারের মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আসনে পরাজিত হয়েছে বিজেপি। তবে তারা কাঁথি বা তমলুকের মতো নতুন কিছু আসনে জয় ধরে রাখতে পেরেছে বা ছিনিয়ে নিতে পেরেছে। লোকসভাভিত্তিক আসন কমলেও রাজ্যের প্রায় ৯০-১০০টি আসনে বিজেপি তৃণমূলের থেকে কিছুটা এগিয়ে আছে, যা ২০২১ সালের জেতা ৭৭টি আসনের কিছু বেশি।
শুধু রাজ্য নেতাদের উপর ভরসা করে যে কিছু হবে না সেটা বুঝতে পেরেছিলেন অমিত শাহ। এবার তিনি হাল ধরলেন নিজে। রণনীতি সাজাবার জন্য কলকাতায় বাসা বাঁধলেন। তৈরি হল নীল নকশা।
তৈরি হল একটা যুদ্ধের আবহ। সেনা-আধাসেনা — সিকিসেনায় ছয়লাপ। বোঁ বোঁ করে ঘুরছে তাদের গাড়ি। টহল দিচ্ছে সাঁজোয়া গাড়ি। সৈনাধ্যক্ষ ঘাঁটি গেড়ে বসে আছেন। কোন ত্রুটি রাখতে দেবেন না। তাঁদের পালের গোদা, স্বঘোযিত বিশ্বগুরু, নন-বায়োলজিক্যাল মানুষটিও আসছেন, যাচ্ছেন। বলে যাচ্ছেন যে তিনি ‘সুনার বাংলা’ গড়ে দেবেন।
এই যুদ্ধের প্রস্তুতি অনেক দিন আগে থেকে। তাঁরা বড় বিব্রত হয়ে ভাবছিলেন, মরিয়া না মরে রাম এ কেমন বৈরি! এতো চুরি-চামারি করেছে শাসক তৃণমূল, এতো অপকর্ম, তবু তারা জিতে যাচ্ছে কেমন করে? তাই এবার নীল নকশার খেলা। তাই এস আই আর। বিহারে পরীক্ষা হয়ে গেছে। এস আই আরের আগে রটিয়ে দেওয়া হল বহিরাগত রোহিঙ্গাদের কথা। লক্ষ লক্ষ ঘুষপেটিয়া ঢুকে পড়েছে রাজ্যে। ‘সুনার বাংলা’ গড়ার বাধা তারা। ভোটার তালিকা থেকে ফটাফট নাম বাদ যাচ্ছে। এমন ভাবে বাদ দিতে হবে যাতে শাসক দলের প্রার্থী হেরে যায়। এসবের জন্য আছে নির্বাচন কমিশন আর জ্ঞানেশ কুমার। নির্বাচনী যুদ্ধে নির্বাচন কমিশনও সৈনিক হয়ে গেল। আরও সৈনিক আছে। ইডি আছে, সিবিআই আছে, ইনকাম ট্যাক্স আছে। আছে ধর্মীয় মেরুকরণের জিগির।