
কদিন ধরে বেশ জাঁকিয়ে শীতটা পড়েছে মন্দ না। লোকজন শীতে জবুথবু। রাজ্যের শীত পোশাক গায়ে দিয়ে লোকে রাস্তাঘাটে বেরোয় যেটুকু সে ওই দিনেরবেলা। পারতপক্ষে কেউ রাতের বেলা বেরুতেই চায় না খুব প্রয়োজন না পড়লে। কুয়াশাও পড়া শুরু হয়ে যায় সন্ধ্যে পড়তে না পড়তেই। কদিন ধরে সূর্যিমামা কেমন যেন ন্যাদা মেরে আছেন। কে বলবে যে এই শীতের কটাদিন গেলেই সেই মামার উগ্রমূর্তিতে মানুষ গরমে সেদ্ধ হয়। যে মানুষ গুলো আজ অতিরিক্ত শীতের জন্য তার আদ্যশ্রাদ্ধ করছে তারাই আবার গরমকালে সূর্যিমামাকে গালমন্দ পাড়তে থাকবে। আসলে মানুষের স্বভাবই হয়েছে ওই পান থেকে চুন খসলেই মুখ হাঁড়ি।
তা যাক, আমিতো এখানে মানুষের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে আসিনি বরং এসেছি একটা গল্প বলতে তাও আবার যে সে গপ্প নয় খোদ সেই “তেনা”-দের গপ্প যেটা আমায় খুব ছোট্টবেলায় বেশ কিছুদিন খুব ভয়ে ভয়ে রেখেছিল।
এমনি এক শীতের রাত্রি ছিল সেটা। আমার তখন বয়স কত হবে — মেরেকেটে নয়-দশ মানে ওই নাক দিয়ে বিশুদ্ধ ঘৃত বেরোনোর দিনটা পেরিয়েছি কোন রকম। তবে তখনও মায়ের সেই চাদর দিয়ে মাথা ও সারা শরীরে গিঠিয়ে দেওয়ার থেকে মুক্ত হই নি। গ্রামের বাড়ি। এখানকার মতো গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ ও তখন পৌঁছে নি। তাই রেতেরবেলা কেরোসিন কুপি বা ঠাকুরমার ঠনঠন অর্থাৎ লন্ঠনই ভরসা। কিছু কিছু বাড়িতে অবশ্য হারিকেন লন্ঠন মুখ দেখানো শুরু করেছে। তা গপ্পটা ঠিক সেই আমলের। আসলে আপনারা হয়তো ভাবছেন বলতে তো চাচ্ছি সেই “তেনাদের” গপ্প, তা অতকথা বলার দরকারই বা কি? আমি বলি কি দরকার অবশ্যই আছে মশাই। কারণ সব জিনিসের ক্ষেত্রে দরকার কিনা জানিনা কিন্তু এই গপ্পের ক্ষেত্রে যদি প্রেক্ষাপট না বলা হয় মজাটাই পাবেন না। তাই “ধান ভানতে শিবের গীত” মনে হলেও ক্ষমা-ঘেন্না যে আপনারা করবেন সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিৎ।
তা সেদিন আমরা ছোটরা বাড়ির ভেতরের বৈঠকখানার ঘরে যথারীতি চাটাই (পাতিঘাস দিয়ে বোনা একপ্রকারের আসন) পেতে বসেছি ঠাকুরমার ঠনঠন জ্বেলে। সামনে বই খাতা খোলা থাকলেও শীতের গুঁতোয় হাত বের করে বই খুলে পড়া জারি রাখতে কার বা ইচ্ছে যায়! কারণ বাৎসরিক পরীক্ষা শেষ করে তখন সব্বাই নতুন ক্লাশে উঠে ও গেছি। আমার নাকি শ্রবণ ও ঘ্রাণেন্দ্রিয় খুবই কর্মঠ। রান্নাঘরে মা ঠাম্মা ও বাবার বিধবা পিসী যিনি বাল্যবিধবা এবং জন্মইস্তক এই বাড়িতেই দেখে এসেছি তাঁরা সব্বাই সুরচাকলি ও অন্যান্য পিঠে বানানোয় ব্যস্ত। তার শব্দ ও সুমধুর ঘ্রাণ কানে ও নাকে এসে বারবার মনটাকে বিক্ষিপ্ত করবে তাতে আর আশ্চার্যি কি! কখন রান্না ঘর থেকে ডাক আসবে সব্বাই সেই প্রতীক্ষাই করছি এমন সময় ঝন্টুমামা এসে হাজির। আমরা সব ছেলে পিলের দল হই হই করে উঠলাম। আমার ছোট বোন বুঁচি ছুট্টে গিয়ে মামার কোলে উঠে পড়লো। মামাও তার আদরের ভাগ্নিটিকে দু-দুটো লজেন্স দিলেন আর আমাদের সব্বার কপালে জুটল কেবল একটা করে! লজেন্স হাতে পেতেই কোল থেকে নেমে বুঁচি একছুট্টে রান্না ঘরে গিয়ে মাকে তার আদরের ঝন্টু ভ্রাতার আগমন বার্তা দিলো। আমরাও পড়া তুই শিকেয় ওঠ করে দলবেঁধে রান্না ঘরে। মা কিছুটা গাঁইগুঁই করলে কি হবে বিপত্তারিণী ঠাম্মা পিড়ে পেতে সব্বাইকে সেই সুস্বাদু পিষ্টক রাশি দিয়ে মা কে এক ধমকে চুপ করিয়ে দিলেন। ঝন্টুমামা সহ সব্বাই উদরপূর্তি করার পর আমি মামাকে ধরলাম একটা গল্প বলার জন্য। আর ঝন্টুমামা যে কেমন গপ্প বলেন তা যে না শুনেছেন আমি হলপ করে বলতে পারি যে তার জীবন বৃথা।
ঝন্টুমামা এবারে বেশ কিছুদিন পরেই বাড়িতে এসেছেন। তিনি আগে সব্বার পরীক্ষার ফলাফলের খোঁজ নিলেন। ফলাফল সন্তোষজনক বিবেচনা করে গল্প বলতে রাজি হলেন। আসলে তিনি মানুষটি একটু অন্যরকম।বর্তমান কালের মা-বাবাদের মতো ছেলে-মেয়েদের শুধু দিয়ে যাও দিয়ে যাও এই নীতিতে বিশ্বাসী নন বরং “কিছু পেতে গেলে কিছু দিতে হবে” এই তাঁর জীবন দর্শণ।
ঝন্টুমামা গল্প শুরু করলেন –
তখন পড়ি ওই ক্লাশ নাইন। তোরা তো জানিস বাবা ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা। কোনদিন একজায়গায় বেশিদিন থাকা তাঁর কপালে নেই। সারা পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব সব জেলাই তাঁর ঘোরা। আমি তখন সামনের বচ্ছর বড়ো পরীক্ষা দেবো হঠাৎ বাবার আবার নর্থ বেঙ্গলে পোস্টিং। আমায় নিয়ে তাঁর তখন সে কি দুর্ভাবনা! সামনের বছরই বড় পরীক্ষা তাই এই সময় আমায় নিয়ে নর্থ বেঙ্গলে গেলে পড়াশুনার বিঘ্ন অবশ্যম্ভাবী। আবার মা ও যদি সাথে না যান তবে তাঁর যে ধরনের কাজ তাতে রান্নাবান্না বা সময় মতো হার্টের ঔষধ খেতে না মনে করিয়ে দিলেও আবার বিপদ। কারণ ওই একটা ব্যাপারে আমার বাবা আবার চিরদিনই ভুলো মন। শেষমেশ আমার মামা এসে এই মুস্কিল আসান করলেন। তাঁর কথায় বাবা আমাকে অনেক চিন্তা ভাবনা করে রূপনারায়ণের তীরে একটা নামি আবাসিক স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। স্কুলটি শুধু জেলা নয় তার রেজাল্টের গুণে সারা রাজ্যেই বিশেষ পরিচিত। এই স্কুলের থেকে পাশ করে প্রচুর ছাত্র দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত।
এক শুভদিন দেখে তল্পিতল্পা সহ আমাকে ওই বোর্ডিং হোষ্টেলে রেখে আসা হল। স্কুলটির বিল্ডিং ও হোষ্টেল ঘর গুলো বেশ ঝকঝকে তকতকে তবে নদীর গা ঘেঁসেই। কাছাকাছি গ্রাম থেকে বেশ দূরে মোটকথায় বলা যায় একরকম “ধ্যারধেরে গোবিন্দপুরে”।
তো এখানেও বিদুৎ বাবাজি অনুপস্থিত। স্কুল ক্যাম্পাস বিশাল বেশ কয়েক একর জুড়ে। সেই ক্যাম্পাসের একাধারে নদীর কিনারে বেশ পুরোনো একটা ভাঙা পোড়ো বাড়ি আম জাম তাল তেঁতুলসহ পাম ও আরও অনেক নাম না জানা গাছে ঘেরা। বিশাল এক অশ্বত্থবৃক্ষ সেই বাড়ির উপর গজিয়েছে ও তার লম্বা লম্বা ঝুরি অক্টোপাশের মতো সারা বাড়িটাকে জড়িয়ে ধরেছে। দু-চারটে পুরনো ইঁট ইতস্তত ছড়ানো ছেটানো। রাজ্যের শকুন বাদুড় কাক শামুকখোল ও নানা অজানা পাখি সেখানে গাছের ডালে বাসা বেঁধে বাস করে। রাত -বিরেতে বিভিন্ন শব্দ সেখান থেকে ভেসে আসে।
একদিন এক গরমের সময় রবিবার স্কুল ছুটি। বেশীর ভাগ ছেলেই বাড়ি চলে গেছে। শুধুমাত্র আমার মতো গুটিকয়েক যাদের বাবা -মা দূরে থাকেন তাদের জন্য হোষ্টেল চালু। দুপুরে আমি রুমে বসে বসে কাকাবাবু সিরিজের একটা গল্প পড়ছি এমন সময় ওদিকে অর্থাৎ ওই পোড়ো বাড়ির দিক থেকে হঠাৎ যেন কোন বাচ্চার কান্নার মতো এক বিকট শব্দ ভেসে এল। আমি চমকে উঠলাম সাথে ভয়ও। রুমে কেউ নেই আমি রুম থেকে বেরিয়ে রান্নার ঠাকুর কেষ্টদার কাছে গিয়ে বললাম — কেষ্টদা কেষ্টদা ওদিকে কাদের বাচ্চা যেন কাঁদছে, তুমি কী তার আওয়াজ পেলে?
— ধুর বোকা ছেল্যা! উটা বাচ্চা ক্যামনে হবে, উটা তো তক্ষুকের ডাক। তুই যেন কুনদিন উদিকে যাসনি বলে দিলাম।
— কেন কেষ্টদা কেন?
— -আরে উটা তো পুড়ো বাড়ি, উদিকে বিস্তর সাপ-খোপ আছে। তাছাড়া —
— তাছাড়া কি কেষ্টদা?
— না না তুই শহরের ছেল্যা শুনলে ভয় পেয়ে যাবি —
— কিসের ভয়? আচ্ছা কেষ্টদা ওই পোড়ো বাড়িটা কিসের বা কাদের বাড়ি ছিল?
— আরে উটা তো লীল কুঠি ছেল। উর মস্ত ইতিহাস আছে। সে পরে একদিন তোকে বলব খন।
— না না তুমি এক্ষুনি বলো। আজ তো ছুটির দিন —
— ইটা মোর দাদুর কাছে শুনা। তখন ইদিকে রূপনারাণ নদীর তীরের জমিন খুব উব্বর। যাই লাগাউনা কেন পচুর ফসল ফলে। তাউ না দেখ্যা হেরিংটন নামে এক সাহেব ইদিকে এষ্যা নীল চাষ করার তরে চাষীদের উপর জুলম শুরু করল। বন্দুকের জোরে সাহেব চাষিদের বাধ্য করল লীল চাষ করত্যে। সাহেবটা ছিল বেজায় রাগী। কথায় কথায় গুলি চালিয়ে মানুষকে সে শ্যাল কুকুরের মতো মারত আর গেরামের সুন্দরী বাউড়ি-ঝিউড়িদের দ্যাখলেই তার সিপাইরা গিয়ে তাকে তুলে লিয়ে আসত। সাহেব তার ঘড়ায় চড়্যা সারাদিন ঘুরত। কুন জমিতে কুন চাষী তার কথামত লীল লাগাইল কিনা খুঁজত। এমনি একদিন ঘুরতে ঘুরতে শীতের দুপুর বেলা সেই সাহেবটা না পাশের গেরামের মাঝুর রাস্তা দিয়া যাচ্ছ ল। এমনি সময় সেউ রাস্তা দিয়া সেউ গেরামের শিবেন চক্কোত্তির মেঝ মেয়্যা কুনঠি নু আসসল। সেই মেইঝি নাকি দেখতে ছিল পিতিমার মতন। মাথা থেক্যা হাঁটু পর্যন্ত তার চুল, দুধে আলতার মতন গার অং! তা সাহেব ত তাকে দেখ্যা থ। সাহেবকে দেখ্যা সেই মেইঝি ত ভয়ে কাঠ। সাহেব তার কাছে যেয়া তার দিকে অনেকখন তাকাই রইল। তারপর তার ঘড়া চড়্যা চলে গেল। সেউ দিন রাত্তির বেলা চক্কোত্তি বামুনের ঘরে সাহেবের সিপাই এস্যা হামলা করল। বাধা দিতে যেয়া বামুন কর্তা আর তার দু ব্যাটা সিপাইয়ের গুলিতে মরল। সিপাই গুল্যা মেইঝিটাকে জোর কর্যা তুল্যা লে গেল।
আমি বললাম — তারপর তারপর।
— তাপ্পর সেই সাহেব সেই মেইঝি কে কুঠিয়ে দুদিন বন্দি কর্যা রাখল আর তারুর পরে মাঘ মাসের শীতের অমাবস্যার রাত্তিরে জোর কর্যা তার ইজ্জত লে লিল। মেইঝিটা সেউ রাত্তিরে কুঠি নু ছুট্যা বেরিয়া ভরা জুয়ারের গাঙ্গে ঝাঁপ দিয়া মরে গেচ্ল। যাবার সময় তার পা’র একটা নূপুর কুঠির বাইরে পড়ে ছিল। পরের দিন মায়াচরে তার শরীলটা আটকে ছিল।
আমি বললাম — তারপর?
— এমনিতে ত গেরামের লোকের সাহেবের উপর খুব রাগ ছিল। মেয়াছেনাটার মরার খপর পেয়া আশপাশের সব গেরামের লোক ক্ষেপা গেল। তারা তারুর পরের দিন লাঠি কদাল যে যা পেল হাতে লিয়া কুঠিটা ঘেরা ফেলল আর সাহেব ও তার সিপাই গুলা কে পিট্যা পিট্যা মের্যা কুঠিটায় আগুন দিয়া জ্বালাই দিল। লোকে কয় সেই মেয়াছেনাটার অতিপ্ত আত্তা নাকি এখনও মাঘ মাসের অমাবস্যার রাত্তিরে এই কুঠি থেক্যা নদী পয্য্ন্ত ঘুর্যা বেড়ায়। ওই রাত্তিরে কেউ কেউ নাকি তার পা’র নূপুরের আবাজ ও শুনেছে।
আমি বললাম — সত্যি?
কেষ্টদা বলল — বিশ্বাস না যায় ত তুই এই মাঘ মাসের অমাবস্যার দিন রাত্তিরে থাকিস হোষ্টেলে মুই তোকে শুনাব।
তা হঠাৎবিশেষ সরকারি কাজে পনের দিনের জন্য মাঘ মাসের অমাবস্যার দুদিন আগে বোবা কোলকাতায় এলেন। অমাবস্যার আগের দিন বাড়ি থেকে বাবার সর্বক্ষণের আপ্ত সহায়ক বরেন কাকা এসে আমায় হোষ্টেল থেকে কোলকাতার বাড়ি নিয়ে গেল।
আমি বললাম — মামা তুমি তো তবে নিজের কানে সেই আওয়াজ শোন নি? এখনও কী সেই পায়েলের শব্দ মাঘী অমাবস্যায় শোনা যায়?
মামা বললেন — ঠিকানা দিয়ে দেব পরীক্ষা করে আসিস।