প্রাকৃতিক বিপর্যয়, জলবায়ুর পরিবর্তন আর মাত্রাহীন দূষণে সমুদ্রে মাছের পরিমান দ্রুত কমছে। সমুদ্র দূষণের এই পরিণতি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের নীরব ভূমিকায় দেশের মৎস্যজীবীরা একদিকে যেমন চিন্তিত অপর দিকে সমুদ্র থেকে মৎস্যশিকার ও মৎস্য আহরণ নিয়ে রীতিমত আতঙ্কিত। সমুদ্র উপকূলের যেসব জমিতে উপকূলের মৎস্যজীবীরা মাছের কারবার চালিয়ে থাকেন সেই জমি মৎস্যজীবীদের নামে আজও চিহ্নিত না হওয়ায় রাজ্যের উন্নয়ন থমকে গেছে। মৎস্যজীবীদের সমবায়গুলিও ক্রমশ ধুঁকছে। সমুদ্র, নদী আর জলাশয়ের মৎস্যচাষিদের বর্তমানে নানাভাবে বঞ্চনার শিকার হতে হচ্ছে। রাজ্যের ও দেশের মৎস্যক্ষেত্রের এমন সার্বিক হতাশজনক পরিস্থিতির মধ্যে সমুদ্র নদী আর জলাশয়ের মৎস্যজীবী থেকে মৎস্যচাষিদের বঞ্চনা, হতাশা, প্রত্যাশা আর ক্ষোভের মধ্য দিয়েই শুক্রবার ২১ নভেম্বর ২৮তম বিশ্ব মৎস্যজীবী দিবস উদযাপিত হল।
রাজ্যের পূর্ব মেদিনীপুরের মন্দারমণি নিউ জলধা উপকূলের মৎস্যখটিতে শুক্রবার কাঁথি মহকুমা খটি মৎস্যজীবী উন্নয়ন সমিতির উদ্যোগে ২৮তম বিশ্ব মৎস্যজীবী দিবস উদযাপন ও মৎস্যজীবী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। মৎস্যজীবীদের সর্বভারতীয় সংগঠন ন্যাশনাল ফিস ওয়াকার্স ফোরাম বা এন এফ এফের উদ্যোগে ১৯৯৭ সালে দিল্লিতে আয়োজিত তিনদনের বিশ্ব মৎস্যজীবী সম্মেলনে গঠিত ওয়ার্ল্ড ফিসারমেন অর্গানাইজেশনের সেই সম্মেলনে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুসারে প্রতিবছর ২১শে নভেম্বর সারা বিশ্ব জুড়ে বিশ্ব মৎস্যজীবী দিবস উদযাপিত হয়ে আসছে। রাজ্যের পূর্ব মেদিনীপুরের মন্দারমণি নিউজলধা মৎস্যখটিতে শুক্রবার কাঁথি মহকুমা খটি মৎস্যজীবী উন্নয়ন সমিতির উদ্যোগে ২৮তম বিশ্ব মৎস্যজীবী দিবস উদযাপন ও বিশ্ব মৎস্যজীবী দিবস উপলক্ষে মৎস্যজীবী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে রাজ্যের পূর্ব মেদিনীপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সমুদ্র, নদী আর জলাশয়ের কয়েকশো মৎস্যজীবী, মৎস্যচাষী ও মৎস্য ব্যবসায়ী অংশগ্রহণ করেন।

সম্মেলনে রাজ্যের মৎস্যমন্ত্রী বিপ্লব রায়চৌধুরী বেকার যুবক-যুবতীদের কর্ম সংস্থানের লক্ষ্যে মাছ চাষের মাধ্যমে স্বনির্ভর হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “বর্তমানে চাকুরীর বাজার খুবই খারাপ। মাছ চাষের মাধ্যমে বেকার যুবক-যুবতীদের স্বনির্ভর হয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হবে। নিজেদের বাড়িতে একটি পুকুর থাকলে মৎস্য দফতর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে সেই পুকুরেই মাছ চাষ করলে মাসে পনের হাজার টাকা নিশ্চিত রোজগার করতে পারবেন। সেই কারনে রাজ্যে মৎস্য দপ্তরের মাধ্যমে ব্লকস্তরে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই মৎস্য দফতরের পক্ষ থেকে দুটি পর্যায়ে রাজ্যের এক লক্ষ তিরিশ হাজার বেকার যুবক-যুবতীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর বর্তমানে তৃতীয় পর্যায়ের প্রশিক্ষণ চলছে। “মৎস্যমন্ত্রী বিপ্লব রায়চৌধুরীর কথায়, মৎস্যজীবীদের মৎস্য শিকার, গ্রামাঞ্চলে মৎস্য বিপননের জন্য মৎস্য বিক্রেতাদের বরফ সহ মাছ রাখার মাছের ট্রে থেকে শুরু করে সাইকেল, মোটর সাইকেল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীও দেওয়া এছাড়াও সমুদ্রগামী মৎস্যজীবীদের যন্ত্রচালিত বোট দেওয়া সহ মৎস্যজীবীদের পরিচয়পত্রও দেওয়া হয়েছে । কিছু কিছু সমস্যা থাকলেও আগে বাম জমানার থেকে বর্তমানে মৎস্যজীবীদের মানোন্নয়নে বর্তমান মৎস্য দফতর ও সরকার সচেষ্ট রয়েছে।”

সম্মেলনে উপস্থিত রাজ্যের প্রাক্তন মৎস্যমন্ত্রী ও রামনগরের বিধায়ক অখিল গিরি বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, “রাজ্যের মৎস্যজীবীদের উন্নয়ন ছাড়া বাংলার উন্নয়ন সম্ভব নয়। কৃষি পন্য রফতানি করে যে পরিমাণ বিদেশী মুদ্রা আমাদের দেশে আসে তার কয়েক গুন বেশি বিদেশী মুদ্রা মাছ রফতানি করে আমাদের দেশে আসে। তা সত্ত্বেও দেশের মৎস্যক্ষেত্র ও মৎস্যজীবীরা উপেক্ষিত। সবার আগে মৎস্যজীবীদের উন্নয়নের প্রয়োজন”। প্রাক্তন মৎস্যমন্ত্রী অখিল গিরি সম্মেলনে বলেন, বর্তমান মৎস্যমন্ত্রী বিপ্লব রায়চৌধুরী রাজ্যের মৎস্যমন্ত্রী হলেও উনি মাছ খান না। উনি সম্পূর্ণ নিরামিষ ভোজী।
মৎস্যমন্ত্রী বিপ্লব রায়চৌধুরীর উদ্দেশ্যে প্রাক্তন মৎস্যমন্ত্রী অখিল গিরি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, “মৎস্যজীবীদের জন্য রাজ্য সরকারের ঘোষিত সমুদ্র সথী প্রকল্পের টাকা মৎস্যজীবীরা যাতে দ্রুত পান তার জন্য উদ্যোগ নেওয়ার। অখিল গিরি কথায়, “কৃষিতে যেমন স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি, মৎস্যতেও আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হব।” সম্মেলনে সুন্দরবনের মৎস্যজীবীদের জীবন ও সংস্কৃতি নিয়ে শরীক পন্ডা সম্পাদিত ‘নোনাচাতর’ পত্রিকার উৎসব সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন করেন মৎস্যমন্ত্রী বিপ্লব রায়চৌধুরী। সম্মেলনের উদ্বোধন করেন দীঘা রামকৃষ্ণ সারদা আশ্রমের অধ্যক্ষ স্বামী নিত্যবোধানন্দ মহারাজ। সভাপতি করেন ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনাইটেড ফিশারম্যান অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি ও দীঘা ফিশারম্যান অ্যান্ড ফিস ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক শ্যাম সুন্দর দাস।
মৎস্যজীবী সম্মেলনে কাঁথি মহকুমা মৎস্যজীবী খটি উন্নয়ন সমিতির সম্পাদক তথা বিশ্ব মৎস্যজীবী দিবস উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক লক্ষীনারায়ণ জানা তাঁর স্বাগত বক্তব্যে মৎস্যজীবীদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। খটির জায়গা সমস্যা, সমুদ্র সাথী প্রকল্প চালু, সহ একাধিক সমস্যার কথা তুলে ধরে অভিযোগ করেন, নদী সমুদ্রের বাইরে জলাশয়ের মৎস্যচাষিরা নানা ভাবে বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন।অপরদিকে মৎস্যক্ষেত্রের সমবায় সমিতিগুলি ক্রমশ ধুঁকছে। সুন্দরবন এলাকায় বন দফতরের আগ্রাসন নীতি ও অত্যাচারে মৎস্যজীবীরা জীবিকাচ্যুত হতে চলেছেন। রাজ্য সরকারের ঘোষিত ‘সমুদ্র সাথী’ প্রকল্পের ভাতা আজও মৎস্যজীবীরা পাননি। তিনবছর ধরে ভাতা পাচ্ছেন না মৎস্যখটিগুলিতে কর্মরত সহায়করা। লক্ষীনারায়ণ জানা আরও বলেন, “রাজ্য সরকার অবিলম্বে উদ্যোগী না হলে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মৎস্যজীবী বিপন্ন ও জীবিকাচ্যুত হবেন।”

সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মিন মিত্র, মমরেজ আলী, বিজন মাইতি, পূর্ব মেদিনীপুর জেলা সহ মৎস্য অধিকর্তা সৌরেন্দ্রনাথ জানা সহ মৎস্য অধিকর্তা (মেরিন) সুমন সাহা, মৎস্য দপ্তরের এ আর সি এস রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস, রামনগর-২ পঞ্চায়েত সমিতির মৎস্য কর্মাধ্যক্ষ শেখ সিরাজ, নিতাই দলুই, বিদ্যাসাগর সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাংকের প্রাক্তন সভাপতি প্রদীপ পাত্র, প্রাক্তন সম্পাদক দীনেশ দাস সহ বিভিন্ন মৎস্যজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
sathik tathya paribesan karechhen
সুন্দর। শমীক হবে শরীক ভুল টাইপিং হয়ে গেছে