এক মাসের মধ্যে দু’দুবার কলকাতায় কম্পন অনুভূত হয়েছে। তার আগে কেঁপেছে বাংলা। তাহলে কী বড় বিপদ দরজায় কড়া নাড়ছে? পরিবেশবিদরা বলছেন, সাম্প্রতিককালে এমন কম্পন কখনও অনুভব করেননি। শহরের একটি বহুতল হেলে পড়েছে। পরিবেশবিদের আরও বক্তব্য, আমরা যে পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছি, তাতে দুনিয়া জুড়েই খুব অদ্ভুত ধরনের ভূপ্রাকৃতিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অবশ্যই সেটা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত। তার প্রভাব পড়ছে বলেই এইসব ঘটনা ঘটছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেই উষ্ণায়নের মাত্রা বাড়ছে, বাতাসে কার্বনের মাত্রা বাড়ছে, এমনটা হচ্ছে বলেই ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা ঘটা স্বাভাবিক। অনেকেই বলছেন, আগে তো এতবার ভূমিকম্প হত না! ঠিক কথা, পরিবেশবিদেরা জানাচ্ছেন, একবার জোরালো কম্পনেই মাটির গঠনে পরিবর্তন হচ্ছে। ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে জায়গাগুলি। পরবর্তী সময়ে যখন বৃষ্টির পরিমাণ একই এলাকায় খুব বেশি হয় তাহলে ধস নামার প্রবণতা বাড়ে।
অনেকের প্রশ্ন, ভূমিকম্প কখন, কোথায়, কিভাবে হবে সেটা কী ভবিষ্যৎ বাণী করা যায় না? না, ভূমিকম্প কোথায়, কখন এবং কত তীব্রভাবে ঘটবে তা আগে থেকে সুনির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব নয়। বিজ্ঞানীরা যা বলতে পারেন তা কেবল অতীত তথ্য বিশ্লেষণ করে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে ভবিষ্যতে ভূমিকম্পের সম্ভাবনা বা পূর্বাভাস দিতে পারেন কিন্তু নিশ্চিত করে বলতে পারেন না যে এই জায়গায় এইদিন, এই সময় ভূমিকম্প হবে। কারণ ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়ার মতো নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি এখনো তৈরি হয়নি। তাছাড়া ভূমিকম্প ভূ-অভ্যন্তরের একটি অত্যন্ত জটিল ও আকস্মিক প্রক্রিয়া যা কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই ঘটে। বিজ্ঞানীরা কেবল বলতে পারেন যে কোন এলাকায় (যেমন টেকটোনিক প্লেটের সীমান্ত) সামনে বড় ভূমিকম্প হওয়ার ঝুঁকি বেশি আছে। কিন্তু সেটি ঠিক কোন দিন বা কোন সময়ে হবেতা বলা একেবারেই অসম্ভব। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ভূমিকম্প শুরু হওয়ার পর এবং ধ্বংসাত্মক তরঙ্গ পৌঁছানোর কয়েক সেকেন্ড বা মিনিট আগে সতর্কবার্তা পাওয়া সম্ভব কিন্তু ভূমিকম্প হওয়ার আগে তার খবর পাওয়া যায় না। অনেকেই বিশ্বাস করেন যে কিছু প্রাণী আছে যারা আগে থেকে ভূমিকম্প টের পায় কিন্তু তারও কোনো নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাই ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়ার চেয়ে বিল্ডিং কোড মেনে মজবুত বাড়িঘর নির্মাণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধিই প্রধান নিরাপত্তা কৌশল।
তবে কলকাতায় যে ঘন ঘন ভূমিকম্প হচ্ছে তার বেশ কিছু কারণ আছে। এর মধ্যে প্রধান কারণগুলি হল টেকটোনিক প্লেটের ক্রমাগত নড়াচড়া। বিশেষ করে ভারতীয় প্লেটের এশীয় প্লেটের নিচে উত্তর দিকে এগিয়ে যাওয়া যা বেসিন এলাকার ভূগর্ভস্থ ফাটলগুলিতে চাপ সৃষ্টি করে। এছাড়া নরম পলিমাটিতে গঠিত ভৌগোলিক অবস্থান এবং বাংলাদেশ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সক্রিয় ফল্ট জোনের কাছাকাছি থাকা কম্পনের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয। মানচিত্র অনুসারে, কলকাতা এবং পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ অংশ ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চলের আওতায় পড়ে। এই কথার অর্থ হল এই অঞ্চলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি খুব বেশি না হলেও মাঝারি তো বটেই যাকে একেবারেই উপেক্ষা করা যায়না। সিকিম এবং পশ্চিমবঙ্গের কিছু অংশ সহ উত্তর-পূর্ব ভারত সক্রিয় টেকটোনিক সীমানার কাছাকাছি অবস্থিত। ভারতীয় টেকটোনিক প্লেট উত্তর দিকে ঠেলে চলেছে, যা এই অঞ্চলের ভূত্বকের উপর ক্রমাগত চাপ তৈরি করছে। ভূকম্পবিদরা অনেকদিন ধরেী বলে আসছেন যে, কলকাতার মতো শহরাঞ্চল যেখানে প্রচুর পুরনো বাড়ি আছে এবং কলকাতা শহরের আধিকাংশ বসতি খুব ঘনবসতিপূর্ণ। যদি কাঠামোগত সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার না দেওয়া হয় তবে মাঝারি ভূমিকম্পেরও উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে।
কলকাতার মতো ঘন জনবসতিপূর্ণ শহরে বারবার ভূমিকম্প হয় তার কারণ হিসাবে বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, কলকাতা ভূমিকম্পপ্রবণ ও মৃদু ভূমিকম্পপ্রবণ জোনের মধ্যেই পড়ে। পাশাপাশি, কলকাতার ভূপৃষ্ঠের চার দশমিক পাঁচ থেকে চার দশমিক সাত পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে অসংখ্য চ্যুতি রয়েছে, যার জেরেও প্লেট সঞ্চারনের সময় কম্পন অনুভূত হতে পারে এই শহরে। গত শুক্রবার দুপুর ১টা ২২ মিনিটে যে কলকাতা আচমকা ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজির তথ্য অনুযায়ী সেই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫.৫। কম্পনের উৎসস্থল বাংলাদেশের সাতক্ষীরা থেকে ১৭ কিমি দক্ষিণ-পূর্বে। মাটি থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরে। সাতক্ষীরা থেকে কলকাতার দূরত্ব মাত্র ৮৬ কিলোমিটারের কাছাকাছি হওয়ায় এখানে কম্পন সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। এতেই স্পষ্ট যে কলকাতা সিসমিক জোননের মধ্যেই অবস্থান করছে বা মাঝারি ঝুঁকির অঞ্চল। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা হল শহরটি গঙ্গার বদ্বীপ অঞ্চলের নরম দোআঁশ মাটির উপর দাঁড়িয়ে। ফলে দূরবর্তী উৎসের কম্পনও এই নরম মাটিতে বেশি সময় ধরে অনুভূত হয় এবং বহুতল ভবনে দোলনের মাত্রা বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা তাই বলছেন, কলকাতার যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে। বড় ধরনের ভূমিকম্প না হলেও মাঝারি মাত্রার কম্পনেই বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।