বিহার বিধানসভা নির্বাচনের আগে একদিকে যেমন বিরোধী মহাজোট মহাসংকটে অন্যদিকে একের পর এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থেকে সাংসদের সাম্প্রদায়িক মন্তব্য দেশের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে আরও উলঙ্গ করে ফেলছে। গিরিরাজ সিং; কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, মেডা কুলকার্নি; মহারাষ্ট্র রাজ্যসভার সাংসদ প্রমুখ বিজেপি নেতারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে ধরনের বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন তাতে কেন্দ্রের শাসকদল বা তাদের রাজনীতি প্রশ্নের মুখে না পড়লেও গোটা বিশ্বের কাছে এই দেশের মাথা অবশ্যই হেঁট হছে। হিন্দুত্ববাদীদের কেউ বলছেন, “নমক হারামদের ভোট চাই না”, কেউ বা ঘোষণা করছেন, “শনিাবারওয়াড়ায় নামাজ করতে দেব না।” এ ধরনের সাম্প্রদায়িক এবং আক্রমণাত্মক মন্তব্যের পরও কি গেরুয়া শিবির কোনো চাপে পড়বে না? তবে গত শনিবার বিহারের আরওয়াল জেলায় একটি নির্বাচনী সভায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিরিরাজ সিং প্রকাশ্যেই বলেন, “যে মানুষ সরকার থেকে সাহায্য পায়, তার নৈতিক দায়িত্ব হল সেই সরকারকেই ভোট দেওয়া। যে সাহায্য নিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে ‘নমক হারাম’। আমি ‘নমক হারাম’-দের ভোট চাই না।” সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে এইভাবে তীব্র সমালোচনা করে গিরিরাজ অভিযোগ করেন, তারা বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা নেয় কিন্তু বিজেপিকে ভোট দেয় না। সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমন এখানেই থেমে থাকে না। গত রবিবার পুনের ঐতিহাসিক শনিবারওয়াড়া দুর্গে মুসলিম মহিলাদের নামাজ পড়ার একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর রাজ্যসভার সাংসদ মেডা কুলকার্নি ও কয়েকটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন সেখানে প্রতিবাদে নেমে শনিবারওয়াড়া দুর্গ চত্বর গোমূত্র ছিটিয়ে শুদ্ধিকরণ করেন এবং দুর্গে হিন্দু রীতিতে পুজো করেন। এরপর তিনি টুইটে লেখেন, “শনিবারওয়াড়ায় নামাজ করতে দেব না, হিন্দু সমাজ এখন জেগে উঠেছে।” পরে সাংবাদিকদের বলেন, “এটি হিন্দু স্বরাজ্যের প্রতীক, এখানে নামাজের জায়গা নেই, এটা কোনো মসজিদ নয়।”
প্রসঙ্গত, গত ৪ সেপ্টেম্বর উত্তর প্রদেশের কানপুর শহরে মুসলমানরা নবীজির জন্মবার্ষিকী ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করছিলেন। সেই সময় একটি বোর্ডে টানানো ছিল ‘আই লাভ মুহাম্মদ’। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয় হিন্দুরা থানায় অভিযোগ জানায়। তাদের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ একাধিক মুসলমানের বিরুদ্ধে মামলা করে। অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটস সূত্রে খবর, এ পর্যন্ত ২২টি মামলায় ২,৫০০ জনেরও বেশি মুসলিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। বিজেপি-শাসিত বিভিন্ন রাজ্য থেকে অন্তত ৪০ জন গ্রেফতার হয়েছে। প্রতিবাদে গত ২৬ সেপ্টেম্বর কানপুর থেকে ২৭০ কিমি দূরের বেরেলি শহরে এক স্থানীয় ইমামের আহ্বানে বিক্ষোভ হয়। সেখানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। ঘটনার জেরে পুলিশ ইমাম তাওকির রাজা, তার আত্মীয়স্বজন ও সহযোগীসহ ৭৫ জনকে গ্রেফতার করে। স্থানীয় প্রশাসন বুলডোজার দিয়ে অভিযুক্তদের বাড়ি ভেঙে দেয়। বিভিন্ন রাজ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে পুলিশের জোরদার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের অভিযান বা সন্ত্রাস-এর কারণ একটাই, ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ বা আমি মুহাম্মদকে ভালোবাসি লেখা পোস্টার, টি-শার্ট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার। আই লাভ মুহাম্মদ বা আমি মুহাম্মদকে ভালোবাসি কী মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ? বলা হচ্ছে এই অভিব্যক্তি ‘জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি এবং উসকানিমূলক’।
যদিও দেশের সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতা ও তা প্রকাশের অধিকারের কথা বলে। সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যেক নাগরিকের নিজস্ব ধর্ম পালন ও প্রকাশের স্বাধীনতা আছে। তাছাড়া সংবিধানের ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিক তার নিজের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করেন, যতক্ষণ সেই মত সরাসরি হিংসা বা ঘৃণাকে না উসকে দিচ্ছে। ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ স্লোগান লেখা বা বলার জন্য পুলিশ যাদের গ্রেফতার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের আইনি অভিযোগ জনসমাবেশে ‘উচ্ছৃঙ্খলতা’ সৃষ্টি বা ধর্মীয় উত্তেজনা ছড়ানোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সেই আইন এমন মানুষদের বিরুদ্ধেও প্রয়োগ করা হয়েছে, যারা কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছে বা ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ লেখা টি-শার্ট পরেছে। প্রশ্ন, আই লাভ মুহাম্মদ বলা কী কোনো অপরাধ, সংবিধানের কোন আইনে তা বলা আছে? প্রায় সব হিন্দু দেবতাদের হাতেই অস্ত্র ধরা ছবি দেখা যায়। তার মানে কি ওই সব ছবি মুসলমানদের অপমান করে বা ভয় দেখায়? আমরা সবাই জানি কোনো ধর্মই অন্য ধর্মকে অপমান করে না যেমন কোনো সরকারই কোনো ধর্মকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করতে পারে না। অথচ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী যখন সরাসরি সংখ্যালঘুদের ‘নমক হারাম’ বলছেন অথবা তাদের ভোটকে অবজ্ঞা অবহেলা করছেন তখন তা ঘৃণামূলক অথবা উসকানি, উৎশৃঙ্খলা, উত্তেজনা সৃষ্টিকারী নয় বরং সংবিধানিক বলে গণ্য হয়। এমনকি যখন কোনো সাংসদ সরাসরি হুমকি দিচ্ছেন এখানে নামাজ করতে দেব না অথবা ঘোষণা করছেন হিন্দু সমাজ এখন জেগে উঠেছে, তখনও তা উসকানি, উৎশৃঙ্খলা, উত্তেজনা সৃষ্টিকারী নয়?
দেখা যাচ্ছে ২০১৪ সালের পর থেকেই মানুষের মতপ্রকাশ ও ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্ণিতকরণ হচ্ছে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে এর থেকে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি আর কি হতে পারে। একটি রাষ্ট্রের ভূমিকা তো নাগরিকদের অধিকার সমানভাবে রক্ষা করা, তার বিশ্বাস বা মত প্রকাশে হস্তক্ষেপ করা নয়। কিন্তু গত কয়েক বছরে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে ঘৃণাবর্ষিত মত বা বক্তব্য প্রকাশ ক্রমশ বেড়েই চলেছে। এখনও পর্যন্ত নথিভুক্ত হওয়া তথ্য জানাচ্ছে ২০২৩ সালে ঘৃণামূলক বক্তৃতার ঘটনা ছিল ৬৬৮টি, ২০২৪ সালে তা প্রায় ৭৪ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১,১৬৫টি। আরও আশ্চর্যের বিষয় অধিকাংশ ঘটনাই ঘটেছে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে। লক্ষণীয়, কানপুরে ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ ঘটনার পর, বারাণসীতে হিন্দুত্ববাদী নেতারা শহরের মোড়ে মোড়ে ‘আই লাভ বুলডোজার’ লেখা পোস্টার টাঙিয়ে দেয় মূলত অভিযুক্ত মুসলমানদের ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভাঙার ইঙ্গিত করে। শনিবার ওয়াড়ার ঘটনার পর হিন্দুত্ববাদী নেতা, বিধায়ক ও সাংসদের প্রশ্ন, যদি হিন্দুরা “হাজি আলী”তে হনুমান চালিসা পাঠ করেন, তবে মুসলিমদের অনুভূতিতে আঘাত লাগবে কি না?’ প্রশ্ন, এই ধরনের বক্তব্য কী সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উসকে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট নয়? আসলে যারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন যে দেশের দারিদ্র থেকে বেকারত্ব দূর করা সম্ভব নয় কিন্তু মিথ্যা পরিসংখ্যান পরিবেশনে তারা দক্ষ, তাদের লক্ষ্য হিন্দু বনাম মুসলমান ইস্যু জাগিয়ে রাখা এবং দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুমতবাদ ধ্বংসের সুকৌশল অভিযান চালিয়ে যাওয়া।