ভাষা একটি জাতির আত্মার প্রকাশ, চিন্তার বাহন এবং সংস্কৃতির আদর্শ প্রতিফলন। ভাষার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে একটি সভ্যতা, নির্মিত হয় জাতির পরিচয়। অথচ আজ, বাংলা ভাষা—যা বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম ভাষা—আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক আগ্রাসনের মুখোমুখি।
আলোচনার প্রারম্ভেই ভাষা, জাতিসত্তা এবং আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কিছুটা আলোকপাত প্রয়োজন। বর্তমানে প্রায় ত্রিশ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, নেপাল ছাড়াও মালয়েশিয়া, কোরিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর, মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যসহ বহু দেশে বাংলাভাষীরা ছড়িয়ে রয়েছেন জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে। তবে এই বিস্তার ভাষার সংরক্ষণ নিশ্চিত করে না।
ঔপনিবেশিক শাসনের পরবর্তী সময়েও বাংলা ভাষা ইংরেজি ও হিন্দি ভাষার আগ্রাসনের শিকার। কথিত ‘আধুনিকতা’ ও ‘আভিজাত্য’-এর মোড়কে অনেকেই বাংলা চর্চাকে পিছিয়ে পড়া হিসেবে দেখেন, যা একধরনের ‘লিঙ্গুইস্টিক ইম্পেরিয়ালিজম’। ভাষাবিদ রবার্ট ফিলিপসন বলেন, “Linguistic imperialism occurs when the dominance of one language over others is established and maintained by structural and cultural inequalities।” লর্ড ম্যাকলের শিক্ষা নীতির ফলে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণি গঠিত হয়, যারা পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এর ফলে বাংলা প্রশাসন, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় প্রান্তিক হয়ে পড়ে।
বিশ্বে প্রায় ৬০০০ ভাষা প্রচলিত আছে, কিন্তু ৪৩% চর্চার অভাবে ভাষা বিপন্ন। ফলস্বরূপ প্রতি দুই সপ্তাহে একটি ভাষা হারিয়ে যায়। সঠিক ব্যবহার ও চর্চার অভাবে শত শত মাতৃভাষা বিলুপ্তির পথে।
বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রাসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ক্ষেত্রবিশেষে সাম্প্রদায়িক অপব্যাখ্যা। ধর্মের সঠিক নয়, বিকৃত ব্যাখ্যার দ্বারা বাংলা শব্দ, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে “হিন্দু” বা “মুসলিম” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর ফলে বাংলা ভাষার সার্বজনীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “ভাষা কোনো ধর্মের নয়, কোনো সম্প্রদায়ের নয়—ভাষা মানুষের।” কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন —
“ভাষা মানুষের, তার কোনো ধর্ম নেই; তার আছে হৃদয়, আছে অনুভব।”
প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলা ভাষা আরও কোণঠাসা। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতায় সারা বিশ্বের বাংলাভাষীর জন্য যথাযথ সফটওয়্যার, অ্যাপ বা প্রযুক্তি তৈরি হয়নি। এই ঘাটতি নতুন প্রজন্মকে ইংরেজি বা অন্য ভাষার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ড. আনিসুজ্জামানের বক্তব্য এখানে প্রণিধানযোগ্য—“ভাষা শুধু ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের বাহক।”
বাংলা ভাষার ওপর সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফলে আমাদের বাঙালি মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে। পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে ‘ভ্যালেন্টাইন’ বা ‘ফাদার্স’ দিবস, কিটি পার্টির মতো অনুষ্ঠান জনপ্রিয় হচ্ছে, অথচ আমাদের বৈশাখী উৎসব, পালাগান, নবান্ন, জারি-সারি গান, ভাটিয়ালি, ঈদ, পূজা, বৌদ্ধ পূর্ণিমা, বিয়ের গান ইত্যাদি অবহেলিত হচ্ছে। সেই জায়গা দখল করে নিচ্ছে চটুল হিন্দি, উর্দু বা ইংরেজি গান। ভাষার অবমাননা হচ্ছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, —“জাতির ভাষা জাতির প্রাণ। ভাষার অবমাননা মানে জাতির অবমাননা।”
কানাডায় দীর্ঘ বিশ বছরের অভিবাসী জীবনে অভিজ্ঞতা দেখেছি, বাংলা চর্চার ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধকতা আছে। অনেক বাংলাভাষী ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে বাংলা চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন—পত্রিকা প্রকাশ, ইউটিউব আলোচনা, সাহিত্যচর্চা—তবে সংখ্যায় তাঁরা অল্প। নিউ ইয়র্কে ড. পার্থ ব্যানার্জী (যিনি এই শারদীয়া পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক) বাংলা ভাষার চর্চায় নিরলসভাবে কাজ করছেন। নিউ ইয়র্ক ও কানাডায় কয়েকটি বাংলা সংবাদমাধ্যম যেমনন উত্তর আমেরিকা প্রথম আলো ,বাঙালি ক্যানাডায় বাংলা কাগজ ,বাংলা মেইল ,পরবাসী ব্লগ বিভিন্ন সাহিত্য ও কবিতা সংগঠন কিছুটা হলেও বাংলা ভাষার সংষ্কৃতির নির্ভর চর্চার দিকটা অব্যাহত রেখেছে। আমি নিজেও বাংলা সাংবাদিকতা ও কানাডার মূল ধারার সাহিত্য বাংলায় ভাবানুবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছি ।
তবে একটি দুঃখজনক বাস্তবতা, কানাডায় অধিকাংশ বাঙালি পরিবারে বাংলা ভাষায় কথ্য এবং লিখিত চর্চার দিকটা প্রায় অনুপস্থিত। টরন্টো, মন্ট্রিয়েলসহ বিভিন্ন শহরের বাংলা কৃষ্টিনির্ভর সাংস্কৃতিক সংগঠন দিনের অনুষ্ঠান করে, কিন্তু দিবসকেন্দ্রিক আয়োজন বাংলা ভাষা বিকাশে সহায়ক হচ্ছে না। নতুন প্রজন্মের বাংলা শেখায় পরিবার যথেষ্ট উদাসীন। অথচ বাংলা ভাষা ও কৃষ্টি আমাদের শিকড়।
কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের মতে, ’সংস্কৃতি যদি নিজের শিকড় ভুলে যায়, তবে তা আর সংস্কৃতি থাকে না—তা হয়ে ওঠে অনুকরণ।”
আমরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে কানাডার হ্যালিফ্যাক্সে গৃহপর্যায়ে শিশু-কিশোরদের জন্য প্রতি সপ্তাহান্তে শনিবার বাংলা স্কুল চালু করেছিলাম। শুরুতে অভিবাসীরা ব্যাপকভাবে প্রশংসা করেছিলেন, শিশুদের সানন্দ অংশগ্রহণে মুখরিত থাকত প্রতিটি ক্লাসl কয়েকজন উৎসাহী কানাডিয়ান বন্ধুও ভাষা শিখতে আসতেনl কিন্তু ছয় মাস অতিবাহিত হবার পর অভিভাবকদের উদাসীনতা, বাঙালি সংগঠনের নেতৃত্বে দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত অহংবোধ এবং সার্বিক সহযোগিতার অভাবে এই কার্যক্রমে ইতি টানা অবধারিত হয়ে উঠেl মাতৃভাষা শিক্ষা আমাদের স্বতন্ত্র পরিচয়ের ভিত্তিকে মজবুত করেl যদি সবার মধ্যে দেশপ্রেম, ভাষার প্রতি দায়বদ্ধতার বোধ ও সচেতনতার দিকটা আরও সক্রিয় থাকত, তবে হয়তো কানাডায় হ্যালিফ্যাক্সে হাতেখড়ি বাংলা স্কুল আমরা চালিয়ে যেতে পারতাম।
বাংলা ভাষার আগ্রাসনভিত্তিক এই সংকট নিরসনে আমাদের করণীয়
আদালত, শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা, গণমাধ্যম ও সংস্কৃতিতে বাংলা ভাষার পূর্ণ ব্যবহার
AI, কীবোর্ড, ভয়েস টুলস, বাংলা অ্যাপ, শিশুতোষ বই ও ব্যাকরণভিত্তিক প্রযুক্তি উন্নয়ন
স্কুল পাঠ্যক্রমে ভাষা আন্দোলন ও বাংলা ভাষার ইতিহাস অন্তর্ভুক্তি
রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন, হাসন রাজা তথা সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে প্রতিযোগিতা ও আলোচনা
অভিভাবকদের মাতৃভাষা রক্ষা কল্পে সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা—বাংলা পাঠশালা, সাহিত্যসভা, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম
দেশে ও প্রবাসে প্রজন্মের জন্য বাংলা বই পড়া, আলোচনা ও ভাষাভিত্তিক কার্যক্রম আয়োজন বৃদ্ধি, প্রবাসে নিয়মিত কথা বলা লেখার বিভিন্ন উদ্যোগ।
বাংলা ভাষা শুধু কথার বাহন নয়, এ আমাদের জাতিসত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ ভাষার অস্তিত্ব মানেই আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সংরক্ষণ। ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন —
“ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি।”
মানবতা ও দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেন—
“আমি সেই ভাষার গান গাই, যে ভাষা মানুষের হৃদয়ের ভাষা।”