নামে কি আসে যায়? ইংরেজ নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়রের বিখ্যাত নাটক রোমিও জুলিয়েটের এই উক্তি কিন্তু আমাদের দেশে অনেক কিছুই যায় আসে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমাদের রাজ্যের নাম দীর্ঘ আট বছর পরে কেন্দ্রীয় সরকারের গড়িমসি (?) তে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ‘বাংলা’ হতে না পারা। ২৬ জুলাই ২০১৮ বিধানসভায় সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হল রাজ্যের নাম বদলের প্রস্তাব। সর্বদলমত নির্বিশেষে রাজ্যের ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নাম বদলে নতুন নাম ‘বাংলা’ রাখতে সম্মতি জানিয়েছিল। এরপর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নাম বাংলা করার জন্য কেন্দ্রের অনুমোদনের জন্য জমা দিলেও অনুমোদন মেলেনি সেখানে দেশের আর একটি রাজ্য কেরল ২০২৩ সালে কেরলের নাম কেরলম করার প্রস্তাব জমা দেয়। কেন্দ্রের অতি সক্রিয়তায় মাত্র বছর তিনেকের মধ্যেই ‘কেরল’থেকে ‘কেরলম’ নামকরণ অনুমোদন পেয়ে গেলেও বাংলা বা পশ্চিমবঙ্গের কপালে তা জুটলো না। তাই ‘নামে কি আসে যায়?’ কথাটি অন্তত আমাদের দেশের ক্ষেত্রে খাটেনা। রাজ্যের নাম বাংলা করা নিয়ে বিজেপি শাসিত কেন্দ্রীয় সরকারের এই গড়িমসিকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপি শাসিত কেন্দ্রীয় সরকারের বাংলা ও বাঙালি বিদ্বেষী মনোভাব বলেই মন্তব্য করেছেন। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “বারবার দিল্লি গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে পশ্চিমবঙ্গের নাম বাংলা করার অনুরোধ করছি। ওরা বাংলা ও বাঙালির বিদ্বেষী বলেই ওরা তা করেন নি।” মন্তব্যকে একবারেই উড়িয়ে দেওয়াও যায়না।
স্বাধীনতার পর থেকেই এরাজ্যের নাম পরিবর্তন ও নতুন নাম নিয়ে রাজ্যের বুদ্ধিজীবীও রাজনৈতিক মহলে বিস্তর আলোচনার পর রাজ্যের নতুন নামকরণ ঠিক করা হয় ‘বাংলা।’ ২০১৮ সালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে রাজ্য বিধানসভায় রাজ্যের নাম ‘বাংলা’ সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে পাস হলে তা অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে সুপারিশ পাঠানো হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের গড়িমসিতে আজও সেই সুপারিশ হিমঘরে শায়িত। রাজ্যের নাম পশ্চিমবঙ্গ কিভাবে হয়েছিল তা জানতে আমাদের একটু রাজ্যের ইতিহাসের পেছন পানের দিকে তাকাতে হবে।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় অখন্ড বঙ্গদেশ বা বঙ্গভূমি দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে একদিকে পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টি হয়ে ভারতে আর অন্যদিকে পূর্ববঙ্গ নামে সৃষ্ট হয়ে পাকিস্তানে বা পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভূক্ত হয়। দেশের স্বাধীনতার সময় জিন্নার দ্বিজাতি তত্ত্বে অখণ্ড ভারত মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান আর সংখ্যাগুরু অমুসলমান ও হিন্দুদের নিয়ে ভারত দ্বিখন্ডিত হয় ১৯৪৭ সালে। ভারত ও পাকিস্তান নাম নিয়ে দুই স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। দেশের স্বাধীনতার জন্য এক ভাষাভাষী অখণ্ড বঙ্গদেশকেও জিন্নার দ্বিজাতি তত্ত্বে রাজনৈতিক ভাগ হতে হয়েছিল দুটি স্বাধীন ভূমিখন্ডে। অখণ্ড বঙ্গদেশের সংখ্যাগুরু মুসলমান প্রধান পূর্ববঙ্গ গেল পাকিস্তানে আর সংখ্যাগুরু হিন্দু ও অমুসলমান সম্প্রদায় নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ অন্তর্ভুক্ত হল ভারতে।
কিভাবে ও কিসের ভিত্তিতে অখণ্ড ভারত ও অখণ্ড বঙ্গদেশ বিভক্ত হল তা জানতে আমাদের দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পাতায় নজর দিলে বোঝা যায় ভারতের স্বাধীনতার জন্য জওহরলাল নেহেরু সহ দেশের তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্ব অতি দ্রুত স্বাধীনতা লাভের জন্য জিন্নার দ্বিজাতি তত্ত্ব মেনে নিয়ে দ্বিখন্ডিত ভারতের স্বাধীনতা লাভকেই সমর্থন জানালে ধর্ম ও সম্প্রদায়ের ভিত্তিতেই ভারতকে দ্বিখন্ডিত করেই ভারত ও পাকিস্তান দুই রাষ্ট্রের জন্ম হয়। সিরিল র্যাডলিফ নামে এক ইংরেজের সালিশি অনুযায়ী প্রধানত সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতেই দুই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের ভিত্তিতেই সীমারেখা নির্ধারিত হল। বঙ্গদেশের নদীয়া, যশোহর মালদহ, দিনাজপুর জেলা গুলিতে ভাগ করতে হয়েছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের ভিত্তিতেই ভাগ করতে দিয়েও দেশের শাসন ব্যবস্থার সুবিধা ও নানাবিধ কারনে অমুসলমান প্রধান খুলনা জেলাকে পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তানে ও মুসলমান প্রধান মুর্শিদাবাদ জেলা এদেশের পশ্চিমবঙ্গে রাখতে বাধ্য হলেন সিরিল র্যাডক্লিফ।
র্যাডক্লিফের সীমা নির্ধারণের পর দেখা গেল পশ্চিমবঙ্গের আয়তন দাঁড়ায় অখণ্ড বঙ্গদেশের তিনভাগের এক ভাগ দুটো খন্ডে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সঙ্গে উত্তরখন্ড বা উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং ও পরে কোচবিহার জেলার সঙ্গে যোগাযোগের রাস্তা প্রায় কিছুই রইল না দিনাজপুর জেলার একটা বড় অংশ মুসলমান প্রধানের কারনে পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তানে চলে যাওয়ার কারনে। যোগাযোগের কোন রাস্তাই ছিলনা পাশের বিহার রাজ্যের মাঝখানের একটা অংশ ছাড়া। দিনাজপুর জেলার নকশাল বাড়ির কাছে মাত্র পনেরো কিলোমিটারের এক চিলতে ভূমিভাগ দুই অংশের যোজনার কাজ করা ছাড়া। অপরদিকে দক্ষিণখন্ডে মালদহ ও দক্ষিণ দিনাজপুর নিয়ে একটি ছোট ভূমিখন্ড যার সঙ্গে বৃহদায়তন দক্ষিণ খন্ড বা দক্ষিণবঙ্গের একটি সরু যোগ ভূমি হল ফারাক্কায়। এই যোগভূমি দিয়েই গঙ্গা নদী বয়ে যাচ্ছে দু’ভাগ হয়ে-একটি ভাগীরথী হয়ে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে দিয়ে আর একটি পদ্মা হয়ে পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তানে। নদীর এই দুই ধারার সঙ্গমস্থলই হল বঙ্গোপসাগর। ভারতের স্বাধীনতা লাভ ও দেশ বিভাগের সময় পশ্চিমবঙ্গ ৭৮ হাজার স্কোয়ার কিলোমিটার আয়তন ও ১৪টি জেলা নিয়ে ভারতের একটি অঙ্গপ্রদেশ হিসেবে পরিগণিত হয়। স্বাধীনতার পরেই বোঝা যায় দেশভাগের সময় দুইদেশের সীমারেখা নির্ধারণে সিরিল র্যাডক্লিফের সীমারেখা নির্ধারণ গোটা ব্যাপারটাই ছিল মূলত জোড়াতালি দেওয়া গোছের।
স্বাধীনতার পর ১৯৫০ সালে দেশীয় রাজ্য কুচবিহার ভারতের সঙ্গে যুক্ত হলে কোচবিহারের সমগ্র এলাকা পশ্চিমবঙ্গে অন্তর্ভূক্ত হয়। এরপর ১৯৫৪ সালে ফরাসী উপনিবেশ চন্দননগর পশ্চিমবঙ্গের অঙ্গীভূত হয়। ১৯৫৬ সালের রাজ্য পূনর্গঠন আইনে ভাষাগত কারনে বিহারের পূর্ণিয়া জেলার পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলের পশ্চিমবঙ্গের আওতায় আনা ছাড়াও বিহারের পুরুলিয়া জেলার একটা বড় অংশকেও ভাষাগত কারনে পশ্চিমবঙ্গে যুক্ত করে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মূল আয়তন ৭৮ হাজার স্কোয়ার কিলোমিটার থেকে বেড়ে ৮৭ হাজার ৬৭৬ স্কোয়ার কিলোমিটারে রূপায়িত হয়ে বর্তমান অবস্থায় আসে। যদিও রাজনৈতিক সুবিধাবাদের কারনে আসামের বাংলা ভাষাভাষী গরিষ্ঠ গোয়ালপাড়া জেলাকে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি। রাজনৈতিক সুবিধাবাদের কারনেই যেমন রাজ্যের প্রকৃত আয়তনের সীমারেখা নির্ধারিত থেকে বঞ্চিত থেকেছে স্বাধীনতার পর থেকেই তেমনই রাজ্যের নাম বদল নিয়ে কেন্দ্রের বিজেপির সরকারের বাংলা ও বাঙালি বিদ্বেষী কারণেই দীর্ঘ আট বছরেও রাজ্যের নাম পশ্চিমবঙ্গ থেকে ‘বাংলা’-য় পরিবর্তন হল না।
It is a pathetic decision of Central Govt. It should take care as a social/ National manner, not as a political system. Pl take care as soon as possible on this matter.