দেশে ২০২৬ সালের কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ হবে ১ ফেব্রুয়ারি তার আগে বাজেট নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রথমত বাজেটের দিনটি পড়েছে রবিবার। যদিও এবারই প্রথম নয়, ১৯৯৯ সালেও রবিবার বাজেট পেশ হয়েছিল এবং তখনও ছিল এনডিএ জমানা। সেই বছর প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর অর্থমন্ত্রী যশবন্ত সিনহা রবিবার বাজেট পেশ করেছিলেন। তখন অবশ্য ২৮ ফেব্রুয়ারি বাজেট হত। ২০১৭ সালের পর থেকে বাজেট পেশ শুরু হয় ১ ফেব্রুয়ারি। অরুণ জেটলী অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন বাজেটের তারিখ পরিবর্তন হয়। উল্লেখ্য, ২০১২ সালে সংসদের প্রথম অধিবেশনের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১৩ মে রবিবার বিশেষ অধিবেশন বসেছিল। পরবর্তীতে ২০২০ সালেও রবিবার করোনা পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে সংসদের অধিবেশন হয়েছিল। আগে ব্রিটিশ আমলের নিয়ম অনুযায়ী ফেব্রুয়ারির শেষ দিনে বাজেট পেশ করা হত। এবং নতুন অর্থবর্ষ শুরু হওয়ার আগে সংসদে ‘ভোট অন অ্যাকাউন্ট’ পাশ করিয়ে সরকারের প্রাথমিক খরচ চালানোর অনুমতি নেওয়া হত। কিন্তু এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া নতুন অর্থবর্ষের প্রথম কয়েক মাসের ব্যয় নির্বিঘ্নে চলত। অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি এই প্রথায় পরিবর্তন আনেন এই যুক্তিতে যে, নতুন আর্থিক বছর শুরুর আগে অর্থাৎ ১ এপ্রিলের আগেই সংসদে বাজেট সংক্রান্ত সমস্ত আইনগত অনুমোদন সম্পন্ন করা। অন্যদিকে বিনিয়োগকারী ও আর্থিক বিশ্লেষকদের দিক থেকেও রবিবারের বাজেট সুবিধাজনক। কারণ শেয়ার বাজার সোমবার খুলবে, রবিবার পুরো দিন হাতে থাকলে বিনিয়োগকারীরা বাজেট বিশ্লেষণ, কর কাঠামোর পরিবর্তন, সরকারি ব্যয়, পরিকাঠামো বিনিয়োগ ও বিভিন্ন খাতের প্রভাব মূল্যায়ন করার সময় পাবে এতে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।
মধ্যবিত্ত থেকে শিল্পপতি, কৃষক থেকে চাকরিপ্রার্থী — সবাই তাকিয়ে সরকার রেলপথ থেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য থেকে পরিকাঠামো, কর্মসংস্থান থেকে স্টার্টআপ এবার কী বড় ঘোষণা করতে চলেছে? একদিকে এবারের বাজেটের সঙ্গে মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, ডিজিটাল অর্থনীতি, গ্রামীণ উন্নয়ন থেকে শুরু করে মানুষের দৈনন্দিন জীবন জীবন যেমন জড়িয়ে অন্যদিকে, সামনে একাধিক রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন অর্থাৎ জাতীয় রাজনীতিতে রয়েছে বিরাট সমীকরণ। সরকারের কাছে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি বজায় রাখা, বিনিয়োগ বাড়ানো, পরিকাঠামো শক্তিশালী করা এবং সাধারণ মানুষের ব্যয়বহুল জীবনে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারেও এই ধারাবাহিকতা সরকারের আর্থিক নীতিতে স্থিতিশীলতার বার্তা দেয়। এই বাজেট থেকে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা করছাড় ও মূল্যবৃদ্ধিতে স্বস্তি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে আরও বরাদ্দ।যুবসমাজ চায় নতুন চাকরি ও স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প।কৃষক চায় ন্যূনতম সহায়তা ও আধুনিক কৃষি পরিকাঠামো। শিল্পপতিরা চায় বিনিয়োগ-বান্ধব নীতি ও ট্যাক্স রিফর্ম। সব মিলিয়ে বলা যায়, বাজেট ঘিরে দেশজুড়ে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। তাই নজর থাকবে সরকার কতটা ভারসাম্য রাখতে পারে উন্নয়ন, মূল্যনিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে।
বাজেট যত এগিয়ে আসছে, সাধারণ মানুষের আশা-প্রত্যাশাও বাড়ছে। কেন্দ্রীয় সরকার বাজেটে আয়করের কাঠামোয় পরিবর্তন আসতে পারেবলে মনে করা হচ্ছে, নতুন কর কাঠামোয় মধ্যবিত্তদের জন্য আরও ছাড় বা অন্য সুবিধার ব্যবস্থা করতে পারে বলে বিশেষঙ্গদের মত। কর বিশেষঙ্গদের মত, গৃহ ঋণের সুদের হার এবং স্বাস্থ্য বিমার প্রিমিয়ামে ছাড়- বর্তমানে এই সুবিধা শুধুমাত্র পুরনো কর কাঠামোয় পাওয়া যায়, যারা নতুন কর কাঠামোয় আয়কর জমা দেন, তারা এই সুবিধা পান না। মনে করা হচ্ছে, এবারের বাজেটে ৮০ডি ধারাকে নতুন ও পুরনো- দুই কর কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। প্রবীণ নাগরিকদের জন্য ছাড় আরও বেশি দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি হোম লোনের সুদে ফ্ল্যাট ডিডাকশন বা বেতনে এইচআরএ (HRA)-তেও ছাড়ের আবেদন জানানো হয়েছে। যেহেতু প্রপার্টি বা সম্পত্তির দাম বাড়ছে, ইএমআই বাড়ছে, তাই ২-৩ লাখের বদলে আরও বেশি ছাড়ের দাবি জানানো হয়েছে। কর বিশেষজ্ঞরা এও মনে করছেন, সেভিং ও ফিক্সড ডিপোজিটে উচ্চ হারে সুদের ছাড় হতে পারে।
তবে যে কোনো বছরের বাজেটে সাধারণ মানুষ যে প্রশ্নটিকে সবথেকে সামনে রাখেন তা হল, দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কি কমবে? ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেট নিয়েও সেই দিকেই তাকিয়ে সাধারণ মানুষ। দ্রুত বিক্রয়যোগ্য ভোগ্যপণ্য বা এফএমসিজি -র বিরাট সংস্থাগুলির প্রত্যাশা, এবারের বাজেটে এমন কিছু ঘোষণা আসবে যাতে একদিকে পণ্যের দাম কমে, অন্যদিকে মানুষের হাতে খরচ করার মতো বেশি টাকা থাকবে। বাজারের প্রধান দাবি— সাবান, ডিটারজেন্ট, প্রসাধনী-সহ দৈনন্দিন ব্যবহারের একাধিক পণ্যের উপর জিএসটি কমানো হোক। বর্তমানে এই ধরনের বহু পণ্যের উপর ১৮ শতাংশ হারে জিএসটি ধার্য রয়েছে। বিশেষঙ্গদের মতে, এই করের হার যদি ৫ শতাংশে নামানো যায়, তাহলে পণ্যের দাম কমবে এবং ক্রেতার সংখ্যা বাড়বে। এর সরাসরি সুফল পাবে মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক বাজেট।
পরিশেষে বলতে হয় নতুন কর ব্যবস্থায় স্বাস্থ্য বিমার প্রিমিয়ামে ছাড় নেই। ২০২৬-এর বাজেটে নতুন রেজিমেও এই সুবিধা চালু হওয়ার প্রত্যাশা করে সাধারণ মানুষ। বর্তমানে গৃহঋণের সুদে ছাড় থাকে খুবই সীমিত। বাড়ির দাম বেড়েছে। তাই এই সীমা বাড়িয়ে ৫ লক্ষ টাকা হোক চায় মধ্যবিত্ত। লেট-আউট প্রপার্টির ক্ষেত্রে প্রকৃত ভাড়ার উপর কর নেওয়া এবং ৩০ শতাংশ স্ট্যান্ডার্ড ডিডাকশন দেওয়ার কথাও মধ্যবিত্তের ভাবনায়। বর্তমানে ছ’টি টিডিএস রেট রয়েছে। সেগুলি যথাক্রমে ০.১%, ১%, ২%, ৫%, ১০% এবং ২০%। মধ্যবিত্ত চায় এটি কমিয়ে ১ শতাংশ ও ৫ শতাংশ করা হোক। ২০২৫ সালে অনেকের রিফান্ড দেরিতে এসেছে। তাই রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং ড্যাশবোর্ড তৈরি ও রিফান্ডে সুদ বাড়ানোর আশা করে।