‘পিতা আমি তপস্যায় নির্গত হব’— ছোট মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে বিস্মিত হন রাজা ধর্মধ্বজ। অনেক তপস্যার ফলে রানী মাধবীর কোল আলো করে এসেছে এক কন্যা সন্তান। জন্মগ্রহণের পর তার ছোট্ট পায়ের তলায় অত্যন্ত শুভ পদচিহ্ন দেখে রাজা বুঝতে পেরেছেন স্বয়ং লক্ষ্মী অংশে জাত এই কন্যা। রাজা তারপর নাম রাখলো তুলসী। অসাধারণ এই কন্যাটি ছোট থেকেই ছিলেন বিষ্ণু ভক্ত।
কিন্তু এত ছোট বয়সে কন্যাকে যে তপস্যায় যেতে দিতে মন চায়না। তবু যাকে ধরে রাখা যায় না তাকে বেঁধে রাখবেন কী করে!
চন্দ্রমার শ্রীযুক্ত এই কন্যা ধন-সম্পদ ত্যাগ করে চলে গেলেন বদ্রিকা আশ্রমে। হিমালয়ের নির্জনে প্রায় এক যুগ ধরে অন্ন জল গ্রহণ না করে শুরু করলেন এক কঠোর তপস্যা। অবশেষে তুলসীর তপসায় তুষ্ট হয়ে পিতামহ ব্রহ্মা উপস্থিত হলেন বদ্রিকা আশ্রমে। ব্রহ্মা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কন্যা তুমি কি বর চাও? কেন এই দুস্কর তপস্যা শুরু করেছো?’
তুলসী বললেন, ‘আমি গোলোকে কৃষ্ণের সেবা করতাম। রাধিকার অংশজাত বলে রাধিকারও প্রিয় সখী ছিলাম। কিন্তু রাধিকাই হলো আমার জীবনের বড় কাল। একদিন আমার সঙ্গে কৃষ্ণকে হাসিমুখে কথা বলতে দেখে রাধা ক্ষুদ্ধ হলেন। কৃষ্ণকে যথেচ্ছ বাক্য শোনালেন উপরন্তু আমাকে তিরস্কার করে অভিশাপ দিলেন, ‘গোলকে থেকে তোমার আর কাজ নেই তুমি ধরিত্রীতে গিয়ে মানুষের ঘরে জন্ম নাও।’
রাধিকার কাছে অভিশপ্ত হয়ে আমি কাঁদতে লাগলাম। আমার মনের একটাই কষ্ট ছিলো, ধরিত্রীতে জন্মগ্রহণ করলে নারায়ণের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটবে, সেই বিরহ আমি সহ্য করব কি করে! শ্রীকৃষ্ণ আমার মনের কষ্ট বুঝতে পারলেন। তিনি আমাকে সান্তনা দিয়ে বললেন, ‘তুমি ধরিত্রীতে গিয়ে তপস্যা কর। সেখানে ব্রহ্মা তোমাকে বরদান করবেন। পিতামহের বর গ্রহণ করে তুমি আবার আমাকে পতিরূপে লাভ করবে।’ তাই আমি এই কঠিন তপস্যা পালন করছি। আপনি আমাকে এখন নারায়ণকে পতিরূপে লাভ করার বরদান করুন।”
তুলসীর কথা শুনে ব্রহ্মা বললেন, ‘শোন তুলসী গোলকে কৃষ্ণ অংশসম্ভূত সুদামা নামে এক সুদর্শন গোপ ছিলেন। তিনি তোমাকে গোলকেই কামনা করতেন। কিন্তু শ্রীরাধার ভয়ে নিজের ভালোবাসার কথা প্রকাশ করতে পারেননি। একদিন কৃষ্ণ বিরজা নামে এক গোপীর সঙ্গে বিহার করলে রাধিকা তাকে তিরস্কার করতে থাকেন। রাধিকাকে কৃষ্ণের প্রতি কটূবাক্য প্রয়োগ করতে দেখে সুদামা ক্রুদ্ধ হন। সুদামার ক্রোধ দেখে রাধিকা অভিশাপ দেন, ‘পৃথিবীতে দৈত্য হয়ে জন্মগ্রহণ করো’। রাধিকার অভিশাপে সুদামা ধরিত্রীতে দৈত্য বংশে রাজা শঙ্খচূড় হয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন। এখনো শঙ্খচূড় তোমাকে কামনা করে। তোমার জন্য তপস্যা করে আমার কাছ থেকে তোমাকে স্ত্রী রূপে লাভ করার বর গ্রহণ করেছেন। আমার বরদান তো মিথ্যা হয়ে যেতে পারে না। সুতরাং কিছুকাল তুমি শঙ্খচূড়ের স্ত্রী হিসেবে অতিবাহিত করবে। তারপর নারায়নকে পতিরূপে লাভ করবে। শোনো তুলসী দৈবকারণে অভিশপ্ত হয়ে তুমি বৃক্ষরূপ লাভ করবে এবং বৃক্ষদের মধ্যে প্রধান হয়ে থাকবে। তোমার পত্র ছাড়া কোন দেবতার পূজা হবে না। বৃন্দাবনে তোমার নাম হবে বৃন্দাবনী বৃক্ষ।’
ব্রহ্মা বরদান করলে তুলসী তাঁকে বললেন, ‘পিতামহ আপনি যা আদেশ করবেন আমি তা পালন করব এক মনে। যে ভাবেই হোক আমি কৃষ্ণকে চাই। কিন্তু কৃষ্ণকে লাভ করতে গেলে রাধিকা প্রধান বাধাস্বরূপ হয়ে দাঁড়ান। আর আমি শ্রী রাধিকাকে অত্যন্ত ভয় পাই। আপনি আমার কোন মন্ত্র দিন যাতে আমার মন থেকে রাধিকার প্রতি ভয় দূর হয়।’
তুলসীর কথা শুনে ব্রহ্মা তাকে ‘রাধিকা মন্ত্র’ প্রদান করলেন যে মন্ত্র জপ করলে রাধিকার প্রতি ভীতি দূর হবে এবং এতদিনে তপস্যা জনিত ক্লেশও দূর হবে। সেই মন্ত্র ধারণ করে তুলসী তপস্যার ক্লেশ থেকে মুক্তি পেয়ে সুন্দর হয়ে উঠলেন। ব্রহ্মার কথামতো অপেক্ষা করতে লাগলেন দৈত্যরাজ শঙ্খচূড়ের জন্য।
এদিকে ব্রহ্মার কাছে বর লাভ করে শঙ্খচূড়ও ভারত পরিক্রমায় নির্গত হলেন। অবশেষে বদ্রিকা আশ্রমে দুজনের দেখা হল। তুলসীকে দেখা মাত্রই শঙ্খচূড় গোপীরূপে চিনতে পারলেন। তিনি তুলসীকে বিবাহের প্রস্তাব দিলেন। অবশেষে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন।
শঙ্খচূড় তপস্যা করে ব্রহ্মার কাছ থেকে বর পেয়েছিলেন যে, তাঁর স্ত্রীর সতীত্ব যতদিন বজায় থাকবে, ততদিন তিনি অমর থাকবেন। বিবাহের পর শঙ্খচূড়ের মধ্যে অসুরসুলভ ভাবের প্রকাশ ঘটতে লাগলো, অসম্ভব অত্যাচারী হয়ে উঠলেন তিনি। দেবতাগণ অতিষ্ট হয়ে ব্রহ্মা এবং মহাদেবের সঙ্গে চললেন নারায়ণের কাছে। নারায়ন সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে বললেন, শিবের সঙ্গে যুদ্ধের সময় তিনি শঙ্খচূড়ের স্ত্রীর সতীত্ব হরণ করবেন।
শিবের সঙ্গে শঙ্খচূড়ের ভয়ঙ্কর যুদ্ধের সময় নারায়ণ শঙ্খচূড়ের বেশ ধরে তুলসীর কাছে আসেন এবং তুলসীর সতীত্ব নষ্ট হয়। ফলস্বরূপ শিবের হাতে শঙ্খচূড়ের মৃত্যু হয়। স্বামীর মৃত্যুর খবর পাওয়া মাত্রই তুলসী বুঝতে পারেন নারায়ন তার সঙ্গে ছলনা করেছেন। রাগে উন্মত্ত হয়ে তুলসী নারায়ণকে অভিশাপ দেন তিনি যেন হৃদয়হীন শিলায় পরিণত হন। মাথা পেতে তাঁর অভিশাপ গ্রহণ করেন। তুলসীর অভিশাপে নারায়ণ শালগ্রাম শিলায় পরিণত হন।
তুলসী নিজেদের দেহ পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন।
ক্রোধ কমলে তুলসী বুঝতে পারেন, তিনি স্বয়ং ভগবানকে অভিশাপ দিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু নারায়ণ যে ভক্তের ভগবান। তখন নারায়ণ তাকে বরদান করেন, সতীসাধ্বী রুপে তিনি মর্তলোকে পূজিত হবেন এবং নারায়ণ পুজা তুলসী পত্র ছাড়া অসম্পূর্ণ থাকবে। এরপর নারায়নের কৃপায় তুলসীর শরীর গণ্ডকী নদীতে পরিণত হয় এবং তুলসীর কেশ (মতান্তরে তুলসীর দেহভস্ম) থেকে তুলসী বৃক্ষের উৎপত্তি হয়। অপরদিকে শিবের সাথে যুদ্ধের সময় শূল দ্বারা নিহত শঙ্খচূড়ের অস্থি স্বয়ং মহাদেব লবণ সমুদ্রের নিক্ষেপ করেন এবং শঙ্খচূড়ের সেই অস্থি থেকেই শঙ্খের উৎপত্তি ঘটে। ধর্মীয় কাজে তাই শঙ্খ এবং তুলসীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
তুলসী বৃক্ষে পরিণত হওয়ার পর তুলসীর সাথে শালিগ্রাম শিলার বিবাহ হয়। ধর্মীয়ভাবে ‘তুলসী বিবাহ’ অনুষ্ঠিত হয় কার্তিক মাসের দেবউত্থান একাদশীর পরের দিন, কার্তিক শুক্লা দ্বাদশী তিথিতে। ভগবান বিষ্ণুর শালগ্রাম রূপের সাথে এই বিবাহ ‘তুলসী বিবাহ’ নামে পরিচিত, যা বিবাহ ঋতুর সূচনা করে।
আবার প্রতি বছর ২৫ ডিসেম্বর দিনটি ‘তুলসী পূজন’ দিবস হিসেবে পালিত হয়। শাস্ত্রমতে তুলসী গাছে দেবী লক্ষ্মীর বাস। আবার তুলসীর আর এক নাম বিষ্ণুপ্রিয়া। এ কারণে তুলসীর পুজো করলে লক্ষ্মীর পাশাপাশি শ্রীহরির আশীর্বাদ পাওয়া যায় এবং ব্যক্তির জীবন সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরে ওঠে।
শুধু ধর্মীয় নয়, তুলসী একটি গুরুত্বপূর্ণ ঔষধি গাছ। এর পাতায় জীবাণুনাশক গুণ রয়েছে এবং এটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য উপকারী।
যে বাড়িতে তুলসী গাছ থাকে, সেখানে শান্তি ও সমৃদ্ধি বিরাজ করে বলে বিশ্বাস করা হয়।