ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার হামলা এবং প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে আটক করার পর থেকে সেই দেশ যে অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাতে কী ভারতের অর্থনীতি কিংবা জ্বালানি-সম্পর্কিত কোনো সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা আছে? এ বিষয়ে ভারত ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের মতামত হল- না, আমেরিকার এই ধরনের পদক্ষেপে ভারতের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা খুবই কম এবং ভারত জ্বালানি-সম্পর্কিত সমস্যারও সম্মুখীন হবে না। জিটিআরআই-এর রিপোর্ট অনুসারে নতুন শতাব্দীর প্রথম দশকে ভারত ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের একজন প্রধান ক্রেতা ছিল। আমেরিকার নিষেধেই ভারত ২০১৯ সাল থেকে ভেনেজুয়েলা থেকে তেল আমদানি কমাতে এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম কমাতে বাধ্য হয়েছিল। ফলত ওই সময় থেকেই ভারত-ভেনেজুয়েলার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক কমতে থাকে। পরবর্তীতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্পৃক্ততা খুব সীমিত হয়ে পড়ে। ২০২৪-২৫ সালে ভেনেজুয়েলা থেকে ভারতের মোট আমদানি ছিল মাত্র ৩৬৪.৫ মিলিয়ন আমেরিকান ডলার, যার মধ্যে অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ ছিল ২২৫.৩ মিলিয়ন আমেরিকান ডলার৷ পাশাপাশি ভেনেজুয়েলায় ভারতের রফতানির পরিমাণ দাঁড়ায় মোট ৯৫.৩ মিলিয়ন আমেরিকান ডলারে, যার মধ্যে ওষুধ ছিল প্রধান পণ্য। জিটিআরআই-এর হিসাব থেকেই বোঝা যায় যে আজকের পরিস্থিতি, কম পরিমাণ বাণিজ্য, এবং ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে ভেনেজুয়েলার অস্থির পরিস্থিতি ভারতের অর্থনীতি বা জ্বালানি নিরাপত্তার উপর তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না।
তা স্বত্বেও ভেনেজুয়েলার উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির আঁচ এসে লেগেছে নয়াদিল্লিতে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোরকে বন্দি করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়ার ঘটনার পর যখন আন্তর্জাতিক মহলে নিন্দার ঝড় ওঠে, তখনও ভারত অত্যন্ত সতর্কতামূলক অবস্থান নেয়। একদিকে ভেনেজুয়েলাতে থাকা ভারতীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সতর্কবার্তা জারি, অন্যদিকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শান্তি ফেরানোর আর্জি — এই দুইয়ে মিলে ভেনেজুয়েলার ঘটনায় মোদী সরকার ভারসাম্য বজায় রাখার পথেই হাঁটছে। পরবর্তী সময়ে আমেরিকার ভেনেজুয়েলা অভিযানের ঘটনায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ভারতের পক্ষে গভীর উদ্বেগের বিষয়। তারা পরিস্থিতির উপর বিশেষভাবে নজর রাখছে। তারা এও জানায়, ভেনিজুয়েলার জনগণের নিরাপত্তার প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতিতে আরও জানিয়েছে, ভারত ভেনেজুয়েলার জনগণের মঙ্গল, নিরাপত্তা, শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকলকে আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানাচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে ভারত দক্ষিণ আমেরিকার ওই দেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের জন্য সতর্কবার্তা জারি করেছে মাত্র। মূল ঘটনা নিয়ে কোনও মন্তব্য করেনি। দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের জন্য সতর্কবার্তা জারি করেছিল নয়াদিল্লি। তবে মূল ঘটনা নিয়ে কোনও মন্তব্য করা হয়নি। মনে করা হচ্ছে ভেনেজ়ুয়েলার মাদুরো-হরণে আর্থিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে কী লাভ হবে, সেই হিসাব কষা শুরু করে দিয়েছে ভারত। খনিজ তেলে সমৃদ্ধ কারাকাসে বড় বিনিয়োগ ছিল এ দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ওএনজিসি বিদেশ লিমিটেডের (ওভিএল)। বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক দিক থেকে নয়াদিল্লির সুবিধা হতে পারে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
অন্যদিকে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি অব্যাহত রাখায় ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের ওপর আরও কঠোর শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও ভারত রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ায় ট্রাম্প যে চটেছেন সেকথা তিনি স্পষ্ট করেই জানিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, ‘ভারত রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা খুব শিগগিরই তাদের ওপর আরও বেশি শুল্ক আরোপ করতে পারি’। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রশংসা করে তাকে ‘দারুণ মানুষ’ হিসেবে অভিহিত করলেও ট্রাম্প বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদী জানতেন আমি খুশি নই। আমাকে খুশি রাখা ওর জন্য জরুরি ছিল’। এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, মোদী তাকে রুশ তেল কেনা বন্ধের বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন, যদিও ভারত সরকার তখন বিষয়টি অস্বীকার করেছিল। এবারও সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থ এবং জ্বালানি নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই তারা সিদ্ধান্ত নেবে। সস্তায় তেল পাওয়ায় পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর বদলে রাশিয়ার ওপর ভারতের নির্ভরতা বাড়ছে। এখন চীন ও ভারতের মতো দেশগুলোই রুশ তেলের প্রধান আমদানিকারক। তবে ট্রাম্পের এই নতুন হুঁশিয়ারি দুই দেশের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন সৃষ্টি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনা কি উচিত হয়েছে আমেরিকার? বিশ্ব জুড়ে এখন এই প্রশ্নই উঠছে। ট্রাম্পের বন্ধু দেশ কিংবা রিপাবলিকানেরা ছাড়া প্রায় কেউই আমেরিকার অভিযানকে ভাল চোখে দেখছেন না। শুধু বিদেশে নয়, আমেরিকার মধ্যেও ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা চলছে। শিকাগো, ওয়াশিংটনের রাস্তায় জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন আমেরিকানরা। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের নিন্দা করেছেন ডেমোক্র্যাটরাও। তাঁদের নেত্রী কমলা হ্যারিস ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ‘বেআইনি’ বলে কটাক্ষ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ কখনওই আমেরিকাকে সুরক্ষিত বা শক্তিশালী করবে না’। কমলার মতে, মাদুরোকে স্বৈরাচারী, নিষ্ঠুর, অবৈধ শাসক বলে কখনওই ট্রাম্প এ ধরনের হামলায় যুক্তি খাড়া করতে পারেন না! শুধু একা হ্যারিস নন, নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিও নিন্দা করেছেন ট্রাম্প প্রশাসনের। তাঁর দাবি, ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প।