বীরভূমের অজ গাঁয়ের দুরন্ত লক্ষীন্দ্র সরেন, অঙ্কিতা বৈদ্য, সনৎ মাঝি, রাধা কিসকু, পরম বৈদ্য, কৃষ্ণ কিসকু আর অভী কর্মকারদের চোখে এখন ভবিষ্যতের স্বপ্ন। যাদের শৈশবের দিনগুলি কেটে যাচ্ছিল ফেরি করে, ইটপাঁজার সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে বা জমিতে চাষের কাজে বা চায়ের দোকানের কাপ প্লেট ধোয়ার কাজে শিশু শ্রমিক হিসেবে। আজ তাদের ক্ষতবিক্ষত নরম হাতে স্লেট, পেন্সিল, সহজপাঠ। এমনই ছবি পাঁউশী অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রমের বীরভূম জেলার গাংটে শাখার শিশু শিক্ষাকেন্দ্রে।
রুটি রোজগারের কঠিন লড়াইয়ের সঙ্গে পরিচিত অঙ্কিতা, কৃষ্ণ, সনৎ, রাধা আর লক্ষীন্দ্ররা প্রতিদিন পাঁউশি অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রমের বীরভূমের গাংটে শাখার শিশু শিক্ষা কেন্দ্রে হাজির হচ্ছে। বর্ণপরিচয়ের সঙ্গে পরিচয়ের এই সুযোগ হয়ত ওদের কাউকে কাউকে পৌঁছে দেবে উজ্জ্বল ভবিষ্যতে।

সমাজের আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া অবহেলিত অসহায় দরিদ্র মানুষের সেবার উদ্দেশ্যে রাজ্যের বীরভূম জেলার সিউড়ির কাছে গাংটেতে পাঁউশী অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রমের বীরভূমের গাংটে শাখা দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে অসহায় আদিবাসী ও তফশীল মানুষদের জন্য শিক্ষা, খাদ্য, বস্ত্র ও স্বাস্থ্য পরিষেবার কাজ করে চলেছে।
শিক্ষা আনে চেতনা এই ভাবনায় এলাকার আদিবাসী ও সমাজের পিছিয়ে পড়া অন্যান্য জাতির ছেলেমেয়েদের মধ্যে শিক্ষা ও চেতনার উন্মেষ ঘটানোর জন্য অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রম তাদের শুভানুধ্যায়ী কিছু মানুষজন ও সংস্থার সহযোগিতায় ‘রেবতী শিশু শিক্ষা কেন্দ্র’ নামে একটি প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্র গাংটে শাখায় চালু রয়েছে। এই রেবতী প্রাথমিক শিশু শিক্ষা কেন্দ্রে বীরভূম জেলার সিউড়ির গাংটে ও আশেপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামের আদিবাসী ও অন্যান্য জাতির ১৭৫ জনের বেশি ছেলেমেয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান দেওয়া হয় বলে অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রমের বীরভূম শাখার ইন চার্জ মনা বৈদ্য জানালেন। মনা বৈদ্যের কথায়, “প্রতিদি পাঠদান দেওয়া ছাড়াও ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাকেন্দ্রে সকালের জলখাবার ও স্কুল চলাকালীন উপস্থিত ছাত্রছাত্রীদের মিড ডে মিল বা দ্বিপ্রাহরিক আহার দেওয়া হয়। এছাড়াও আশ্রমের পক্ষ থেকে ছাত্রছাত্রীদের বই খাতা, কাগজ, কালি, ব্যাগ, জামাকাপড় ও স্কুল ইউনিফর্ম দেওয়া হয়।”

পাঁউশী অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রমের কর্ণধার বলরাম করণ জানান, “পথে ঘাটে ঘুরে বেড়ানো ও শিশু শ্রমিকদের সুস্থ নাগরিক হিসাবে বিকাশের, শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের লক্ষ্যেই আশ্রমের পক্ষ থেকে এই উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি সার্থক ভাবেই চলছে আশ্রমের কর্মসূচি শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায়।”

বীরভূমের গাংটে শাখায় এলাকার বয়স্ক কর্মহীন মানুষদের জন্যও একটি কমিউনিটি কিচেন চালু করা হয়েছে করোনা কারনে সামাজিক জীবন অচল হয়ে পড়ার পর থেকেই। সেই সময় থেকেই দীর্ঘ ছ-বছর ধরে বয়স্ক কর্মহীন মানুষদের আশ্রমে সকালের প্রস্তাব ও মধ্যাহ্ন ভোজনের ব্যবস্থা চলে আসছে। সেখানে প্রতিদিন গাংটে ও আশেপাশের এলাকার ৮৬ জন কর্মহীন, দরিদ্র অসহায় মানুষ প্রতিদিন প্রাতরাশ ও মধ্যাহ্ন ভোজন করে আসছেন। এছাড়াও শারদ উৎসবের সময় তাঁদের অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রমের পক্ষ থেকে নতুন বস্ত্র দেওয়া হয়।”

অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা বলরাম করণ জানান, “বীরভূম জেলার গাংটেতে অবস্থিত অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রমের বীরভূম শাখায় দীর্ঘদিন ধরেই শাখার ভারপ্রাপ্ত মনা বৈদ্য সাফল্যের সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্রে আদিবাসী সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদের শিক্ষাদান ও কর্মহীন মানুষদের জন্যও কমিউনিটি কিচেনের মাধ্যমে মধ্যাহ্ন ভোজনের ব্যবস্থা আগামীদিনে সহৃদয় শুভানুধ্যায়ী মানুষজনের সহযোগিতায় আরও বেশী মানুষদের আশ্রমের সমাজকল্যাণ কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত করে আগামীদিনে এক রঙিন ভোরের সম্ভাবনায় আশ্রমের কর্মীরা নিরলস কাজ করে চলেছে।”