শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | দুপুর ২:৪৪
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নির্বাচন পরবর্তী মিয়ানমার-রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীচৈতন্যদেব গরুড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক : অসিত দাস বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দোলউৎসব : রিঙ্কি সামন্ত পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এলেন রবীন্দ্রনাথ : প্রবুদ্ধ পালিত এসআইআর-এর নামে ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ সরব দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ঘন ঘন কেঁপে উঠছে কেন : তপন মল্লিক চৌধুরী জহির রায়হান-এর ছোটগল্প অনমিতা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘কান্না হাসির দোলায়’ আ শর্ট ট্রিপ টু ‘জামশেদপুর’ : রিঙ্কি সামন্ত নয় টাকা কেজি দরে বারো লক্ষ টন আলু কিনবে রাজ্য সরকার : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় এআই ইমপ্যাক্ট সামিট নিয়ে প্রশ্ন অনেক উত্তর কম : তপন মল্লিক চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার বাবার রসবোধ : সৈয়দ মোশারফ আলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি বই যেভাবে বদলে দিয়েছিল তলস্তয়কে : সাইফুর রহমান কেন্দ্রের দ্বিচারিতায় দীর্ঘ আট বছরেও পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হল না : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আলুর পর্যাপ্ত ফলন, প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-এর ছোটগল্প ‘ট্র্যাপিজ’

মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য / ২৬৪৭ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৫

খবরের কাগজটা কোলে নিয়ে অনাথ আশ্রমের বারন্দায় বসে আছে ঝিল। প্রথম পাতার খবরটা ওকে আরও একবার ঝাঁকিয়ে দিয়েছে। সার্কাসের তাঁবুতে মিস্ রুনার দুর্ঘটনায় মৃত্যু। যে মেয়ে আট বছর বয়স থেকে ট্র্যাপিজের খেলায় অভ‍্যস্ত, অনুশীলনের সময় সে কিভাবে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে? তদন্ত চলছে।

ঝিল চোখ বন্ধ করে ফেলে। বন্ধ চোখের সামনে ও স্পষ্ট দেখতে পায় ট্র্যাপিজের দড়িগুলো ঝুলছে। একটা দড়ি থেকে অন্য দড়িতে নিজেকে দিব্যি ভাসিয়ে দিচ্ছে এক সুন্দরী তরুণী। দর্শকদের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে, কিন্তু তরুণীর কোনো পরোয়া নেই। অনায়াসে লাস্যে জীবন দোলায় দুলছে। হঠাৎই দড়ি ছিঁড়ে যায়। তরুণী নিচে পড়ে তালগোল পাকিয়ে যায়। ঝিল শিউরে উঠে অনুভব করে যেন ও নিজেই সেই তরুণীটি। ভয়ে, কষ্টে মুখ থেকে বেরিয়ে আসে “উঃ:” । চোখ খুলে যায় ওর। ভাবে, এসব কি স্বপ্ন!

তখন থেকেই ঝিল বসে আছে। কিন্তু ওর মনের সমস্ত সত্তা ঘিরে এখন শুধুই অতীত। ছোট থেকেই ছকে বাঁধা নিয়মের বাইরে চলতে পছন্দ করা ঝিল বড়োলোকের একমাত্র সন্তান হওয়া সত্ত্বেও কোনোদিন বিলাসিতায় গা-ভাসায়নি। গরীব দুঃখীদের অসহায়তা অনুভব করতে পারত। পড়াশোনা শেষ করে ওর সমবয়সীরা যখন নিজেদের কেরিয়ার তৈরী করতে ব্যস্ত তখন ও যোগ দেয় একটি এনজিওতে, যারা পথশিশুদের উন্নতিকল্পে কাজ করে। এসব কাজে ও বাবার সমর্থন সবসময় পেলেও ওর মা মেয়ের এই বাউণ্ডুলেপনায় বিরক্তই ছিলেন। ঝিল ওর স্বভাবসিদ্ধ হো হো হাসিতে মায়ের বিরক্তি কে নস্যাৎ করে দিত।

সেইসময় এনজিওর অধীনে থেকে ঝিল নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে পারছিল না। তাই প্রান্তিক শিশুদের কাছে পৌঁছাতে ও নিজেই একটি এনজিও তৈরী করে। ওর এনজিও “বনানী” বঞ্চিত শিশুদের পাশে পৌঁছে যায় ওদের মুখে হাসি ফোটাতে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়ায় এনজিও “বনানী”। ঝিলের এই উদ্যোগে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। বিভিন্ন সেমিনারে এনজিওর কর্মকাণ্ড তুলে ধরে ঝিল। এইরকমই একটি সেমিনারে ওর পরিচয় হয় সৌম্য দর্শন তরুণ অধ্যাপক অয়ন বাসুর সাথে। অর্থনীতির অধ্যাপক।

পরিচয় ধীরে ধীরে গাঢ় হয়। কিন্তু এই আপাতঅস্থির ডাকাবুকো, অতি-আধুনিকা মেয়ে যে কিনা কথায় কথায় ঠোঁটে সিগারেট গুঁজে ধোঁয়ার রিং বাতাসে উড়িয়ে হো হো হাসিতে ফেটে পড়ে তার প্রেমে বিপরীত মেরুর শান্ত, গভীর জীবনবোধ সম্পন্ন অয়ন কিভাবে হাবুডুবু খায় তা বোধহয় স্বয়ং ঈশ্বরও জানেননা। সময়ের সাথে সাথে অয়নের দিক থেকে প্রস্তাব আসে সম্পর্কের পরিণতি দেওয়ার জন্য।

ঝিলের জীবনদর্শন সম্পূর্ণ আলাদা। ও জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে। অয়নের প্রস্তাবে ও কিছুটা সময় নেয়, তারপর শান্ত কিন্তু দৃঢ়ভাবে বলে, “দ‍্যাখো অয়ন, বিয়ে আমার জন্য নয়। ওতে আমার বিশ্বাস নেই। তবে আমরা চাইলেই একসাথে থাকতে পারি। আমার মতে সম্পর্ক বাঁচে ভালোবাসায়, কোনো নামে নয়।”

অয়ন জানে ঝিলকে ওর নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরানো কঠিন; তবুও বলে

“সমাজকে কি এত সহজে অস্বীকার করা যায়? একটু ভেবে দেখ ঝিল, তোমার ‘বনানী’ তো এই সমাজের পিছিয়ে পড়া বাচ্চাদের কথাই ভাবে। আর এমন নামহীন সম্পর্ক আমার মা-বাবা আত্মীয়স্বজন কেউ এটা মেনে নেবে না”।

তুড়ি মেরে সমাজের নিয়মকানুনকে উড়িয়ে দেওয়া ঝিল গোঁ ধরে থাকে, “জীবন আমাদের দুজনের অয়ন, অন্য কারুর মেনে নেওয়া না নেওয়ায় কি আসে যায়?’

তবুও অয়ন ওকে বোঝাতে চায়, আমরা প্রত্যেকেই পরিবারের অংশ। তাই নিজেদের ভালোবাসার সাথে পরিবারের সম্মানের কথা ভুললে চলবে না।”

ঝিল মুহূর্তে ঝেড়ে ফেলে অয়নকে। বলে, “পথ দ‍্যাখো, আমার পথ অন্য।”

আহত অয়ন বুঝতে পারে ঝিলকে তার মতের থেকে একচুলও নড়ানো যাবে না। কিন্তু ঝিলকে ও প্রাণের থেকেও বেশী ভালোবাসে। তাই ঝিলের প্রস্তাবেই রাজী হয়।

ঝিল খুশী হয়ে জড়িয়ে ধরে অয়নকে। সেদিনই দুজনে নিজেদের সিদ্ধান্তের কথা বাড়িতে জানায়।

ঝিল নিশ্চিত ছিল যে ওর বাবা ওকে সমর্থন করবে কিন্তু ঝিলের বাবা পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে কাজে সমাজের মঙ্গল হয় শুধুমাত্র তাতেই তাঁর সমর্থন আছে। যদি ঝিল আইন অনুযায়ী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় তবে ও যাকে পছন্দ করবে তাকেই তিনি সাদরে জামাতারূপে গ্ৰহণ করবেন। কিন্তু এই সমাজ বহির্ভূত সম্পর্কে তাঁর সায় নেই। বাবার প্রতি আস্থা কোথাও যেন টলে যায়। আহত হয় ঝিল।সেদিনই বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে ও চলে আসে অয়নের বাড়ি।

অয়নের বাবা সুধীর বাসু ওদের জানিয়ে দেন, যে সম্পর্কে সমাজের সায় নেই তাকে স্বীকার করার ক্ষমতা তাঁর নেই। অয়নকে বলেন যে সে এই ধরনের সম্পর্কে জড়ালে তিনি নিজেকে নিঃসন্তান মনে করবেন।

অয়ন বাবার মতকে সম্মান জানিয়ে ঝিলকে সাথে নিয়ে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়। সেদিনের মতো একটা হোটেলে গিয়ে ওঠে। বাড়ি ছাড়লেও জেদী ঝিল অয়নের বাড়ির কাছাকাছি থাকতে চায়। বলে, “দেখো আমরা যদি ভালো থাকি তাহলে তোমার মা-বাবাও বস্তাপচা বিয়ের ধ‍্যানধারণা ফেলে দিয়ে আমাদের মেনে নেবে। তাছাড়া তুমি ওঁদের একমাত্র ছেলে, ওঁদের প্রতি দায়িত্ব তুমি অস্বীকার করতে পারো না।”

অয়ন আবার নতুন করে ঝিলের প্রেমে পড়ে; ভাবে, ঝিলের ভেতরের এই সুকুমার বৃত্তিটাই বোধহয় ওদের সম্পর্কের রসায়ন।

এরপর নতুন ভাড়াবাড়িতে ওদের আস্তানা ওরা মন দিয়ে সাজিয়ে তোলে। ঝড়ের গতিতে ওদের জীবন এগিয়ে চলে। ওদের ভালো থাকার খবর বাসু পরিবার আর চ‍্যাটার্জ্জী পরিবারের কানে পৌঁছলেও ওরা দুই পরিবারের কাছেই ব্রাত‍্য থাকে। সময় থেমে থাকে না। বছর গড়ায়। সন্তানসম্ভবা ঝিল, এই খবর দুই বাড়িতেই পৌঁছায়, কিন্তু কেউই উৎসাহ দেখায় না।

অয়ন বলে, “ঝিল এবার আমাদের বিয়েটা সেরে ফেলা দরকার। আমাদের সন্তানের স্বার্থে।”

ঝিল অবুঝ, “কেন?”

“দ‍্যাখো ঝিল আমাদের সন্তানের কাছে শুধুমাত্র জন্মদাতা নয়, আমি বাবা হয়ে উঠতে চাই। সমাজ নাহলে ওর দিকে আঙুল তুলবে।”

“তুমি তো জানো অয়ন, সমাজের চোখরাঙানিকে আমি কোনোদিনই ভয় পাই না। আমাদের ভালোবাসার সন্তানও সমস্ত বাধার সামনে সোজা হয়ে দাঁড়াবে।”

অয়ন চুপ করে যায়। বোঝে ঝিলের সঙ্গে এনিয়ে কথা বলে কোনও লাভ হবে না।

দুই

ফুটফুটে নল। অয়ন আর ঝিলের সন্তান। বয়স এখন পাঁচ। ঝিলের সমস্ত মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু নল। কিন্তু অয়ন? সব দায়িত্বই সুন্দরভাবে পালন করে, তবুও কোথায় যেন একটা খামতি থেকে যায়। অয়ন এটা নিজেও বোঝে, কিন্তু প্রাণখুলে ছেলেকে কাছে টেনে নিতে পারে না। ঝিলের মনে লাগে, আবার মেনেও নেয়, ভাবে, সবাই তো আর একরকম হয় না। সব দায়িত্বই তো ও সুন্দরভাবে পালন করছে। নিজের কাজের সময়টুকু বাদ দিয়ে ঝিল আরও বেশী করে আঁকড়ে ধরে নলকে, যেন ভালোবাসার কোনও খামতি না থাকে নলের জীবনে।

এমনসময় এক রবিবার সকালে সুধীর বাসু আসেন ওদের বাড়ি। ভারী খুশি হয় ঝিল, অয়ন। সুধীরবাবু বলেন, আমি তোমাদের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়তে আসিনি। ছেলেকে বলেন, তোমার সন্তান যেহেতু বাসু পরিবারের বংশধর তাই আমি চাই না ও বড়ো হয়ে নিজেকে শিকড়হীন আগাছা ভাবুক। তাই এবার থেকে প্রতি রবিবার আমি ওকে নিয়ে যাব, সারাদিন পরে ওকে আবার ফিরিয়ে দিয়ে যাব। এটুকু করা আমার দায়িত্ব বলেই মনে করি। অবশ্য তোমাদের যদি সম্মতি থাকে তবেই। অয়ন, ঝিল সাগ্ৰহে সম্মতি দেয়।

এরপর থেকে নল প্রতি রবিবার ওর দাদু ঠাকুমার সাথে কাটিয়ে আসে। কিন্তু অয়ন ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে থাকে। নলের প্রতি সবরকম দায়িত্ব পালন করে, কিন্তু নলকে ঠিক সহ‍্য করতে পারে না। আগে কখনোসখনো মদ খেত অয়ন। কিন্তু কোনোদিনও বেসামাল হতে দেখেনি ঝিল। এখন প্রতিদিনই সন্ধ‍্যেবেলা বাড়িতে বসে ড্রিঙ্ক করছে। মাঝমধ‍্যে আবার বন্ধুবান্ধব জুটিয়ে আসর জমাচ্ছে।

নল বড়ো হচ্ছে। ঝিল যতই আধুনিকা হোক না কেন ও বোঝে যে এতে নলের ক্ষতি হচ্ছে, ওর কচি মনের ওপর চাপ পড়ছে। অয়নকে বোঝাতে চেষ্টা করে। তাতে বিপত্তি বাড়ে বৈ কমবে না।, চিৎকার চেঁচামেচি করে অয়ন। বাবার কাছে ব্রাত্য হওয়াটা ও মেনে নিয়েছিল, কিন্তু সেখানে নলের আধিপত্য ও মেনে নিতে পারে না।নল এখন ক্লাস টুয়েলভ্। সামনে হায়ারসেকেণ্ডারী পরীক্ষা।

এখন আর ওর দাদু আসেন না। ও নিজেই রবিবার ছাড়াও ছুটির দিনগুলো দাদু ঠাকুমার সাথে কাটাতে ওই বাড়ি চলে যায়। নল ওর মাকে বোঝে, ভালোবাসে। কিন্তু বাবার সামনে পারতপক্ষে যায় না। ওর সঙ্গে অয়নের এখন শুধুই স্বার্থের সম্পর্ক। কিছু প্রয়োজন হলে নল বলে এটা চাই, ওটা চাই। অয়ন বিনাবাক‍্যব‍্যয়ে ওর হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।

দিন যায়। এক সন্ধ‍্যেবেলা অয়ন এক বন্ধুকে নিয়ে মজলিশ বসিয়েছে। ঝিল বাড়ি নেই। এনজিওর কাজে বেড়িয়েছে, ফিরতে রাত হবে। বাড়িতে নল। পড়াশোনায় ব‍্যস্ত। কিন্তু মাঝেমাঝেই ড্রয়িংরুম থেকে ছিটকে আসা হুল্লোড়ে ওর মনোসংযোগে ব‍্যাঘাত ঘটছে। ও ওঠে। দরজা বন্ধ করবে বলে এগিয়ে যায়। ভারী পর্দার ওপার থেকে অয়নের বন্ধুর গলা, “আরে ইয়ার, বিয়ে তো করিসনি, ভয় কি? যাতায়াতের পথ তো ভাই খুলেই রেখেছিস, চল আজ একটু মস্তি করে আসি।”

নল দাঁড়িয়ে পড়ে। কিছুই বুঝতে পারে না, কাকুটা কি বলছে? কানে আসে অয়নের গলা, চুপ কর। নল ঘরে আছে। শুনতে পাবে।

বন্ধুর গলা, “আরে ছাড় ইয়ার, ও কি তোর বিয়ে করা বউয়ের ছেলে! সাময়িক উত্তেজনার ফসলকে সার, জল দিচ্ছিস, এই ঢের।

কেউ যেন নলের কানে গরম সীসা ঢালে, ও নড়তে পারে না।

তারপরেই কানে আসে, “এই যে সংসার সংসার খেলছিস, তার তোর পার্টনার এত রাত পর্যন্ত কোথায় কি করে তার হিসাব কি দেয় তোকে?

“ঝিলের এনজিওর কাজের সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট ধারণা আছে রে, ও বড়ো ভালো মেয়ে।”

“ফোট, সংসার করবো অথচ বিয়ে করবো না, সে আবার ভালো, চল চল আমার সঙ্গে।”

অয়ন আর ওর বন্ধু বেড়িয়ে যায়।

নল কি করবে বুঝতে পারে না। ওর জন্মের সামাজিক স্বীকৃতি নেই? ওর নিজেকে ক্ষণিক আনন্দের ঘৃণ্য কীট মনে হয়। রাত দশটায় ঝিল বাড়ি ফেরে। নলের ঘরে যায়। ঝিলকে দেখে নলের যেন বমি পায়।

চিৎকার করে ওঠে নল, “বেরিয়ে যাও এখান থেকে।”

ঝিল কিছু বুঝতে পারে না। শুধু বলে তোর বাবা কোথায়?

বাবা! কে বাবা? অয়ন বাসু? তোমার সঙ্গী?

হতচকিত ঝিল, এসব কি বলছিস নল?

কেন কিছু ভুল বললাম? নল বলে,তোমার নাগর গেছে অন্য ফুলে মধু খেতে।

— চুপ। ঠাস করে চড় মারে ছেলের গালে।

আমার গালে চড় মেরে কিস্‌সু হবে না ঝিল চ‍্যাটার্জ্জী। তোমরা এ ডালে ও ডালে উড়ে বেড়াচ্ছ আর নর্দমার পোকার মতো বেড়ে ওঠা আমার গায়ে আজ জারজ তকমা।

নল, আমি তোর মা। আমার সর্বস্ব দিয়ে তোকে ভালোবাসি। আর্ত চিৎকার করে ঝিল।

— একদম চুপ, নল চিৎকার করে, বেরিয়ে যাও এখান থেকে।

— ঠিক আছে বাবা, আমি যাচ্ছি। তুই শান্ত হ। শুধু তোকে একটা কথা বলি, আমার সবটুকু জুড়ে শুধু তুই আছিস নল, শুধু তুই। ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে যায় ঝিল।

তিন

রাত বারোটা। ডাইনিং টেবিলে ঝিল বসে আছে। ওর ভেতরে তোলপাড় চলছে। অয়ন ফেরেনি। নিজের ঘরের দরজা খুলে নল ডাইনিং টেবিলে এসে চেয়ার টেনে বসে। ঝিল ভাবে নল হয়তো স্বাভাবিক হয়েছে। কিন্তু কি করে ও এসব জানলো তা ঝিল বুঝে উঠতে পারে না। যাইহোক খাবার বেড়ে দেয় নলের সামনে। নল গভীর ভাবে ঝিলকে দ‍্যাখে। বলে, তোমার খাবারও বেড়ে নাও। অনেক সকালে বেরিয়েছো।

ঝিল ভাবে ছেলের সাময়িক উত্তেজনা কেটে গেছে। ঝিল নলকে বলে, দ‍্যাখ্ জীবনে অনেকরকম পরিস্থিতি আসতে পারে, শিরদাঁড়া সোজা রেখে আমরা মা ছেলে মিলে তার মোকাবিলা করবো। যদি প্রয়োজন হয় তোকে নিয়ে আমি অন্য কোথাও শিফ্ট করে যাবো।

নির্লিপ্ত নল, কিছুই বলে না। চুপচাপ খেয়ে নিজের ঘরে চলে যায়।

ঝিল ঠিক করে আজ অয়ন ফিরলে ওর সাথে কথা বলবে। যা নলের অগোচরে ছিল তা সামনে এল কিভাবে, এভাবে সবকিছু তছনছ হতে দিতে ও পারে না। জেগে অপেক্ষা করে অয়নের জন্য। রাতের গাঢ়তা কেটে ভোর হয়। বিপর্যস্ত বেসামাল অয়ন ভোর পাঁচটায় বাড়ি ফেরে। ঘৃণায় মুখ ঘুরিয়ে নেয় ঝিল। কোনোমতে নিজের ঘরে গিয়ে অয়ন সোজা বিছানায়। ঝিল স্থির করে ফেলে, আর নয়। নলকে নিয়ে ও অন‍্যত্র চলে যাবে। সারারাতের ক্লান্তি ধুতে ও স্নান করতে যায়। স্নান সেরে অনেকক্ষণ নিজের ঘরে নিজের ভাবনায় ডুবে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে পা বাড়ায় নলের ঘরের দিকে। আজই কোনো একটা ব‍্যবস্থা করতে হবে।

নলের ঘরের দরজা খোলা। ঝিল ভেতরে ঢুকে নলকে দেখতে পায় না। ওয়াশরুমেও নেই। ভাবে হয়তো আশেপাশেই কোথাও আছে। ওর অগোছালো ঘরটা গোছানোয় মন দেয় ঝিল। সবকিছু অগোছালো থাকলেও নলের পড়ার টেবিলটা সুন্দর করে গোছানো রয়েছে। অবাক হয় ঝিল। ভাবে ছেলেটা ধীরে ধীরে সাবলম্বী হয়ে উঠছে। হঠাৎ চোখে পড়ে টেবিলের মাঝখানে পেনদানির তলায় রাখা ভাঁজ করা কাগজ। কৌতূহলবশতঃ কাগজটা টেনে নেয় ঝিল। ভাঁজ করা কাগজটা খুলে পড়তে গিয়ে ওর মুখ ফ‍্যাকাশে হয়ে যায়। ওর শরীর থেকে সমস্ত রক্ত যেন কেউ ব্লটিং পেপারে শুষে নিয়েছে। চারদিক অন্ধকার দেখে ঝিল।

নল লিখেছে, “ঝিল চ‍্যাটার্জ্জী, তোমাকে আমি খুব ভালোবাসি, কিন্তু মা বলে আর মানতে পারবো না। এই পৃথিবীতে আমাকে আগাছার মতো একলা দাঁড় করিয়ে তোমরা অন‍্যায় করেছো। এটা সম্পূর্ণ আমার ভাবনা। তুমি সমাজের জন্য কাজ করো অথচ সমাজের নিয়মকে অগ্ৰাহ‍্য করো, এটা তোমাদের ভাবনা। ভিন্ন মতে তোমাদের সাথে আর থাকতে পারবো না। চললাম।”

স্থানুবৎ ঝিল মেঝেতে বসে পড়ে । সম্বিৎ ফেরে কলিংবেলের আওয়াজে। দরজায় পুলিশ। পুলিশ জানায় কিছুক্ষণ আগে সামনের রেললাইনে একজন কিশোর ট্রেনে কাটা পড়েছে। তার পকেট থেকে এই বাড়ির ঠিকানা পাওয়া গেছে। নাম লেখা আছে নল।

এরপরের ঘটনা ঝিলের আজ আর মনে পড়ে না। এরপর বহুদিন ওকে কাটাতে হয়েছে মানসিক হাসপাতালে। এখন সুস্থ। তবে ওর স্মৃতি থেকে মাঝখানের সময়টা হারিয়ে গেছে। তবুও নলের স্মৃতি আঁকড়ে ও এখন একটা অনাথ আশ্রমের স্থায়ী বাসিন্দা। এখানকার বাচ্চাদের কাজ করে। সবার মধ্যেই ও নলের ছায়া দ‍্যাখে। ভালোবেসে আঁকড়ে রাখে।

কোল থেকে কাগজটা তুলে ঝিল পাশে সরিয়ে রাখে। জীবন ওকে শিখিয়েছে ট্র্যাপিজের খেলা শুধুমাত্র সার্কাসে চলে না। জীবন জুড়ে থাকে ট্র্যাপিজের দড়ি। ওঠানামার সামন‍্যতম ভুল ও জীবনে চরম বিপর্যয় ডেকে আনে।


আপনার মতামত লিখুন :

5 responses to “মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-এর ছোটগল্প ‘ট্র্যাপিজ’”

  1. Sanchaita Santra says:

    খুব সুন্দর গল্প পড়লাম। চরিত্রের এমন নাম খুব বিরল, ভালো লাগলো।

  2. তপতী ভট্টাচার্য says:

    নলের পরিণতি খুবই কষ্টকর কিন্ত বাস্তব। ভাল বলে না মানলেও সমাজকে মানতেই হয় _এটাই বাস্তব। অনেক দিন মনে থাকার মতো গল্প!

  3. তপতী ভট্টাচার্য says:

    নলের পরিণতি খুব কষ্টকর কিন্ত বাস্তব। অনেক দিন মনে থাকবে গল্পটা।নামকরণ অসাধারণ!

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন