প্রাকৃতিক নিয়মে প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চে শরৎকালের আগমন ঘটেছে। বাতাসে পূজো পুজো গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। কৈলাস থেকে সন্তানদের নিয়ে মর্ত্যে কটাদিন থাকবেন মা। আর মা আসা মানেই সারা বছর ক্লান্তি ভুলে একটু আনন্দ। শুধুমাত্র কেনাকাটি, ঘর গোছানো, খাওয়া-দাওয়া, ঘুরতে যাওয়া নয় নিজেকেও ঘষে মেজে ঝকঝকেও হয়ে উঠতে হবে। ছোট থেকে বড় অব্দি তাই বেজায় চিন্তায় পড়েছেন। যদিও চটজলদি সমাধানের নাম পার্লার। কিন্তু নানা কারণে পার্লারে যাওয়া অনেকেরই সম্ভব হয় না। তবে কুচপরোয়া নেহি। মা-ঠাকুরমাদের রূপচর্চার প্রাচীন কৌশল যে মোটেই ফেলনা নয়, সে কথা বার বার প্রমাণিত। তাহলে আর দেরি না করে জেনে নেওয়া যাক ঘরোয়া টিপসগুলি।
আমার ছোটবেলায় দেখেছি, ঘরে সাজের জিনিস বলতে একটা ফাউন্ডেশন, বোরোলিন আর একটা লিপস্টিক, কাজল। নামিদামি ক্রিম বা পার্লারে যাওয়ার চল তখন অন্তত আমাদের মতো সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে থাকতো না। ছুটির দিনে, কোথাও যাওয়ার আগে মা দুধের সাথে বেসন মিশিয়ে মুখে মাখত। মাঝেমধ্যে মেশাতেও মধু আর কাঁচা হলুদের সামান্য রস। এই ঘরোয়া টিপসেরগুলো ব্যবহার করে মায়ের ত্বক থাকতো ভীষণ উজ্জ্বল।

এমনিতে হলুদ খুব উপকারী। হলুদে উপস্থিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বকের যত্ন নেয় যথেষ্ট ।তাছাড়া এটি সহজলভ্যও। সপ্তাহে অন্তত তিন দিন যদি স্নানের ১৫-২০ মিনিট আগে যদি ১ চামচ বেসন, ১ চিমটি হলুদ গুঁড়ো, এবং ২-৩ চামচ দুধ বা দই মিশিয়ে একটি প্যাক তৈরি করে মুখে ও গলায় লাগিয়ে রেখে স্বাভাবিক জল দিয়ে ধুয়ে নিতে পারেন। আপনি চাইলে এর সাথে কয়েক ফোঁটা মধু বা অলিভ অয়েলও যোগ করতে পারেন। এতে আপনার ত্বকে বসে থাকা আলগা ময়লা চলে যাবে, ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়বে।
ব্রণ কমাতে পাতিলেবুর রস, শসার রসের সঙ্গে হলুদ বাটা মিশিয়ে ব্রণর উপরে ১০-১৫ মিনিট রেখে দিন। এতে ব্রণ শুকিয়ে যায় তাড়াতাড়ি। আবার ব্রণ সারার পরে তার দাগ তুলতে এই প্যাকের সঙ্গে নারকেল তেল বা তিল তেল মিশিয়ে নিন।
কাঁচা হলুদের সঙ্গে জিরে গুঁড়ো ও জল মিশিয়ে মুখে ও সারা শরীরে লাগিয়ে নিলে, ট্যানভাব থেকে রেহাই মিলবে। জিরের অ্যান্টিসেপটিক প্রপার্টি ত্বকের যেকোনো দাগ,মেচেদা দূর করতে সাহায্য করে।
যাদের শুষ্ক ত্বক তাদের ট্যানভাব দূর করতে হলুদ গুঁড়োর সাথে মুলতানি মাটি ও দুধ একসঙ্গে মিশিয়ে নিয়মিত মাখতে পারেন।যাদের তৈলাক্ত ত্বক এবং ব্রণ আছে, তারা দুধের পরিবারকে টক দই মেশাবেন।
ত্বক হোক বা চুল, ফ্রিজে থাকা টক দই কিন্তু অনেক সমস্যার সমাধান করে।কারণ এতে থাকা আলফা-হাইড্রোক্সি এসিড স্কিনে বা স্ক্যাল্পের কোন ক্ষতি না করে এক্সফোলিয়েট করে। মৃত কোষ ত্বকে জমে থাকা ধুলো ময়লা সরিয়ে, ত্বককে আরও উজ্জ্বল করে তোলে।

আমাদের রান্না ঘরেই রয়েছে সমস্ত সমস্যার চাবিকাঠি।
ঘরোয়া উপকরণ দিয়েই ত্বকের পরিচর্যা করেন বহু অভিনেত্রীরাও। ভিটামিন ও খনিজ থাকার জন্য রান্না ঘরে ব্যবহৃত মসলাগুলি আমাদের ত্বকের জন্য খুব উপকারী উপাদান। যেমন ধরুন বিভিন্ন ধরনের ডাল–ছোলা, মটর,মসুর ঘরোয়া স্ক্র্যাবার হিসেবে ভালো কাজ দেয়। মুখে ও সারা শরীরে যদি স্থানের আগে ডাল বেটে লাগানো যায় তাহলে ত্বকের গভীরে লুকিয়ে থাকা ময়লাও বেরিয়ে যাবে। সেইসঙ্গে ত্বকও হবে চকচকে। সাবানের মধ্যে থাকা কেমিক্যাল ত্বককে শুষ্ক, নির্জীব করে দেয়।সেক্ষেত্রে ডাল বাটা একবারে অব্যর্থ। সাবান লাগানোর প্রয়োজন নেই।
বিরিয়ানি বা পায়েস কিম্বা রোজের ডাল-চচ্চড়ি, বেশির ভাগ রান্নাতেই ফোড়ন হিসেবে তেজপাতার বেশ নামডাক। আপনি কি জানেন তেজপাতা সেনসিটিভ স্কিনের জন্য ভীষণ উপকারী। এতে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান ত্বকের সমস্যা যেমন ব্রণ এবং অন্যান্য সংক্রমণ কমাতে সাহায্য করে। মিক্সিতে বা শিলে তেজপাতা গুঁড়ো করে, সঙ্গে ডাল বাটা মিশিয়ে এক সপ্তাহ ব্রণ বা লালর্যাশ যুক্ত ত্বকে লাগালে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
ফ্রেশ মিল্কের সাথে স্যাফরান মিশিয়ে লাগালে ত্বকের উজ্জ্বল ভাব ফিরে আসে। ডেড সেল রিমুভ করতে ওটমিল্ক ও টক দই এর প্যাক ভীষণ কাজ দেয়। পিগমেন্টেশন রুখতে কমলালেবুর খোসা বাটা ও টক দই লাগালে উপকার হবে। রিঙ্কেলস দেখা গেলে মধু ও গাজরের রস (এক বাই এক) ও সঙ্গে এক চিমটে বেকিং পাউডার মিশিয়ে লাগাতে হবে।

এছাড়াও কোমল ঝকঝকে ত্বক পেতে মিল্ক পাউডারের সঙ্গে মধু মিশিয়ে প্রথমে মুখ পরিষ্কার করে নিতে হবে। দু-চামচ চায়ের লিকারের সঙ্গে এক চামচ ব্রাউন সুগার, এক চামচ দুধের সর ও এক চামচ পাকা পেঁপের পেষ্ট লাগালে ভালো স্ক্র্যাবিং এর কাজ করবে। এরপর চার চামচ তিল তেলের সঙ্গে এক চামচ অলিভ অয়েল আর এক চামচ আমন্ড অয়েল মিশিয়ে মেসেজ করতে হবে।পরে মটর ডাল দুধে ভিজিয়ে বেটে মেসেজ করলে ট্যান রিমুভ হবে।
সারাদিন কাজকর্ম শেষে বাড়ি ফিরে আবার অন্য কোথাও যেতে হলে চিন্তায় পড়ে যাই আমরা কারণ টায়ার্ডনেস। সারাদিনের ক্লান্তিভাব দূর করতে স্নানের সময় এক বালতি জলে হাফ কাপ দুধ ও তিন চামচ মধু মিশিয়ে স্নান করতে পারলে ক্লান্তি ভাব দূর হয়ে যায়, সেই সঙ্গে ত্বক হয় উজ্জ্বল।
সর্বাঙ্গসুন্দর হতে গেলে হাত ও পায়ের যত্ন নেওয়া জরুরী। সময় থাকলে মাসে অন্তত একটা হ্যান্ড এন্ড ফুটস স্পা নিতে পারেন। আজ পঞ্চমী। তাই পার্লারে গিয়ে ম্যানিকিয়োর করা সম্ভব নয়। তার চেয়ে বলি, একটা সহজ উপায় ঘরে বসেই সেরে ফেলুন ম্যানিকিয়োর।

নেল রিমুভার দিয়ে পুরোনো নেলপালিশ তুলে ফেলুন। এরপর নখের চারপাশটা পরিষ্কার করে নিন এবং নখ সাইজ করে কেটে ফেলুন। একটা বড় বাটি কিংবা বালতিতে ঈষৎ উষ্ণ জলের মধ্যে কয়েক ফোটা এসেনসিয়াল অয়েল বা লেবুর টুকরো ফেলে দুহাতের আঙুলগুলোকে মিনিট দশেক ডুবিয়ে রাখুন। অথবা উষ্ণ জলের মধ্যে ১ চা চামচ শ্যাম্পু মিশিয়ে ওই জলের মধ্যে হাত ডুবিয়ে রাখুন মিনিট দশেক। এতে নখের কিউটিকলগুলো নরম হওয়ার সাথে জমে থাকা ময়লা, মৃত কোষ, রান্না করা হাতের হলুদের দাগ সহজেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। এবার কোনও ক্রিম বা ময়েশ্চারাইজার হাতে এবং নখে কিউটিকল অয়েল ভাল করে মেখে নিন। আর হ্যাঁ, শেষে পছন্দের রঙের নেলপালিশ পরতে ভুলবেন না।
বলা হয়, জিরে ধনে ও মেথি ভেজানো জল যদি রোজ খালি পেটে খাওয়া হয় তাহলে ত্বকের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান হয়। মশলা ত্বককে ভেতর থেকে রক্ষা করে। ত্বক ও চুলকে ভালো রাখতে নিয়মিত প্রচুর পরিমাণে জল খাওয়া দরকার। ঘরোয়া উপায়ে আমাদের রান্নাঘরে থাকা মশলা দিয়ে রূপচর্চা করলে ত্বকের ক্ষতি হবার কোন সম্ভাবনা নেই বরং উপযুক্ত প্যাকগুলি লাগালে আখেরে লাভই হবে।
শুধুমাত্র রূপচর্চা করলেই হবে না, সেই সঙ্গে মনটাকেও ভালো রাখতে হবে। পজিটিভ থিঙ্কিং এবং ফুড হ্যাবিট ঠিকঠাক রাখা ভীষণ জরুরি। কেননা অভ্যন্তরীণ দিক থেকে সুস্থ থাকলে তার প্রতিফলন পরে আমাদের মুখে।