ডিসেম্বরের শেষে মধ্যরাতে কালিকটে পৌঁছে দেখি দোকানপাট সব খোলা। ঝাঁ চকচকে এই বন্দর শহরের বেশ কিছু বড় শোরুম আরব মরুভূমির নানা কিসিমের খেজুর, মেওয়া, সুগন্ধির পশরা সাজিয়ে রেখেছে।
এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলের পথ বেশ দীর্ঘ। গাড়িতেই ক্লান্তির আধোঘুম। স্বপ্নে তখন রোদে পোড়া তামাটে চেহারার লম্বা চওড়া পর্তুগিজ সাহেবটি এসে ঘোরাঘুরি করছেন। জোব্বাপরা নাবিকটির হাতে কবেকার মরচে ধরা তলোয়ার!
— কি ব্যাপার এখনো তুমি কি করতে এখানে রয়েছ? আরবদের তাড়িয়ে তুমি এখানে ব্যবসা শুরু করেছিলে বটে তবে তোমার সে সুদিন তো আর নেই!

— হ্যাঁ তখন ভেবেছিলাম আমি এলাম, একটু যুদ্ধুটুদ্ধু করলাম, প্যাঁচাপয়জার কষলাম, ব্যস আমার জয় সুনিশ্চিত! কিন্তু এখন দেখছি কিছুই রইল না! সব শেষ হয়ে গেল!
— ওরা কিন্তু এখনও এখানে দিব্যি ব্যবসা করছে!
— আর আমি ধূলো খেয়ে ইতিহাসের বইয়ে বসে আছি! তবে তোমরা আমায় ভোলো নি! আমার নামে গোয়ায় একটা শহর গড়েছ! এখানে এসেও দ্যাখো তুমি আমার কথাই ভাবছ!
— সে শহরের নামকরণ তোমার জাতভাইরা করেছে। তবে তুমি একজন বিতর্কিত চরিত্র, তাই বোধহয় তোমার সম্পর্কে সবার এত কৌতুহল। তোমার সাহস, নৌবিদ্যার তো তুলনা ছিল না কিন্তু তুমি এদেশে এসে বড় লুটপাট করেছ। এত খারাপ কাজ করেও লোকে তোমাকে এখনো মনে রেখেছে এ তোমার সৌভাগ্য। তোমার সাহস শেষ পর্যন্ত আর কাজ দিল না।

— হুমম ভুল তো অনেক করেছি। সাহস ছিল, কিন্তু টিকে থাকার স্কিল ছিল না! তবে এও ঠিক আমি প্রথমে এসেছিলাম বলে আমাকে অনুসরণ করে অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো এলো। তোমরাও বেশ শিক্ষা-সংস্কৃতিতে আলোকিত হলে….
— বাজে কথা বোলো না তো! এমন সুন্দর দেশ দেখেছ তুমি! কি নেই এখানে!
আমি চেপে ধরতেই তর্কাতর্কিতে ভঙ্গ দিয়ে বুড়ো পর্তুগীজ নাবিক ভাস্কো ডা গামা স্বপ্ন থেকে বিদায় নিল। আমি বেমালুম তার কথা ভুলে পরের সাতদিন উত্তর কেরালার মালাবার উপকূলের রূপ-রস-গন্ধে বিভোর হয়ে রইলাম।

‘Cleanliness is next to Godliness’ যেন এখানে কোনো আপ্তবাক্য মাত্র নয়, ভগবানের আপন দেশেই তার সার্থক প্রয়োগ। আরব সাগরের নোনাজল এই মালাবার উপকূলকে ভিজিয়ে দিয়ে যায়। বড়দিনের ছুটিতে সেই জলে পা ডোবাতে, খেলা করতে, ছবি তুলতে এসেছে বহু স্থানীয় মানুষ। কিন্তু কোথাও কোনো অপরিচ্ছন্নতা চোখে পড়ে না। নিজের দেশকে ভগবানের দেশের মত সুন্দর করে তুলতে এদের চেষ্টার অন্ত নেই!
আমার এক সপ্তাহের ভ্রমণে স্থানীয় মানুষের সুখদুঃখকে তেমন করে ছুঁতে পারি নি। দুস্তর ভাষার ব্যবধান তাদের সঙ্গে গল্প করার অবকাশ দেয়নি। তবুও তাদের এই সব সুঅভ্যাস দৃষ্টি এড়ায় না। তাদের সদা হাস্যময় মুখ, ডাইনে বাঁয়ে ঘাড় নেড়ে ‘শেরি শেরি’ (OK) বলায় কোথাও যেন অন্তরঙ্গতার সুর বাজে। মর্ণিং ওয়াকে বেরিয়ে গৃহস্বামীর বাগান দেখে তারিফ করলে সকালের কফিটা তাদের সঙ্গে বসে খাবার আমন্ত্রণও পাওয়া যায়।

অসংগতি কি নেই সেখানে! পশ্চিমঘাট পাহাড়ের বুকে আঘাতের পর আঘাত হেনে রাস্তা চওড়া হচ্ছে। বিকেলের পর থেকে তাই বিস্তর যানজটে আটকে পড়েছি আমরা।
আমার এক মালয়ালী বান্ধবী বলেছিল, কেরালার যুব সমাজ তাদের জমিবাড়ি মর্টগেজ রেখে, লোন নিয়ে পিকচার পোস্টকার্ডের মত বিদেশী জীবনের হাতছানিতে সাগর পাড়ি দিচ্ছে। তাদের রাজ্যে বয়োবৃদ্ধের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। পরিসংখ্যান বলছে কেরালায় বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বিশেষ কম নয়! ‘গাল্ফ বুনে’-র কল্যাণে সেখানকার গ্রামে গঞ্জেও সুন্দর সুন্দর চক মেলানো প্রাসাদ। প্রাসাদ সংলগ্ন মনোরম ফুলের বাগান। কারা থাকে সেখানে? বেশিরভাগ শূন্য বাড়ি পাহারা দেয় কেয়ারটেকার।

যারা এখানে রয়ে গেল তারা মাছ ধরে, ধান চাষ করে, ব্যবসায় মন দেয়। বাড়ির ছোট্ট বাগানটিতে কফি গাছে লাল লাল ফল ধরে। সেই ফলের বীজ রোদে শুকিয়ে, গুঁড়ো করে সারা বছরের প্রিয় পানীয়ের পাউডার ভাঁড়ারে সঞ্চিত থাকে।
মন্দিরে এখনো মালয়ালি পুরুষের পরিধান সাদা মুন্ডু ধুতি। মহিলাদের পরনে জড়িপাড় সাদা কাসাভু শাড়ি। বেণীতে মল্লিকার মালা, কপালে চন্দনের ছোঁয়া। মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রদীপের আলো-অন্ধকারে, চন্দন-কুঙ্কুমের সুগন্ধে সুব্রহ্মণ্য স্বামী, শেষনাগে উপবিষ্ট নারায়ণ, শ্রীদেবী, ভূদেবী ভক্তদের দর্শন দেন। ভক্তির প্রাবল্যে শুধু প্রণাম নয়, তিনবার দু-কান ছুঁয়ে, হাঁটু ভাঁজ করে পাপস্খালন করা আমাদের চোখ এড়ায় না। আমি আর স্বাতী মন্দির প্রদক্ষিণ করতে করতে লাল, নীল, সবুজ, হলুদের বর্ণময় ম্যুরাল, ফ্রেস্কো দেখে বিস্ময়-বিমুগ্ধ হই। চিনতে, জানতে চেষ্টা করি পৌরাণিক কাহিনী আর তার চরিত্রদের।

ওয়ানাডের পুকুডু লেকে জলজ উদ্ভিদ গোলাপি আঁচল বিছিয়ে রেখেছে। সেই গোলাপরঙা মোহে গাছেরাও ঝুঁকে পড়ে জলের দিকে। শেষ বিকেলে আমরা বাণাসুর হ্রদের জলে গোল গোল ক্যোরাকেল নৌকায় ঘুরপাক খাই। ব্যাক ওয়াটারের ক্রুজে ভেসে ভেসে সূর্যাস্ত দেখি। রাতের অন্ধকারে ফায়ার থৈয়ম আমাদের অভিভূত করে।
এই সাতদিনে আমাদের স্বাদকোরকগুলি উজ্জীবিত হয়েছে অভিনব খাবার দাবারের স্বাদে। পুট্টু, ইডিয়াপ্পাম, আপ্পামে, আভিয়ালে আটপৌরে সরলতা। আনারসের পায়েস, মালাবার বিরিয়ানি, মাছের পাতুরিতে মালাবার উপকূলের তাজা মশলার স্বাদ এবং সুবাস।

নীল আকাশের নিচে সবুজের অফুরন্ত আস্তরণ, নারকেল পাতার ফাঁকে ফাঁকে রোদের মৃদু হাসি, শান্ত ব্যাকওয়াটারের বুকে নৌকার ধীর ছন্দ — সব মিলিয়ে কেরালা এক জীবন্ত কবিতা হয়ে ধরা দেয়। ইচ্ছে করে, —
মালাবার উপকূলের কোনো এক কোণে
ছোট্ট একটা বাড়ি বানাবো,
দরজা কখনো বন্ধ হবে না তার।
বাতাস নিজেই ঢুকে পড়বে অনুমতি ছাড়াই।
সকালে ঘুম ভাঙবে
নারকেল পাতার ফিসফিসে কথায়,
চা কখন জুড়িয়ে জল হয়ে যাবে
বৃষ্টি দেখতে দেখতে।
সবুজ এখানে রঙের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে জীবনী শক্তি দেয়।
তার ছায়ায় ছায়ায় শান্তি পাবে আমার থিতু জীবন,
আর তাড়া থাকবে না কোথাও যাওয়ার!
আমার দিনগুলো ঝুলে থাকবে
জানালার ধারে,
ভেজা কাপড়ের মতো—
রোদে, ছায়ায়, সময়ে।
আমি আর হিসেব রাখব না
কত বছর বাঁচলাম!
সুন্দর লেখা,ছবি।
দারুন লেখা।পড়তে পড়তে কখন যে কেরালায় চলে গেলাম।
ধন্যবাদ মহুয়া। ধন্যবাদ শুভেন্দুদা। তোমরা যে লেখাটা মন দিয়ে পড়ে মতামত দিলে এ আমার অনেক পাওয়া ।