শুন্ডি হুন্ডির দারুণ যুদ্ধ। উটের সারি। রসোগোল্লা আকাশপথে নামছে হাঁড়ি হাঁড়ি। সেই হাঁড়ি দেখে রোগা ক্ষয়ে যাওয়া সেনার দল, যাদের বড় বড় চোখেই সমগ্র ক্ষুধার আভাস, তারা যুদ্ধ ছেড়ে হাঁড়ি আঁকড়ায়। বস্তুত তো এটাই ঠিক যে ওই ক্ষুধা আর হাঁড়ি সামলাতেই সাধারণ মানুষ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। বা বলা ভালো জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করা হয়। সত্যজিৎ রায়ের এই গুপী গায়েন বাঘা বায়েন এক এক বয়সে এক এক রকম এফেক্ট ফেলে। যখন ছোটবেলায় এটা দেখা তখন শুধুই অনাবিল আনন্দ পায় ছোটরা। ওই ক্ষুধার্ত চোখ বা রোগা শরীরে যুদ্ধের সাজ সবটাই হাসির পরতে মোড়া এক দারুণ রূপকথার রাজ্য। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সিনেমা দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে বাধ্য করে। তখন এর রাজনৈতিক দিকগুলো কি অনায়াসে ছোটদের মত করে উপস্থাপন করা এটাই দেখতে থাকে মানুষ। আর আরও বয়স বাড়লে গোটা সিনেমাটা যেন ওই ক্ষুধার্ত চোখ আর হাঁড়ির উপর হামলে পড়াতে মন আটকে রাখে। বিশেষ করে মহিলারা তো মায়ের জাত। কেউ ক্ষুধার্ত চোখে তাকালে সেই চোখ আর জীবনে ভোলা অসম্ভব হয়ে পড়ে তাঁদের কাছে। আর প্রণাম সেই রায় মশাইদের যাঁদের একজন এই গল্পটা লিখেছেন এবং তাঁর যোগ্য উত্তরসূরী এটা নিয়ে ছোটদের সিনেমা বানিয়েছেন। আসলে তো সকলের জীবনের যুদ্ধ এই হাঁড়ি সামলাতে সামলাতেই কেটে যায়।
এই সিনেমা যে বা যারা একবার দেখেছে সে বা তারা জীবনে একবার হলেও মরুভূমি দেখতে যাবে না তা কি হয়? বিশেষ করে বাঙালি হয়ে। আমার এবারের গন্তব্য ছিল প্রথমে দিল্লীর আত্মীয় পরিদর্শন, তারপর মরুশহর ভ্রমণ। দিল্লীর পর্ব সুন্দরভাবে মিটে যেতেই জয়সলমীরগামী প্লেনে উঠে বসে পড়া গেল। সুন্দর আবহাওয়া। প্লেনে বসার পর মনে হল এবার তাহলে সত্যিই মরুশহর দেখা হচ্ছে। রাজস্থানের অনেকগুলি জায়গায় ঘোরা হয়ে গেছে। কিন্তু এটি প্রত্যেকবারই ফাঁকি পড়ে যাচ্ছিল। এবার আর ফাঁক থাকতে দেওয়া যাবে না কোনোমতেই। এক ঘন্টা পনের কুড়ি মিনিটের মধ্যেই প্লেনটি একটু বেঁকে টার্ন নিয়ে নামতে শুরু করল। প্লেন বেঁকে যেতেই আমার দুর্বল হৃদয় একটু শুকিয়ে গেছিল। কিন্তু নামার পর বুঝলাম এখানে প্লেন ওঠার এবং নামার সময় এই বাঁকটা নেয়। কেন কে জানে? চারপাশে তো পাহাড়, পর্বত, বড় বিল্ডিং কিছুই নেই। থাকার মধ্যে রয়েছে শুধু ধু ধু বালি আর কাঁটা ঝোপ, অসংখ্য বাবলা গাছ আর নামার আগে একটা হ্রদের মতো নীল জল চোখে পড়ে।
ছোট্ট মরুশহর জয়সলমীর। যার প্রায় পুরোটাই বালিয়ারি দিয়ে ঘেরা। NH-68 ধরে উত্তর পশ্চিম অভিমুখে চললাম। আমাদের গন্তব্য একটি বিশেষ মন্দির। ‘বিশেষ’ এই কথাটির উপরে সকলে জোর দিলেন কিন্তু কেন বিশেষ সেটি ভাঙলেন না। এখানকার মানুষজন বেশ অতিথিবৎসল। বাঙালি এবং সত্যজিৎ রায় এঁদের সকলের মুখে মুখে শুনতে বিশেষ আনন্দ লাভ হয়। Google চেক করলেই পেয়ে যাওয়া যায় কেন বিশেষ মন্দির কিন্তু যেহেতু ওঁরা মন্দিরের নামও বললেন না তাই মনে হল থাক, সারপ্রাইজ জিনিসটা থাকুক অন্তত আমাদের জেনারেশনে। সারথি অর্জুন রাম বেজায় হাসিখুশি মানুষ। বাঙলা সব বোঝেন, বলতে পারেন না। আগের দিন বিকেলে ভূতের গ্রাম ‘কুলধারা’ নিয়ে যাবার পথে অর্জুন রাম একটা ছবির মতো আঁকা মরুভূমির মাঝে চায়ের দোকানে চা খাওয়াল। উটের দুধের কিনা জানি না, তবে ‘বড়িয়া চায়’। দোকানের পাশের জমিতে সবুজ ক্ষেত আর একদিকে মরুভূমি। আচমকা অর্জুন নেমে গেল ক্ষেতের মধ্যে। তারপর একগোছা মাটি সমেত তুলে নিয়ে এল ছোলে। আমাদের ছোলা। কচি নবীন চিকন সবুজ। খোসা ছাড়িয়ে মুখে ফেলতে হয়। আহা! কি অপূর্ব মাটির আঘ্রাণ। এই অর্জুন ক্ষণে ক্ষণে চমক দিতে পছন্দ করে এটা বোঝা গেছিল বেশ। তাই মন্দির দেখার পথে ওকে আর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় নি।
দেড় ঘন্টার মাথায় একটা মন্দিরের সামনে গাড়ি থামল। মরুভূমির কোলে একা নির্জন মন্দির। কিন্তু কি ভীষণ শান্তির পরিবেশ। নামা হল। দেখলাম অনেক ঘন্টা ঝুলছে চারিদিকে। মায়ের নাম ‘ঘন্টেওয়ালি মাতা’। বুঝলাম মায়ের ঘন্টা খুব পছন্দের, তাই এই নাম। নিরিবিলি পরিবেশে বেশ খানিকক্ষণ থাকলেও মনে হয় আরও কিছুক্ষণ থাকি।
মন্দিরের লেখা কাহিনী পড়ে জানা গেল যে ওখানে একটি গ্রাম ছিল। সেখানে মুসলিম আক্রমণ ঘটে এবং প্রচুর মানুষ মারা যায়। একমাত্র একজন গর্ভবতী মহিলা ওইসময় বাপের বাড়ি থাকার ফলে বেঁচে যায়। এরপর সে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেয়। কালে ছেলেটি বড় হয়ে পাঠশালায় যায়। সেখানে অন্য বাচ্চারা ওই ছেলেটির বাবা কোথায় এই প্রশ্ন করলে ছেলেটি মায়ের কাছে ফিরে তার পিতার সম্বন্ধে জানতে চায়। তখন তার অসহায় মা কাঁদতে কাঁদতে বলে যে শত্রুরা তাদের পুরো গ্রামের বাসিন্দাকে হত্যা করেছে, যার মধ্যে ওর পিতাও ছিল।
এই কাহিনী শুনে ছেলেটি জেদ ধরে যে সে শত্রু নিধন করে তবে ফিরবে। ততদিনে সে বড় হয়েছে। মাকে রেখে ছেলেটি একটি তরবারি সঙ্গী করে মরুপথে একলা যাত্রা শুরু করে। অনেক কষ্টে সে নিজের ধ্বংসপ্রাপ্ত গ্রামে এসে পৌঁছয়। জলের অভাবে তখন ছেলেটি মৃতপ্রায়। সেই সময় একটি ছোট্ট পরিত্যক্ত মন্দির দেখে ওইখানে এসে অবসন্ন হয়ে পড়ে। এমন সময় মন্দির থেকে একটি ছোট মেয়ে এক ঘটি জল এনে ছেলেটিকে সুস্থ করে তোলে। ছেলেটি এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে একা একটি বালিকাকে দেখে প্রশ্ন করে যে এখানে তো একটি পাখিও নেই, তাহলে সে একাকী কি করে আছে? উত্তরে ছোট বালিকা তাকে বলে যে সে কেন তরবারি হাতে এই অঞ্চলে এসেছে সে সব জানে।
ছেলেটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে কিভাবে সে জানতে পারল। তখন দেবীরূপের প্রকাশ ঘটে। দেবী ছেলেটিকে বলেন যে তিনি জগতের মাতা। তিনি জানতেন যে ছেলেটি আসবেই। দেবী তাকে এক বিশেষ পথে যেতে নির্দেশ দেন এবং বলে দেন যে একটি শোভাযাত্রার পিছন থেকে একটি মাত্র ব্যক্তিকে হত্যা করে সে সরে আসবে। তারপর দেবীর কৃপায় যা ঘটবার তা ঘটবে।
ছেলেটি দেবীর নির্দেশ মতো স্থানে গিয়ে দেখে সেখানে বরযাত্রীদের একটি বিরাট শোভাযাত্রা চলেছে। ছেলেটি পিছন থেকে একজনকে হত্যা করে মায়ের নির্দেশ মতো সরে আসে। এবার দলটির নিজেদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। এরপর নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করে তারা। এইভাবে প্রতিজ্ঞা পূরণ হলে ছেলেটি ফিরে এসে নিজেকে মায়ের পায়ে বলি দিতে গেলে মাতা আবার প্রকট হন। বলেন যে মা কখনও সন্তানের রক্ত চান না। এরপরেই আবার নতুন করে এই মন্দিরে পুজো শুরু হয়। মা এখানে ঘন্টেওয়ালি মাতা (Ghante Wali Mata) নামে পরিচিতা।
পরবর্তী কালে মন্দির নতুন করে গঠিত হয়েছে। দূরবর্তী গ্রাম থেকে এখানে সকলে আসেন পুজো দিতে। একটি বিশেষ সময় মেলাও বসে। চারপাশে মরুভূমির বালিয়ারি, কাঁটা ঝোপ, হু হু হাওয়া আর মাঝে একলা মন্দির। পুরোহিতের মুখে শুনলাম এই মাতারা পাঁচ বোন, অন্য মতে সাত বোন। তবে এইবারে আমরা ঘন্টেওয়ালি মাতা দর্শন সেরে মাতার বড়দিদির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। যাঁর বিশেষত্বের কথা সকাল থেকে শুনে কৌতুহলী হয়েছি।
Good content.Interesting and informative