একশো পঁচাত্তর বছরের দোর গড়ায় পৌঁছে ভারতীয় রেল আজ জাতীয় সংহতির প্রতীক। কু-ঝিক্-ঝিক্ রেল ইঞ্জিনের আওয়াজ তখন শুরুই হয়নি ভারতবর্ষে। ভারতবর্ষে বাস্পচালিত রেল আসার বা রেলপথ চালু হওয়ার অনেক আগেই প্রথম ভারতীয় রেলযাত্রী হওয়ার এক অনন্য কৃতিত্বের অধিকারী হয়ে ছিলেন এক বাঙালি। তিনি রাজা রামমোহন রায়। তাঁর কোনো রাজত্ব ছিল না, কিন্তু নামের আগে বসেছিল ‘রাজা’ উপাধি। অবিভক্ত বাংলার নব জাগরণের পুরোধা হিসেবেই আমরা বাঙালিরা তাঁকে অভিহিত করে থাকি। ভারতে রেল চলাচল শুরু হওয়ার অনেক আগেই রাজা রামমোহন প্রথম ভারতীয় রেলযাত্রী হিসেবে রেল ভ্রমণের কৃতিত্ব অর্জনের পেছনে এক ঐতিহাসিক ঘটনা রয়েছে। সেই ঐতিহাসিক ঘটনা জানতে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে আজ থেকে কাছাকাছি প্রায় দুশো বছর পেছনের দিকে।
সময়টা ১৮৩০-৩১ খ্রীষ্টাব্দ। রাজা রামমোহন রায় তখন ইংল্যান্ডে। ভারতে সতীদাহ প্রথা রদ করে ১৮২৯ খ্রীস্টাব্দে গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক আইন পাস করতেই তার বিরুদ্ধে সতীদাহ প্রথা চালু রাখতে লন্ডনে প্রিভি কাউন্সিলে ভারতীয়দের একাংশ আপত্তি জানান। সেই আপত্তির বিরুদ্ধে ও গভর্নর লর্ড বেন্টিংকের সতীদাহ প্রথা রদের স্বপক্ষে সওয়াল করতে ১৮৩০ খ্রীষ্টাব্দের ১৯ নভেম্বর ভারতের খেজুরি বন্দর থেকে জাহাজে করে ইংল্যান্ডে যান অবিভক্ত বাংলার নব জাগরণের পথিকৃত রাজা রামমোহন রায়।

বিশ্বে প্রথম রেল আবিষ্কার করে যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে তখন গোটা ইংল্যান্ডে এক উন্মাদনা বয়ে চলছে। ১৮৩০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কাশায়ারের লিভারপুল ও ম্যানচেস্টারের মধ্যে রেল চলাচলের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ইংল্যান্ডের প্রথম আন্তঃশহর বা ইন্টারসিটি রেলওয়ে। তার পাঁচবছর আগে ১৮২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর জর্জ স্টিফেনসনের তৈরি বাষ্পচালিত ইঞ্জিনযান চালিত ‘লোকোমোশন নং ওয়ান’ প্রথম যাত্রীবাহী রেল হিসেবে উত্তর পূর্ব ইংল্যান্ডের স্টকটন-ডার্লিংটন রেলওয়েতে যাত্রী পরিবহণ শুরু করে। এটিই বিশ্বের প্রথম যাত্রীবাহী ট্রেন হিসেবে ইতিহাসে পরিচিত।
ইংল্যান্ডে পৌঁছে রাজা রামমোহন রায় লন্ডনে প্রিভি কাউন্সিলে সতীদাহ প্রথা রদ করার পক্ষে জোরালো যুক্তিবাদী সওয়াল করেন ও জয়ী হন। এই ঘটনা বিলেতে রাজা রামমোহন রায়কে ব্যাপক পরিচিতি ও খ্যাতি এনে দেয়।
ইংল্যান্ডে থাকাকালীন ১৮৩১ সালের ১৩ এপ্রিল রাজা রামমোহন ইংল্যান্ডের আন্তঃশহর বা ইন্টারসিটি রেলওয়ের লিভারপুল থেকে ম্যানচেস্টার পর্যন্ত রেলে যাতায়াত করে ইতিহাসে প্রথম ভারতীয় রেলযাত্রীর কৃতিত্ব অর্জন করেন। তখনও সমগ্র ভারতবর্ষে রেল চলাচল দুরঅস্ত ছিল। ‘সংবাদটি প্রকাশিত হয় ১৮৩১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি তখন ইংল্যান্ডের লিভারপুলে অবস্থান করছেন। ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার শহরেই তিনি প্রথম রেললাইন দেখলেন। লোহার পাত কেটে বানানো রাস্তার উপর দিয়ে বাষ্পচালিত গাড়ি ছুটে যাচ্ছে; এই দৃশ্য দেখে তিনি অভিভূত হয়েছিলেন। বাঙালিদের মধ্যে তিনিই প্রথম রেলগাড়ি চড়েছেন। এমনকি সেই গাড়ি যখন ঘণ্টায় পনেরো ক্রোশ বেগে চলতে শুরু করে, তখন যে ‘রাজা’ অত্যন্ত মুগ্ধ হয়েছিলেন, সেকথাও সংবাদে উল্লেখ করা হয়’।
রামমোহন রায়ের প্রথম রেল ভ্রমণের ১১ বছর পর ১৮৪২ সালে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ইংল্যান্ডে গিয়ে প্রথমবার রেলে চড়ে এতটাই আপ্লুত হয়ে পড়েন যে ইংল্যান্ডে রেলপথ পত্তনকে বিস্ময়কর কীর্তি বলে মন্তব্যের পাশাপাশি দ্বারকানাথ ভারতে রেলপথ পত্তনের কথা ভেবে ভারতে ‘গ্রেট ওয়েস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে’ নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের আকস্মিক প্রয়াণে তা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে মিশে যায়।

রাজা রামমোহনের ইংল্যান্ডে প্রথম রেলযাত্রার ২২ বছর পর ১৮৫৩ সালের ১৬ এপ্রিল ভারতের বোম্বাইয়ের (বর্তমান মুম্বই) বোরি বন্দর থেকে থানের মধ্যে ভারতের প্রথম যাত্রীবাহী রেল পরিষেবার সূচনা ঘটে। প্রথম যাত্রীবাহী রেলটি মুম্বাইয়ের (তৎকালীন বম্বে) বোরি বন্দর থেকে থানে পর্যন্ত ১৪টি কোচে ৪০০ জন যাত্রী নিয়ে মোট ৩৪ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছিল।
পরের বছর ১৮৫৪ সালের ১৫ আগষ্ট পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া থেকে হুগলি পর্যন্ত রাজ্যের প্রথম ও ভারতের দ্বিতীয় রেলপথ ও রেল চালু হয়। ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ে (EIR) পরিচালিত এই রেলপথ পরে বর্ধমানের রানীগঞ্জ পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। মুম্বাই থেকে থানে পর্যন্ত প্রথম রেলপথের পর হাওড়া থেকে হুগলি পর্যন্ত রেলপথই ছিল ভারতে ব্রিটিশদের নির্মিত দ্বিতীয় যাত্রী রেলপথ। মুম্বাই-থানে রেলপথের পরে এটিই ছিল ভারতের দ্বিতীয় চালু হওয়া রেলপথ পরিষেবা। ১৮৫৩ সালে ভারতের রেল পরিবহন চালুর পর আজ দেড়শো বছর বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এবং প্রাচীনতম রেল পরিবহণ ব্যবস্থা যা ভারতের অর্থনীতি ও যোগাযোগে মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে চলেছে। ১৮৫৩ সালে ৩৪ কিলোমিটার রেলপথ নিয়ে যাত্রা পথ চালু হওয়া ১৮৫৩ সালে ভারতের রেল পরিবহন চালুর দেড়শো বছর পর আজ বিশ্বের বৃহত্তম এবং প্রাচীনতম রেল পরিবহণ ব্যবস্থা যা ভারতের অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম মেরুদণ্ড। ১৮৫৩ সালে ৩৪ কিলোমিটার রেলপথ নিয়ে যাত্রাপথ চালু হওয়া ভারতীয় রেল ব্যবস্থায় আজ বর্তমানে ১ লক্ষ ৩২ হাজার কিলোমিটারের বেশি রেলপথ বিস্তৃত রেলপথে প্রতিদিন কয়েক লক্ষ যাত্রী এবং মিলিয়ন টন পণ্য পরিবহন করে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত রেল নেটওয়ার্কগুলোর মধ্যে আজ অন্যতম।

রাজা রামমোহন রায় বা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ভারতীয় রেলে চড়ার সুযোগ না পেলেও (দুজনে আগেই প্রয়াত) রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ও স্বামী বিবেকানন্দ একাধিকবার ভারতীয় রেলে চড়ে তীর্থ ও দেশ ভ্রমণ করেছেন। রামকৃষ্ণদেব ১৮৬৩ সালে প্রথম রেলে চড়ে কাশী ভ্রমণ করেছিলেন। ১৮৮৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর নরেন্দ্রনাথ দত্ত ও তাঁর আট সঙ্গী হাওড়া স্টেশন থেকে তারকেশ্বর লাইনে রেলে চড়ে হরিপাল যান এবং সেখান থেকে আটপুর গ্রামে গিয়ে ওই দিন মধ্য রাতেই সন্ন্যাস গ্রহণ করে স্বামী বিবেকানন্দ হন। স্বামী বিবেকানন্দের সন্ন্যাস গ্রহণের ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকল ভারতীয় রেল। শুধু তাই নয়, শিকাগো বিশ্ব ধর্মসভায় বিশ্বজয় করে স্বামীজী ১৮৯৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি জাহাজে করে বজবজে এসে নামেন। বজবজ (কোমাগাতা মারু বজবজ স্টেশন) স্টেশন থেকে রেলে চড়ে শিয়ালদহ পৌঁছান। ভারতীয় রেলওয়ের পূর্ব রেল কর্তৃপক্ষ ওই ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রতি বছর ১৯ ফেব্রুয়ারি সকালে বজবজ থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত একটি বিশেষ রেল চালিয়ে থাকেন। এমনকী বজবজ স্টেশনে রেলে ওঠার আগে চিফ ইয়ার্ড মাষ্টারের ঘরে যে চেয়ারে স্বামীজী বসেছিলেন সেই চেয়ারটিও প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে কলকাতার ফেয়ার লি প্লেসে পূর্ব রেলের সদর দফতরের সংগ্রহশালায় সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে।
আর মাত্র একবছর বাদে ২০২৮ সালে ভারতীয় রেল ১৭৫তম বর্ষে পা রাখতে চলেছে। এই ১৭৫ বছরের সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ভারতীয় রেলওয়ে আজ পরিবহনের মাধ্যমই শুধু নয়, ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জাতীয় সংহতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুন্দর লেখা