ম্যাডান স্ট্রিট নামটি আমাদের অনেকেরই জানা। নামটি শুনে প্রথমেই মনে হয় কোনো ইংরেজের নামে এই রাস্তার নাম। আলাদা করে খোঁজ নিলে জানা যাবে এটা কোনো ইংরেজ সাহেবের নামে নয়। এটি এক ভারতীয়র নামেই নামকরণ। জামশেদজি ফ্রামজি ম্যাডান — জে এফ ম্যাডান নামেই যিনি সমধিক পরিচিত। ইনি পার্সি পরিবারের। আর একজন বিখ্যাত জামশেদজিও পার্সি পরিবারের। তবে তিনি টাটা আর ইনি ম্যাডান।
জামশেদজি ফ্রামজি ম্যাডানের জন্ম মুম্বই (বোম্বাই) এর এক পার্সি পরিবারে ১৮৫৬ সালের ২৭শে এপ্রিল। জামশেদজির শৈশব খুব একটা মসৃণ পথ ধরে এগোয় নি। বরং শৈশবেই বেশ জোর ধাক্কা খেতে খেতে এঁর জীবনের পথচলা শুরু। ম্যাডানের পিতার বম্বে রিক্ল্যামেশন ব্যাঙ্কের পতনের কারণে অনেক টাকার ক্ষতি হয়। এর ফলে জামশেদজিকে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হতে হয়। মাত্র বারো বছর বয়সে তিনি ১৮৬৮ সালে ‘এলফিনস্টোন ড্রামাটিক ক্লাব’-এ থিয়েটারে prop boy এর কাজ নেন। ১৮৭৫ সালের মধ্যে এই অপেশাদার ক্লাব একটি পেশাদার থিয়েটার কোম্পানিতে পরিণত হয় আর সারা ভারতবর্ষে তাদের থিয়েটার মঞ্চস্থ করে।
১৮৮২ সালে জামশেদজি থিয়েটার কোম্পানির কাজ ছেড়ে করাচি শহরে ব্যবসা শুরু করেন। তাতেও লাভের মুখ দেখেন। ১৮৮৩ সালে ম্যাডান আসেন কলকাতায়। সেখানে সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্টে নানান প্রয়োজনীয় দ্রব্য জোগান দেওয়ার ব্যবসা শুরু করেন। এই সময় তিনি ‘জে এফ ম্যাডান অ্যান্ড সন্স’ নামে কোম্পানি তৈরি করে খাদ্যসামগ্রী, ওষুধ, বিলিতি মদ, রিয়েল এস্টেট, ইনসিওরেন্স ইত্যাদি নানারকমের ব্যবসা শুরু করেন। এইসব ব্যবসাতেও তিনি সাফল্যের মুখ দেখেন। এই সাফল্যের ফলে জামশেদজি কলকাতায় ‘কোরিন্থিয়ান হল’ নামে একটি থিয়েটার মঞ্চ কিনে ফেলেন। বারো বছর থেকে যিনি থিয়েটারে যুক্ত হয়েছেন থিয়েটারের সঙ্গে তো তাঁর নাড়ীর যোগ বলা যায়।
ফ্রান্সের লুমিয়ের ভাইদের আবিষ্কৃত চলচ্চিত্রের প্রথম প্রদর্শনের (১৮৯৫-এর ২৮শে ডিসেম্বর, প্যারিস) এক বছরের মধ্যেই কলকাতায় দেখানো হয় চলমান ছবি। প্রথম ব্যবসায়িক ভিত্তিতে ভারতীয় বায়োস্কোপ প্রদর্শন করেছিলেন হীরালাল সেন (১৮১৬-১৯১৭)। ১৮৯৮ সালে হীরালাল ‘রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা করে ছবি দেখাতে থাকেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর দুই ভাই মতিলাল ও দেবকীলাল এবং ভাগ্নে কুমারশঙ্কর (ভোলানাথ) গুপ্ত।
এর মধ্যে এলফিনস্টোন থিয়েটার কোম্পানি ম্যাডান কিনে নেন কুভার্জী নাজির এর কাছ থেকে। কুভার্জী নাজির — যাঁকে ভারতীয় থিয়েটারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ধরা হয়। কোরিন্থিয়ান হলের নতুন নামকরণ হয় কোরিন্থিয়ান থিয়েটার। সেখানে তখনকার দিনের জনপ্রিয় পার্সি থিয়েটার মঞ্চস্থ হতে থাকে। অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ এইসব থিয়েটারে অভিনয় করতেন মহিলা অভিনেত্রীরা, যা তখনকার দিনে বিরলতম ঘটনা।

হীরালালের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯০২ সালে কলকাতা ময়দানে তাঁবু খাটিয়ে জামশেদজি বায়োস্কোপ শো দেখানো শুরু করলেন। এই তাঁবু খাটিয়ে সাময়িক সিনেমা হলের উদ্বোধন হয়েছিল vengeance নামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের বিদেশী ছবি দেখিয়ে। একইসঙ্গে কোরিন্থিয়ান থিয়েটারেও এইরকম শো শুরু করে দিলেন। প্যারিসের ‘পাথে ফ্রেরেস’ কোম্পানি থেকে আনানো হয়েছিল এই সব শোয়ের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। তবে এইসব বায়োস্কোপে পাথে প্রোডাকশনের নির্মিত ছবিই দেখানো হত। এলফিনস্টোন বায়োস্কোপ কোম্পানির তত্ত্বাবধানে অনেক স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবিও বানানো হয়। ওই বছরেই ‘আলফ্রেড থিয়েটার’ কিনে নিয়ে ম্যাডান সেখানেও বায়োস্কোপ দেখাতে শুরু করেন। এছাড়াও তিনি ছবি দেখাতে শুরু করেন ব্যান্ডম্যান কোম্পানির ‘এম্পায়ার থিয়েটারে’ (পরবর্তীকালে ‘রক্সি’)।
তাঁবু-সিনেমা জনপ্রিয় হওয়ায় ম্যাডান কোম্পানি উত্তর কলকাতার হাতিবাগান ও শ্যামবাজার অঞ্চলেও এই ধরনের তাঁবু-সিনেমা চালু করেন। সিনেমার বিপুল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা আঁচ করে এবার স্থায়ী হলের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারেন জামশেদজি ম্যাডান। তাঁর উদ্যোগে এবার হগ মার্কেটের (নিউ মার্কেট) পাশে তৈরি হল ১৯০৭ সালে প্রথম স্থায়ী সিনেমা হল ‘এলফিনস্টোন পিকচার প্যালেস’। পরে এর নাম দুবার পাল্টে প্রথমে হয় ‘মিনার্ভা’ এবং তার পরে ১৯৮৯ সালে চার্লি চ্যাপলিনের জন্মশতবর্ষে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক অধিগৃহীত হলটির নাম হয় ‘চ্যাপলিন’। আজ আর এর কোনো অস্তিত্ব নেই। এরপর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ম্যাডান থিয়েটার’ এবং ‘প্যালেস অফ ভ্যারাইটিস’ যেটি ‘এলিট সিনেমা’ নামে প্রসিদ্ধ।
এবার এল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কাল। যুদ্ধের পর ম্যাডানের ব্যবসার আরও উন্নতি হয়।ব্যবসার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সাম্রাজ্যেরও বিস্তার ঘটতে থাকে। কলকাতা ছাড়িয়ে ভারতের অন্যান্য প্রদেশ এবং ভারতের বাইরে মায়ানমার এবং শ্রীলঙ্কায় (তখন নাম ছিল বার্মা ও সিংহল) ১৭২টি সিনেমা হলে দেখানো হত তাঁর ছবি। ভারতে সিনেমা ব্যবসার মোট আয়ের অর্ধেক ছিল তাঁদের আয়। এবার নিজেই উদ্যোগী হলেন ছবি তৈরিতে।
১৯১৭ সালে টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপোর পূর্বদিকে বিশাল জায়গা নিয়ে তৈরি হল ‘ম্যাডান স্টুডিও’। এখানে ক্যামেরা, যন্ত্রপাতি, সেট-সেটিং, আলো সব ছিল আধুনিক। ১৯৩৫ সালে ম্যাডান কোম্পানি বন্ধ হবার মুখে এটি কিনে নেন শেঠ সুখলাল কারনানি। নতুন নাম হল ‘ইন্দ্রপুরী স্টুডিও’। প্রথমে পৌরাণিক এবং ধর্মীয় কাহিনী ভিত্তিক স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি তৈরি করতেন রুস্তমজি ধোতিওয়ালা। তিনি আগে কোরিন্থিয়ানের একজন সাধারণ কর্মচারী ছিলেন। তাঁর কর্মদক্ষতা দেখে জামশেদজি তাঁকে ব্যবসার প্রধান দায়িত্ব দেন। শুধু তাই নয়, নিজের একমাত্র কন্যার সঙ্গে তার বিবাহও দেন।
১৯১৯ সালে চলচ্চিত্র প্রযোজনা ব্যবসায় তিনি ‘ম্যাডান থিয়েটার্স লিমিটেড’ নামে একটি যৌথ উদ্যোগে একটি কোম্পানি স্থাপন করেন। তখনকার প্রায় সমস্ত ভারতীয় থিয়েটার হাউস গুলির উপর তাঁর কোম্পানির প্রতিপত্তি ছিল। ১৯১৯ সালে ম্যাডানের প্রযোজনায় প্রথম তৈরি হল বাংলা চলচ্চিত্র ‘বিল্বমঙ্গল’। এ ছবি প্রথম প্রদর্শিত হয় কর্নওয়ালিস থিয়েটারে যার পরবর্তী নাম ‘শ্রী সিনেমা’। এছাড়াও ‘দি ইলেকট্রিক থিয়েটার’ পরবর্তী নাম ‘রিগ্যাল সিনেমা’, ‘গ্র্যান্ড অপেরা হাউস’ কিছুদিন আগেও যেটা জ্বলজ্বল করত ‘গ্লোব সিনেমা’ নামে, ‘ক্রাউন’ পরবর্তী কালে ‘উত্তরা সিনেমা’ এ সবই ছিল ম্যাডানের অধীনে।

ম্যাডানের তৈরি চলচ্চিত্র উচ্চমানের কারিগরী দক্ষতার পরিচয় বহন করে। বিদেশ থেকে তিনি অনেক নামী পরিচালককে আমন্ত্রণ করে এনে এখানে ছবির কাজে নিযুক্ত করেন। এঁদের অভিজ্ঞতা, বিশাল সেটের ব্যবহার ও পৌরাণিক কাহিনী ম্যাডানকে সাফল্য এনে দেয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল নল দময়ন্তী (১৯২০), ধ্রুব চরিত্র (১৯২১), রত্নাবলী (১৯২২), সাবিত্রী সত্যবান (১৯২৩)।
নির্বাক-সবাক মিলিয়ে ম্যাডানের ছবির সংখ্যা একশোর বেশি। কিন্তু আজ আর কোনো ছবিরই অস্তিত্ব নেই। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, রমেশ চন্দ্র দত্তের সামাজিক ও পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে সেই সময় বিভিন্ন ছবি তৈরি হয়েছিল। যেমন — বিষবৃক্ষ (১৯২২), দুর্গেশনন্দিনী (১৯২৭), রাধারাণী (১৯৩০), কৃষ্ণকান্তের উইল (১৯২৬), কপালকুন্ডলা (১৯২৯), দেবী চৌধুরাণী (১৯৩১) বঙ্কিমচন্দ্রের কাহিনী অবলম্বনে। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের কাহিনী অবলম্বনে গিরিবালা (১৯২৯) ও অন্যান্যদের কাহিনীর ভিত্তিতে মাতৃস্নেহ, সতীলক্ষ্মী ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। সতীলক্ষ্মী ছবিতেই প্রথম শট ডিভিশন করে ছবি তোলার পদ্ধতি চালু হয়।
জামশেদজি ফ্রামজি ম্যাডান ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত সৎ, দয়ালু ও সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন। দানধ্যান করতেন প্রচুর। বিশাল ধনী ব্যক্তি হয়েও ছিলেন নিরহংকারী। সব মানুষের জন্য তাঁর দরজা ছিল অবারিত। কলকাতার পার্সি সমাজের মুখপাত্র ছিলেন তিনি। এই বিশাল মাপের মানুষটি প্রয়াত হন ২৮শে জুন ১৯২৩ সালে। তাঁর অবর্তমানে তাঁর জামাতা রুস্তমজি এই সাম্রাজ্য শক্ত হাতে সামলেছেন। কিন্তু রুস্তমজির মৃত্যুর (১৯৩১) পরে ম্যাডান সাম্রাজ্যের ভাঙন শুরু হয়। ম্যাডান পুত্রদের মধ্যে বনাবনির অভাবে পুরোনো কর্মচারীরা একে একে চলে যেতে থাকেন। তিনের দশকের শেষে বন্ধ হয়ে যায় ম্যাডান থিয়েটার্স। এই অবাঙালি ভারতীয়র গৌরবময় গাথা আঁকড়ে এখনও পড়ে আছে ধর্মতলার ব্যস্ত রাস্তা — ম্যাডান স্ট্রিট।
ম্যাডান স্ট্রীট দিয়ে অনেক বার গেছি, কিন্তু আমারও আর পাঁচ জনের মতো একিই ধারণা ছিল, ম্যাডান স্ট্রীট নাম টি এসেছে কোন ইউরোপীয়ান সাহেবের নাম থেকে। ধন্যবাদ ওনেকে এই ধরনের অজানা ইতিহাস নিয়ে লেখার জন্যে। এই লেখাটি না পেলে হয়তো আমারও সঠিক ইতিহাস অধরাই থেকে যেত । ম্যাডান স্ট্রীট দিয়ে অনেক বার গেছি, কিন্তু আমারও আর পাঁচ জনের মতো একিই ধারণা ছিল, ম্যাডান স্ট্রীট নাম টি এসেছে কোন ইউরোপীয়ান সাহেবের নাম থেকে। ধন্যবাদ ওনেকে এই ধরনের অজানা ইতিহাস নিয়ে লেখার জন্যে। এই লেখাটি না পেলে হয়তো আমারও সঠিক ইতিহাস অধরাই থেকে যেত । 👍👍
অনেক ধন্যবাদ