১৭৬২-র ৩০শে অক্টোবরের বাংলা থেকে কোর্টে পাঠানো সাধারণ চিঠিতে দেখা যায় যে, পরগনাগুলো এক বছরের জন্য কোম্পানির হাতে রাখার প্রস্তাবটা সে সময় নেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, রাজস্ব ইজারা দেওয়ার মাধ্যমে ইজারার মূল্য নির্ধারণ করাই ছিল সবচেয়ে সহজ উপায় — হলওয়েলের এই স্থির বিশ্বাস, ভূমি কমিটি (কমিটি অব ল্যান্ডস) নস্যাৎ করল। হলয়েলের তত্ত্বের আনুমানিক ভিত্তি ছিল, কোনো যুক্তিবাদী ব্যক্তিই রাজস্বের বিনিময়ে এককালীন অর্থ জমা রাখার বাধ্যবাধকতা স্বীকার করবে না, যদি না সে কৃষকদের থেকে সেই পরিমাণ অর্থ আদায় করার পথ এবং সেই আদায় থেকে নিজের লাভের জন্য একটা নির্দিষ্ট অংশ রাখার ছবি পরিষ্কার দেখতে পায়। এই মতের পক্ষে যতই বিমূর্ত যুক্তি উপস্থাপন করা হোক না কেন, বাস্তবে দেখা গিয়েছিল, প্রকাশ্য নিলামে রাজস্ব ইজারার দেওয়া জন্য উত্থাপিত দর সাধারণত অত্যন্ত ফটকা প্রকৃতির ছিল। যদি ইজারার মেয়াদ তিন বছর হতো, তবে প্রথম বছরে ইজারাদার কৃষকদের থেকে অতিরিক্ত খাজনা আদায় করত; এবং যদি সে দেখত যে সে নিজের জন্য লাভ করতে পারছে না বা তার বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে পারছে না, তবে সে প্রথম বছরেই দায়িত্ব ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চক্কর তৈরি করত; দ্বিতীয় বছরে সে টিকে থাকলেও বকেয়া ফেলত, এবং তৃতীয় বছরেও যদি টিকে থাকত, তাহলে মোট রাজস্ব আদায়ের জন্য তার হাতে খুব কম সময় আছে জেনে সে রাজস্ব আদায়ে চরম অবহেলা করত। যেহেতু রাজস্ব ইজারাদাররা মূলত স্থানীয় মানুষজন ছিলেন না, বরং জেলার অধিবাসীও ছিলেন না, তাই স্থানীয় স্বার্থের বাধ্যবাধকতাও তাকে রায়তদের স্বার্থ দেখতে প্রণোদিত করত না, এবং তার কার্যকালের মেয়াদ এতটাই ছোট ছিল যে, রায়তদের সঙ্গে তার আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠার সুযোগও থাকত না। The temptation to make undue profits, if profits proved possible, or else either to abscond or become fraudulently bankrupt, had not been duly considered when it was maintained as plain commonsense that no man would involve himself in obligations to pay a lump-sum if the lands or customs would not produce such a lump-sum and an ample profit for the collector into the bargain (যখন সাধারণ ধারণা ছিল, জমি বা শুল্ক দর কষাকষিতে সংগ্রাহকের জন্য এতটা এককালীন এবং প্রচুর মুনাফা না আনলে কোনও ব্যক্তি এককালীন অর্থ প্রদানের বাধ্যবাধকতায় নিজেকে জড়াবে না, তখন অযৌক্তিক মুনাফা অর্জনের প্রলোভন, যদি লাভ সম্ভব হয়, অথবা হয় পালিয়ে যাওয়ার বা প্রতারণামূলকভাবে দেউলিয়া হওয়ার প্রলোভন, তখন যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।)। দরপত্রের ফটকাবাজিমূলক প্রকৃতির কারণে নিলামে দেওয়া প্রস্তাবগুলো থেকে জমি বা শুল্কের মূল্যের কোনো ঠিক অনুমান পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না।
১৭৬৭-তে বেশ কিছু স্থানীয় ব্যক্তি চব্বিশ পরগনার ইজারার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রস্তাব করেছিল ১০,০০,০০১ টাকা, কিন্তু “প্রেসিডেন্ট সম্মতিতে জমির মূল্য প্রস্তাবিত অঙ্কের চেয়ে বেশি বলে কাউন্সিল এই সিদ্ধান্ত নেয়, যতক্ষণ না জমির প্রকৃত মূল্য উপযুক্তভাবে নির্ণয় করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত কালেক্টর জেনারেলের তত্ত্বাবধানে রাজস্ব আদায়ের কাজটি কোম্পানির হাতেই রাখা কোম্পানির স্বার্থের জন্য অধিকতর মঙ্গলজনক হবে।” (লং: সিলেকশনস, নং ৯১২ এবং ৯৪১-এর উল্লেখ আছে) এই সময়ে প্রেসিডেন্ট ছিলেন লর্ড ক্লাইভ এবং তাঁর মত তুলে দেওয়া যাক:
কোম্পানির নিজস্ব বা কলকাতা অঞ্চলের জমিগুলির বিষয়ে, আমার বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে যে সেই রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে কোম্পানির প্রতি গুরুতর অবিচার করা হয়েছে। সিলেক্ট কমিটি এই জমিগুলির প্রকৃতি ও মূল্য সম্পর্কে একটা পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করার পরিকল্পনার কথা বিবেচনা করেছিল, কিন্তু গত ১লা নভেম্বর পর্যন্ত, যে মেয়াদের জন্য জমিগুলি পূর্ববর্তী ইজারাদারদের কাছে ইজারা দেওয়া হয়েছিল, সেই মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে বা সংঘটিত জালিয়াতি বিন্দুমাত্রও শনাক্ত করতে পারেনি। এই জমি এখন এই বোর্ডের অধীনে এসেছে, এবং আমি আশা করি, এই জমিগুলোর প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের জন্য আপনাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকা দরকার। যে ভদ্রলোকেরা পূর্বে পরগনাগুলি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছিলেন, তাঁরা যদি বড় ধরনের সুবিধা নাও পেয়ে থাকেন, তবে এটা নিশ্চিত যে তাঁদের অধীনে কর্মরত কর্মচারীরা তা পেয়েছিল; কারণ আমি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানতে পেরেছি যে, সেই ভদ্রলোকদের বানিয়ানরা, এবং অন্যান্যরাও, প্রতি বিঘা জমি ৮ থেকে ১২ আনা হারে ভোগদখল করছে, অথচ অন্য প্রজারা ২ টাকা ৪ আনা থেকে ২ টাকা ১২ আনা পর্যন্ত খাজনা দিয়েছে। আমি সর্বোত্তম তথ্য সংগ্রহ করে জানতে পারছি যে, কলকাতা অঞ্চলের জমি অল্প সময়ের মধ্যেই কোম্পানিকে বছরে চৌদ্দ থেকে পনেরো লক্ষ টাকা রাজস্ব দিতে সক্ষম হওয়া উচিৎ। যদি তাই হয়, তবে সেই ভদ্রলোকদের আচরণ কতটা নিন্দনীয়, যাঁরা তাঁদের নিয়োগকর্তাদের স্বার্থকে এমন নির্লজ্জভাবে উপেক্ষা করেছেন!
বিবৃতিটি ক্লাইভ ১৯শে জানুয়ারি, ১৭৬৭-তে দিয়েছিলেন, এবং তিনি সম্ভবত ভেরেলস্টের গবেষণার উপর নির্ভর করছিলেন। মাথায় রাখতে হবে ভেরেলস্ট ২৯শে এপ্রিল সিলেক্ট কমিটির কার্যবিবরণীতে কলকাতা অঞ্চলের জমি বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কার্যবিবরণী পেশ করেন —
চব্বিশ-পরগনার পরিমাপের বিভিন্ন সময়ে গৃহীত বিভিন্ন হিসাব থেকে দেখা যায় যে, সমগ্র জমির পরিমাণ ১০,৮২,৫৪৩ বিঘা, ১৫ কাঠা জমি, চাষ করা হয়েছিল কিন্তু দাতব্য [রাজস্বমুক্ত] জমি দেখিয়ে পরিত্যক্ত [এ সব রাজস্বদায়ী নয়] বলা হয়েছিল, এবং নতুন করে গোপনও করা হয়েছে, এই পরিমাপের দুই-তৃতীয়াংশের কমই প্রকৃতপক্ষে কোম্পানিকে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এই ঘাটতির কারণ অনুসন্ধানে গিয়ে কোম্পানি দেখতে পায় তার জমিতে বাসিন্দাদের সংখ্যা হ্রাসের পরিবর্তে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বিষয়টা নিশ্চিত করতে আমার সময় এবং মনোযোগ বিশেষভাবে নিয়োজিত করেছে।
“দাতব্য জমিগুলির পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যায় যে, যখন কোম্পানি এই পরগণার দায়িত্ব পেয়েছিল, তখন এই উদ্দেশ্যে নির্ধারিত জমির মোট পরিমাণ (যার হিসাব জমিদাররা নিজেরাই প্রদান করেছিলেন) —

(লক্ষ্য করা যাবে যে বিয়োগে একটা ভুল আছে, কিন্তু সংখ্যাগুলো ‘লং-এর সিলেকশনস’-এ যেমন দেওয়া আছে, তেমনই রাখা হয়েছে।)
এর পরিবর্তে, কোনো না কোনো উপায়ে, সম্ভবত দপ্তরের কৃষ্ণাঙ্গ [দেশিয়] কর্মচারীদের দুর্বৃত্তির জন্য সেই সময় থেকে জমির পরিমাণ বেড়ে ২,৬৩,৭০২ বিঘা ২ কাঠা ৮ ছটাক হয়েছে, যার ফলে কোম্পানি ৬১,২২০ বিঘা ৪ কাঠা ৮ ছটাক জমির বার্ষিক খাজনা থেকে বঞ্চিত হয়েছে, যার বেশিরভাগই, যদি সবটা নাও হয়, সম্ভবত দপ্তরের দেশিয় কর্মচারীদের বা তাদের নির্ভরশীলদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।
“এই জমিগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ২৫,৬৭৯ বিঘা ১৩ কাঠা জমি দীর্ঘকাল ধরে পতিত অবস্থায় পড়ে আছে। যেহেতু এই জমিগুলো মূলত দরিদ্র মানুষের তাৎক্ষণিক ভরণপোষণ বা ধর্মীয় কাজের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল, তাই এগুলো কেবল চাষাবাদের মাধ্যমেই ব্যবহারযোগ্য হত, এবং দেশের প্রথা অনুযায়ী, যাদের তত্ত্বাবধানে ছিল তারা অবহেলা করলেই কোম্পানির পক্ষে সেটা অবিলম্বে বাজেয়াপ্ত করা উচিত ছিল। আমি মনে করি, প্রত্যেক ব্যক্তি যে সনদের মাধ্যমে তারা এই জমিগুলো ভোগদখলের অধিকারী, তা দেখাতে বাধ্য করলে রাজস্বে একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। ৬১,২২০ বিঘা ৪ কাঠা ৮ ছটাক জমি বাজেয়াপ্ত করার পর, উপরোক্ত দাতব্য কাজের জন্য বরাদ্দকৃত জমির পরিমাণ বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে আমি মনে করি, কারণ ২,০২,৪০১ বিঘা ১৮ কাঠা ৮২ ছটাক জমিকে (লং-এর দেখানো অঙ্কে) অন্য জমির গড় খাজনার হারে হিসাব করলে, বার্ষিক রাজস্ব ৩,১৪,৬৩৮ টাকার কম হবে না।
রায়তি জমি, বা যে জমিগুলো ইজারা দেওয়া হয়েছে, তার পরিমাণ কাছারি বইয়ে ৫,৯১,১৭২ বিঘা ৯ কাঠা দেখানো হয়েছে, যেখান থেকে বার্ষিক ১০,১২,৩০৫ টাকা ১২ আনা রাজস্ব আদায় হয়; এছাড়াও এই খাতের অধীনে ২৯,৩৬৩ বিঘা ৩ কাঠা ১২ ছটাক জমি পতিত বলে দেখানো হয়েছে, কিন্তু এ বিষয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে আমার ধারণা যে, এর বেশিরভাগই আবাদি জমি এবং একে অবিলম্বে রাজস্ব খাতের আওতায় আনা উচিত। আরও দেখা যায় যে, কর্মরত কর্মচারী এবং তাদের নির্ভরশীলদের দখলে থাকা ১৫,৮৭৭ বিঘা ৫ কাঠা ১৩ ছটাক জমির খাজনা যা হওয়া উচিত ছিল তার চেয়ে কম ধরা হয়েছে, যা হিসাবের আওতায় আনা হবে, কারণ কোম্পানির নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি যখন মাসিক ভাতা পান, তখন কোনো উপরি পাওনার প্রয়োজন আমি দেখি না, এবং তারা কীসের বলে এতদিন ধরে এত কম হারে খাজনা দিয়ে আসছিলেন, তার যৌক্তিকতা আমি খুঁজে পাইনি।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ