এই প্রস্তাবগুলোর বিরুদ্ধে ইংরেজরা যে সব রাজস্ব ইজারাদারদের দায়িত্বে পেয়েছিল, তারা স্বাভাবিকভাবেই আপত্তি জানালেন এবং নিম্নলিখিত বিনীত প্রতিবাদপত্র পেশ করলেন :
‘আপনাদের কাছে আবেদনকারীদের প্রধান অংশ হলেন কোম্পানির সদ্য অধিগ্রহণ করা ভূমির প্রাচীন কৃষক, এবং তাঁরা অপরিসীম শ্রম আর যত্নের পাশাপাশি প্রচুর অর্থ ব্যয় করে জঙ্গল পরিষ্কার করেছেন, বনের আদিম অধিবাসীদের বিতাড়িত করেছেন, যাতে ভূমিকে মানববসতিপূর্ণ করা যায়, এবং বছরের পর বছর অক্লান্ত এবং অবিরাম পরিশ্রমের ফলে তাঁরা তাঁদের শ্রমের ফল এবং ভূমিকে সমৃদ্ধ হতে দেখে আনন্দিত হয়েছেন; আরও অধিক উৎসাহ এবং প্রসারের জন্য তাঁদের পূর্বপুরুষেরা নিজেদের পরিবারসহ অভিবাসিত হয়ে নতুন আবাদ করা জমির কেন্দ্রে বসতি স্থাপন করেছেন, যেখানে তাঁরা তাঁদের বাসস্থান নির্মাণ করেছেন, এবং তাঁদের উপস্থিতি ও সদয় আচরণের ফলে তাঁদের প্রজাদের সংখ্যা প্রতিদিন বৃদ্ধি পেতে দেখে আনন্দিত হয়েছেন – তাঁদের তাঁরা নিজেদের পরিবারের অংশ হিসেবে দেখতেন এবং গণ্য করতেন, এবং যাঁরা সামান্য আহ্বানেই যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকতেন, যার ফলে এই ভূমি থেকে সমস্ত ডাকাত, চোর ইত্যাদি সর্বদা দূরে থাকত; এবং যদি জমিদারদের (বা বরং বিভিন্ন নবাবদের) দ্বারা জমির উপর আরোপিত অন্যায় এবং অতিরিক্ত করের মাধ্যমে আমাদের উদ্যোগে বাধা সৃষ্টি না করা হতো, তবে জমির এত বড় অংশ বর্তমানের মতো অনুর্বর আর পতিত থাকত না, যার ফলে গত কয়েক বছর ধরে আমরা ভূমিকে যে সমৃদ্ধ অবস্থায় নিয়ে এসেছিলাম, তা হ্রাস পাচ্ছে এবং খাজনা ক্রমাগত কমছে; যখন মাননীয় কোম্পানির এই ভূমিগুলির দখল নেওয়ার সুখবর পেলাম, তখন আমরা আবার এই মনোরম আশায় উজ্জীবিত হলাম যে আমরা আমাদের তত্ত্বাবধানে ভূমিগুলিকে কেবল কয়েক বছর আগের সেই সমৃদ্ধ অবস্থায় ফিরিয়ে আনব না, বরং আমাদের প্রত্যাশিত নতুন শাসকদের মৃদু ও ন্যায়সঙ্গত শাসনের অধীনে কয়েক বছরের মধ্যে আমরা এই সন্তুষ্টি লাভ করব যে জমির প্রতিটি বিঘা মাননীয় কোম্পানির সম্মান ও গৌরবের জন্য তার উপযুক্ত ফসল উৎপাদন করবে।(লং: পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ২০৩-৪)
১৭৫৯-তে কাউন্সিলের সামনে সেই সমস্যাটিই উপস্থিত হয়েছিল, যা লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় পর্যন্ত ইংরেজ রাজস্ব প্রশাসকদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছিল। বিকল্প ছিল কৃষকদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরাসরি রাজস্ব আদায় করা অথবা জমিদারদের মাধ্যমে আদায় করা, অথবা রাজস্ব আদায়ের কাজটি ফটকাবাজ পুঁজিপতিদের ইজারা দেওয়া। ১৭৫৯-তে ইংরেজরা দ্বিতীয় পদ্ধতিটির পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়, ক্লাইভ এই মত পোষণ করতেন যে হলওয়েলের চিঠিতে উপস্থাপিত যুক্তিগুলো অখণ্ডনীয় ছিল। সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, “পরগনাগুলোকে পনেরোটি ভাগে বিভক্ত করে প্রকাশ্য নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে তিন বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হবে, তবে জমির রাজস্ব এবং বিচারিক ক্ষমতা, জরিমানা, বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি, মাটির নিচে লুকানো ধনসম্পদ ইত্যাদি কোম্পানির হাতে সংরক্ষিত থাকবে।” (হলওয়েল: ইন্ডিয়া ট্র্যাক্টস, পৃষ্ঠা ১৭৫) নিলামটি টাউন হলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং ফলাফল ছিল নিম্নরূপ: (লং: সিলেকশনস, নং ৪৪৩। বানান লং অনুযায়ী।)

ফ্র্যাঙ্কল্যান্ডের প্রতিবেদনের উপর কোর্ট অফ ডিরেক্টরসের মতামত একটা রাজস্ব কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার নির্দেশনাসহ বাংলায় এসে পৌঁছায়। ১৭৬০-এর ১লা এপ্রিল বাংলা কর্তাদের তাদের নিয়মিত চিঠিতে ডিরেক্টররা লেখেন :
“৯৪. আমাদের কাছে হস্তান্তরিত জমিগুলোর বিষয়ে, মিঃ ফ্র্যাঙ্কল্যান্ডের চিঠিটি অত্যন্ত দীর্ঘ এবং যদিও খুব একটা বোধগম্য নয়, কিন্তু বিভিন্ন পরগনা, জমি এবং রাজস্ব সম্পর্কে তার বিবরণ বিচক্ষণ ও স্পষ্ট। অনুর্বর এবং পতিত জমির পরিমাণ অনেক বেশি, কিন্তু আপনাদের যত্ন ও মনোযোগের মাধ্যমে আমরা ব্যাপক উন্নতির আশা করি। বেশিরভাগ মাটিতেই নারকেল গাছ জন্মাবে, যদিও আমাদের আশঙ্কা যে বাংলার অবস্থান সেগুলোর জন্য কিছুটা উত্তর দিকে। তবে আমরা বিষয়টি আপনাদের বিবেচনার জন্য সুপারিশ করছি। অনেক এলাকা লবণের জন্য, কিছু কিছু অঞ্চল ধানের জন্য এবং কিছু আখ চাষের জন্য উপযুক্ত হতে পারে; কিন্তু যেহেতু এই বিষয়গুলো কলকাতার ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই আমরা আপনাদের সর্বোচ্চ অধ্যবসায়ের বিষয়ে কোনো সন্দেহ রাখব না এবং আমরা সম্পূর্ণ ও আস্থার সাথে আপনাদের উপর নির্ভর করব। আমরা যা ন্যায়সঙ্গত তার চেয়ে বেশি কিছু দখল করতে চাই না বা কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও ধর্মান্ধ মানুষের মনে বিরক্তি সৃষ্টি করতে চাই না, কিন্তু পুরোহিত ও দেবতাদের জন্য বরাদ্দকৃত বিশাল জমির মধ্যে যদি অবহেলার কারণে কোনো অপব্যবহার শুরু হয়ে থাকে, তবেই আমরা কেবল সেগুলো বন্ধ করার জন্য আপনাদের অনুরোধ করছি। এই রাজস্ব আদায়ের জন্য প্রতি বছর প্রায় ৮০০ কর্মচারী নিযুক্ত থাকে, যাদের মজুরি বাবদ বছরে প্রায় ৫০,০০০ টাকা খরচ হয়, যা ছাড়াও তাদের বড় অঙ্কের জমি ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়। এটি রাজস্বের উপর দশ থেকে পনেরো শতাংশ, এবং এখানে হয়তো কিছু নিয়মকানুন প্রবর্তনের সুযোগ থাকতে পারে; কিন্তু তবুও, যদি এই নিয়মকানুনগুলো প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী চালু থাকে এবং সংস্কারের ফলে স্থানীয় অঞ্চলে জনগণের মধ্যে অস্বস্তি চারিয়ে যেতে শুরু করে অথবা আমাদের ওপর বদনাম আসার ঝুঁকি থাকে, তবে সে পরিবর্তন বিন্দুমাত্রও কাম্য নয়।
৯৫. সমস্ত বড় এবং ছড়িয়ে থাকা শাখায় অনেকগুলো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকা উচিত, এবং যদিও আমরা আমাদের কর্মচারীদের সততা ও বিশ্বস্ততা নিয়ে সন্দেহ করি না, তবুও আমরা প্রায়শই তাদের অমনোযোগিতা এবং শৈথিল্যের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি; এবং উদ্ভাবন ও উন্নতির এত বিশাল ক্ষেত্রে উপযুক্ত পরিকল্পনা প্রণয়নে আমরা যথেষ্ট সতর্ক না হয়ে পারি না।
৯৬. অতএব, আমরা নির্দেশ দিচ্ছি যে, এই নতুন অধিগ্রহণকৃত এলাকাগুলো একটা কমিটির ব্যবস্থাপনায় রাখা হবে। এই কমিটি পাঁচজন সদস্য নিয়ে গঠিত হবে (যার প্রধান হবেন তৎকালীন দ্বিতীয় ব্যক্তি, এবং তার সাথে কাউন্সিলের অন্তত আরও দুজন সদস্য থাকবেন), এই শর্তে যে, যখনই প্রেসিডেন্ট প্রয়োজন মনে করবেন, তিনিই নেতৃত্ব দেবেন, (১৭৬১-র ১৩ই মার্চের সাধারণ চিঠিতে কোর্ট অফ ডিরেক্টরস নির্দেশ দেন যে, প্রেসিডেন্ট সর্বদা ভূমি কমিটির প্রধান থাকবেন এবং সংগৃহীত রাজস্বের ২ শতাংশ তাকে ‘কনসুলেজ বা কমিশন’ হিসেবে প্রদান করা হবে। এটি লক্ষণীয় যে, ১৭৬৬-র কোর্ট অফ ডিরেক্টরস (General Letter to Bengal, 17th May, para. 17) লিখেছিলেন : — “আমরা লক্ষ্য করছি যে, যখন আমরা জাফর আলী খানের কাছ থেকে কলকাতা অঞ্চলের ভূমি অনুদান হিসেবে প্রথম গ্রহণ করি, তখন আমরা সরকার ও কৃষকদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী সকলকে অবিলম্বে অপসারণ করি এবং ভূমির ইজারা প্রকাশ্য নিলামে বিক্রি করি, এবং এতে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই যে আমাদের কর্মচারীরা তাদের সর্বোত্তম বিচারবুদ্ধি অনুসারে আমাদের স্বার্থেই কাজ করেছিল; কিন্তু এই পদক্ষেপকে স্থানীয়রা মনে করেছিল চরম নিপীড়নমূলক এবং হিন্দুস্তানের চলতি রীতির পরিপন্থী। তবে এই আংশিক মন্দ পদক্ষেপটি তখন একটা ছোট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এবং কোম্পানির আত্মপক্ষ সমর্থনে যুক্তি দেওয়ার ছিল যে, কলকাতার কাছাকাছি তাদের সমগ্র অঞ্চলটি প্রেসিডেন্সির সাধারণ প্রশাসনের অধীনে সহজেই রাখার সীমিত উদ্দেশ্যে এটি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ও যথাযথ পদক্ষেপ ছিল।” ভেরেলস্ট: ভিউ, ইত্যাদি, পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা ১৩৭।) এবং দেশীয় শাসকদের সাথে সমস্ত আবেদন বা বিরোধ কেবল তাঁর কর্তৃত্বের মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হবে। নিয়মিত হিসাবের খাতা রাখতে হবে এবং বিভিন্ন পরগণার জন্য আলাদা হিসাবের খাতাও খুলতে হবে; এই লেনদেনগুলো সাধারণ হিসাবের খাতায় ‘নতুন জমির খাজনা ও রাজস্ব’ শিরোনামে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে; তাদের লেনদেনের নিয়মিত ডায়েরি রাখতে হবে, যেখানে সমস্ত পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় মন্তব্য লিপিবদ্ধ থাকবে; সম্পূর্ণটি বার্ষিকভাবে আমাদের কাছে পাঠাতে হবে। এই কমিটির জন্য আপনাকে একজন চুক্তিবদ্ধ কর্মচারীকে সচিব ও হিসাবরক্ষক হিসেবে নিয়োগ করতে হবে।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ
খুবই গুরুত্বপূর্ণ লেখা আমার খুব ভালো লেগেছে।