সুরমান দৌত্য এবং সংশ্লিষ্ট ফরমানকে সুকুমার ভট্টাচার্য দ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এন্ড দ্য ইকনমি অব বেঙ্গল ১৭০৪-১৭৪০ আর আবদুল করিম, মুর্শিদ কুলি খানের এন্ড হিজ টাইমস-এ ম্যাগনাকার্টা আখ্যা দেওয়ার বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন সুশীল চৌধুরীর ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানাইজেশন অব বেঙ্গল-এর তৃতীয় অধ্যায় গ্রোথ এন্ড ডেভেলাপমেন্ট অব কোম্পানি ট্রেডের ৪২ পাতায়। সেই বক্তব্যটি তুলে দিলাম —
বাংলায় কোম্পানির ব্যবসা উন্নয়নের পঞ্জিকায় অষ্টাদশ শতকের প্রথম দুই দশক খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ তারা ফারুখশিয়রের থেকে মাত্র ৩০০০ টাকার বাৎসরিক পেশকাশ দিয়ে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের অধিকার অর্জন করে। বহুকাল ধরে ব্রিটিশেরা সারা দেশে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য অধিকার লাভ করার উদ্দেশ্যে একটা সাধারণ ফরমান আদায় করার ব্যবস্থায় ছিল। ব্রিটিশদের মনোভাব আমরা শাহ আলমের খানইখানান জাউদি খানকে লেখা মাদ্রাজের গভর্নর পিটের চিঠি থেকে পাই, যিনি ব্রিটিশদের এই ধরণের অধিকার অর্জনের জন্যে তাদের পাশে দাঁড়ান। পিট লিখলেন বাংলায় তাদের কাছে সম্রাটের ফরমান আছে এবং নবাবের নিশান আছে এছাড়াও মাত্র তিন হাজার টাকার বিনিময়ে শুল্কমুক্তির আদেশ হিসেবে বহু নবাবের পরওয়ানা আছে। তবুও নানান জায়গায় তাদের কুঠির সামনে বাণিজ্য অবরোধ তৈরি করা হচ্ছে। তার আশা খুব তাড়াতাড়ি কোম্পানি এমন একটা ফরমান পাবে, যার বলে আগামী দিন সব ধরণের বাধাবিপত্তি উন্মুক্ত হবে যা “লেড গ্রেটলি টু দ্য অনার অব দ্য কিং এন্ড দ্য অগমেন্টেশন অব দ্য রিচেস অব দিস কান্ট্রি (হোম মিসলেনি, ৬৯ খণ্ড, ১৮৪)। শেষ পর্যন্ত ফারুখশায়ারের দরবারে পাঠানো সুরমান দৌত্যের ফলে ১৭১৭ সালে ব্রিটিশরা তাদের চাহিদামত ফরমান পেতে সফল হয় (সুরমান দৈত্য সম্বন্ধে জানতে দেখুন হোম মিসলেনি, ৬৯-৭১ খণ্ড; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস মিস্লেনিয়াস ১৯, ২০ খণ্ড। ফরমানের বিষয় জানতে দেখুন হোম মিসলেনিয়াস, ৬৯ খণ্ড, ১৩০-৩১; এস ভট্টাচার্য, দ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এন্ড দ্য ইকনমি অব বেঙ্গল, ২৯; আবদুল করিম, মুর্শিদ কুলি খান এন্ড হিজ টাইমস, ১৬৬-৬৭)।
আমরা এস ভট্টাচার্য ১৭১৭-র ফরমানকে অভিহিত করেছেন ব্রিটিশ ব্যবসার ম্যাগনা কার্টা বা মুক্ত বাণিজ্যের সনদ হিসেবে; আমরা তাঁর মত মেনে নিচ্ছি না (এস ভট্টাচার্য, প্রাগুক্ত, ২৯)। অস্বীকার করার উপায় নেই যে ফরমানটা কাগজে কলমে ব্রিটিশ ব্যবসায় কিছু প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে দিয়েছিল – বিশেষ কর স্থানীয় প্রশাসন ফরমানের অভাবে ব্রিটিশ দাবির বিপক্ষে প্রশ্ন তুলত। ব্রিটিশদের সব থেকে বড় লাভ হয়েছিল বাৎসরিক মাত্র ৩ হাজার টাকার বিনিময়ে সারা ভারতে ব্যবসা উপযোগী একটা ফরমানের অন্তত একটা কাগজ হাতে থাকা। এর আগে কোন শাহী ফরমান ব্রিটিশদের এরকম ব্যবসার স্বাধীনতা দেয় নি, যদিও ঘুষ উপঢৌকনের বিনিময়ে বিভিন্ন সুবাদারের দেওয়া নিশান, পরওয়ানা ইত্যাদি নিয়ে তারা বিভিন্ন অঞ্চলে শুল্কমুক্ত ব্যবসা করছিল। তবে এই ফরমানটার বয়ান খুবই অস্পষ্ট এই কারণে যে কি ধরণের ব্যবসা শুল্কমুক্ত হবে তার কথা বলা নেই। কিন্তু মুল প্রেক্ষিত এবং ফরমানটা উদ্দেশ্য বিচার করলে বোঝা যাবে এই শুল্কমুক্তি শুধু কোম্পানির আমদানি রপ্তানি ব্যবসার জন্যে সত্য, অবশ্যই কোম্পানির দেশিয় ব্যবসার জন্যে আর কোম্পানির আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসার জন্যে নয়।
এস ভট্টাচার্য যে লিখেছেন যে এটা কোম্পানি এবং কোম্পানি কর্মচারীদের পক্ষে ব্যবসার স্বাধীনতা তৈরি করেছিল স্থানীয় প্রশাসনের হাতে নিগৃহীত না হতে, বা তল্লাসির বিরুদ্ধে এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে, এবং তারা এই ফরমানের মাধ্যমে অতিরাষ্ট্রীয় (এক্সট্রাটেরিটোরিয়াল) সুযোগ পেয়েছিল এটা বলা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে (ঐ, ২৯)। কোম্পানির আমলারা অত্যাচার এবং উতপীড়ন থেকে মুক্তি পেয়েছিল, যা আবদুল করিমেরও দাবি, সেটাকে অধিকার কিভাবে বলা যায় আর সেটাকে কিভাবে অতিরাষ্ট্রীয় অধিকারও বলা যায় জানি না (আবদুল করিম, প্রাগুক্ত, ১৬৯)। তল্লাসি থেকে মুক্তি পাওয়াকে যদি অধিকার যদি বলা যায় ফরমানে বা হাসবুলহুকুমে (শাহী নির্দেশ) এইরকম কোন লব্জ বলা নেই। কোম্পানির হাত থেকে পালিয়ে যাওয়া ঋণীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু এটা পরিষ্কার সেটা শুধু তার কর্মচারীদের ওপরেই প্রযোজ্য ছিল — কোম্পানিদের সঙ্গে কাজ করা ব্যবসায়ী বা তাঁতি, যারা কোম্পানির চাকুরে নন, তাদের ওপরে সে গ্রেফতারের কোনও অধিকারই প্রয়োগ করতে পারত না। আমরা যদি ফরমানের না বলা অংশটার দিকে নজর দিই, তাহলে দেখব সেখানে মার্চেন্ট-উইভার্স আর কোম্পানি সার্ভেন্টদের মধ্যে স্পষ্ট ভাগ করা হচ্ছে। মার্চেন্ট-উইভারসেরা যদি ঋণী হয় তাহলে ফরমান বলছে তারা খাতায়কলমে কুঠিয়ালদের যা প্রাপ্য তাই শুধু শোধ করবে। কিন্তু কোম্পানির কর্মচারী যদি ঋণী হয় তাহলে তাকে কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হবে। ফরমানে কোথাও কোম্পানির দেশিয় আর ইওরোপিয় কর্মচারীর মধ্যে পার্থক্য করা হয় নি। দেশিয় চাকুরে যদি ঋণী হয় তাকে কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হবে। এটা খুবই সাধারণতম অধিকার, অতিরাষ্ট্রীয় অধিকার বলা অতিরঞ্জিত হবে, কারণ অন্য সব ঝামেলাতেই কোম্পানির দেশিয় কর্মচারীর মুঘল আইনে বিচার হবে।
ফিরি ফার্মিঙ্গারের বয়ানে
১৬ই নভেম্বর, ১৭১৭-য় গভর্নর আর কাউন্সিল মুঘল ফরমান গ্রহণ করার জন্য হুগলির উজান, ত্রিবেণীতে জাঁকজমক সহকারে যাত্রা করেন এবং এরপর দুপক্ষ মিলিত হলে যথারীতি আনন্দ-উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। মুর্শিদ কুলি খান (মি. আরভিন লিখেছেন (জার্নাল অফ দ্য রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি, ১৮৯৭, পৃষ্ঠা ১৮১-৮২):- “বাংলার দেওয়ান মুর্শিদ কুলি খানকে ১১১৯ হিজরিতে (১৭০৭) বাহাদুর শাহের সিংহাসনারোহণের পর পদ থেকে অপসারণ করা হয় এবং তিনি দাক্ষিণাত্য যাত্রার পথে সেই সম্রাটের শিবিরে যোগদান করেন। জিয়া-উল্লাহ-খানের হত্যাকাণ্ড — ২রা মহররম ১১২২ হিজরি (২ মার্চ, ১৭১০) পর্যন্ত মুর্শিদ কুলি খানকে বাংলায় পুনরায় নিযুক্ত করা হয়নি।”) ইতিমধ্যেই শুল্ক সংক্রান্ত বিষয়টি মেনে নিয়েছিলেন, কিন্তু টাঁকশাল ব্যবহারের বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে শাহী ফরমানের বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়েনি। কাশিমবাজার কুঠির প্রধান কুঠিয়াল স্যামুয়েল ফিক তাঁর কাছে অনুনয়-বিনয় করেও ব্যর্থ হন। শাহী ফরমান পাঠ করার পর নবাব “স্পষ্টভাবে বলেন যে, আমরা [কোম্পানি] টাঁকশাল ব্যবহারের অনুমতিও পাব না অথবা আরও শহর কেনার স্বাধীনতাও পাব না, যদিও সম্রাট আমাদের উভয়ই মঞ্জুর করেছেন।” এবং এখানেই, বাংলার ক্ষেত্রে, সুরমানের দৌত্য দলের সফল দৌত্যের কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায়। ইংরেজরা যদি শহরগুলো কিনতে পারত, তবে তাদের জমিদারী উত্তরে ডাচ কুঠি বা বারানগরের সীমানা থেকে দক্ষিণে কুলপি পর্যন্ত বিস্তৃত হতো এবং কলকাতার বিপরীতে নদীর তীরে অবস্থিত সালকিয়া, হাওড়া, কাসুন্দিয়া, রামকৃষ্ণপুর এবং বেতোড়ের গ্রামগুলো এর অন্তর্ভুক্ত হতো। কিন্তু মুর্শিদ কুলি খানের ভ্রুকুঞ্চিত মুখের সামনে আদৌ কোন দেশীয় ব্যক্তি তার জমিদারী স্বত্ব বিক্রি করার সাহস করত?
ভারতে ইংরেজদের একটি বিবরণমূলক ইতিহাসে মুঘল দরবারে সুরমানের দৌত্যের কাহিনী গুরুত্বের দিক থেকে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করা উচিৎ (মিলের হিস্ট্রি অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৩ (১৮৫৭ সংস্করণ)। সি. আর. উইলসন ফারুকসিয়ারের অনুমতি দেওয়া সুযোগ-সুবিধা থেকে ইংরেজদের তাৎক্ষণিক সুবিধা পাওয়ায় ব্যর্থতার কারণ হিসেবে মুর্শিদ কুলি খানের অনমনীয়তা ছাড়াও অন্য কারণও উল্লেখ করেছেন; যেমন, প্রথমে ওস্টেন্ডারদের [ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি] সাথে এবং তার পরের আমলে মারাঠাদের সাথে সংগ্রামের ফলে উদ্ভূত জটিলতা, এবং “কোম্পানির কর্মচারীদের নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যবসার ক্ষতি করে স্থানীয় সরকারের সাথে ঝগড়া করার স্বাভাবিক অনিচ্ছা।” উইলসন, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, খণ্ড ২, অংশ ২, পৃষ্ঠা ৫৮); কিন্তু বাংলায় ইংরেজদের অধিকার প্রতিষ্ঠার গবেষণায় এই কাহিনীটি খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। অন্য জায়গায় কেন্দ্রিয় দরবারে আলাপ-আলোচনায় অর্জিত সুযোগ-সুবিধাগুলো পুরোপুরি ব্যবহার করার সুযোগ পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু বাংলার নবাব এতটাই শক্তিশালী ছিলেন যে, তিনি কোম্পানিকে সেই প্রধান উদ্দেশ্যগুলো পূরণ করতে প্রবল বাধা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন, অথচ এর জন্য এত কষ্ট ও ধৈর্য ধরে শাহী ফরমান সংগ্রহ করার উদ্যম নেওয়া হয়েছিল। বাংলার ক্ষেত্রে প্রাপ্ত ফলাফল সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি যা বলা যায়, তা হলো প্রয়াত Dr. C. R. Wilson, তাঁর Introduction to the Diary of Messrs. Surman and Stephenson (ডায়েরিটি প্রয়াত সি. আর. উইলসনের ‘আর্লি অ্যানালস অফ দ্য ইংলিশ ইন বেঙ্গল’-এর দ্বিতীয় খণ্ডের দ্বিতীয় অংশ। ডক্টর উইলসন ২৪ জুলাই, ১৯০৪ সালে লন্ডনে মারা যান এবং অ্যানালসের দ্বিতীয় খণ্ডের দ্বিতীয় অংশটি ১৯১১ সালে উইলিয়াম আরভিনের (মৃত্যু ১৯১১) সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়, আরভিনের স্মৃতি অমলিন হয়ে থাকবে মানুচ্চির স্টোরিয়া দো মোগর’-এর চমৎকার অনুবাদের মধ্যে দিয়ে)
সুতরাং, কলকাতার ক্ষেত্রে সুরমান দৌত্যের প্রচেষ্টা ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছিল; কিন্তু ১৭৫৪-তে তিন শহরের এক উদ্যমী কালেক্টর স্থানীয় জমিদারদের কাছ থেকে একটি সংলগ্ন জেলার দখল পেতে সফল হন। ৮ই ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট ও কাউন্সিল দেশে লিখে পাঠান:
“৮ই আগস্ট, মিঃ হলওয়েল বোর্ডের কাছে লেখা এক চিঠিতে আমাদের জানান যে, তিনি সিমিলিয়া নামক একটি জমির মালিকদের রাজি করানোর জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন, যাতে তারা আপনার সম্মানীয়দের কাছে ২,২৮১ টাকা ভাড়ায় জমিটি ইজারা দেয়। তিনি আপনার পক্ষে জমিটি গ্রহণ করার জন্য আমাদের অনুমতি চেয়েছিলেন, কারণ স্থানটি (এক অর্থে কলকাতারই একটি অংশ হওয়ায়) অনেক সুবিধাজনক ছিল এবং এর বর্তমান ব্যবস্থাপনায় এর রাজস্ব আমরা যে পরিমাণ অর্থ দেব তার চেয়ে বেশি ছিল, এবং তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে আমাদের হাতে এলে এটি থেকে আরও অনেক বেশি আয় হবে। সেই অনুযায়ী আমরা তাকে দখল নেওয়ার অনুমতি দিয়েছি। কিন্তু যেহেতু পরবর্তীকালে এই জমির জখল নিয়ে বিরোধিতা হয়েছে, তাই আমরা এখনও বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে পারিনি, তবে যখনই আমরা তা করতে পারব, আপনার সম্মানীয়দের যথাসময়ে অবহিত করব।” (১ লং সিলেকশনস, নং ১৩৯। আরও দেখুন লং-এর পাদটীকা, ঐ, পৃ. ৫৩)
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ