শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | সকাল ৯:৫৭
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নির্বাচন পরবর্তী মিয়ানমার-রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীচৈতন্যদেব গরুড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক : অসিত দাস বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দোলউৎসব : রিঙ্কি সামন্ত পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এলেন রবীন্দ্রনাথ : প্রবুদ্ধ পালিত এসআইআর-এর নামে ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ সরব দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ঘন ঘন কেঁপে উঠছে কেন : তপন মল্লিক চৌধুরী জহির রায়হান-এর ছোটগল্প অনমিতা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘কান্না হাসির দোলায়’ আ শর্ট ট্রিপ টু ‘জামশেদপুর’ : রিঙ্কি সামন্ত নয় টাকা কেজি দরে বারো লক্ষ টন আলু কিনবে রাজ্য সরকার : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় এআই ইমপ্যাক্ট সামিট নিয়ে প্রশ্ন অনেক উত্তর কম : তপন মল্লিক চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার বাবার রসবোধ : সৈয়দ মোশারফ আলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি বই যেভাবে বদলে দিয়েছিল তলস্তয়কে : সাইফুর রহমান কেন্দ্রের দ্বিচারিতায় দীর্ঘ আট বছরেও পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হল না : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আলুর পর্যাপ্ত ফলন, প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ব্রাত্য দেবতা পঞ্চানন, বিস্মৃত ইতিহাস : সুব্রত দত্ত

সুব্রত দত্ত / ৭১৪ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫

 শুন শুন সাধুজন,

 শুন দিয়া মন।

 পঞ্চাননের পঞ্চকথা,

 করিব বর্নন।

 কখনও ভয়াল তিনি

 কখনও দয়াল,

 কালের সাক্ষী তিনি

 তিনি মহাকাল।

 শিকড়ের স্মৃতি হয়ে

 তার অবস্থান

 সেই কথা শোন সবে

 পাবে আত্ম জ্ঞান।

পৌষ পার্বণ শেষ। এবার মেলার বেলা। বিশেষত রাঢ় বাংলায়। বর্ধমান বীরভূমে মেলার শেষ নেই। এই মেলার ভিড়ে নজর কাড়ে কাটোয়া অঞ্চলের পঞ্চানন মেলা। আমাদের এলাকায় খুব কাছাকাছি তিনটি মেলা আছে। গীধগ্রাম অঞ্চলের কারুলিয়া গ্রাম, চান্ডুলি অঞ্চলে মুলগ্রাম ও করজগ্রাম অঞ্চলে পঞ্চানন মেলা। এ ছাড়া কাটোয়ার পাশে বাঁদরা গ্রামেও মেলা বসে। সেখানেও কালু রায় সম্ভবত বাবা পঞ্চানন।

আমার এলাকার পঞ্চানন পূজা বাঁধমুড়া, গোঁড়াপাড়া, গোপালপুর, বনগ্রাম, গাঁফুলিয়া, আলমপুর চার পাঁচটি গ্রামের। কিন্ত মেলা সবার। হিন্দু মুসলিমে ভেদ নেই। আত্মীয় কুটুম্বে ভরা বাড়ি। যাত্রাপালা, কবিগান, লেটো গান, ম্যাজিক শো, পুতুলনাচ, সার্কাসে জমজমাট মেলা চলে সপ্তাহ খানেক। সারা বছর ধরে মানুষ অপেক্ষা করে মেলার।

খুব ছোট্ট বেলা থেকেই দেখছি বাবা পঞ্চাননকে। আমাদের দুর্গাগ্রাম থেকে একটু দূরে ‘ফরে’ নদীর ধারে এক নির্জন স্থানে ছিল এক অতিবৃদ্ধ অশ্বত্থ বৃক্ষ। জটার মত ডালপালা ছড়িয়েছিল অনেক দূর। সেই ডালে দোল খেতাম স্কুলের টিফিনে। তার তলেই ছিলেন বাবা। কোন মূর্তি ছিল না তখন। মানতের মাটির ঘোড়ার স্তূপ তাকে ঘিরে। বছরের একদিন তার পূজা। হাজার হাজার মানুষের ভীড়। মেলা উৎসব। বর্তমানে সেখানে শিবের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। গাছটাও নতুন। বৃদ্ধ পুরাতন গাছের মৃত্যুর পর বীজনগর গ্রামের ভীষ্মদেব বৈরাগী পুরাতনের নতুন প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠা করেন। চোখের সম্মুখে দেবতার রূপান্তর হল তখন বুঝি নাই। কে এই দেবতা? তিনি কি সত্যিই হিন্দুর ভোলা মহেশ্বর! একটু বড় হতেই নানা প্রশ্নের ভীড় জমল মনে। মাঘ মাসে তো শিব পূজার প্রচলন নেই! শিব নাকি পরম বৈষ্ণব। অথচ সেখানেই কয়েকশ পাঁঠা শূকর বলি! শিব রাত্রি,শিব গাজনে কেন কোন পূজা নাই এখানে? এ কেমন শিব! অনেক পরে পেলাম রহস্যের উত্তর। তিনি শিব নন। তিনি এক অপদেবতা। তার শিকড় আদিম যুগে। যখন এ বাংলা ছিল অনার্যের বাসভূমি তখন তিনিই ছিলেন একচ্ছত্র আধিপতি। তারপর তার দিন গেল। দেবতা থেকে হলেন অপদেবতা। গরিমা হারিয়ে গ্রাম থেকে নির্বাসিত হলেন দূরে। তবে আসন টলেনি। ভয় আর ভক্তির জোরে পূজাও পেয়েছেন। তাকে ঘিরে রহস্যের মেঘ জমেছে। কোথাও বদলে গেছে নাম। তবে অতীত রূপেও আছেন কোথাও কোথাও। অনেক উত্থান পতন। নিজের আসন ফিরে পেতে এক অন্ত্যজ দেবতার সংগ্রাম কাহিনি তুলে ধরব আজ।

মানুষের জীবন যখন ছিল বড়ই অনিশ্চিত। যখন জ্ঞান বিজ্ঞান ছিল না। তখন মানুষের বাঁচার ভরসা ছিলেন ঠাকুর দেবতারাই। সমস্যার যেমন নানান রূপ দেবতাও তাই। সব জীবের মত মানুষও চায় বংশ বিস্তার করতে। বংশ রক্ষা করতে। সন্তান হল বংশ প্রদীপ। ছোট বেলায় দেখেছি অধিকাংশ শিশুর মৃত্যু হত সূতিকাগারে। পূর্বে গ্রামে প্রসূতিদের সন্তান প্রসব করাতেন হাড়ি মা। তারা বাঁশের ছিলা দিয়ে নবজাতকের নাড়ি কাটতেন। ডেটল বা কোন রকমের প্রতিষেধকের ব্যবহার করতেন না। ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার গল্প তখন কেউ শোনেনি। টিটেনাশ বা ধনুষ্টংকার নামক ভয়ংকর ব্যাধির কথা জানাই ছিল না কারো। জন্মের পর অনেক শিশুই এই রোগে আক্রান্ত হত। ধনুর মত বেঁকে উঠত শরীর। মর্মান্তিক মৃত্যু হত তাদের। অনেক শিশু ভিটামিন ডি’এর অভাবে রিকেট রোগে আক্রান্ত হত। হাড় বেঁকে যেত, শুকনো শরীর দড়ির মত পাকানো, অস্থি কঙ্কাল সার হত শিশু। অজ্ঞ গ্রামের লোক ভাবত এ সবই বাবা পঞ্চানন্দের আক্রোশ। তার প্রমথ বা চ্যালা পেঁচো ঘেঁচো মামদো ভূত বা ধনুষ্টংকার ভর করেছে শিশুর ঘাড়ে। ভয়ে তারা ছুটত ঠাকুরের থানে। মানত করত সন্তানের জীবনের জন্য। পূজা দিত। তাদের বিশ্বাস শিশু সন্তানদের ভাগ্য বিধান করেন যিনি তিনিই বাবা পঞ্চানন্দ বা পঞ্চানন। বাবা ঠাকুর, পাঁচু ঠাকুর, নানা এলাকায় তার নানান নাম। পূজার সময়ও আলাদা। কোথাও তিনি শিব পুত্র বটুক ভৈরব। অনেক জায়গায় আবার তিনি গ্রাম রক্ষক, কোথাও ক্ষেত্রপাল বা ক্ষেত্রের (জমি) অধিপতি হিসেবে পূজা পান তিনি। যেমন কাটোয়া ২নং ব্লকের সিঙ্গীগ্রাম। এখানে আষাঢ় শ্রাবণ মাসে মাঠের মাঝে এক বৃক্ষতলে মহা ধুমধামে পূজা। অর্থাৎ প্রাক বর্ষার কৃষি দেবতা তিনি। দেয়াশী সাহা (শুড়ি) সম্প্রদায়। তবে বর্তমানে মূল পূজা করেন ব্রাহ্মণরা।

পঞ্চাননের জন্মের নানান বৃত্তান্ত। কালিকাপুরাণে বর্ণিত আছে, মহাদেবের মুখ নিসৃত ফেনা থেকেই প্রমথদের উৎপত্তি। তাঁরা নৃত্য গীতে পারদর্শী ও নানান রূপধারী।এরা মহাদেবের চ্যালা বা পার্শ্বচর।এরা তুষ্ট হলে বন্ধ্যা নারীর সন্তান হয়, গর্ভস্থ ভ্রুন রক্ষা পায়, সন্তান রক্ষা পায়। শিশুর পেঁচোপাওয়া (রিকেট), খিঁচুনি (ধনুষ্টংকার) নিরাময় হয়।

মধ্য যুগীয় শিবতন্ত্রে উল্লেখ আছে —

 “কোন স্থানে পঞ্চানন,কোথাও স্বরূপ।

 কোথাও ভৈরবী মূর্তি দৃশ্য আপরূপ।

 পঞ্চানন দেব প্রায় অশ্বত্থ তলায়,

 মধ্য মাঠে সরোবর তীরে দেখা যায়।”

দ্বিজ দুর্গারামের পঞ্চানন মঙ্গলে পঞ্চাননের জন্ম বৃত্তান্ত আলাদা। দেব সেনাপতি কার্তিকের হাতে তারকাসুর নিহত হলে তার উদ্ধারের জন্য —

 “সভা করি বসিলেন যত দেব গণ

 পঞ্চ মুখে গান কর দেব ত্রিলোচন।

 পঞ্চ মুখে গান যদি তুমি সে করিবে

 তবে সে তারক বীর উদ্ধার হইবে।

 মহামন্ত্র মহাদেব কৈল উচ্চারণ,

 দেব বংশে হইল জন্ম নাম পঞ্চানন।

 হেনকালে ব্রহ্মাদেব কহে মহেশ্বরে,

 ব্যাধিরাজ ভারদেহ এই তো কুমারে।”

এই পঞ্চানন বা পঞ্চানন্দের মূর্তি অনেকটাই মহাদেবের মত। তবে কিছুটা বিভৎস বিভীষন। মাথার জটা কাঁধ ও পিঠে ছড়ানো। একটি মুখ, ত্রিলোচন রক্তিম গোলাকার, উগ্র দৃষ্টি। গলায় যজ্ঞোপবীত, কান পর্যন্ত বিস্তৃত গোঁফ। পরনে ন্যাংটার মত ব্যাঘ্র চর্ম, হাতে রুদ্রাক্ষ মালা ও তাগা, ত্রিশূল। পায়ে খড়ম, মাথা বা দেহের উপর সাপ। কোথাও কোথাও অশ্বারূঢ় বা ভাল্লুক বাহন। বাবার অনুচর জরাসুর ও ধনুষ্টংকার নামক দুজন অপদেবতা, সঙ্গে থাকে মামদো ভূত। তবে মূর্তি বিশেষ দেখা যায় না। সাধারণত অশ্বত্থ বৃক্ষ তলে বা শ্যাওড়া ঝোঁপে বাঁধানো উঁচু বেদীতে পোড়া মাটির ঘোড়া বা প্রস্তর শিলা বা ঘটকে দেবতা রূপে পূজা করা হয়, এখন অনেক স্থানেই মূর্তি ও মন্দির হয়েছে। নিত্য পূজার নিয়ম নেই তবে শনি মঙ্গলবারে বিশেষ পূজা হয়। সাধারণত পূজা করেন নিম্ন বর্ণের মানুষ,তাদের বলা হয় দেয়াশী বা দেওয়াশীন। তিনি নারী বা পুরুষ হতে পারেন। পূজার সময় কোথাও কোথাও পঞ্চানন ভর করেন দেয়াশীর উপর। ভরে ভক্তদের প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি। ওষুধ কবচের নির্দেশ দেন। গলসী থানার ইরকোনা গ্রামের পাঁচু ঠাকুর ভোলা রায় নামে পরিচিত। এখানে বন্ধ্যা নারী দেয়াশীর সামনে ঢিল ছোড়ে। দেয়াশী তাকে ঠাকুরের মন্ত্র পূত তেল কবচ দেন। সন্তান হলে নাম রাখতে হয় ভোলানাথ বা ভুলি। ছেলের ডান ও মেয়ের বা পায়ে লোহার বালা পরতে হয়। মানত শোধ না হওয়া পর্যন্ত চুল কাটা নিষেধ। পায়ের লোহার বালা ব্রাহ্মণদের উপনয়নের সময় অন্য জাতির বারো বছর বয়সে খোলার নিয়ম। এই বালা বাঁধিয়ে নব বধুর হাতে পরিয়ে দিতে হয় ছেলেদের।

এই পঞ্চানন বা পঞ্চানন্দের পূজার মন্ত্র বড়ই বিচিত্র। বিনয় ঘোষ তার পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি গ্রন্থে আরামবাগ অঞ্চলের যে পঞ্চানন্দের বিবরণ দিয়েছেন, সেখানে ক্ষেত্র পালক হিসাবে পূজা করা হয় তার। তার ধ্যান মন্ত্রে সংস্কৃতের বীজ ছড়ানো। অর্থ হীন ভাষা এই দেবতার আদিমত্বের পরিচায়ক।

 “টং টং বিটং কপানি বিটেং

 রং রং রক্ত বর্ণং রক্ত জিহ্বা,

 রক্ত জিহ্বা করালং,

 ধুং ধুং ধূম বর্ণং, শকট বিকট নয়নং

 পঞ্চানন ক্ষেত্র পালং নমঃ”

পূজারী যেখানেই নিম্ন বর্ণের সেখানেই মন্ত্র এমনই অবোধ্য। তবে ব্রাহ্মণদের মন্ত্র শাস্ত্র সম্মত। ষোড়শপচারে সেখানে পূজা হয় তার। পুরোহিত দর্পণের ধ্যান মন্ত্র —

“দ্বিভূজং জটিলং শান্তং করুনাসাগরং বিভূম।/ব্যাঘ্র চর্ম পরিধানং যজ্ঞ সূত্র সমন্বিতং।।/লোচনত্রয় সংযুক্তং ভক্তাভীষ্ট ফলপ্রদম। /ব্যাধীনামীশ্বরং দেবং পঞ্চাননমহং ভজে। ।/৺ও এং পঞ্চানন্দায় নমঃ”

মধ্য যুগে ব্রাহ্মণ্য স্বীকৃতি মিললেও পঞ্চানন্দ প্রথমে যে অস্ট্রিক জাতির বৃক্ষ দেবতা রূপে বা সমাজের ব্রাত্যদের মধ্য রুদ্র অনার্য রূপে পূজিত হতেন সন্দেহ নেই। বৌদ্ধরাও তাকে ফেলতে পারে নাই। মহাযানী নাথ যোগীরা পঞ্চানন্দকে নিরঞ্জন নৈরাকার ধর্ম রূপে পূজা করতেন। ১৮২৫ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ কর্তৃপক্ষ সংগৃহীত ‘বৃহদ্রুদ যামল’ নামক সংস্কৃত ভাষায় বঙ্গাক্ষরে রচিত তান্ত্রিক পুঁথিতে পঞ্চানন্দকে “শুভ্র বর পঞ্চমুখ বৃষবাহন” রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। রূপরামের ধর্মমঙ্গলেও পঞ্চানন্দের উল্লেখ আছে।

 “কামারহাটে পঞ্চানন্দ

 বন্দ জোড় হাতে,

ছেলের জন্য কত মেয়ে

 ওষুধ যায় খেতে।”

বাংলার অনার্য লোকধর্মের বাহক তথা নিম্ন বর্ণের মানুষ। মধ্য যুগের শেষ পর্বে এ দেশে ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব ঘটে। দলে দলে নিম্ন বর্ণের মানুষ ও বৌদ্ধদের ইসলাম গ্রহণ ঠেকাতে তাদের দেব দেবতার মর্যাদা বৃদ্ধি হল।তাদের ঠাঁই দেওয়া হল হিন্দুর শাস্ত্র পুরাণে। এ সময়েই সম্ভবত পঞ্চানন্দ পঞ্চানন শিব হলেন। তাকে নিয়ে রচিত হল মঙ্গলকাব্য।

বাংলার দীর্ঘ পাল বংশের শাসন কালে হিন্দু ও বৌদ্ধদের দেব দেবীর সমন্বয় ও সাঙ্গীকরন শুরু হয়ে চলেছিল দীর্ঘদিন। ডঃ নীহাররঞ্জন রায় তার ‘বাঙালির ইতিহাস (আদিপর্ব)’এ যে মন্তব্য করেছেন তা উল্লেখযোগ্য —

“পাল যুগে ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধ দেব দেবীদের মধ্যেও একটা বৃহৎ সমন্বয় ও সাঙ্গীকরন চলিতেছেল। বৌদ্ধ ও শৈব তন্ত্র, ধর্ম ও চিত্তা, বৌদ্ধ দেব দেবীদের একটি বৃহৎ সমন্বয় সুত্রে গাঁথিয়া তুলিতেছিল। বৌদ্ধরা অসংখ্য ব্রাহ্মণ্য দেব দেবীদের স্বীকার করিয়া লইতেছিল। আর্যেত্তর ব্রাহ্মণেত্তর সংস্কৃতির দেব দেবীদের পঙ্ক্তি ভুক্ত করিতেছিল। অন্য দিকে ব্রাহ্মণরাও বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্যেত্তর আর্যেত্তর দেব দেবীদের কিছু কিছু মানিয়া লইতেছিল। জীবনের সকল ক্ষেত্রেই এই সমন্বয় ও সাঙ্গীকরন সম ভাবেই চলিতেছিল। এই পঞ্চানন্দও আর্যেত্তর সংস্কৃতি থেকে উন্নীত হয়ে বৌদ্ধ নাথ যোগীদের আদিত্য নিরঞ্জন নৈরাকার নগ্রস্ত পঞ্চানন্দ ধর্মে ও পরে ব্রাহ্মণ্য দেব দেবীর সারনীতে শিবের অন্যতম প্রমথ রূপে পূজিত হতে থাকেন।”

গবেষক গোপেন্দ্রনাথ বসু তাঁর ‘বাংলার লৌকিক দেবতা গ্রন্থে যে মন্তব্য করেছেন তাতে পরিষ্কার আদিম যুগের শিবই পঞ্চানন্দ বা পঞ্চানন।

“শিব আদিতে অনার্যদের উপাস্য ছিলেন, পরে আর্য দেবকূলস্থ হয়েছেন, আরো পূর্বে বৌদ্ধ ধর্মের প্রাবল্যকালে তিনি মহাযোগী রূপে কল্পিত হয়েছেন, বৌদ্ধ প্রভাবে রূপান্তরিত শিব মূর্তিই আমরা বর্তমানে দেখি। আদি মূর্তি কি ছিল আমরা জানি না। তবে ইনি যখন ব্রাত্যদের কল্পিত দেবতা, সেদিক দিয়ে অনুমান করা যায় এর আদিরূপ নিশ্চয়ই এত সুন্দর ও সৌম্য ছিল না। আর্য পূর্ব যুগের আদিবাসীরা দেবতাকে মঙ্গলদাতা, করুণাময়, মহাযোগী বলে কল্পনায় মনে করত, যখন তারা কিছু উন্নত হয়ে সেই অশরীরী আত্মার নিজেদের মত মনুষ্য রূপ দিতে থাকে সেগুলোর আকৃতি অতি ভয়াবহ, উগ্র ভাব ব্যাঞ্জক ছিল। পরে উন্নত স্থানে শিবই শান্ত রূপ ধরলেন। আদি শিব সমাজে পূর্ব রূপ নিয়েই থাকলেন। বাবাঠাকুর হয়ত এর আদি নাম ছিল, পরে পঞ্চানন্দ নাম লাভ করলেন, কিন্ত শিবের সঙ্গে এর সম্পর্কের কথা ব্রাত্যরা ভুললেন না। ব্রাত্য সমাজ উন্নত হলে ব্রাহ্মণরা তাদের দেবতাকে স্বীকার করার পর লৌকিক শিব ও শাস্ত্রীয় শিবের মধ্য একটা সামঞ্জস্য বিধান করলেন। বাবাঠাকুর বা পঞ্চানন্দকে শিবের আকৃতিভেদ শিব পুত্র বটুক ভৈরব ইত্যাদি প্রচার করে উন্নত ও অনুন্নত সমাজের মধ্য সম্পর্ক সৃষ্টি করলেন যাতে উভয় শ্রেণীই পূজা করে তাদের মন্দিরে বা থানে, পঞ্চানন্দের বা বাবাঠাকুরের ভক্ত সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।”

বাংলার পঞ্চানন্দ যে দ্রাবিড় দেবতা শিবের সমতূল্য ছিলেন সন্দেহ নেই। কিন্তু অনার্য দেবতা বলে তার ঠাঁই হল নিচে। যেমনটা হয়েছিল দেবী মনসা শীতলা চণ্ডীর। জনপ্রিয়তার জোরে দেবী মনসা চণ্ডী বর্ণ হিন্দুর পূজা আদায় করেন কিন্তু অপদেবতার অপবাদ নিয়ে বহুকাল দূরেই থাকতে হল পঞ্চানন্দকে। কিন্তু ভক্ত ভক্তি ও ভয় কম ছিল না। তাই গ্রামের প্রান্তে হলেও তার আসন টলেনি কখনও। এমনই পঞ্চানন্দ ক্ষেত্রপাল হয়ে আছেন মঙ্গলকোটের নিগন গ্রামে। বৈশাখের প্রথম দিনে তার পূজা। দেয়াশী মালাকার সম্প্রদায়ের। তার পূজার আয়োজনে জমির নানান বন্দোবস্ত শুনে মনে হল একদা তিনিই ছিলেন গ্রামের মূখ্য দেবতার আসনে। কিন্তু বর্ণ হিন্দুর দেবতা শিবের আগমনে আসনচ্যুত হন তিনি। তাই হয়ত তার আসনের অদূরেই ঐ গ্রামের শিবতলা। যাইহোক তাকে ঘিরে রহস্যের শেষ নেই। সেই রহস্য ও পূজা মানত’এর কথা শোনালেন ঐ গ্রামের অজয় ও কিরীটী মণ্ডল। ভক্তের প্রার্থনা মঞ্জুর হলেই জ্যান্ত শোল মাছের নৈবেদ্য গ্রহন করেন তিনি। সকালে ভক্ত দেখে মাছের কাঁটা টুকু পড়ে আছে। অন্যথা হলে জ্যান্ত মাছ জ্যান্ত পড়ে থাকে। পিঁপড়ে পর্যন্ত স্পর্শ করে না। পূজারীর দেখা না মেলায় মন্ত্র তন্ত্র জানা হয়নি তবে পূজার নিয়ম অদ্ভুত। নিশি রাতে পূজার পর ব্রাহ্মণ এমনকি ঢাকীদেরও পিছনে ফিরে তাকানো নিষিদ্ধ। তার ভয় এমনই যে গ্রামের মাঝেও পূজাতলা নির্জন নিঝুম।

পূর্ব বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোট ব্লকের খুদরুন গ্রামের পঞ্চাননও বেশ বিখ্যাত। মাঠের মধ্যে নির্জন বন্য পরিবেশে তার অবস্থান। ঐ গ্রামের তাপস কুণ্ডু জানান বাৎসরিক বিশেষ পূজা হয় না। নিত্য পূজা হয়।পূজা করেন গ্রামের ব্রাহ্মণরা। মানতের রীতি নীতি আলাদা। এজন্য গাছে ঢিল বেঁধে রাখে মানুষ। প্রার্থনা মঞ্জুর হলে মাটির ঘোড়া, বিশেষ ধরনের মৃৎপাত্র দিতে হয় দেবতাকে। আর মানতের পশু বলি না করে ছেড়ে দিতে হয় পূজা তলায়। সেই পশু প্রাপ্য পূজারীর। কার্তিক মাসে মাঠ পালনীর আসর বসে পূজাতলায়। ভয় ভক্তি রহস্যের কথা শুনলাম এখানেও। রাত্রে দেবতার ত্রিসীমানা মারান না কেউ। এজন্য বিপদে পড়েছেন নাকি অনেকেই। একটা অর্ধসমাপ্ত পাকা ঘর দেখলাম। যারা শুরু করে ছিলেন তারা শেষ করেননি। দেবতা নারাজ তাই আর সম্পূর্ণ হয়নি সেই ঘর।

আমাদের পঞ্চাননতলার পঞ্চনন এক সময়ে যে অপদেবতাই ছিলেন সন্দেহ নেই। বৃক্ষ তলায় পূজা হত। কোন মূর্তি ছিল না তার। তাকে মানত করে ঘোড়া দিত মানুষ। আশপাশের নিম্ন বর্ণের অনার্য মানুষই ছিল তার ভক্ত। মাঘ মাসের প্রথম দিনে সবাই সমবেত হয়ে পূজা করত তার। এক দিন তারা সামিল হল হিন্দু ধর্মে। পূজা হল সর্বজনীন।

তার পূজার সূচনা নিয়ে রচিত হয় নতুন গল্প। সেই কথাই বিশ্বাস করে সবাই। দু আড়াই শো বছর আগের কথা। এই এলাকায় একবার শুরু হয়েছিল মড়ক মহামারী। দলে দলে মরছে মানুষ। গ্রাম উজাড় হবার জোগাড়। প্রাণের ভয়ে মানুষ ছুটল সমাজপতিদের কাছে। তারা বললেন, এ বাবা পঞ্চাননের আক্রোশ। তার পূজা দিতে হবে। গ্রামে গ্রামে ঢ়েড়ি দেওয়া হল। পয়লা মাঘ পাঁচ গ্রামের মাঝখানে পূজা হল পঞ্চাননের। পরে সেই জায়গার নাম হল পঞ্চাননতলা। দলে দলে গ্রামের মানুষ এল পূজা নিয়ে। খুব ধুমধাম। মেলা বসল। কেউ কেউ বলে বাবা স্বপ্নাদিষ্ট। এলাকার মানুষ জানে এই পূজা বাঁধমুড়া গ্রামের রায় পরিবারের। এখন জমিদার নেই তাদের পাঁঠাই প্রথম বলি হয় এখানে। দেবতার সেবায়েত বনগ্রামের চ্যাটার্জি পরিবার। পূজা ও মেলার জন্য জমি দিয়েছিলেন দাঁইহাট পাইকপাড়ার জমিদার মিত্ররা। সে জমির অধিকাংশই এখন জবরদখলে। ঠাকুরের ঠাঁইটুকুই টিকে আছে। মেলার জমিতে বসতি বসেছে। তাই তার কোন নির্দিষ্ট ঠাঁই নেই। প্রশাসন ও স্থানীয় পঞ্চায়েতকে এর স্থায়ী সমাধান করার অনুরোধ রইল। এই সব দেবতার জায়গা জমি নিয়ে অনেক ভুল ধারণা আছে মানুষের। জমিদারদের জমি দানের জয়গান গায় সবাই। আসল কথা আলাদা। দেবতার ঠাঁই চিরকালই তার নিজের। জনগণের দান।ইংরেজ শাসনে জমির মালিক হন জমিদার (চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত-১৭৯৩)। সেই সুত্রে দেবতার সম্পত্তি রেকর্ড হয় তাদের নামে। সেই রেকর্ড বাজছে এখন।

আজ আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের কল্যাণে রোগ ব্যাধির কারণ জেনেছে মানুষ। শিক্ষার প্রসারে ভূত প্রেত অপদেবতার কুসংস্কারও অনেক কমেছে। শিশুর জন্ম ও লালন পালন বিজ্ঞান সম্মত হওয়ায় শিশু মৃত্যুর হারও কমে গেছে। দেব দেবতার ভরসা নেই তেমন। তবুও তারা আছেন,পূজাও পাচ্ছেন। জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রসার নেই যেখানে সেখানে দেবতাই মানুষের আশ্রয় এখনও। ধর্মগুরু,ওঝা ওস্তাদরা এখনও সক্রিয়। এই আলো অন্ধকারের সহাবস্থান কতদিন চলবে কে জানে!

তবে লোক সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অমূল্য দলিল এই সব দেবতা ও তাদের কাহিনী। তাদের পূজা ও মেলাকে কেন্দ্র করে এখনও প্রবাহিত স্থানীয় লোকজীবন। আর এই সব দেবতারাই দেন আমাদের শিঁকডের সন্ধান।

তথ্য ঋণ : ১। এককড়ি চট্টোপাধ্যায় ২। যজ্ঞেশ্বর চৌধুরী ৩। উইকিপিডিয়া

এই লেখার কিছু ছবি করজগ্রাম অঞ্চলের পঞ্চাননতলার প্রণয় ঘোষের ও সিঙ্গী গ্রামের ছবি মিঠুন ভট্টাচার্য্যের তোলা। এজন্য কৃতজ্ঞতা জানাই তাদের।

লেখার ভুল ত্রুটি সংশোধনীয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন