শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | সকাল ৯:৫৯
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নির্বাচন পরবর্তী মিয়ানমার-রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীচৈতন্যদেব গরুড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক : অসিত দাস বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দোলউৎসব : রিঙ্কি সামন্ত পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এলেন রবীন্দ্রনাথ : প্রবুদ্ধ পালিত এসআইআর-এর নামে ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ সরব দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ঘন ঘন কেঁপে উঠছে কেন : তপন মল্লিক চৌধুরী জহির রায়হান-এর ছোটগল্প অনমিতা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘কান্না হাসির দোলায়’ আ শর্ট ট্রিপ টু ‘জামশেদপুর’ : রিঙ্কি সামন্ত নয় টাকা কেজি দরে বারো লক্ষ টন আলু কিনবে রাজ্য সরকার : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় এআই ইমপ্যাক্ট সামিট নিয়ে প্রশ্ন অনেক উত্তর কম : তপন মল্লিক চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার বাবার রসবোধ : সৈয়দ মোশারফ আলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি বই যেভাবে বদলে দিয়েছিল তলস্তয়কে : সাইফুর রহমান কেন্দ্রের দ্বিচারিতায় দীর্ঘ আট বছরেও পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হল না : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আলুর পর্যাপ্ত ফলন, প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত

প্রবুদ্ধ পালিত / ২১৫ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২৬

চৈতন্য পার্শ্বদ বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও অবতারত্বের যে উল্লেখ রয়েছে, তাতে তিনি ফাল্গুনী পূর্ণিমায় নবদ্বীপে শচীদেবী ও জগন্নাথ মিশ্রের পুত্ররূপে (বিশ্বম্ভর) অবতীর্ণ হন। শ্রীচৈতন্যদেবকে পুরাণসহ বিভিন্ন শাস্ত্রে যেমন ‘গৌরগণোদ্দেশ দীপিকা’ তাঁকে কলিযুগের যুগাবতার তথা শ্রীকৃষ্ণের তনু ও মন (গৌরাঙ্গ) রূপে বর্ণনা করা হয়েছে।

১৪৮৬ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ৮৯২ বঙ্গাব্দের ২৩শে ফাল্গুন, শনিবার, দোলপূর্ণিমার রাতে, চন্দ্রগ্রহণের সময় নদীয়ার নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্যদেব জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জগন্নাথ মিশ্র, মাতা শচী দেবী। তিনি গৌরবর্ণ হওয়ায় গৌরাঙ্গ নামেও পরিচিত। ফাল্গুনী পূর্ণিমায় তাঁর জন্মদিনটি — গৌর পূর্ণিমা হিসেবে পালিত হয়।

শ্রীচৈতন্যদেব (যিনি কলিযুগে হরিনাম প্রচারের জন্য পরিচিত) এমন এক মুহূর্তে আবির্ভূত হয়েছিলেন যখন চারদিক হরিনামে মুখরিত হয়েছিল। চৈতন্যদেবের জন্মের সময় চন্দ্রগ্রহণের কারণে নবদ্বীপের প্রতিটি মানুষ তখন উচ্চস্বরে ‘হরি হরি’ বলে সংকীর্তন করছিলেন। বৈষ্ণব ভক্তদের মতে, এটি ভগবানের আগমনে ধরণীকে পবিত্র করার একটি বিশেষ যোগ ছিল। তাঁর অন্য নাম ‘গৌরহরি’। অনেকে বলেন, গ্রহণের সময় অন্ধকার ভেদ করে তাঁর দেহের কাঁচা সোনার মতো বর্ণ (গৌর বর্ণ) চারদিক আলোকিত করেছিল বলেই তাঁর এমন নাম।

চৈতন্যমহাপ্রভুকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন বাসুদেব ঘোষ। তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পার্শ্বদ ও ভক্ত এবং বড় পদকর্তা ছিলেন। তিনি মূলত চৈতন্যদেবকে কেন্দ্র করে ‘গৌরচন্দ্রিকা’ বা গৌরাঙ্গ বিষয়ক পদ রচনার জন্য বিখ্যাত। তাঁর পদাবলীতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শৈশব ও বাল্যলীলারও বর্ণনা আছে। এছাড় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সন্ন্যাস, নীলাচল লীলা এবং নবদ্বীপের ভক্তদের প্রতি তাঁর অপরিসীম করুণা ও ব্যাকুলতা অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি পদাবলী রচনার মাধ্যমে বৈষ্ণব সাহিত্যে চৈতন্যলীলার ভক্তি ও আবেগকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছেন। চৈতন্য মহাপ্রভূকে নিয়ে রচিত তাঁর একান্নটি পদের একটি পুঁথি আমার সংগ্রহের মধ্যে রয়েছে। চৈতন্য জীবনের প্রত্যক্ষ পরিচয় তাঁর গৌর বিষয়ক পদগুলির উৎস।

বাসুদেব ঘোষের পদাবলী দেখা যাক —

“জয় জয় কলরব নদীয়া নগরে।

জনম লভিল গোরা শচীর ওদরে।।

ফাল্গুন পূর্ণিমাতিথি নক্ষত্র ফাল্গুনী।

শুভক্ষণে জন্মিলা গোরা দ্বিজমণী।।

পূর্ণিমার চন্দ্র যিনি কিরণ প্রকাশ।

দুরে গেল অন্ধকার পাইল জ্ঞানৈরাশ।

দ্বাপর যুগেতে এল কৃষ্ণ অবতার।

অপুনি করিতে সেই অসুর সংহার।।”

 

“শচীর ওদরে জীব গোরা অবতার।

কলিযুগে জীব গোরা করিতে উদ্ধার।।

বাসুদেব ঘোস গায় মনে করি আসা।

গোরাঙ্গ পদদ্বন্দ করিঞা ভরসা।।”

 

“মিশ্রী পুরন্দর তবে মনে বিচারিয়া।

পুরহিত দ্বিজবরে আনিল ডাকিয়া।।

ধনরত্ন অলঙ্কার দ্বিজবরে দিল।

স্তুতি বাক বলিয়া ধান তুলি নিল।।

আশিস তন্ডুল দ্বিজ তুলি নিজ হাতে।

সন্তোসে তুলিয়া দিল গোরাচান্দের মাথে।।”

 

“শচী ঠাকুরাণী তবে বলিতে লাগিল।

সাত পুত্রি এই পুত্র বিধি মোরে দিল।।

নিমাই বলিঞা নাম দেয় দিজবর।

বাসুদেব ঘোষ বলে জোড় করি কর।।”

 

“এক মুখে কি কহব গোরাচাঁদের লীলা।

হমাগুড়ি যায় নানারঙ্গে শচীবালা।।

লালে মুখ ঝর২ দেখিতে সুন্দর।

পাকা বিম্বু ফল জিনি সুন্দর অধর।।

অঙ্গদ বলয়া সাজে সুবাহু যুগলে।

চরণে মগরা খাড়ু বাগ নখ গলে।।

সনার সিপিঠে পাটে রথোপমা।

বাসুদেব ঘোষ বলে নিছনি পণা।।

সোনার শিকলি পিঠে পাটের থোপনা।।”

 

“কিএ হাম পে বহুঁ কনক পুতলিয়া।

শচীর আঙ্গিনায় নাচে ধূলায় ধূসরিয়া।।

চৌদিগে দিগম্বর বালক বেড়িঞা।

কোঙালা কুন্তল নপুর সুধরিয়া।।

কহে বাসুদেব ঘোষ সিসুরস জানিয়া।

ধন্য নদীয়ার বালক নবদ্বিপ ধনিয়া।।”

 

“সুতিঞাছে গোরা চাঁদ শয়ন মন্দিরে।

বিচিত্র পালঙ্ক সেজ অতি মনোহরে।।

তার উপর সুতিঞাছে গোরা নটরায়।

কিকহব যার সোভা কহনে না যায়।।

মেঘের বিজুরি কিবা যা জতনে।

কতরস দিয়া বিধি করিল নির্ম্মাণে।।

বাসুদেব ঘোষ গায় মনের হরিসে।

অতি মনোহর বিচিত্র বিসেসে।।”

 

“উঠ২ গোরাচাদ নিশি পুহাইল।

নগরের লোক সব উঠিঞা বসিল।।

মউর মউরি রব কোকিলের ধনি।

কত সুখে নিদ্রা জায় গোরা গুণমণি।।

অরুন উদয় ভেল কোমোল প্রকাশ।

তেজল মধুকর কুমুদিনি পাস।

করজোড়ে করি বলে বাসুদেব ঘোষ।

কত নিদ্রা যায় গোরা নিন্দের আলসে।।”

 

“পূর্ব্ব লীলা গোরাচাদের মনেও পড়িল।

ধবলি সাঙলি বলি সঘনে ডাকিল।।

পিতা বৈনু মূর্তির জয় জয় ধনি।

হোই২ করিয়া ফিরয়ে পাছনি।

রামাঞি সুন্দরানন্দ সঙ্গে নিত্যানন্দ।

গৌরিদাস আদি সভে হ ইলা আনন্দ।।

বাসুদেব ঘোষ গায় মনের হরিসে।

গোষ্ঠ লিলা গোরাচাদ করিল প্রকাশে।।”

 

“আজু মনে কি ভাবে উঠিল।

নদীয়ার পাটে গোরাদান সিরজিল।

কি রসের দান চাহ গোরা দ্বিজ মুণি।

বেত্র দিয়া আগুলিয়া রাখ এত দানি।

দান দেহ২ বলি ঘন ডাকে।

নগর নাগরি সব পড়িল বিপাকে।।

কৃষ্ণ অবতার আমি সাদিঞাছি দান।

সে ভাব উঠিল মনে বাসুদেব গান।।”

 

“ফাগু খেলে গোরা চাঁদ নদিয়া নগরে ।

যুবতীর চিত হরে নয়নের সরে।।

সহচর মেলি ফাগু মারে গোরা গায়।

চন্দন পীচক লঞয়া কেহো২ ধায়।।

নানা যন্ত্র সুমেলি করিয়া শ্রীনিবাস।

গদাধর আদি সঙ্গে করএ বিলাস।।

হরি বলি ভুজ তুলি নাচে হরি দাস।

বাসুদেব ঘোষ রস করিল প্রকাশ।।”

*(পুঁথির প্রাচীন বানানের কোনো বিবর্তন করা হয়নি। কারণ রবীন্দ্রনাথ বলেছেন — ‘বানান পরিবর্তন করলে শব্দের আদি রূপ হারিয়ে যায়।)

কৃষ্ণদাস কবিরাজ-এর “পাষন্ডদলন” কাব্যে চৈতন্য মহাপ্রভুর বাল্য লীলা কাহিনী এইরূপ বর্ণিত হয়েছে — শচীর উদরে শ্রীগৌরাঙ্গ দেব জন্মেছেন। স্নান করে শচী তাকে কোলে নিলেন। গৌরাঙ্গ স্তন পান করেন না, কেবল গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতে লাগলেন। তিন দিন এইরূপ চলতে লাগলো। অদ্বৈত এলেন। গৌরাঙ্গ এর পূজা করলেন। গৌরাঙ্গ বলেন — মাতার অন্তরে হরিনাম নাই — তিনি গুরু করেন নাই — সে জন্য তাঁর স্তন পান তিনি করতে পারেন না। গৌরাঙ্গ অদ্বৈতকে হরিনাম দিলেন। অদ্বৈত শচী ঠাকুরাণীকে নাম দিলেন। গৌরাঙ্গ স্তন পান করলেন।

বায়ু পূরাণ পুঁথিতে চৈতন্য মহাপ্রভুকে কৃষ্ণের অবতার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে তিনি ছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অবতার। কলিযুগে প্রেম ও ভক্তির মাধ্যমে মানবজাতির মুক্তি দিতে এসেছেন। এই পুরাণে, চৈতন্য মহাপ্রভুকে কৃষ্ণের লীলা সম্বরণের পর তাঁরই স্বরূপ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে, তিনি কলিযুগে ধর্ম প্রচার ও ভক্তদের মুক্তি লাভের জন্য আবির্ভূত হয়েছিলেন। অর্থাৎ কৃষ্ণের লীলা সম্বরণের পর, চৈতন্য মহাপ্রভু তাঁরই অংশ রূপে পৃথিবীতে আসেন এবং প্রেমভক্তির নতুন ধারা প্রবর্তন করেন।

বায়ুপূরাণ (সংস্কৃত) পুঁথির তৃতীয়খন্ডে পঞ্চাশত্তম অধ্যায়ে আছে — “তপস্যাম্যসিতে পক্ষে ফাল্গুণী পঞ্চদস্যাংশুভে দিনে” —” তিনি সুরধনী তীরে নবদ্বীপে জগন্নাথের ঔরষে শচীগর্ভে জন্মাবেন। গোপ গোপীগণ দ্বিজরূপে নবদ্বীপে জন্মাবেন। মহাপ্রভূ বাল্যে তাদের নিয়ে ক্রীড়া করবেন। সকল বিদ্যা অধ্যয়ণ করে গুরুকে দক্ষিণা দেবেন। গুরুর সন্দেহ ভঞ্জনার্থ তাঁকে স্বমূর্তি দেখাবেন।

গৌরাঙ্গ বিবাহ করবেন। একদিন নিদ্রাকালে, মাতাকে তিনি জুম্ভনে (মুখের মধ্যে) ত্রিভূবন দেখাবেন। একজন সন্নাসী তাঁর কাছে আসবেন। তিনি মহাপ্রভুকে বলবেন — ‘সর্ব্বলোকহীতের নিমিত্ত মহীতলে তোমার জন্ম। সন্ন্যাস গ্রহণ করে তুমি লোকের কল্যাণ কর। পিতাকে এবং দ্বিজগণকে নমস্কার করে এক প্রভাতে গঙ্গাতীরে এসে মহাপ্রভু সর্ব্বাশ্রমকে নমস্কার করে সন্ন্যাস দীক্ষা নেবেন। তারপর গুরুকে প্রণাম করে কাঞ্চুপুরী যাবেন। শচীদেবী সংবাদ শ্রবণে মূর্চ্ছিত হবেন। স্ত্রীকে প্রবোধ দিয়ে তিনি কাঞ্চনপুরীতে এসে -ভক্তকর্ণে বত্রিশাক্ষর মন্ত্র প্রদান করবেন। তারপর শ্রীপুরুষোত্তমে আসবেন। এইরূপে ক্রমে নানা তীর্থাদি ভ্রমণ করে লীলা সম্বরণ করিবেন।” ইত্যাদি।

চৈতন্যদেবকে কেন্দ্র করে লেখা বৃন্দাবন দাসের — ‘শ্রীচৈতন্যভাগবত’, লোচদাসের চৈতন্য মঙ্গল এবং কৃষ্ণদাস কবিরাজের রচিত “চৈতন্যচরিতামৃত”। এই কাব্য ধারার প্রধান হল “চৈতন্যচরিতামৃত”। কারণ এর প্রামাণ্যতা, গভীর দার্শনিক ভিত্তি, ভক্তি আদর্শের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ এবং বাংলা ও বৈষ্ণব সাহিত্যের উপর এর অপরিসীম প্রভাব। এটি শ্রীচৈতন্যদেবের জীবন, শিক্ষা ও দর্শনকে সবচেয়ে বিস্তারিত ও নির্ভরযোগ্যভাবে উপস্থাপন করে, যা অন্যান্য জীবনী থেকে একে আলাদা করে তোলে।

কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ চৈতন্য জীবনী কাব্য ধারার চূড়ান্ত ও প্রামাণ্য গ্রন্থ, যা শুধুমাত্র শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনীর বিশদ বিবরণ দেয় না, বরং গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্ব, দর্শন এবং ভক্তি-আদর্শের একটি সম্পূর্ণ সারসংক্ষেপ ও ব্যাখ্যা প্রদান করে। এটি বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগীয় ধারার একটি শ্রেষ্ঠ ও অবিস্মরণীয় সৃষ্টি, যা আজও বৈষ্ণব ভক্ত ও গবেষকদের কাছে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ। চৈতন্যদেবের সন্ন্যাস-জীবন ও- ভক্তির আদর্শের বিশদ বর্ণনা ‘অন্ত্যলীলা’য় রয়েছে, যা ভক্তিমূলক জীবনযাপনের এক অসাধারণ উদাহরণ।

লোচন দাসের “চৈতন্যমঙ্গল” ও-চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবন ও আদর্শ ঘিরে রচিত। মধ্যযুগীয় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে চৈতন্যদেবের জীবন ও লীলা বিষয়ক এই কাব্যধারা এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গ্রন্থটি চারটি খন্ডে বিভক্ত — সূত্র খন্ড, আদি খন্ড, মধ্য খন্ড ও শেষ খন্ড। সূত্র খন্ডের বিষয় অবতারের স্বরূপ নির্ণয়, আদি খন্ডে গয়া গমন পর্যন্ত বর্ণনা, মধ্য খন্ডে সার্বভোমের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন, শেষ খন্ডে তীর্থ যাত্রার বর্ণনা, প্রতাপরুদ্রের প্রতি অনুগ্রহ, মহাপ্রভূর তিরোধানে হয়েছে কাব্যের পূর্ণচ্ছেদ। আনুমানিক ১৫৬০-১৬৭০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে এই গ্রন্থটি রচিত হয়েছিল। চৈতন্যমঙ্গল প্রায় ১১,০০০টি শ্লোক নিয়ে গঠিত। ড. বিমান বিহারী মজুমদার লিখেছেন — “বৈষ্ণব ধর্মের ইতিহাসে লোচনের গ্রন্থ খুবই মূল্যবান, কেন না গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের একটি শাখার উপাসনা ও ভাব সাধনার প্রণালীর বিশদ ও অকৃতিম বিবরণ ইহাতে পাওয়া যায়।”

কৃষ্ণদাস কবিরাজ যিনি “চৈতন্য চরিতামৃত” গ্রন্থের রচয়িতা হিসেবে অধিক পরিচিত, তিনি “পাষণ্ড দলন” গ্রন্থটিও রচনা করেন। “পাষণ্ড” শব্দটি সাধারণত সেইসব ব্যক্তিদের বোঝায় যারা ধর্ম বা সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি ও বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয় এবং তাদের বিরোধিতা করে। “দলন” শব্দের অর্থ হলো দমন করা বা ধ্বংস করা। তাই, “পাষণ্ড দলন” একটি সম্মিলিত শব্দ যা ধর্ম ও সমাজের প্রতি বিরুদ্ধাচরণকারীদের দমন করার ধারণা প্রকাশ করে।

ঐতিহাসিকভাবে, “পাষণ্ড দলন” শব্দটি চৈতন্য মহাপ্রভুর অনুসারীরা ব্যবহার করতেন, যাঁরা তাদের সময়ে প্রচলিত বিভিন্ন কুসংস্কার ও অনৈতিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতেন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন যে, এই ধরনের কার্যকলাপ সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং ধর্মের সঠিক পথ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে নেয়।

এই গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে, বিশেষ করে বৈষ্ণব সাহিত্য ও দর্শনে এর গভীর প্রভাব অনস্বীকার্য। এটি কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ নয়, বরং তৎকালীন সমাজ ও সংস্কৃতির একটি মূল্যবান দলিলও বটে। “কৃষ্ণদাস কবিরাজ” এই গ্রন্থে শ্রীচৈতন্যদেবের আদর্শ ও শিক্ষাকে তুলে ধরেছেন এবং তাঁর অনুসারীদের সঠিক পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করেছেন। গ্রন্থটিতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অলৌকিক কার্যকলাপ, তাঁর প্রেমভক্তি প্রচার এবং তৎকালীন সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার ও ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান বর্ণিত হয়েছে।

পুঁথির শেষের এইরূপ আছে —

“কার মাতা কারপীতা বোন্ধু জে বান্ধব।

জত দীন দেহ আছে তত দীন সব।।

এই দেহ ভোগষারী নষ্ট জবে হয়।

মাতা পিতা বোন্ধু তাঁরা কেবা কোথা রয়।।

সুন সুন হরিদ্বাস কহিএ তোমারে।

নিজ স্ত্রী পুত্রেরে জীব জত ভাব করে।।

তাহার কিঞ্চিত ভাব কৃষ্ণেতে রহিবে।

তবেতো আনন্দ রূপে গোলোকে থাকিবে।।

এতেক কোহিল যদি নিতাই সুন্দর।

অন্তরেতে হরিদ্বাস হইল জর্জর।।

করজূড়ি হরিদ্বাস করেন প্রণাম।

এতদিনে নিষ্ঠা করালে হরিনাম।।

প্রেমাবেশে দুইজনে আলিঙ্গন করে।

হরিবোল তীন বার বলে উচ্চেশ্বরে।।

শ্রীগুরু বৈষ্ণব পদে সদা কোটি আস।

পাষন্ডদলন এই কহে কৃষ্ণদাস।।”

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে জীবনী কাব্য ছিল একটি সমৃদ্ধ ধারা। মূলত ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের (যেমন শ্রীচৈতন্যদেব) জীবন ও কর্ম অবলম্বনে এই কাব্য রচিত হয়েছিল।

তথ্যসূত্র :

১) লেখকের সংগৃহীত প্রাচীন পুঁথি ‘বাসুদেব ঘোষের পদাবলী’ ও অন্যান্য।

২) “পুঁথিপরিচয়” সম্পাদনা, অশোক কুমার পালিত, পুঁথি সংখ্যায়-৭৮, ১৪৪, ১৪৫, ১৪৬, ১৪৭, ১৪৮, ১৪৯।

*৪) রবীন্দ্রনাথ বলেছেন — ‘প্রাচীন পুঁথির বানানের পরির্তন করলে ভাষাতত্ত্বের আলোচনায় ব্যাঘাত ঘটে।’। প্রাচীন পুঁথির মূল বানান পরিবর্তন করলে ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা, ধ্বনি পরিবর্তন, রূপমূল বা প্রাচীন বাংলা রূপ বোঝা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এটি ভাষার ঐতিহাসিক বিবর্তন ও ধারার সঠিক বিশ্লেষণ ব্যাহত করে। তাই ভাষাতত্ত্বের স্বার্থে পুঁথি সম্পাদনায় বানান পরিবর্তন না করে মূল বানান অক্ষুণ্ন রাখা অপরিহার্য।


আপনার মতামত লিখুন :

2 responses to “বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত”

  1. সুপ্রিয় মুখার্জি says:

    ওপরের লেখায় “বায়ু পুরানে চৈতন্য মহাপ্রভুর কথা লেখা আছে”। বায়ু পুরান সম্ভবতঃ খ্রীষ্টিয় দ্বিতীয় শতকে লেখা। শ্রীচৈতন্যের জন্ম পঞ্চদশ শতাব্দীতে। আমার প্রশ্ন, এর কি অন্য কোনো ব্যাখ্যা আছে?

  2. প্রবুদ্ধ পালিত says:

    বায়ু পুরাণের অধিকাংশ অংশই অত্যন্ত প্রাচীন এবং প্রামাণিক হিসেবে গণ্য করা হলেও এর বেশ কিছু অংশ পরবর্তীকালে যুক্ত করা হয়েছে, যাকে ‘প্রক্ষিপ্ত’ (interpolated) অংশ বলা হয়। এই নির্দিষ্ট অবতার বর্ণনটি মধ্যযুগের রচনা বলে পণ্ডিতরা মত দেন, কারণ চৈতন্য-পূর্ববর্তী সময়ে এই শ্লোকের উল্লেখ বা প্রচলন পাওয়া যায় না।এটি মূলত মধ্যযুগীয় বাংলার বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলনের একটি সাহিত্যিক সংযোজন।
    অনেক গবেষক মনে করেন,এই বিশেষ শ্লোকটি (কলৌ সংকীর্তনারম্ভে…) চৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাবের পর, তাঁর প্রভাবে বা গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতবাদের প্রসারের সময় অর্থাৎ মধ্যযুগে বায়ুপূরাণের মূল ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল । প্রমাণ স্বরূপ আমার সংগ্রহে রক্ষিত ‘বায়ুপুরাণ’ পুঁথির শেষ পত্রটি এখানে ছাপা হয়েছে । মধ্যযুগে বাংলায় বৈষ্ণব আন্দোলন এবং চৈতন্যদেবকে স্বয়ং ভগবান বা শ্রীকৃষ্ণের অবতার রূপে প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে এই ধরণের শাস্ত্রীয় প্রমাণ বা শ্লোক যুক্ত করার প্রবণতা দেখা যায়।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন