২৭.মোহিনী চৌধুরীর গান : প্রেম আর প্রতিবাদ, বিদ্রোহ—অভিমান
আমরা সবাই প্রায় শুনেছি সেই গান। উদ্বুদ্ধ হয়েছি। অনুপ্রাণিত হয়েছি। ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হল বলিদান’। এই রকম আরও অনেক গান লিখেছিলেন তিনি। প্রেমের, বিরহের, প্রতিবাদের, অভিমানের। একটা তালিকা মেলে ধরা যাক :
১] রাজকুমারী ওলো নয়নপাতা খোলো /সোনার টিয়া ডাকছে গাছে, ওই বুঝি ভোর হলো
২] জেগে আছি, একা জেগে আছি কারাগারে
৩] বিদেশি এক রাজার কুমার তোমার পাশে জাগে
৪] মানবের তরে মাটির পৃথিবী, দানবের তরে নয়
৫] সুন্দরী লো সুন্দরী, দল বেঁধে আয় গান করি
৬] পিয়া সনে মিলন পিয়াস
৭] হায় কী যে করি এ মন নিয়া
৮] ভুলি নাই ভুলি নাই/নয়নে তোমারে হারিয়েছি প্রিয়া
৯] ভালোবাসা মোরে ভিখারি করেছে
১০] কে আমারে আজও পিছু ডাকে
১১] ভুলায়ে আমায় দু’দিন শেষে কি হায় ভুলবে
১৩] পৃথিবী আমারে চায় রেখো না বেঁধে আমায়
১৪] যাদের জীবনভরা শুধু আঁখিজল
১৫] আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড় তুমি যে বহ্নিশিখা
১৬] শতেক বরষ পরে তুমি আর আমি ফিরে আসি যেন
১৭] দিন দুনিয়ার মালিক তোমার দীনকে দয়া হয় না
১৮] অভিনয় নয় গো অভিনয় নয়
এই গীতিকারের গানে সুর দিয়েছিলেন বিখ্যাত সব মানুষেরা। যেমন : শচীন দেববর্মণ, চিত্ত রায়, সুধীন দাশগুপ্ত, শৈলেশ দত্তগুপ্ত, কমল দাশগুপ্ত, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুধীরলাল চক্রবর্তী, নরেশ ভট্টাচার্য। তাঁর লেখা গান গেয়েছিলেন আরও বিখ্যাত সব গায়কেরা : ফিরোজা বেগম, শ্যামল মিত্র, জগন্ময় মিত্র, শচীন দেববর্মণ, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, গীতা দত্ত, তালাত মাহমুদ, রামকুমার চট্টোপাধ্যায়, সন্তোষ সেনগুপ্ত, উৎপলা সেন, কিশোরকুমার, মান্না দে।
গান ছিল সেই গীতিকারের প্রাণ। কিন্তু তাঁর জীবনে একই মাল্যবাঁধনে বাঁধা পড়েন নি লক্ষ্মী-সরস্বতী। তেমন মান জোটেনি। জোটেনি অর্থ। আমাদের এই জগতে শ্রেণিভেদ আছে নানা স্তরে। সিনেমায় দেখুন অভিনেতারা যে সম্মান ও অর্থ পান, তেমন পান না রূপসজ্জার শিল্পীরা, ফ্লোর আর্টিস্টরা। গানের জগতে অর্থ ও সম্মানের দিক থেকে প্রথমে আছেন গায়করা, তারপরে সুরকাররা, তারপরে সংগীত পরিচালকরা, তারপরে বাদ্যযন্ত্রের শিল্পীরা, শেষে আছেন গীতিকারেরা। ব্যতিক্রম অবশ্য আছে। যেমন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়।
এবার গীতিকারের নামটা বলে ফেলা যাক।
তিনি মোহিনী চৌধুরী (১৯২০-১৯৮৭)। বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ (সাবেক ফরিদপুর) জেলার কোটালিপাড়া উপজেলার শহরপাড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। বাবা মতিলাল চৌধুরী। কলকাতায় চাকরি করতেন তিনি। তাই মোহিনী চৌধুরী কলকাতা চলে আসেন লেখাপড়ার জন্য। রিপন কলেজ থেকে আই.এস.সি পাশ করলেন। আর পড়াশুনো হল না। লেগে পড়লেন জীবিকার সন্ধানে। গান লিখতেন। এইচ এম ভি থেকে তাঁর গানের রেকর্ড বেরোল। সাহায্য করলেন হেমচন্দ্র সোম। তারপর আরও রেকর্ড। গান গাইলেন সিনেমায়। সুযোগ দিলেন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। রেডিয়োতে গান গাইলেন শচীনদেব বর্মণের সৌজন্যে। গণনাট্যের সঙ্গেও যুক্ত হন। কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হবার পরে তিনি বেহালায় গড়ে তুলেছিলেন ‘প্রগতি কৃষ্টি পরিষদ’।
কিন্তু গান লিখে বাড়ি-গাড়ি তো দূরের কথা, ভাত-কাপড়ের জোগাড় হয় না। তার মানে গান তাঁর মান রাখল না। তাই জীবিকার সন্ধানে ঘুরতে হয়েছে নানা জায়গায়।
চাকরি করেছেন জি.পি.ওতে। কাজ করেছেন বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার সংসদীয় সচিব হিসেবে। শিল্পপতি দেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের একান্ত সচিব হিসেবে কাজ করেছেন। হয়তো ভেবেছিলেন সিনেমা করলে পয়সা আসবে, অভাব ঘুচবে। কিন্তু সিনেমা করার কি পরিণতি হয়েছিল তা বর্ণনা করেছেন সায়ন্তনী সেনগুপ্ত :
“শুরু করলেন ‘সাধনা’ ছবির কাজ। কিন্তু ছবি শেষ করতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হলেন। ব্যাঙ্ক ব্যালান্স, স্ত্রীর গয়না-গাঁটি, সব চলে গেল। পাওনাদারদের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে তাঁর বাবা তাড়িয়ে দিলেন বাড়ি থেকে। স্ত্রী-পুত্র নিয়ে দেউলিয়া মোহিনী চেতলায় এক ভাড়াবাড়ির এক কামরার ঘরে কোনও রকমে মাথা গুঁজলেন। দুধের শিশু নিয়ে অসম্ভব দারিদ্র্যের সঙ্গে নিয়ত যুঝছেন যখন, বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি মুখ ফিরিয়ে নিল তাঁর থেকে। শৈলজানন্দের কাছ থেকে অনেক টাকা পাওনা তখন। কোনও রকমে একজনের কাছ থেকে আট আনা জোগাড় করে বাগবাজারের বাড়িতে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন টাকা পাবার আশায়। শৈলজানন্দ পকেট থেকে এক টাকা বার করে দিলেন। অপমানিত লেখক সেই টাকা ফিরিয়েও দিতে পারলেন না। ছেলের দুধ খাওয়ার টাকাটা তো অন্তত জোগাড় হল।”
মোহিনী চৌধুরীর নাম খ্যাতিমান গীতিকার হিসাবেই জানি। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অনেক বিশিষ্ট খ্যাতিমান মানুষদের নামটুকুই জানা থাকে তাঁদের খ্যাতিমান হবার পিছনে কত লড়াই, ত্যাগ, দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে হয়, এর সঙ্গে কত বেদনা কষ্টের কথা লুকিয়ে থাকে তা সকলের জানা থাকে না,সেসব জানা প্রয়োজন। মোহিনী চৌধুরী সম্পর্কে সবটুকু জানা হল না।