শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | সকাল ৯:৫৮
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নির্বাচন পরবর্তী মিয়ানমার-রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীচৈতন্যদেব গরুড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক : অসিত দাস বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দোলউৎসব : রিঙ্কি সামন্ত পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এলেন রবীন্দ্রনাথ : প্রবুদ্ধ পালিত এসআইআর-এর নামে ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ সরব দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ঘন ঘন কেঁপে উঠছে কেন : তপন মল্লিক চৌধুরী জহির রায়হান-এর ছোটগল্প অনমিতা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘কান্না হাসির দোলায়’ আ শর্ট ট্রিপ টু ‘জামশেদপুর’ : রিঙ্কি সামন্ত নয় টাকা কেজি দরে বারো লক্ষ টন আলু কিনবে রাজ্য সরকার : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় এআই ইমপ্যাক্ট সামিট নিয়ে প্রশ্ন অনেক উত্তর কম : তপন মল্লিক চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার বাবার রসবোধ : সৈয়দ মোশারফ আলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি বই যেভাবে বদলে দিয়েছিল তলস্তয়কে : সাইফুর রহমান কেন্দ্রের দ্বিচারিতায় দীর্ঘ আট বছরেও পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হল না : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আলুর পর্যাপ্ত ফলন, প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত

সুব্রত দত্ত / ১৫৭ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬

গৌড় নগরী

এই তো সেই রাজপথ। পথ ধরে ছুটে আসছে বখতিয়ার খিলজীর দিক বিজয়ী অশ্বারোহী বাহিনী। হাতে শানিত তরবারি। মুখে আল্লাহ আকবর ধ্বণি। নবদ্বীপ আক্রমনের পর আসছে লক্ষ্মণাবতী নগরীর দখল নিতে। অশ্ব খুরের ধুলায় ঢেকে গেছে আকাশ। দিনের বেলা অন্ধকার ঘনিয়েছে নগরে। জনশূন্য পথ, গৃহশূন্য মানুষ। দেবতা শূন্য মন্দির। ইতিমধ্যেই নবদ্বীপ নগর লুন্ঠন ও ধ্বংসের খবর এসেছিল সেখানে। কিছু মানুষ তবুও থেকে গিয়েছিল। কেউ মায়ার টানে, কেউ কর্তব্যের খাতিরে, কারো হয়ত এমন অমানবিকতায় বিশ্বাস হয়নি! আর মায়া! এ নগর তাদের চোখের মনি। তাদের গৌরব, তাদের অহংকার! এ নগর তাদের সাত পুরুষের শান্তির ঠিকানা। নানা জাতির পাশাপাশি বাস। ব্যবসা বাণিজ্য। তাদের উপার্জন, বিলাশ বৈভবের সব আয়োজন এখানে। অনেকেই ভুলে গেছে যুদ্ধ কি জিনিস! দীর্ঘদিন সেন শাসনে সুরক্ষিত এ নগর আক্রমণের দুঃসাহস কারো ছিল না। কিন্তু ১১৯২ সালে মুহাম্মদ ঘোরীর দিল্লী অধিকারের পর উত্তর ভারতের রাজনৈতিক চিত্রপট বদলে গেছে। গৌড় রাজ্যের প্রজাদের সে খবর জানা ছিল না। বখতিয়ার বাহিনী বিহার জয়ের পর যখন নবদ্বীপ আক্রমণ করে, তখনই খবরটা দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে। বৃদ্ধ রাজা লক্ষনসেন শেষ বয়সে গঙ্গাবাসে বাস করতেন। হঠাৎই সেখানে আক্রমণের কারণ হয়ত তাকে বন্দী করা! কিন্তু রাজাকে বন্দী করা যায়নি। অচকিত আক্রমণে হতচকিত রাজা পশ্চাদপসরন করে পূর্ব বঙ্গের বিক্রমপুরের (বর্তমান বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ) জয়স্কন্ধবারে আশ্রয় নেন। তারপর নবদ্বীপ পুনরুদ্ধারে তুর্কি সেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করেন। এ সময় লক্ষনাবতীর সুরক্ষার দায়িত্বে ছিলেন দুই রাজপুত্র বিশ্বরূপ ও কেশব সেন। নবদ্বীপ আক্রমণের খবর শুনে তারা ছুটে গেছেন বিক্রমপুর। তার আগে নগরবাসীদের এ নগর ত্যাগের আদেশ দিয়ে গেছেন। কারণ তারা বুঝেছিলেন অবস্থানের সুবিধায় বখতিয়ারের এই নগরী দখল এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। সেদিন থেকেই যে যেদিকে পারে নগর ছেড়ে চলে গেছে। অভিজাতরা ধনসম্পদ পরিবার নিয়ে চলে গেছেন বিক্রমপুর। থেকে গেছে নিম্নবিত্তরা। তাদের কেউ শ্রমিক কারিগর প্রহরী ভিখারি, কেউ ভবঘুরে যাদের পালাবার স্থান নেই। বৃদ্ধ রাজা লক্ষ্মণ সেন এখনও কোন পুত্রকে সিংহাসন ছেড়ে দেননি। কেন দেননি এই নিয়েই নানান গালগল্প। রাজবাড়ি, অভিজাতদের নানান কেচ্ছা কেলেঙ্কারি রঙ চড়িয়ে শোনা বা শোনানো নগরবাসীদের বিশেষ বিনোদন। ইদানিং রাজার দুই রানীর বিবাদ নতুন কেচ্ছার খোরাক হয়েছিল। রাজার দুই পত্নী তন্দ্রাদেবী ও তারাদেবীর দুই পুত্র বিশ্বরূপ সেন ও কেশব সেন। এখন কে রাজা হবে এই নিয়ে বিবাদ। বৃদ্ধ রাজাও বিপদে পড়েছেন কোন রানীর মন যোগাবেন! তাই কি কালক্ষেপ! এদিকে কখন শিয়রে শমন এসে হাজির। দুই রাজপুত্রের অনুপস্থিতিতে নগর অরক্ষিত হতেই ছুটে এল বখতিয়ার বাহিনী। অবশ্য এই সময় সেন বংশের শাসন নীতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল অধিকাংশ প্রজা। পাল যুগের শাসন ছিল উদার। যে যেমন খুশি ধর্মাচরণ করত। কিন্তু এখন রাজা ব্রাহ্মণদের মাথায় তুলেছেন। তারা বৌদ্ধদের উপর খড়্গহস্ত। নিম্ন বর্ণের মানুষদের অস্পৃশ্য অশুচি মনে করে। নানান বিধি নিষেধ চাপিয়েছে সবার উপরে। এ সবে বিক্ষুব্ধ অধিকাংশ প্রজা। তারা তুর্কিদের নবদ্বীপ আক্রমণে খুব খুশি। শাসন পরিবর্তন হলে আবার আগের যুগ ফিরে আসবে এই আশা তাদের মনে। তাদের একাংশ তুর্কিদের সাহায্য করছে।

এদিকে নগরের অনেকেই ভেবেছিল রাজায় রাজায় যুদ্ধ। তাদের দোষ কি! তারা তো কোন পক্ষের নয়। কিন্তু ভুল ভেঙে গেল। তুর্কি সেনারা নগর লুন্ঠন করছে। নির্বিচারে চলছে হত্যা। রাজপথে রক্ত স্রোত। মহানন্দা গঙ্গার জল লালে লাল। আগে এ দেশে এ নিয়ম ছিল না। এ দেশের যুদ্ধের রীতিনীতি আলাদা। নগর জনপদ ধ্বংস লুণ্ঠন ছিল ব্যতিক্রমী ঘটনা। কিন্তু ওরা এসেছে সম্পদের লোভে। আমার এ কথায় হয়ত কেউ অন্য গন্ধ পাবেন। তবে এটাই সত্য। বাংলার সম্পদ ছিল লোভনীয়। সোনার বাংলা কথাটা মিথ্যা ছিল না। বাংলার মাটি অত্যন্ত উর্বর হওয়ায় ধান, পাট, আখ, নারকেল, সুপারি ও পানের ব্যাপক ফলন হতো। বয়ন শিল্পে (মসলিন ও সুতি বস্ত্র) এবং ধাতুশিল্পে বাংলা অত্যন্ত উন্নত ছিল। মাটির তৈরি জিনিসপত্র, লবণ উৎপাদন ও কুটির শিল্পে সমৃদ্ধ ছিল বাংলা। স্থল ও জলপথে চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের সাথে বাংলার বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। নানান পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো। পুণ্ড্রবর্ধনের বণিকরা মসলিন ও হীরা বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। চট্টগ্রাম তাম্রলিপ্ত ও চন্দকেতুগড় বন্দরের মাধ্যমে প্রাচীন বাংলার বণিকরা সপ্তডিঙা সাজিয়ে পৃথিবীর নানান দেশে যেতেন। সুবর্ণবণিকরা প্রাচীন বাংলায় সোনা আমদানি-রপ্তানি করতেন। গন্ধবণিক ও তাম্বুলীরা জড়িত ছিলেন সুগন্ধি দ্রব্য, মশলা এবং পান-সুপারি ব্যবসার সঙ্গে। কথিত আছে সেই সময় বাংলার বনিক অভিজাতরা সোনার থালায় ভাত খেতেন। সেই সমৃদ্ধির গল্প রূপকথার মত ছড়িয়ে পড়েছিল দেশে বিদেশে।বিদেশী আক্রমণের এটাই ছিল মূল কারণ। ক্রমাগত লুণ্ঠন শোষণে ক্রমশ নিরক্ত হয়েছিল সোনার বাংলা। ( সুলতানদের সময়, ইউরোপবাসীরা বাংলাকে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী বাণিজ্যিক দেশ রূপে গণ্য করত। এরপর, বাংলা মুঘলদের অধিকারে চলে আসে। মুঘল আমলে বাংলা ছিল সবচেয়ে সম্পদশালী প্রদেশ। মুঘল আমলে, সুবাহ বাংলা সমগ্র সাম্রাজ্যের শতকরা ৫০ ভাগ জিডিপি এর যোগান দিত। মুঘল সাম্রাজ্যের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপির) ১২ শতাংশ উৎপন্ন হত সুবাহ বাংলায়, যা সে সময় সমগ্র ইউরোপের মোট দেশজ উৎপাদনের চেয়ে অধিক ছিল।–সুত্র বাংলাপিডিয়া) মুঘল সুবেদার শায়েস্তা খানের (১৬৬৪-৮৮) দৈনিক ব্যয় কত ছিল জানেন? ৫০,০০০ টাকা। তিনি নাকি বাংলা থেকে ফিরে যান ২৮ কোটি টাকা নিয়ে। মনে রাখতে হবে তখনকার এক টাকার মূল্য এখন ৪০০ টাকার মত। তিনি কিন্তু কাগজের টাকা নিয়ে যাননি। গৌড় আদিনা দর্শনে লক্ষ্য করবেন সব সৌধ স্থাপত্য ইটের তৈরি। তবে ভিত গড়া হয়েছে হিন্দু বৌদ্ধ যুগের পাথর দিয়ে। অর্থাৎ আগের যুগের শাসকরা ভিন রাজ্য থেকে মূল্যবান পাথর এনে সৌধ গড়েছিলেন। অথচ পরের ইসলামী শাসনে আর পাথর ব্যবহারের সামর্থ্য ছিল না শাসকদের। তাই হয়ত ধ্বংস মন্দির আর মাটির পোড়া ইটে সৌধ গডার সাধ মেটাতে হয়েছিল। সন্ধাকর নন্দী রামচরিত’এ রামাবতী নগরের যে অনুপম বৈভবের বর্ণনা দিয়েছেন তা কি মিথ্যা! লক্ষনাবতীও ছিল তেমনই নগর। সেই নগর এখন মৃত্যুপুরী। ধ্বংসের ভূমিশয্যায় শায়িত। এ ভাবেই হয়ত নতুন ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল গৌড়ে। তারপর আবার ছন্দে ফিরেছিল গৌড়। তুর্কি পাঠান আফগান হাবসী মুঘল শাসনে নতুন রীতি নীতি কীর্তি সৌধ স্থাপত্যে আবার সেজে উঠল গৌড়।

১২০৪ থেকে ১২২৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত গৌড়ে চলেছিল খিলজি বংশের রাজত্ব। ১২২৭ থেকে ১২৮১ পর্যন্ত দিল্লীর মামলুক সুলতানির অধীনে ১৫ জন প্রদেশ শাসক প্রশাসনের ভার নেয়। এরপর ১৩২৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চলে বলবন শাসন। কিছু বছর পর তারা স্বাধীন ভাবে বাংলাকে শাসন করতে থাকে। তুঘলক বংশের শাসনকালে ১৩২৪ থেকে ১৩৩৯ পর্যন্ত তিনজন প্রাদেশিক শাসনকর্তা সোনারগাঁও, সাতগাঁও এবং গৌড়ের শাসক নিযুক্ত হয়েছিলেন। পরে এদের মধ্যে ইলিয়াস শাহ এই সমস্ত অঞ্চল দখল করে গৌড়ে ইলিয়াস শাহী বংশের স্বাধীন শাসনের সূচনা করেন। ১৪৮৭ পর্যন্ত ইলিয়াস শাহী বংশ বাংলায় রাজত্ব করে যদিও ১৪১৪ থেকে ১৪৩৫ পর্যন্ত হিন্দু রাজা গণেশ ও তার পুত্র যদু (জালালুদ্দিন) বাংলা শাসন করেন । ১৪৯৪ তে হুসেন শাহ বাংলার মসনদে বসেন। তার আগে অবশ্য কিছুদিন হাবসী (আবিসিনীয়) দের অধীনে (১৪৬৭- ১৪৯৪) ছিল বাংলা। ১৫৩৮ পর্যন্ত শাসন চলে হুসেন শাহী বংশের। এরপর ১৫৫৪ থেকে শের শাহ্‌ সুরী আমলে বাংলার শাসনভার সামলান প্রাদেশিক শাসনকর্তারা। মহম্মদ শাহ (১৫৫৪-১৫৬৪) এবং কাররানি শাসনকাল অতিবাহিত হওয়ার পর মোগল সাম্রাজ্যের অধীনে আসে বাংলা।

খিলজি বংশের শাসনের পর বাংলা সালতানাতের সুলতানদের তালিকা —

১) শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ (১৩৫২-১৩৫৮)

২) আবুল মুজাহিদ সিকান্দার শাহ (১৩৫৮-১৩৯০)

৩) গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ (১৩৯০-১৪১১)

৪) সাইফুদ্দিন হামজা শাহ (১৪১০-১৪১৩)

** মুহাম্মদ শাহ বিন হামজা শাহ (১৪১৩) [বিতর্কিত]

৫) শিহাবউদ্দিন বায়েজিদ শাহ (১৪১৩-১৪১৪)

৬) আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ (১৪১৪)

৭) জালালুদ্দিন মুহাম্মদ শাহ (১৪১৫-১৪১৬ এবং ১৪১৮-১৪৩৩)

৮) শামসুদ্দিন আহমেদ শাহ (১৪৩৩-১৪৩৫)

৯) নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৪৩৫-১৪৫৯)

১০) রুকনুদ্দিন বরবক শাহ (১৪৫৯-১৪৭৪)

১১) শামসুদ্দিন ইউসুফ শাহ (১৪৭৪-১৪৮১)

১২) নূরউদ্দিন সিকান্দার শাহ (১৪৮১)

১৩) জালালুদ্দিন ফতেহ শাহ (১৪৮১-১৪৮৭)

১৪) গিয়াসউদ্দিন বরবক শাহ (১৪৮৭)

১৫) সাইফুদ্দিন ফিরোজ শাহ (১৪৮৭-১৪৮৯)

১৬) নাসিরুদ্দিন মুহাম্মদ শাহ (১৪৮৯-১৪৯০)

১৭) শামসুদ্দিন মোজাফফর শাহ (১৪৯০-১৪৯৪)

১৮) আলাউদ্দিন হুসেন শাহ (১৪৯৪-১৫১৯)

১৯) নাসিরুদ্দিন নসরত শাহ (১৫১৯-১৫৩৩)

২০) দ্বিতীয় আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ (১৫৩৩)

২১) গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৫৩৩-১৫৩৮/৩৯)

২২) শামসুদ্দিন মুহাম্মদ শাহ (১৫৫৩-১৫৫৫)

২৩) গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহ (১৫৫৫-১৫৬১ এবং ১৫৬৩-১৫৬৪)

২৪) গিয়াসউদ্দিন জালাল শাহ (১৫৬১-১৫৬৩ )

২৫) দ্বিতীয় গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহ (১৫৬৩-১৫৬৪)

২৬) তাজ খান কাররাণী (১৫৬৪-১৫৬৬)

২৭) সুলায়মান খান কাররাণী (১৫৬৬-১৫৭২)

২৮) বায়েজিদ খান কাররাণী (১৫৭২)

২৯) দাউদ খান কাররাণী (১৫৭২-১৫৭৬)

ঘন্টা কয়েক ছোটাছুটি। তাতেই সাঙ্গ গৌড় নগরী দর্শন। গুটি কয়েক চিহ্ন শতকের সাক্ষী হয়ে টিমটিম করে জ্বলছে। আর সব চুরি হয়ে গেছে। মেহেদীপুর সীমান্তে কোতোয়ালি গেট থেকে পিয়াসবাড়ি আসার পথের ধারে দেখলাম লুটন মসজিদ আর তাঁতিপাড়া মসজিদ। তারপর গেলাম নগরীর মূল কেন্দ্র এলাকায়। দেখলাম বড় সোনা মসজিদ বা বারো দুয়ারী মসজিদ, দাখিল দরওয়াজা,লুকোচুরি দরওয়াজা, কদম রসুল (সাঃ) মসজিদ, চিকা মসজিদ,বাইশ গজী দেওয়াল, ফিরোজ মিনার, বল্লাল বাটি। একটু দূরেই বিখ্যাত রামকেলি গ্রাম। হিন্দুর তীর্থস্থান। রথ দেখা আর কলা বেচা হবে। ইচ্ছে পূরণে সারথী রথ নিয়ে চললেন সেখানে। প্রায় ৫০০ বছর আগে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এ গ্রামেই রূপ ও সনাতন গোস্বামীকে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত করেন, যা এই স্থানকে পবিত্র তীর্থক্ষেত্রে পরিনত করে। বৈষ্ণবদের কাছে এ গ্রাম বৃন্দাবন তূল্য। দেখা হল সেই কেলি কদম্ব বৃক্ষ যার তলে বিশ্রাম নেন চৈতন্য মহাপ্রভু। তার নিচে একটি ছোট্ট মন্দিরে রক্ষিত আছে চৈতন্য চরন চিহ্ন। এখানেই নাকি দীক্ষিত হন রূপ সনাতন। দেখলাম রূপ সনাতনের রাধামাধব মন্দির। মনে মনে ভাবছি তাদের আশ্চর্য রূপান্তর কাহিনি। সনাতন গোস্বামী (জ্যেষ্ঠ) ও রূপ গোস্বামী (কনিষ্ঠ) দুই ভাইয়ের আদি নাম ছিল যথাক্রমে অমর ও সন্তোষ। পৈত্রিক বসবাস ছিল কাটোয়ার কাছাকাছি নবহট্ট বা নৈহাটি গ্রাম। পিতার মৃত্যুর পর যোগ দেন তৎকালীন বঙ্গের সুলতান হোসেন শাহের দরবারের রাজকাজে। সনাতন ছিলেন শাকর মল্লিক (ট্রেজারার), এবং শ্রী রূপ গোস্বামী বৃত হন দবীর-ই-খাস (ব্যক্তিগত সচিব) পদে। কিন্তু রাজকার্যে মন ছিল না তেমন দুই ভাইয়ের। মনে ছিল বৈরাগ্যের বীজ।এমনই সময়ে (১৫১৫) বৃন্দাবন যাত্রাপথে রামকেলি গ্রামে উপস্থিত হন চৈতন্য মহাপ্রভু। সেই খবর শুনে দু ভাই গোপনে সাক্ষাত করলেন মহাপ্রভুর সঙ্গে। বৈরাগ্যের বাসনা গ্রাস করল মন। মহাপ্রভুর কাছে বৈষ্ণব মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে রাজকার্য ত্যাগের সঙ্কল্প নিলেন কিন্তু কাজটা সহজ হল না। সে সময়েই হুসেন শাহ উড়িষ্যা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়ে সনাতনকে তার সঙ্গী হতে বলেন। কিন্তু এই নিকৃষ্ট কাজে যেতে রাজি নন সনাতন তাই অসুস্থতার ভান করে দরবারে যাওয়া বন্ধ করলেন। সন্দিহান সুলতান হঠাৎই একদিন হাজির হলেন তার বাসভবনে। কিন্তু সনাতন সুস্থ আাছেন দেখে সুলতান আবার তাকে উড়িষ্যা প্রদেশ আক্রমণে সহয়াতা করতে বলেন। সনাতন এ আদেশ মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে রাজকার্য থেকে অবসর গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। ক্রুদ্ধ সুলতান সনাতনকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিলেন। সনাতনকে বন্দী করা হল বারদুয়ারী মসজিদের অন্ধকুঠুরীতে। ওদিকে সুলতান গেলেন উড়িষ্যা আক্রমণে এদিকে ভাই রুপ গোস্বামী ঘুষ দিয়ে হাত করলেন কারা প্রধানকে। সাত হাজার স্বর্ণমুদ্রা বিনিময়ে সে এক রাত্রে কারাগারের গবাক্ষ খুলে দিল। গৌড় ছেড়ে তারপর দুই ভাই বৃন্দাবন যাত্রা করেন। তারপর ষড় গোস্বামী রূপে দুই ভাই বৃন্দাবনে বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার এবং কৃষ্ণলীলার স্থানসমূহ পুনরুদ্ধারে অগ্রণী ভূমিকা নেন। রূপ গোস্বামী ‘ভক্তিরসামৃতসিন্ধু’, ‘উজ্জ্বলনীলমণি’ এবং সনাতন গোস্বামী ‘হরিভক্তিবিলাস’ সহ অসংখ্য বৈষ্ণব শাস্ত্র ও ভক্তিমূলক গ্রন্থ রচনা করেন। তারা গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজে ‘রূপানুগ’ ধারার মূল ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। রামকেলি গ্রাম এখনও চৈতন্যদেব, রূপ সনাতনের স্মৃতি বুকে আগলে রেখেছে। সেই স্মৃতি স্মরণে প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের সংক্রান্তির দিন থেকে শুরু হয় বিখ্যাত রামকেলি মেলা। সপ্তাহব্যাপী এই মেলা উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন (৫১১ বছরের বেশি পুরনো) মেলা। মেলায় হরিনাম সংকীর্তন, পুজো, নানান অনুষ্ঠানে জমে ওঠে। একসময় এখানে জাতিভেদের বিরুদ্ধে গণবিবাহের আয়োজনও করা হতো। এখনও লক্ষ লক্ষ ভক্ত আসেন ভক্তির টানে।

পূণ্য অর্জন হল কিন্তু উদ্দেশ্য পূরণ হল কি! যা দেখলাম তা কতটুকু! সপ্তম শতক থেকে ষষ্টদশ শতক পর্যন্ত জীবন্ত একটা সমৃদ্ধ নগরী গেল কোথা! কঙ্কালের কয়েকটা হাড় আছে মাত্র! পাল,সেন শাসনের সাক্ষী কিছু ভগ্ন প্রস্তর খণ্ড। অবশ্য ২০০৩ সালে খননে আবিস্কৃত হয়েছে একটি প্রত্নস্থল। স্থানীয়রা বলেন বল্লাল বাটি। তবে তা কোন ভগ্ন বৌদ্ধ বিহারও হতে পারে! অন্য ঐতিহাসিক স্থাপনা গুলোর পরিচয়েও নানা প্রশ্ন চিহ্ন! আসলে এ দেশে ইতিহাস নিয়ে কেউ কোনদিন মাথা ঘামায়নি। ইতিহাস রচনা বা রক্ষার কোন রীতি ছিল না। বরং ইতিহাস ধ্বংস করাই ছিল রীতি। এক শাসক অন্যের স্মৃতি মুছে ফেলতে চাইতেন ইতিহাস থেকে। নিজের কীর্তির ফুল ফোটাতেন সাধের বাগানে। নতুন ছাঁচে ঢেলে সাজাতেন সব। গৌড় নগরীর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। এ দেশের প্রকৃত ইতিহাস নেই। অতীতের অধিকাংশ পুরাকীর্তি পুঁথিপত্র ধ্বংস হয়ে গেছে। যা আছে তাতেও বিভ্রান্তি। হাজার হাজার বছরের বদলে কালের সূত্র ছিন্ন বিচ্ছিন্ন। তাই গৌড় নগরীর কোন ইতিহাস নেই। বিদেশী পর্যটকের বিবরণ, সমসাময়িক কবি লেখকদের রচনায় উল্লেখ থেকে কিছুটা ধারণা মেলে।

হয়ত সব হারিয়ে যেত! কিন্তু গেল না। হঠাৎই এ দেশে হাজির হল ইংরেজ। তারাই এ দেশের আধুনিক ইতিহাস রচনার সূত্রপাত করে। পলাশী যুদ্ধের পর সুবে বাংলার রাজনৈতিক কর্তৃত্ব যখন ইংরেজের হাতে তখন এ দেশের মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতে চাইল শাসক ইংরেজ। তার আগে বিদেশীদের চোখে ভারত ছিল এক রহস্যময় দেশ। অসভ্য অশিক্ষিত অনুন্নত। মন্ত্র তন্ত্র যাদুবিদ্যা আর অলৌকিক বিশ্বাস নিয়ে বাঁচে মানুষ। পৃথিবীর কোন খবর রাখে না। তাই অবজ্ঞা তাচ্ছিল্য নিয়ে এসেছিল ইংরেজও। নিজেদের গর্ব অহংকার আর শাসনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে ইতিহাসকে অস্ত্র করতে চেয়েছিল ইংরেজ। বিদেশী শাসন যেন ভারতের নিয়তি। একটা হীনমন্য জাতিকে শাসন করা খুব সহজ। সেভাবেই ভারতের ইতিহাস লিখতে চেয়েছিল ইংরেজ।

কিন্তু কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে এল। নানান উৎখনন আর অনুসন্ধানে উঠে এল ভারতের বিষ্ময়কর ইতিহাস। সিন্ধু সভ্যতা, আর্য দ্রাবিড়দের সমৃদ্ধ জীবন ও সংস্কৃতির আলোয় চমকে উঠল ওরা। একদল ইংরেজ ঝোল নিজেদের কোলেই টানতে চেয়েছিল।

কিন্তু শিক্ষিত ভারতীয় ঐতিহাসিকরা প্রমাণ করলেন ভারতীয় সভ্যতা কারো অবদান নয়,স্বমহিমায় বিকশিত। তবুও ইংরেজের অবদান অস্বীকার করা যাবে না। তাদেরই উদ্যম উৎসাহ অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে উঠেছিল এ দেশের ইতিহাসের ভিত। এজন্য ভিনসেন্ট স্মিথ, আলেকজান্ডার ক্যানিংহাম, ম্যাক্সমুলার! হান্টার প্রমূখ ইংরেজ ঐতিহাসিকদের ঋণ শোধ হবে না কোনদিন। যাইহোক এই সময়ে বিষ্ময়করভাবে পাদপ্রদীপের আলোর উঠে এসেছিল বিস্মৃত গৌড় নগরী।

পলাশীর যুদ্ধের পর ইংরেজরা মালদহের ইংলিশ বাজারকে নতুন ব্যবসা ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলে। এ দেশে নীলচাষ শুরু হলে ইংলিশবাজারেও তৈরি হল কুঠি।

১৭৭৬ সালে নীলকুঠির কর্ণধার হয়ে এলেন স্কটল্যান্ডবাসী এক তরুণ হেনরি ক্রেইটন। এলাকায় পরিভ্রমনের সময় হঠাৎই একদিন তার নজরে পড়ল একটি প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষ। নগরের বিস্তার ও স্থাপত্য কীর্তি দেখে বিস্মিত হলেন। এ দেশ সম্পর্কে নিজের ধারণা হয়ত আছড়ে পড়েছিল কঠিন মাটিতে! শুরু হল ইতিহাসের খোঁজ। ১৮০৭ সালে তার অকাল মৃত্যু পর্যন্ত পরবর্তী ২১ বছর ধরে, ক্রেইটন এই ধ্বংসাবশেষ অনুসন্ধান করেন এবং ভুলে যাওয়া শহরের মানচিত্র এবং সৌধ স্থাপত্যের চিত্র অঙ্কন করেন। তার মৃত্যুর কয়েক দশক পরে, ১৮৬০-এর দশকে, ক্রেইটনের ফেলে রাখা কাজ আবার শুরু করলেন বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের একজন কর্মচারী জন হেনরি র‍্যাভেনশ। তিনিও বছরের পর বছর ধরে এই নগরের ধ্বংসাবশেষের ছবি তুলেছিলেন। এই সব দুর্লভ, ঔপনিবেশিক যুগের নথি এবং ছবিগুলি এখন সরমায়া ফাউন্ডেশনের সংগ্রহের অংশ। তবে এ সময়েও ইতিহাস চুরি থামেনি। স্থানীয় জমিদার এই কাজে অনুমতি দিয়ে মোটা টাকা উপার্জন করতেন। তাই ক্রেইটন, রাভেনশ যে অবস্থায় দেখেছিলেন গৌড়কে। আজ তার সামান্যই অবশিষ্ট আছে। আপাতত যে স্মৃতিটুকু বেঁচে আছে গৌড়ের বুকে তার পরিচয় তুলে ধরছি নিচে।

বাইশ-গজি প্রাচীর : এককালে গৌড়ের দুর্গের রক্ষাকবচ ছিল এই প্রাচীর। অধিকাংশ অংশই বর্তমানে বিলীন। যা আছে তাও ক্রমশ মলিন ধুলোবালিতে পরিণত হচ্ছে। এই প্রাচীরের উচ্চতা ৬৬ ফুট বা ২২ গজ। সে কারণেই এর নাম হয়েছে ‘বাইশ-গজি’। বলা হয় এটি নির্মাণ করেছিলেন বরবাক শাহ। ১৪৫৯-১৪৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন সুবে বাংলার সুলতান।

বড় সোনা মসজিদ :  গৌড়ের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে এটি অন্যতম বৃহত্তম স্থাপত্য। ১৫২৬ সালে এটির স্থাপনা করেছিলেন নাসিরুদ্দিন নসরত শাহ। এই মসজিদে এক সময় ৪৪টি গম্বুজ ছিল, যার মধ্যে বর্তমানে ১১টি টিকে আছে। বড় সোনা মসজিদের আর এক নাম বারো দুয়ারি, কারণ এর নাকি ১২টি দরজা কিন্তু এই মসজিদের পূর্ব দিকে রয়েছে মোট ১১টি বিশাল দরজা। অর্থাৎ বার(বহিঃ) দুয়ারের দরজা থেকেও এ নাম হতে পারে।

হাতি বাঁধা স্তম্ভ : গৌড়ের দুর্গ শহরে আগত দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায় দুটি সুসজ্জিত, অলংকৃত ও চিত্রিত স্তম্ভ। বড় সোনা মসজিদের পাথুরে স্তম্ভের সঙ্গে এই নির্মাণকাজের অদ্ভুত সাদৃশ্য রয়েছে। ধারণা করা হয় যে, এই স্তম্ভগুলিও এক সময় মন্দির বা মসজিদের অংশ ছিল। তবে কেউ জানে না, কবে ও কেন এগুলি মূল স্থান থেকে সরানো হয়েছিল। সম্ভবত, হাতি বাঁধার জন্য এগুলি পরে ব্যবহৃত হত তাই স্থানীয়রা এর নাম দেয় ‘হাতি বাঁধা থাম’।

দাখিল দরওয়াজা : গৌড়ের দুর্গের যে তিনটি তোরণ আজও টিকে রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হল দাখিল দরওয়াজা। এটি সালামি দরওয়াজা নামেও পরিচিত। দুর্গে যখন কোনও বিশিষ্ট অতিথি আসতেন তখন এখান থেকে তাঁকে বন্দুক দেগে অভ্যর্থনা জানানো হত, তাই এমন নাম। এই ইমারতের মধ্যে ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্যগুলি মিশ্রিত হয়েছে এবং সূক্ষ্ম টেরাকোটার কাজও আছে। আছে ফ্লোরাল ও জ্যামিতিক নকশা। ইঁটে নির্মিত এই তোরণের চার কোণে রয়েছে চারটি মিনার।

ফিরোজ মিনার : পঞ্চদশ শতকে হাবসী সুলতান সাইফুদ্দিন ফিরুজ শাহ নির্মাণ করেছিলেন ফিরোজ মিনার। পাঁচ তলা বিশিষ্ট এটি এক বিজয়-স্তম্ভ। বরবাক শাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করার পর এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। সেই স্মৃতি আজও বহন করছে এই ইমারত। এর উচ্চতা ৮৫ ফুট। এক সময় বিশালাকায় গম্বুজ ছিল যার উপর পরে সমতল ছাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে একটি মজার ও দুঃখজনক জনশ্রুতি আছে। যে রাজমিস্ত্রি এটা তৈরি করছিল সে উচ্চতা কম করলে সুলতান কৈফিয়ত চান। সে মালমশলা কম ছিল বলে জানালে ক্রুদ্ধ সুলতান তাকে মিনারের উপর থেকে নিচে ফেলে দেওয়ার আদেশ দেন।

তাঁতিপাড়া মসজিদ : ১৪৭৪-১৪৮০ সালে মধ্যে নির্মিত এই এই মসজিদের সঙ্গে স্থানীয় তাঁতি সম্প্রদায়ের গভীর যোগাযোগ ছিল। তাঁতিপাড়া মসজিদ সুন্দর টেরাকোটার কাজে সমৃদ্ধ। গৌড়ে যতগুলি সুদৃশ্য মসজিদ রয়েছে তার মধ্যে এই মসজিদের টেরাকোটার কাজ বিখ্যাত। কিন্তু সময় বড় নির্মম। এক সময় ১১০টি গম্বুজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকত যেখানে আজ সেখানে একটাও গম্বুজ নেই। পূর্ব দিকের দেওয়ালের একটা বড় অংশও ভেঙে পড়েছে। তবুও এই মসজিদ সেই সময় বাংলার তাঁতি সম্প্রদায়ের সমৃদ্ধির কথা বলে।

চামকাটি মসজিদ : চামকাটি মসজিদের এমন নাম হল কেন তা নিয়ে নানা রকম তত্ত্ব প্রচলিত রয়েছে। কেউ মনে করেন, ‘চাম কাটি’ এসেছে ‘চামড়া কাটা’ থেকে। মনে করা হোয মুসলিম ‘লেদার’ শ্রমিকদের দেওয়া এই নাম। আবার অনেকের বিশ্বাস, মসজিদের নাম ‘চামকাথি’ থেকে এসেছে যার অর্থ হল সংকীর্ণ প্রবেশ পথ। ১৪৭৫ সালে এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন শামসুদ্দিন ইউসুফ শাহ।

চিকা মসজিদ : সুলতান ইউসুফ শাহ ১৪৭৫ সালে চিকা মসজিদ নির্মাণ করেন। এই নামটি এসেছে এই কারণে যে এটিতে প্রচুর সংখ্যক চিকা বা বাদুড় বাস করত। এটি একটি একগম্বুজ বিশিষ্ট ভবন, যা এখন প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। দেয়ালে সুন্দরভাবে খোদাই করা খোদাই করা খোদাই এবং দরজা এবং লিন্টেলের পাথরের কাজগুলিতে হিন্দু মূর্তির ছবি এখনও দৃশ্যমান।

লুকোচুরি গেট : লুকোচুরি গেটটি কদম রসুল মসজিদের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। শাহ সুজা ১৬৫৫ সালে মুঘল স্থাপত্য শৈলীতে এটি তৈরি করেছিলেন বলে জানা যায়। সুলতান নাকি তার বেগমদের সাথে এখানে লুকোচুরি খেলতেন তাই নামটির উৎপত্তি। ইতিহাসবিদদের আরেকটি মত অনুসারে, ১৫২২ সালে আলাউদ্দিন হুসেন শাহ এটি নির্মাণ করেছিলেন। রাজপ্রাসাদের পূর্ব দিকে অবস্থিত, এই দ্বিতল দরওয়াজাটি কার্যকরীভাবে প্রাসাদের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করেছিল। এর উদ্ভাবনী স্থাপত্য শৈলী এটিকে একটি আকর্ষণীয় স্থান করে তুলেছে।এই তোরণে আজও সূক্ষ্ম পলেস্তারা-কর্মের চিহ্ন রয়ে গেছে। এই তোরণের সমগ্র বাইরের অংশটা এক কালে আবৃত ছিল রঙিন মিনে করা এনামেলের টালি দিয়ে।

কদম রসুল মসজিদ : ফিরোজ মিনার থেকে আধা কিলোমিটার দূরে কদম রসুল মসজিদ অবস্থিত। যথাযথ নাম কদম রসুল, যার অর্থ নবীর পদচিহ্ন, মসজিদটিতে পাথরে হযরত মুহাম্মদের পদচিহ্ন রয়েছে। চার কোণে কালো মার্বেল দিয়ে তৈরি চারটি মিনার রয়েছে, যার উপরে চূড়াগুলি জটিল শিল্পকর্ম দিয়ে আবৃত। সুলতান নাসিরুদ্দিন নুসরত শাহ ১৫৩০ সালে মসজিদটি নির্মাণ করেন।

ফতে খানের সমাধি :  কদম রসুল মসজিদের বিপরীতে আওরঙ্গজেবের সেনাবাহিনীর সেনাপতি ফতেহ খানের ১৭ শতকের সমাধি রয়েছে। এই আকর্ষণীয় কাঠামোটি হিন্দু চালা শৈলীতে নির্মিত হয়েছিল।

গুমতি দরওয়াজা : চিকা মসজিদের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত, গুমতি দরওয়াজাটি ১৫১২ সালে আলাউদ্দিন হুসেন শাহ কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। ইট এবং পোড়ামাটির তৈরি, শিল্পকর্মে বোনা একসময়ের উজ্জ্বল রঙ এখন বিবর্ণ। বলা হয় অলংকরণে আসল সোনা ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে। তবে সে কথা সত্য নয়। উজ্জ্বল হলুদ মীনা করা ইটের রঙ এই বিভ্রান্তির কারন। দরওয়াজাটি এখন জনসাধারণের জন্য বন্ধ।

ইতিহাস ও কল্পকাহিনীর সংমিশ্রণে এই লেখা। উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া থেকে নানান তথ্য সংগৃহীত।


আপনার মতামত লিখুন :

2 responses to “পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত”

  1. AYAN MUKHOPADHYAY says:

    ভালো লাগলো

  2. Subrata Dutta says:

    অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই ‘পেজ ফোর’ ওয়েব ম্যাগাজিনের মাননীয় সম্পাদক ও সহযোগীদের আমার এই লেখা প্রকাশের জন্য।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন