কিশোরী রাজকন্যা আশমানতারা হারিয়ে গেছে। সন্ধ্যা তারার মত সবে ফুটেছিল আশমানে। মাটির পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে একদিন চমকে উঠল সে। পিতা তার গৌড়ের সুলতান শিহাব উদ্দীন বায়োজিদ শাহ। একদিন পিতা যখন দরবারে, চিকের আড়ালে থেকে সে উঁকি দিয়েছিল সেখানে। তার পর থেকেই হারিয়ে গেছে সে। দেখেছিল এক দেবকান্তি যুবাকে। প্রথম দর্শনেই হারিয়েছিল সব। কিন্তু কে ঐ পুরুষ? গোপনে খবর নিয়ে জানতে পারল সে দিনাজপুরের ভাতুড়িয়ার জমিদার গনেশ নারায়ণ ভাদুড়ীর জৈষ্ঠপুত্র। জমিদার হলেও তখন গৌড়ের দরবারে গনেশের অপ্রতিহত প্রতাপ। তার অঙ্গুলিহেলনে বদলে যায় মসনদের মালিক। একে একে নিহত হয়েছেন সুলতান গিয়াসউদ্দিন,সয়ফউদ্দিন হামজা শাহ। মসনদে এখন শিহাব উদ্দিন বায়োজিদ শাহ। জমিদার গনেশের লক্ষ্য গৌড়ের সিংহাসন। তাই পথের কাঁটা সরাতে ব্যস্ত তিনি। কিশোরী আশমানতারা কুটিল রাজনীতির বোঝো না। তার লক্ষ্য যদু নারায়ণ। তার মনের আশমানে তারা হতে চায় সে। কিন্তু দু-জনের মাঝে দুস্তর দরিয়া। কেমন করে পার হবে! হঠাৎই ঘোর কেটে গেল কল্পনার।

ইতিহাসের আকাশ থেকে আছড়ে পড়লাম বাস্তবের কঠিন মাটিতে। টোটো চলছে অন্য পথে। হাতের আ্যন্ড্রয়েড ফোনে গুগল ম্যাপ খোলা। তাতে হোটেলের অবস্থান ও পথ দেখতে পাচ্ছি। টোটো ওয়ালাকে বলতেই আশ্বস্ত করল, ওটা ঘুরপথ, গাড়ির জট। এ দিকে সর্টকাট। হতেই পারে! চোখের সামনে দেখছি হাজারো টোটো। তার ভীড়ে চিড়ে চ্যাপ্টা অন্য গাড়ি। এটাই এখন এ রাজ্যে সব শহরের ছবি। নেই কাজ তো খই ভাজ। বেকার ছেলেরা এখন একটা টোটো কিনে বেরিয়ে পড়ে পথে। ড্রাইভারী লাইসেন্স লাগে না। কাগজ পত্রের দরকার নেই। রোজগারের সহজ সরল পথ এটাই। টোটো ওয়ালা তার ক্ষোভ দুঃখের কাহিনী শোনাচ্ছিল পথে। ছেলেটা বেশ ভালো। তাই ওর কথায় অবিশ্বাস হল না। পরের দিনের পরিক্রমায় ওকেই সঙ্গে নেব ভাবছি। কথাও হল। এখন অলিগলি রাস্তা ধরে টোটো চলছে। মাথায় সন্দেহের ঘনঘটা। কিন্তু কিছুই করার নেই। অচেনা শহরে এসেছি। এখন ওদের কথাই শুনতে হবে।

এতক্ষণ ছিলাম সুদূরের এক দেশে। সেখানে পৌঁছানোর যানবাহন নেই। সময়ের সমুদ্র সাঁতরে পৌঁছাতে হয় সেখানে। হাজার বছর পিছনে পাড়ি। তার পর সেই দেশ, অচেনা মানুষ, অজানা ইতিহাস। ধনধান্য পুস্পে ভরা এক দেশ। সেই সুখ শান্তির নীড়ে আশ্রয় নিয়েছে কত বিদেশীর মানুষ। আমাদের রক্তলেখায় আছে সে কথা। সে দেশের মানুষ একদিন রচনা করেছিল নতুন ইতিহাস। সে ইতিহাস বড়ই গৌরবের। আমরা ভুলে গেছি সব। কিন্তু তার ইঁট কাঠ পাথর বইছে স্মৃতি। কত কথা বুকে নিয়ে নির্বাক হয়ে আছে ইতিহাস। ঝর্ণা পাহাড় সমুদ্র অনেক দেখেছি। সে দেখা ফুরিয়ে যায় ঘর ফিরে। সে দেখা মর্ম স্পর্শ করে না। আর ইতিহাস আলো জ্বালে অন্তরে। তবে ইঁট কাঠ পাথরের কথা শুনতে হলে পৌঁছাতে হবে সেই সময়ের মাঝে। অনুভবের স্পর্শে তখন প্রাণ পাবে পাথর। শোনাবে বোবা বুকে জমা ইতিহাসের কথা।
তখন এ বাংলা ছিল না। সভ্যতার আদি লগ্নে সমুদ্র থেকে জেগে উঠেছে অসংখ্য ভূখণ্ড। অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ পুণ্ড্র সমতট, নানান নাম। আর্যদের কাছে এ ছিল বার্ত্য ভূমি। এখানকার মানুষজন ছিল অস্পৃশ্য। এখানে পর্যটনের প্রায়শ্চিত্তের বিধান ছিল। সে ছিল প্রাগৈতিহাসিক যুগ। তার পর গ্রীক ইতিহাসে প্রথম জানা গেল গঙ্গারিড়ি জাতির কথা। ভীষণ পরাক্রম ছিল তাদের। দিক বিজয়ী বীর আলেকজান্ডারের সৈন্যরা তাদের ভয়ে পিছু হটেছিল। সেই সব রাজ্য গুলো মিলে এক সময় গড়ে উঠেছিল গৌড় বঙ্গ। ইতিহাসেও বিশিষ্ট স্থান পেয়েছিল। এক সময় সমগ্র উত্তর ভারত শাসন করেছিল বাংলা। সম্রাট শশাঙ্কের আগে বাংলার স্বীকৃত ইতিহাস ছিল না। বাংলাকে সেই মর্যাদা এনে দেন গৌড় ভুজঙ্গ শশাঙ্ক। তার পর বাংলার পাল ও সেন বংশ পাঁচশো বছর উত্তর ভারতের অধিকাংশ এলাকা শাসন করেছেন। ভারতের ইতিহাসে বাংলা তখন বিখ্যাত গৌড়বঙ্গ নামে। কালের গর্ভ থেকে কেমন করে উঠে এসেছিল গৌড় জনপদ আসুন একটু জানি।

অতীত ইতিহাসে গৌড় নামটি সুপরিচিত হলেও এর ভৌগোলিক অবস্থান সম্বন্ধে সুনির্দিষ্ট ধারণা করা কষ্টসাধ্য। তবে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বঙ্গ, পুন্ড্র ও কামরূপের সাথে গৌড়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। কামরূপ ও পুন্ড্রের সঙ্গে একত্রে উল্লেখের কারণে এর অবস্থান যে পূর্বভারতেই ছিল সন্দেহ নেই। বাৎসায়নও (তিন-চার শতক) এই জনপদের উল্লেখ করেছেন। বিভিন্ন পুরাণেও গৌড়কে পূর্বদেশের জনপদ হিসেবে দেখানো হয়েছে। বরাহমিহিরের (খ্রি. ছয় শতক) বৃহৎসংহিতাতেও গৌড়ের উল্লেখ আছে। এখানে গৌড়ক, পুন্ড্র, বঙ্গ, সমতট, বর্ধমান এবং তাম্রলিপ্তি নামে ৬টি জনপদের নাম পাওয়া যায়। তাঁর বর্ণনানুযায়ী মুর্শিদাবাদ, বীরভূম এবং পশ্চিম বর্ধমান নিয়ে ছিল প্রাচীন গৌড় রাজ্য। আদি অভিলেখ-র মধ্যে খ্রিস্টীয় ৫৫৪ অব্দে উৎকীর্ণ মৌখরি বংশীয় রাজা ঈশান বর্মণের হরাহ লিপিতে গৌড়বাসীর উল্লেখ পাওয়া যায়। এ লিপি থেকে জানা যায় যে, ঈশাণ বর্মণ সমুদ্র তীরের অধিবাসী গৌড়দের পরাস্ত করেন (গৌড়ান্-সমুদ্রাশ্রয়ান্)। প্রবোধশিবের (খ্রি. এগারো শতক) গুর্গি লিপি থেকেও এ উক্তির সমর্থন মেলে। এতে গৌড়ের রাজাকে সমুদ্রের জলদুর্গে বসবাসকারী বলে বর্ণনা করা হয়েছে (জলনিধি জলদুর্গম গৌড়রাজ ধিশেতে)। উক্ত দুটি প্রমাণ থেকে অন্তত এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, কোনো একসময় গৌড় জনপদ সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
মূলত সময় এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের সাথে সাথে গৌড় নামের অর্থেরও পরিবর্তন হয়। সাত শতকের প্রথম দিকে গৌড়ের অত্যন্ত শক্তিশালী রাজা শশাঙ্ক গৌড়ের সীমার সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন। চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং কর্ণসুবর্ণ থেকে উপকূলীয় উড়িষ্যা পর্যন্ত অঞ্চলে ভ্রমণ করেছিলেন এবং ওই এলাকায় শশাঙ্ক শাসন করতেন। উল্লেখ্য, বাণভট্ট হর্ষচরিত-এ কর্ণসুবর্ণের রাজা শশাঙ্ককে ‘গৌড়-ভুজঙ্গ’ (ভয়ঙ্কর গৌড় সর্প) বলে বিভূষিত করেছেন। খ্রিস্টীয় সাত শতকের প্রথমার্ধে গৌড় ও কর্ণসুবর্ণ সমার্থক হয়ে উঠেছিল। হিউয়েন সাং-এর ভ্রমণকাহিনী তে বর্ণিত কর্ণসুবর্ণ ও তার উপকণ্ঠে অবস্থিত রক্তমৃত্তিকা বিহার যে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ছিরুটি অঞ্চলে অবস্থিত ছিল বর্তমান প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননে তা প্রামানিত। আর একারণেই মুর্শিদাবাদ গৌড়ের কেন্দ্রবিন্দু বলে পরিগণিত হয়।

এরপর গৌড়ের রাজনৈতিক পরিধি আরও একধাপ বৃদ্ধি পায়; উত্তরবঙ্গ অর্থাৎ পুন্ড্রবর্ধন পর্যন্ত এর বিস্তৃতি ঘটে। বৌদ্ধগ্রন্থ আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্পের বর্ণনানুযায়ী পুন্ড্রবর্ধন রাজা শশাঙ্ক কর্তৃক শাসিত হতো। ভাস্কর বর্মণের দুবি তাম্রফলকে বর্ণিত কামরূপের সুস্থিত বর্মণ এবং ভাস্কর বর্মণের সঙ্গে গৌড়ের রাজার সংঘর্ষের কাহিনী উক্ত মতকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করে। পক্ষান্তরে ভাস্কর বর্মণের (আনুমানিক খ্রি. সাত শতক) সমসাময়িক শাসক হিসেবে শশাঙ্ককে নির্ধারণ করা হয়। আলোচ্য সংঘর্ষ সম্ভবত উত্তরবঙ্গে কোথাও সংঘটিত হয়েছিল। হিউয়েন সাঙ-এর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, পুন্ড্রবর্ধন ও কামরূপ রাজ্য দুটি পরস্পর সংযুক্ত ছিল। বোঝা যায় শশাঙ্কের শাসনাধীন এলাকায় অন্তত কিছু সময়ের জন্য কামরূপ বা অধুনা আসামও সংযুক্ত ছিল।
আদি মধ্যযুগে গৌড়ের ভৌগোলিক ধারণার আরও ব্যাপ্তি ঘটে। রাষ্ট্রকূট ও প্রতিহারদের বিভিন্ন সূত্রে পাল নরপতিগণ গৌড়েশ্বর, গৌড়েন্দ্র, গৌড়রাজ প্রভৃতি উপাধিতে আখ্যাত হয়েছেন। এ তথ্য নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে, খ্রিস্টীয় আট এবং নয় শতকে গৌড়ের, যা এক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের একাংশ হিসেবে চিহ্নিত ছিল, পরিব্যাপ্তি ঘটে। কখনও কখনও সমগ্র পাল সাম্রাজ্য তথা উত্তর ভারতের অধিকাংশ এলাকাকেই তখন গৌড়রাজ্য বলা হতো। শৌর্য বীর্যে বাঙালি তখন উচ্চ শিখরে।
কাশ্মীরের বিখ্যাত ইতিহাস, কলহনের রাজতরঙ্গিণীতে প্রথম ‘পঞ্চগৌড়’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এ তথ্য আলোচ্য অঞ্চলের পরিসীমার ব্যাপকতাই নির্দেশ করে। বঙ্গ দেশিয় গৌড়, সারস্বত দেশ (পাঞ্জাবের পূর্বভাগ), কান্যকুব্জ, মিথিলা ও উৎকল এ পাঁচটি দেশ একত্রে পঞ্চগৌড় বলে অভিহিত হয়েছে।

পঞ্চগৌড়, ইতিহাসে বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন। তার সূতিকাগার ছিল আজকের মুর্শিদাবাদ জেলার কর্ণসুবর্ণ। সম্রাট শশাঙ্কের পরে কর্ণসুবর্ণ হারিয়ে গেল। তারপর মৎস্যন্যায়ের অন্ধকার ভেদ করে উঠে এল পাল বংশ। শুরু হল বাংলার গৌরবের নতুন অধ্যায়। সে গৌরবের কেন্দ্রভূমি হল গৌড় নগরী। কখন কিভাবে এই নগরের পত্তন কেউ জানে না। অনেকের ধারণা মগধে প্রদ্যোতন রাজারা যে সময় রাজত্ব করতেন সে সময় ভোজ নামক এক ব্যক্তি গঙ্গা পুলিণে গৌড় নগর স্থাপন করেন। তিনি অযোধ্যার অন্তর্গত গৌড়ের অধিবাসী ছিলেন। জন্মভূমির নামানুসারে স্বীয় প্রতিষ্ঠিত নগরীর তিনি নামকরণ করেন গৌড়। কিন্তু এ দাবির সপক্ষে তেমন প্রমাণ নেই। তবে তা যদি সত্য হয়ে থাকে তবে গৌড় নগরী যে খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতকে নির্মিত হয়েছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। আর এ মতও প্রচলিত যে প্রাচীন পুন্ড্র জনপদে কোন কোন অঞ্চলে আখ থেকে গুড়ের খুব উৎপাদন ছিল। চিনি বা গুড় ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবেই নাকি গৌড় নগরীর পত্তন।পাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা গোপালের রাজধানী ছিল নাকি এখানেই। তার পরবর্তী রাজাদের জয়স্কন্ধাবার (শাসন কেন্দ্র) ছিল মুদগিরি বা মুঙ্গের, পাটলিপুত্র, বিক্রমপুর। মহীপাল, রামপালের সময়কালে রামাবতী শহর নতুন রাজধানী হয় এবং শেষ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল (বর্তমানে মালদহ অঞ্চলে)। পাল বংশের শেষ শাসক মদন পালকে পরাজিত করে গৌড় রাজ্য তথা নগরীর দখল নেন সেন বংশের রাজা বল্লাল সেন। লক্ষন সেন এই শহরের নাম দেন লক্ষনাবতী। অর্থাৎ এটাই ছিল তাদের প্রধান শাসন কেন্দ্র। তার কারণ নগরের ভৌগলিক অবস্থান। তখন যোগাযোগের প্রধান ও নিরাপদ মাধ্যম ছিল নদীপথ। এছাড়া বানিজ্য বা সামরিক প্রয়োজনেও তখন নদীর ভীষণ গুরুত্ব ছিল। গৌড় নগর ছিল গঙ্গা, মহানন্দা ও তাদের নানান শাখা নদীর দুর্ভেদ্য অবস্থানে। উত্তর ভারত ও বাংলার সমগ্র এলাকার সঙ্গে সহজ যোগাযোগের কারনেই বিভিন্ন শাসক তাদের রাজধানী হিসেবে এই নগরকে বেছে নিয়েছেন বারবার। যদিও সেই সময়ে শাসকদের একাধিক রাজধানী বা শাসনকেন্দ্র থাকত। তাদের জয়স্কন্ধাবার বলা হত। যেমন সেন শাসকদের ছিল বিজয়পুর, বিক্রমপুর নবদ্বীপ শহরে। লক্ষন সেনের শেষ বয়সে (১২০৪) নবদ্বীপ আক্রমণ করে বখতিয়ার খলজী। সম্ভবত আক্রান্ত হবার ভয়ে আগেই তিনি লক্ষনাবতী ছেড়ে যান। এর পরেই গৌড়ের দখল চলে যায় বখতিয়ারের হাতে। তার নাম হল লখনৌতি। বাংলায় শুরু হল মুসলিম শাসন। লক্ষন সেন নবদ্বীপ ত্যাগ করে চলে যান পূর্ব বঙ্গের বিক্রমপুর। সেখানে তিনি ও তার বংশধররা রাজত্ব শুরু করেন। এদিকে গৌড় নগরী হল মুসলিম শাসকদের রাজধানী শহর।

বাংলার সুলতানী আমলে গৌরবের শিখর স্পর্শ করেছিল গৌড়। তারপর শুরু হল পতনের পর্ব। গৌড়ের দর্শন পর্বে সে কথা বিস্তারিত জানাবো। বাংলায় মুঘল শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত ও বিস্তারিত হলে ঢাকা শহর হয় তাদের শাসন কেন্দ্র। ১৬১০ সালে সুবেদার ইসলাম খান চিশতি রাজধানী স্থানান্তর করে ঢাকা’র নাম দেন জাহাঙ্গীরনগর। তার আগে সুবেদার মানসিংহ ও শাহ সুজা (১৬৫০-৬০) সাময়িক রাজধানী স্থানান্তরিত করেছিলেন বিহারের রাজমহল। মীরজুমলা আবার তা ঢাকা শহরে ফিরিয়ে আনেন। সম্রাট ঔরঙজেবের সময় (১৭০৪ খ্রিস্টাব্দ) মুর্শিদকুলি খান তার রাজস্ব বিভাগ নিয়ে আসেন মুর্শিদাবাদ শহরে। নবাবী শাসনে সেটাই হল বাংলা বিহার ও উড়িষ্যার রাজধানী। ওদিকে গৌরবহারা গৌড় জনবর্জিত হয়ে পড়ে রইল অন্ধকারে অতীতের ইট কাঠ পাথর নিয়ে। শুধু ইতিহাস পাগলরা ভোলেনি তাকে। প্রতি বছর আসে তার খোঁজে। কিন্তু হিসেব মেলে কি! কোথা সেই ৮০০ বছর? কোথা সেই সুরম্য সৌধ, রাজপ্রসাদ,বিহার মন্দির? কোথা গেল সুলতানী বিলাশ বৈভবের স্থাপত্য নিদর্শন? কোথা লক্ষ লোকের কলকণ্ঠে ভরা রাজপথ? বিদেশী পর্যটকদের চোখে যা ছিল কনস্ট্যন্টিনোপল শহরের সমতূল, আজ তার চিহ্ন নেই। শুধু কটা জীর্ণ মসজিদ,ভগ্নস্তূপ ইট কাঠ পাথর সাক্ষী হয়ে আছে অতীতের। তাকে আজ পথে পথে খুঁজে বেরাতে হয়।
ইতিহাসের কি নির্মম পরিহাস! কিছু বিচ্ছিন্ন সময় বাদে প্রায় ৮০০ বছর যে নগর বাংলা তথা উত্তর ভারতের শাসন কেন্দ্র ছিল,যে নগরের পরিচয়ে একদিন পরিচিত হত আপামর বাঙালি, যে নগরের নামে গড়ে উঠেছিল এক বিশাল দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্য,ইতিহাসে যার নজির খুব কম। যে ইতিহাস রচনা করেছিল তাকেই হারিয়ে যেতে হল ইতিহাসে! রবীন্দ্র অনুভবেও সেই অমোঘ উচ্চারণ।
“রাজছত্র ভেঙে পড়ে,
রণডঙ্কা শব্দ নাহি তোলে,
জয়স্তম্ভ মূঢ় সম অর্থ তার ভোলে,
রক্ত মাখা অস্ত্র হাতে যত রক্ত আঁখি
শিশুপাঠ্য কাহিনীতে থাকে মুখ ঢাকি।”
ছবি : লেখক